বর্ষায় অরণ্যে

অরিজিত কর


~ বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্যের আরও ছবি ~

বেথুয়াডহরি পৌঁছাতে বেলা গড়িয়ে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। এদিকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা। পথে বৃষ্টিও পেলাম। শঙ্করদাকে মধ্যাহ্নভোজের অর্ডারটা দিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বেশ গুছিয়ে বসলাম। ঠিক করলাম, বিকেলের দিকে একটু বেরোব অরণ্যের অনুভূতিটা নেওয়ার জন্য। অবশ্য প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকার সময় ফরেস্টের কর্মচারীদের অতিথিবৎসলতায় মুগ্ধ হয়ে কিভাবে কখন ঘুরব, তার পরিকল্পনাটা তখনই করে ফেলেছিলাম। বেশ ভি.আই.পি. ট্রিটমেন্ট। বাইরের ভিজিটরদের জন্য গেট তখনো বন্ধ। অনলাইন বুকিং-এর কাগজটা দেখাতেই স্বাদর অভ্যর্থনা। একটু গল্প করে জানলাম বাইরের দর্শকদের জন্য দুটো থেকে চারটে পর্যন্ত গেট খোলা থাকে বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্যে। যেহেতু ফরেস্ট বাংলো বুক করেছি, আমার জন্য অরণ্য সারাক্ষণ খোলা। কখন কিভাবে এই গহন অরণ্যের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করব, তা নিজের ওপর। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যখন বাইরের পর্যটকদের পালা শেষ হবে, আমার অভিযান শুরু হবে। বুঝলাম বিকেল পাঁচটার পর থেকে ১৬৭ একরের বেথুয়াডহরি শুধু আমার আর ফরেস্টের গুটিকয়েক কর্মচারীর দখলে!!

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের কোনও এক সন্ধে। বর্ষা এসে গেছে। চপ-মুড়ি খেতে খেতে মনটা খালি টানছিল অরণ্যভ্রমণের জন্য। ভাবছেন বর্ষায় অরণ্য তো বন্ধ। ঠিকই। ডুয়ার্সের সমস্ত অরণ্য বন্ধ বর্ষায়। কিন্তু বর্ষায় জঙ্গলের যে রূপ তা যে অন্য কোনও সময় খুঁজে পাব না। সেই রূপের খোঁজেই খুঁজে পেলাম বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য। বন্ধ থাকে না বর্ষায়। হোক না মাত্র ১৬৭ একর। তবু তো সে অরণ্য। হরিণ, ঘড়িয়াল, টার্টল, গোসাপ, পাইথন, শেয়াল (এটা বনকর্মীদের কথানুযায়ী) এবং প্রচুর পাখি - এসব তো পাবই। তাই বেথুয়াডহরি।
অল্প বিশ্রাম নিয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বেরোলাম। সঙ্গে শুধু ক্যামেরা এবং অবশ্যই একটি প্লাস্টিক প্যাকেট (ঠেকে শিখেছি বৃষ্টি না পড়লেও একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট সঙ্গে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অসময়ে ক্যামেরা রক্ষার্থে)। জুন মাসের সাড়ে পাঁচটা হলেও আলো খুবই কম কারণ মেঘেদের আন্দোলন তখনও শেষ হয়নি। কটেজ থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের সরু রাস্তা ধরলাম। একটু সোজা হেঁটে বাঁ দিকের আরও সরু রাস্তা নিলাম। কয়েক পা এগোতেই অনুভব করলাম আমার দিকে কে যেন তাকিয়ে আছে! আই অ্যাম বিয়িং ওয়াচড... মুখ তুলেই বুঝলাম বেথুয়াডহরি আসার প্রথম সার্থকতা পেয়ে গিয়েছি। হ্যাঁ, ঠিক পনেরো ফুট দূরেই সেই ফালি রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে এক হরিণ শাবক।
আহ্লাদে আটখানা হয়ে ক্যামেরার লাইট মিটারে চোখ রেখে বুঝলাম ট্রাইপডটা না এনে বেশ ভুল করেছি। আই এস ও বেশ খানিকটা বাড়ানো ছাড়া কোনও উপায় নেই। যাইহোক, ম্যানুয়াল অ্যাডজাস্টমেন্ট করে ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে বেশ চমকে গেলাম। শাবকের পাশে তার মা। তার শিঙের বাহার দেখে প্রথম দর্শনে একটু ভয় লাগবেই। এ তো আর চিড়িয়াখানা বা ডিয়ার পার্ক নয়। হরিণ এবং আমি - একই অরণ্যের সহবাসী এখন। যদি তাড়া করে, বর্ষায় পিচ্ছিল রাস্তা দিয়ে জোরে ছোটাও যাবে না। তবে ওরকম কিছুই হল না। মা হরিণটা তার সমস্ত ইন্দ্রিয় নিক্ষেপ করে আমার নড়াচড়া খেয়াল করছিল। বুদ্ধি বলছিল, একজায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা উচিত যাতে বুঝতে পারে যে, ওদের কোনও ক্ষতি করতে আসিনি। এক-দুটো ফটো নিয়ে... এক পা এগোলাম। এগিয়েই বুঝলাম ভুলটা করে ফেলেছি। মা এবং শাবক দুজনেই একছুটে গহীন অরণ্যে মিশে গেল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, বেথুয়াডহরির অরণ্য আয়তনে ছোট হতে পারে কিন্তু গভীরতা কোনও অংশে কম নয়। দিনের আলো থাকা সত্ত্বেও অরণ্যের বেশিরভাগ জায়গা অন্ধকার ।
ঠিক করলাম, আরও সতর্ক পায়ে এগোতে হবে। এগিয়ে চললাম সেই ফালি রাস্তা ধরে গভীরে… আরও গভীরে। আলো বেশ কমে এসেছে। ঝিঁঝি পোকার ডাক - প্রচণ্ড কানে লাগছে। অরণ্যের এই এক বৈশিষ্ট্য। একটু গভীরে এলেই নিস্তব্ধ চারদিক। যেন পিন পড়লেও শোনা যাবে। আশপাশের গাছগুলো আধো অন্ধকারে যেন একেকটা রহস্যময় জীব। বেশ গা ছমছম করছে। নিজের মনকে বোঝালাম এই অরণ্যে হিংস্র প্রাণী নেই। হরিণ তো আর মানুষ খায় না। পরমুহূর্তেই মনে পড়ল বনকর্মীর কথা - গোসাপ, পাইথন, শেয়াল!!! সতর্ক হয়ে এগোতে থাকলাম। আমার চোখ দুটো স্তরে ঘোরাফেরা করছে। সামনে হরিণ দেখার পিপাসায়। আর নীচে পাইথন বা গোসাপের ভয়ে।

সেই ফালি রাস্তা ঘুরে ঘড়িয়াল পুকুরের দিকে যায়। সেখানে এসে দেখি দুটি ঘড়িয়াল আপত্তিজনক অবস্থায় বিরাজমান। দুইজনে চুমু খাচ্ছেন কিনা বুঝলাম না। আমার দিকে অবশ্য তেনাদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। এদের বিদায় জানিয়ে এগোতে থাকলাম। এদিকে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। গায়ে না পড়লেও বুঝতে পারছি আওয়াজে... পাতায় পাতায় । ক্যামেরা তখনও ব্যাগে ঢোকাইনি কারণ অরণ্য এত গভীর যে বৃষ্টি খুব জোরে না পড়লে গায়ে লাগবে না। এমন সময় একটা আওয়াজে চমকে উঠলাম। ঠিক ডানপাশের ঝোপগুলোতে খসখস করে একটা আওয়াজ হল। বেশ জোরে। ওটা হাওয়া বা বৃষ্টি নয়। কিছু একটা নড়ে চলে গেল। অন্ধকারে ঠাওর করতে পারলাম না। একা হাঁটছি। একটু ভয়ও পেলাম এবার। এগিয়ে চললাম। দশ পা এগিয়েই বুঝলাম কার আওয়াজ শুনেছি। সামনে কুড়ি ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে শিংধারী বেশ বড়ো মাপের একটা হরিণ। একেবারে রাস্তার মাঝামাঝি। আলো এত কম, জানি ফটো ভালো আসবে না। যতটা আই এস ও বাড়ানো যায় বাড়িয়ে, ছবি নিলাম।
আর দাঁড়াইনি। এইবার একটু জোরেই পা চালালাম কারণ বৃষ্টি বেশ বেগেই পড়ছে ততক্ষণে। ক্যামেরা প্যাকেটে ঢুকিয়ে নিয়েছি। দেখতে দেখতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল। সে কী আওয়াজ। অরণ্যের বৃষ্টি এক অন্য জিনিস। আমার হাতে উপায় দুটো। এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা যেখানে বৃষ্টি গাছের ঘনত্ব ভেদ করে অতটা ঢুকছে না। নতুবা ভিজে ভিজে বাংলোতে ফেরা। দু-পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়টাই বেছে নিলাম। ক্যামেরার প্যাকেটটা বুকে জাপটে ধরে সজোরে পা চালালাম বাংলোর দিকে। ফিরে শঙ্করদাকে দিয়ে গরম চা আর ফুলুরি আনিয়ে বেশ ধাতস্থ হলাম।

ঘুমটা ভালোই হল রাত্রে। গরমের লেশমাত্র ছিল না। বৃষ্টি প্রায় সারারাত হয়েছে। সকাল সাতটার মধ্যে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে গেলাম জঙ্গলের মধ্যেই একটি মিনি জু-তে। নীলগাই, ময়ূর, পেন্টেড স্টর্ক, বাঁদর, খরগোশ ইত্যাদিতে ভরা এই ছোট্ট চিড়িয়াখানা। বাইরের দর্শকদের হরিণ দেখার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ তাঁদের দেখার ওই সময়টুকুতে তেনারা গভীর জঙ্গলেই থাকতে অভ্যস্ত। বাইরের জনতার জন্য এই মিনি জু-টাই প্রধান আকর্ষণ। জানতাম যে সকালের দিকে হরিণকে খেতে দেওয়া হয়। ওদের কিছু কিছু জায়গা আছে। সেই জায়গাগুলো খাবার ঢেলে দিয়ে বনকর্মীরা চলে যায়। আগের দিন বিকেলে বেরিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা করে নিয়েছিলাম কোথায় কোথায় এই খাওয়ার জায়গাগুলো আছে। খুব সহজেই আজ হরিণের দেখা পেয়ে গেলাম সেখানে সেখানে।

প্রথম জায়গাটায় গিয়ে দেখলাম গোটাছয়েক হরিণ একসঙ্গে। আমাকে দূর থেকে দেখে সতর্ক হয়ে গেল ঠিকই তবে পিছটান মেরে দৌড় দিল না। বরং একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। খেয়াল করলাম, বাকিরা যখন খেতে ব্যস্ত, কোনও একটি হরিণ কান খাড়া করে সোজাসুজি আমার দিকে তাকিয়ে। প্রতিটা পদক্ষেপ ও মাপছে। মনে হচ্ছে ও যেন দলের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে। কুড়ি-পঁচিশ ফুট দূরত্বে আমার সামনে খোলা স্বাধীনভাবে হরিণের সংসার। মনের সুখে ছবি তুলতে লাগলাম। একটা খাবারের জায়গায় বেশ কিছুক্ষণ কাটালাম। ছবি তুললাম। ওদের ব্যবহারগুলো বোঝার চেষ্টা করলাম। বেশ একটা ছন্দ আছে। আর হ্যাঁ, সদা সতর্ক। সামান্যতম আওয়াজেই সবাই খাবার ছেড়ে মুখ উঁচু করে বোঝার চেষ্টা করছে কোনও বিপদ ধেয়ে আসছে কিনা। বেশ লাগছিল দেখতে। একটু পরে হাঁটা লাগালাম অন্য দিকের খাবারের জায়গাটার দিকে। এসে দেখলাম এ তো পুরো হরিণের একান্নবর্তী পরিবার, কে নেই সেখানে!! আর দলবদ্ধভাবে আছে বলেই হয়তো দুঃসাহসটাও একটু বেশি... আমাকে অনেকটা কাছাকাছি যাওয়ার অনুমতি দিল এইবার!! প্রাণ ভরে এক-একটা করে কম্পোজিশন সাজালাম ভিউফাইন্ডারে আর লেন্সবন্দি করলাম তাদের। এবার ফেরার পালা। বাংলোতে ফিরে রেডি হয়ে ঠিক উল্টোদিকের নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টারটা একবার চাক্ষুষ দেখে বাস ধরে চলে এলাম কৃষ্ণনগর সদর। সেখান থেকে টোটোতে কৃষ্ণনগর স্টেশন। কৃষ্ণনগর লোকাল। এক সুন্দর, সুস্থ, বর্ষাস্নাত অরণ্যসুন্দরীর প্রেমে আসক্ত হয়ে... আবার ফিরে আসার আশা নিয়ে বেথুয়াডহরিকে বিদায় জানালাম।


~ বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্যের আরও ছবি ~

পেশাগত ভাবে ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত অরিজিত করের ভালোলাগা বা প্যাশন হল ফোটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। এরই সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের ঘোরার অভিজ্ঞতা এবং বেড়ানোর ছবিগুলো নিয়ে একটি নিজস্ব ট্রাভেল ব্লগও লেখেন।

 

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

Cannot connect to the Host