আলাস্কার অন্দরে

সচ্চিদানন্দ দত্ত


~ আলাস্কার আরও ছবি ~

উপক্রমণিকা
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯ তম রাজ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত আলাস্কা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, মাঝখানে কানাডা। আয়তনে বিশাল - ভারতবর্ষের অর্ধেক। আর জনসংখ্যা? ব্যারাকপুর থেকে বেলঘড়িয়া যত লোক তার চেয়েও কম - কুল্লে সাত লাখ চল্লিশ হাজার। তায় আবার এর অর্ধেক মানুষ বাস করেন অ্যাঙ্করেজ শহরে – আলাস্কার বৃহত্তম শহর। উত্তর মেরুরেখা (Arctic Circle) মাঝ বরাবর বিস্তৃত, শীতকালে অরোরা বোরিয়ালিস দেখা যায়। সুতরাং আমাদের এই রোদ বৃষ্টি ঘাম থেকে হাজার যোজন বিপরীতে উত্তর মেরুর কোলঘেঁষা এও এক নিশীথ সূর্যের দেশ - ঠান্ডা আর বরফের চাদর ঢাকা। তবে সেসব শীতকালে। গরম কালে আলাস্কা এক নিসর্গ স্বর্গ।

প্রস্তুতি
মোটামুটি ভাবে আলাস্কায় দুটো সার্কিটে ট্যুর হয়। বেশি জনপ্রিয় 'ইনসাইড প্যাসেজ' - বিশাল বিলাসবহুল জাহাজ বা ক্রুইজে - প্রায় একটা ফাইভ ষ্টার হোটেলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাসমান। অন্য দেশের আর বয়স্কদের কাছে এটাই সুবিধেজনক, বুক করলেই আর কোনও অসুবিধা নেই। আমি অন্য সার্কিটটা নিয়েছিলাম, সাউথ সেন্ট্রাল আলাস্কা - যাতে মেনল্যান্ডের অভ্যন্তরেও বেশ কিছুটা সেঁধানো যাবে আর আলাস্কার আত্মাটা যদি কিছু অনুভব করা যায়। আমেরিকানরা অনেকেই এভাবেই ঘোরেন। কিন্তু ড্রাইভার চাই। নিজেদেরই ড্রাইভ করতে হবে, রেন্টাল কার তুলনামূলক শস্তায় পাওয়া যায়, পেট্রলের দাম আমাদের চেয়েও কম, লিটার পিছু পঞ্চাশ টাকা। বড় ছেলের কাঁধে ভর করে বুকিং শুরু করে দিলাম,ও ভালোই ড্রাইভ করে। তবে ক্রুইস ও ল্যান্ড জুড়ে ঘোরা যায়, অবশ্যই সেটা আরও সময় ও খরচ সাপেক্ষ। আর আছে আর ভি রেন্টাল – ক্যারাভান বা চলমান বাড়ি, হোটেল বুক করার ঝামেলা নেই, এও বেশ জনপ্রিয়।
অ্যাঙ্করেজ আলাস্কার বৃহত্তম শহর, এখান থেকেই যাত্রা শুরু। কেনাই ফোর্ড ও দেনালি - দুটো ন্যাশনাল পার্ক ঘোরা মনস্থ করলাম। অ্যাঙ্করেজ, সিওয়ার্দ, পামার ,দেনালি দু দিন করে মোট আট দিনের বুকিং সেরে ফেললাম। জুন থেকে সেপ্টেম্বর টুরিস্ট সিজন, বাকি বছর শুনশান, বরফ আর ঠান্ডার কব্জায়। তাই হোটেলের ভাড়া একটু বেশি। ঝোপ বুঝে আর নেট ঘেঁটে কিছুটা কমে ম্যানেজ করা গেল। কোথায় থামব, কতটা চলব এই স্বাধীনতাটাই এ ভাবে ঘোরার প্রাপ্তি।


অ্যাঙ্করেজ
তেসরা জুন ২০১৬, বিকেল সাড়ে চারটেতে যখন প্লেন ছাড়ল, সানফ্রান্সিসকোতে ঝকঝকে দুপুরই বলা চলে। সাতটায় সল্টলেক সিটি – তখনও বাইরে বেজায় আলো। রাত সাড়ে এগারোটায় যখন অ্যাঙ্করেজ-এ নামলাম তখনও দিব্যি দিনের আলো। পরদিন শহর ঘোরাঘুরি। প্রথমে কিনকেড পার্ক - সমুদ্রের কাছেই,পরপর পাঁচ-ছটা মাঠে তুমুল ফুটবল খেলা চলছে,কচিকাঁচা থেকে বড়রা সবাই সামিল। মাঠ ঘিরে প্রচুর দর্শক – শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। রীতিমতো মেলা। শহর ঘুরতে লাগলাম - চওড়া ঝকঝকে রাস্তা, ছিমছাম বাড়ি ঘর, ধোপদুরস্ত দোকানপাট ও ডাউনটাউন-এ উঁচু উঁচু বহুতল - টিপিকাল আমেরিকান শহর। মাঝে সাবওয়েতে লাঞ্চ সেরে অ্যাঙ্করেজ মিউজিয়ামে ঢুকলাম। মূলত ছবি ও ভিডিও সহযোগে উত্তরের আবহ ধরার প্রয়াস – ইতিহাস ও সংস্কৃতি। ঠিক হৃদয়গ্রাহী হয়নি। এরপর ঘুরতে ঘুরতে গেলাম ফিশ ক্রিকে - ছোট্ট নদী, চওড়া কিন্তু হাঁটু জল। সেখানে উদ্দাম মাছ ধরা চলছে, মায় নদীতে নেমে পর্যন্ত, পায়ে গামবুট, সুদৃশ্য হুইলঅলা ছিপ, পাশে মাছ রাখার কনটেনার, গায়ে বর্ষাতি – সে এক এলাহি কারবার! নতুন নতুন লোক নব নব উদ্যমে এই মাছ ধরার মচ্ছবে এসে লেগে পড়ছে। সবাই ট্যুরিস্ট। আসলে বহু আমেরিকানের কাছে আলাস্কায় মাছ ধরা এক বিরাট বিনোদন ক্ষেত্র। দেখতে দেখতে প্রায় পঁচিশ-তিরিশ জন "মৎস্য মারিব খাইব সুখে" বুঁদ হয়ে গেল। জায়গাটা সত্যিই খুব মনোরম। প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ হোটেলমুখো হলাম, তখনও পার্কিং লটে নতুন গাড়ি ঢুকছে। তবে ওই তিন ঘণ্টায় কারও কাছে একটা মাছের লেজ পর্যন্ত দেখিনি।

কেনাই ফিওর্ড ন্যাশনাল পার্ক
এবার রওনা সেওয়ার্দ, ১৩০ মাইল পথ। একদিকে পাহাড় উঠে গেছে প্রায় খাড়া, অন্যদিকে সমুদ্র খাঁড়ি - টার্ন এগেইন আর্ম। অসাধারণ রাস্তা। তিন ঘন্টার পরিবর্তে পাঁচ ঘন্টা লেগে গেল - থামতে থামতে, নামতে নামতে - ছবির মতো। পরের দিন লঞ্চ ট্যুর ন্যাশনাল পার্কের অভ্যন্তরে। ঠিক ঘড়ি ধরে দশটায় ছেড়ে দিল। আলাস্কা যথার্থই একটা ইউ.এস.এ. স্টেট,অনেক ব্যাপারেই। যাইহোক রেজারেকসন বে ধরে লঞ্চ এগিয়ে চলল ২২ নট স্পিডে, বসার ব্যবস্থাপনা সুন্দর। দুপাশে পাহাড় আর মাথায় গায়ে ছোপ ছোপ বরফের চুমকি। আধ ঘন্টাটাক বাদে একটা খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁসে লঞ্চ প্রায় দাঁড়িয়ে গেল,বেশ কিছু করমোরান্ট পাখি বসে আছে, কালো ও লাল ঝুঁটি। কিছুক্ষণ বাদে একটি ছোট্ট পাহাড়ি দ্বীপের দিকে লঞ্চ ধীরে ধীরে সরতে লাগল, গায়ে এবং খাঁজে অনেকগুলো সি-লায়ন (Sea-Lion) শুয়ে আছে পরম নিশ্চিন্তে, আলস্যে - বিস্মিত হচ্ছিলাম থেকে থেকে! ডেকে একজন গাইড ছিলেন,তিনিই সব দেখাচ্ছিলেন। এরপরে একটা জায়গায় পৌঁছে লঞ্চের গতি ঢিমে হয়ে এলো আর পরক্ষণেই একটা বিজাতীয় আওয়াজ শুনতে পেলাম - তিমির ডাক, লঞ্চ থেকেই করা হচ্ছিল! তারপরে একেবারে হই হই পড়ে গেল - সমুদ্রে এখানে ওখানে ঝলকের মত ভেসে উঠছে ডরসাল ফিন, কালো পিঠ আর লেজ - কিলার হোয়েল (Killer Whale)। কোনটা মাদি কোনটা বাচ্চা - আমাদের পাইলট মাইকে তার ধারাবিবরণী দিতে লাগলেন, ছবি তোলার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। এর পরে আর এক জায়গায় সি-লায়ন দেখিয়ে লঞ্চ হাজির একটা দ্বীপ আর পাহাড়ের মাঝে - অনেক পাফিন (Puffin) উড়ে বেড়াচ্ছিল,সুন্দর পাখি। এরপরে দেখলাম বিশালাকায় হাম্পব্যাক তিমি (Humpback Whale) - ভুস ভুস করে কালো পিঠ পাহাড়ের মত ভেসে উঠছিল। একটা ধূসর হোয়েল (Grey Whale) -এর লেজও এক জায়গায় দৃশ্যগোচর হল। দুটো বল্ড ঈগল (Bald Eagle) বসে আছে একটা ক্লিফের চূড়ায়, এরাই আমেরিকার জাতীয় পাখি, এক সময় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আমেরিকান গভর্নমেন্ট আইন ও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ায় ওরা আজ স্বমহিমায়। দুঃখের বিষয় আবহাওয়া বেশ খারাপ ছিল - কনকনে ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া আর একনাগাড়ে বৃষ্টি - ঝিরঝিরে। তাতে অবশ্য উৎসাহে কোনো ভাঁটা পড়েনি কারোরই। লঞ্চ এবার এসব ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে চলল...

বেশ কয়েক মাইল ফুল স্পিডে গিয়ে একটু ধীরগতি হল লঞ্চ। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখি অনেক ছোট ছোট সাদা টুকরো ভেসে আসছে,ভালো করে ঠাওর করতেই স্পষ্ট হল ছোট-বড় বরফ খণ্ড, অসংখ্য। সামান্য বাঁক নিয়ে একটু কাছে ভিড়তেই ভেসে উঠল নীলচে সাদা চাপ চাপ জমাট বরফের ক্যানভাস। ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস আর মেঘলা আকাশের ম্যাড়ম্যাড়ে পরিমন্ডলে ঝকঝক করে উঠল এক অদ্ভুত শুভ্রতার জমক - আলালাইক গ্লেসিয়ার। মাঝে মাঝেই অংশ বিশেষ ভেঙে পরছে সমুদ্রে, সশব্দে। সামনের অনেকখানি অঞ্চল ভাসমান অসংখ্য বরফ খণ্ডে থোকা থোকা সাদা ফুলের কার্পেট হয়ে আছে আর বেশ কিছু সীল তার ওপর বসে আছে,ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সিগালেরা উড়ে বেড়াচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ার শোঁ শোঁ আওয়াজ আর বরফ ভেঙে পড়া। সবমিলিয়ে আমাদের সে এক বাকরুদ্ধ অবস্থা। এ কী দেখলাম!
ফেরার পথে আরও দুটো গ্লেসিয়ার হলগেট ও বেয়ার দেখে (একটু দূর দিয়ে) আমাদের লঞ্চ একটা খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল - প্রায় ৩০০ ফুট ওপর থেকে ঝরনা সরাসরি নেমেছে সমুদ্রের বুকে। আর ঠিক তখনি আমাদের ক্যাপ্টেন একটি কবিতা আবৃত্তি করে উঠলেন। এই রেজারেকসন বে - এই কেনাই ফিওর্ডের মর্মবাণী তাঁর কন্ঠ থেকে যেন ঝরে পড়ল। অসাধারণ! আরও কিছু সি লায়ন, তিমি, পাফিন পাখি দেখিয়ে লঞ্চ এসে থামল ফক্স আইল্যান্ড-এ। স্যামন মাছ সহযোগে ডিনার সেরে হারবারে ফিরে এলাম। লঞ্চ থেকে নামার সময় ক্যাপ্টেনের সঙ্গে একটা ছবিও নিলাম। জানলাম, কবিতাটি ওঁরই লেখা। আট ঘন্টা কোথা দিয়ে যে শেষ! কিন্তু মন ভরে থাকল এই অসাধারণ প্রকৃতির চলমান চালচিত্রে আর মন ছুঁয়ে গেল প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া একজন কেজো মানুষের কবিতার অনুরণনে।

মাতানুসকা গ্লেসিয়ার
সেওয়ার্ড থেকে পামার ১৭১ মাইল। মাঝে পোরতেজ বলে একটা জায়গায় আলাস্কা ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সেন্টারে ঢুকলাম। আহত বা পরিত্যক্ত প্রাণীদের আশ্রম বলা যায়। কেউ কোনও একটি প্রাণীকে পোষ্যও নিতে পারে, ওদের তত্ত্বাবধানে। একে একে দেখলাম গ্রিজলি ভাল্লুক (Grizzly Bear),কারিব্যু হরিণ (Caribou Deer), এল্ক (Elk), শজারু (Porcupine), মুজ হরিণ (Moose Deer),লাল শেয়াল (Red Fox),মাস্ক অক্স (Musk Ox) - খাঁড়ির ধারে বিশাল বিস্তৃতিতে রাখা আছে। জনমানবহীন - প্রকৃতির ক্যানভাসে।
চমৎকার এলাম। অ্যাঙ্করেজ হয়ে। দিব্যি রাস্তা। পামার আলাস্কার বেশ একটা পুরোনো শহর। ঝকঝকে বাড়ি ঘর আর চওড়া চওড়া রাস্তার কোনো কমতি নেই, দোকানপাটও বেশ। কিন্তু এক লহমা দেখলে মনে হবে মৃত্যু পুরী, সেই রূপকথার রাক্ষসের মরণ কাঠি ছুঁয়ে দেবার মত... কেউ কোত্থাও নেই, অনেক গাড়ি পার্ক করা আছে... মাঝে সাঝে দু-একটা গাড়ি হুসহাস বেরিয়ে যাচ্ছে। হোটেলের রিসেপশানে গিয়েও দেখি সেই একই - কেউ নেই, সব ভোঁ-ভা।
বিকেলে ব্রিজ পেরিয়ে নদীর ধারে গেলাম - মাতানুসকা নদী, মোহনার কাছাকাছি, বেশ অনেক চওড়া। নামটা আমেরিকান নয়। প্রায় দেড়শ বছর আগে ১৮৬৭ সালে রাশিয়া এই আলাস্কাকে আমেরিকার কাছে বেচে দেয় মাত্র ৭২ লক্ষ ডলারে। এখনও কিছু কিছু নদী, পাহাড়, বন্দর সেই রাশিয়ান স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। যেমন এই নদীর নাম - মাতানুসকা। নদীর পাড়ে সুন্দর ট্রেল... শুনশান,দূরে বরফাবৃত শৃঙ্গ,চারপাশে জঙ্গল - সবমিলিয়ে দুর্দান্ত একটা দৃশ্যপট। বিকেলটা ভালোই কাটল। সাড়ে আটটা নাগাদ হোটেলে ফিরলাম। তখনও ঝকঝকে রোদ। সত্যি কথা বলতে কী সারা আলাস্কা ভ্রমণে রাতের অন্ধকার কখনও দেখিনি, ঘুমোতে যাওয়া থেকে ঘুম ভাঙা সবই দিনের আলোয় আলোয় কাটছে।

পরের দিন দশটা নাগাদ গ্লেন হাইওয়ে ধরলাম,পাহাড়ি রাস্তা কিন্তু চওড়া এবং চমৎকার। ষাট মাইল রাস্তা ঘন্টাদেড়েকে পার হলাম। মাতানুসকা নদীর ধার ধরে চলা, পার্বতী নদীর গা বেয়ে মণিকরণ যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল। হাইওয়ে থেকে তিন মাইল ভেতরে ঢুকে যেখানে গাড়ি পার্ক করলাম তার গা ঘেঁষেই প্রায় গ্লেসিয়ার, মাতানুসকা। নদীর উৎপত্তি এখানেই। শ'পাঁচেক ফুট পা বাড়াতেই গ্লেসিয়ারের ওপর এসে পড়লাম - ধুলো বালি নুড়ি পাথরে একটু কালচে হয়ে আছে কিন্তু হাঁটলেই জুতোয় আওয়াজ উঠছে। আর এখান ওখান ফুঁড়ে সারা জায়গা জুড়ে জল বেড়িয়ে আসছে,কোথাও শুধু ভিজে কোথাও জলের ধারা। সারা জায়গায় জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে একটা গোটা নদীর উৎপত্তি! ভাবলেই কেমন অবাক লাগছে। আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম - বরফ এখন শক্ত ও সাদা। আরো ওপরে বরফের রং নীলচে। কিন্তু ক্ষান্ত দিলাম,পায়ে আইস স্যু আর হাতে লাঠি থাকলে এগোতাম, সেরকম খাড়া নয়। আলাস্কার বৃহত্তম মটোরেবল গ্লেসিয়ারে অনেক ছবি-টবি তুলে ফেরার পথ ধরলাম।

দেনালি ন্যাশনাল পার্ক
সামনে তিনটে গাড়ি পর পর দাঁড়িয়ে গেল, নট নড়ন চড়ন। শেষ পর্যন্ত যখন এগোল দেখি একটা মুজ আর তার বাচ্চা পাতা খেয়ে যাচ্ছে, একমনে। মুজ হল বিশাল হরিণ, প্রায় পাঁচশ কেজি ওজন। পার্কে ঢোকার আগেই প্রাণী দর্শন হয়ে গেল। প্রসঙ্গত বলে রাখি, গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আমরা আগের দিনই আঙ্করেজ থেকে হিলি এসেছি বাসে ২৬০ মাইল। এরপর পার্কের সবুজ বাসে রওনা হলাম, ৬০ মাইল যেতে হবে। যাওয়া- আসা সবমিলিয়ে আট ঘন্টার এই অভিযান। মাইল দশেক চলল উত্তেজনাহীন পাহাড়ি পথ। তারপর বাঁক ঘুরতেই চমক। চারদিকে ছোপ ছোপ বরফের পাহাড় আর দূরে উত্তুঙ্গ শুভ্রতার ঝলক - মাউন্ট দেনালি, উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ভিন্ন ভিন্ন চেহারায় এই শৃঙ্গ বারে বারে ধরা পড়েছে পুরো যাত্রাপথে - অসাধারণ। এরপর নজরে এল আকাশে উড়ন্ত দুটো সোনালি ঈগল (Golden Eagle), রাস্তার ধার দিয়ে ছুটে গেল আর্কটিকের মেঠো কাঠবিড়ালি (Arctic Ground Squirrel)। দশ বিশ মাইল ছাড়া ছাড়া রেস্ট রুম, দশ মিনিট বাস থেকে নামার বিরতি। ক্রমশ আমরা ওপরে উঠছি। গ্রেট আলাস্কান রেঞ্জ আমাদের বাঁ দিক দিয়ে চলেছে,প্রতিটি বাঁকে নতুন নতুন দৃশ্যপট,বরফ এবং পাহাড় নতুন নতুন ছন্দে। হঠাৎ বাস থেমে গেল,হৈ হৈ করে উঠতে উঠতে সব নিশ্চুপ,হাতে হাতে ক্যামেরা উঠে এল,কে কোথা দিয়ে লেন্স গলিয়ে ক্লিক করবে – একটা গ্রিজলি ভাল্লুক হেলে দুলে চলেছে রাস্তার ঠিক মাঝখান দিয়ে। বাস আবার চলতে লাগল। মাঝে মধ্যেই পাহাড়ি নদী,ঝরনাধারা। হটাৎ ফক্স ফক্স বলে একটা বোল উঠল। শেয়াল! সে আবার দেখার কী আছে! আমেরিকানদের আদিখ্যেতা। ছোঃ। বসেই ছিলাম। কিন্তু আবছা নজরে পড়তেই মুখ বাড়ালাম। বাব্বাঃ! এতো বাহারি! ঝাঁকড়া লেজ, লালচে রঙিন গা – লাল শেয়াল। রাস্তার পাশ দিয়ে চলে গেল। বেশ!

ক্রমে ক্রমে নজরে পড়ল ক্যারিব্যু হরিণ -ডাল পালার মতন শিং আর ডাল ভেড়াদের (Dall Sheep)। ভেড়াগুলো দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের প্রত্যন্ত গায়ে, বরফের মত সাদা গা, মোটা বাঁকানো শিং। পৌঁছলাম এইলসন সেন্টারে - আমাদের বাস যাত্রার শেষ প্রান্ত। সুন্দর হাঁটাপথ নেমে গেছে বিস্তৃত নদীখাতে। পা চালালাম, পরের বা তারও পরের বাসে ফিরব। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ছুরির মত বিঁধছে, তবু ভালোই লাগছিল। মাঝে একটা উত্তুরে কাঠবিড়ালী একটু মশকরাই করল বলা যায়। তাড়া করতেই দৌড় লাগাল, একটু গিয়েই খাড়া দাঁড়িয়ে গেল দু পায়ের ওপর। আমরা এগোচ্ছি দেখেও ভ্রুক্ষেপ নেই। কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুললাম। ঠায় দাঁড়ানো, মাঝে মধ্যেই ক্রিক ক্রিক করে তীক্ষ্ণ আওয়াজ করছে,যেন আমাদের বকছে। আরও কাছে প্রায় হাতের নাগাল হতেই মুহূর্তে অদৃশ্য। আসলে ওর পায়ের কাছেই গর্ত ছিল – বাসা। তিনটে পনেরোর ফেরার বাস ধরলাম। আসার পথের উল্লেখযোগ্য - পাহাড়ের অনেক উঁচু দিয়ে এক পাল ডাল ভেড়ার চলে যাওয়া। দুর্দান্ত। এই ডাল ভেড়াদের পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরেই এই পার্কের সূত্রপাত, আগামী বছর প্লাটিনাম জুবিলী।

জ্যাক-এর গাড়িতে ফেরার পথে আর এক নাটক। পার্ক থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে উঠেছি, হিলির পথে হু হু করে চলছে গাড়ি, হঠাৎ রেলিং টপকে গাড়ির সামনে একটা মুজ মা আর তার বাচ্চা। মুহূর্তে ব্রেক - মা ছিটকে বেরিয়ে গেল সামনে, বাচ্চা ভয়ে পিছিয়ে। চুলচেরা বাঁচা। দুজনেই। হতচকিত দুটোই ওপাশের রেলিং টপকে অদৃশ্য জঙ্গলে। আমরা থ। ঈশ্বরের বাগানের সৃষ্টিরা অক্ষত ফিরে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

প্রত্যাগমন
আজ আলাস্কায় শেষদিন। বেড়ানোর শেষ কিন্তু বেড়ানো জারি কারণ ফ্লাইট ধরতে যেতে হবে ফেয়ারব্যাঙ্কস - একশো মাইল দূরে। আবার পার্কস হাইওয়ে, এদিকটা আরও নির্জন আরও ছমছমে - লোকবসতি তো নেইই, গাড়ি ঘোড়াও কম। আমরা চলেছি আলাস্কার আরও অভ্যন্তরে - যথার্থই পাণ্ডব বর্জিত অঞ্চল। আমাদের সহযাত্রী দুটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল, সুদূর পোল্যান্ড থেকে আসছে সামারে রোজগারের কনট্র্যাক্ট নিয়ে - মোটামুটি ইংরেজি শিখেছে। মাঝ পথে নেনানা বলে একটা শুনশান জায়গায় নেমে গেল। শুনলাম পূর্ব ইউরোপ থেকে সামারে অনেকেই শর্ট টার্ম জব করতে এখানে আসে, ইংরেজি জানলেই চলবে। ফেয়ারব্যাঙ্কস পৌঁছে ঢুকলাম নর্দার্ন ইউনিভারসিটির মিউজিয়াম-এ। ফেরার আগে আলাস্কার ইতিহাস আর প্রত্যন্ত অধিবাসীদের জীবন যাত্রার রূপরেখা কিছুটা অনুভব করতে পারলাম। আলাস্কার বিভিন্ন দুর্গম জায়গায় খনন চালিয়ে প্রচুর ডাইনোসরাস এবং ম্যামথ-এর হাড়গোড় উদ্ধার করে রাখা আছে এখানে। আলাস্কা ডাইনোসরাসদের মূল ঘাঁটি ছিলও বলা যায়। এরপর শেষ পর্যন্ত আমরা এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। দেখলাম এটাই বোধহয় একমাত্র আমেরিকান এয়ারপোর্ট যেখানে সিকিওরিটি শিকেই চড়ানো। কাজের ফাঁকে ফোকরে চলছে দেদার আড্ডা। প্লেন ছাড়ল রাত দুটোয়, বাইরে উঁকি মেরে দেখি অন্ধকার, রাত্রির অন্ধকার এই প্রথম আলাস্কায়! মুখ থেকে বেরিয়ে এল স্বগোতক্তি, বেশ জোরেই - গুড নাইট, গুড নাইট আলাস্কা।


~ আলাস্কার আরও ছবি ~


চক্ষু শল্যচিকিৎসক হওয়ার সুবাদে ব্যারাকপুরের ডাঃ সচ্চিদানন্দ দত্তের চিরকালই সময়ের বড় টানাটানি। তাতে অবশ্য নিয়ম করে বেরিয়ে পড়া আটকায়নি। ভ্রমণ তাঁর কাছে জীবনের এক মহার্ঘ অনুষঙ্গ - যা চলার পথে মনের শক্তি ও রসদ যোগায়। লেখার প্রয়াস এই প্রথম।

 

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

For any queries/complaints, please contact admin@amaderchhuti.com
Best viewed in FF or IE at a resolution of 1024x768 or higher