যেখানে রূপকথা মিশে আছে প্রকৃতিতে

অনিরুদ্ধ ভৌমিক


রূপকুণ্ড ট্রেক রুট ম্যাপ || ট্রেকের আরো ছবি - -

যেখানে ইতিহাস মিশে আছে রূপকথায়, রূপকথায় জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বাস, আর বিশ্বাস নিমজ্জিত হয়েছে প্রকৃতিতে - ঠিকই ধরেছেন, এবারের যাত্রা সেই বহুচর্চিত রূপকুণ্ডের পথে।
গাড়োয়াল হিমালয়ের ১৬,৪৭০ ফুট উচ্চতায় ত্রিশূল, নন্দাঘুন্টি, কালিডাক শৃঙ্গের তটস্থ প্রহরায় এই রূপকুণ্ডের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তিন-চারশো নরকঙ্কাল, যাদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা জনশ্রুতি রয়েছে।
যাত্রা শুরু সকাল সাড়ে আটটার হাওড়া- লালকুঁয়া উইকলি সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস। আমরা দুই স্বামী-স্ত্রী আঠাশ ঘণ্টা ট্রেন জার্নি করে পরের দিন বেলা সাড়ে দশটায় নির্ধারিত সময়ের দু ঘণ্টা পরে পৌঁছলাম লালকুঁয়া স্টেশনে। স্টেশনচত্বর থিকথিক করছে নৈনিতাল যাওয়ার টুরিস্টের দলে। আমাদের আজকের গন্তব্য 'ওয়ান'। লালকুঁয়া থেকে যার দূরত্ব ২৬০ কি.মি.। আগের থেকে দু জনের জন্য গাড়ি বুকিং করে না রাখায় বেশ বিপত্তির মুখে পড়তে হলো। সৌভাগ্যক্রমে কলকাতা থেকে আসা আরেকটি ট্রেকিং দলের বদান্যতায় তাদের রিজার্ভ করা গাড়িতে জায়গা পেলাম। বেলা বারোটা নাগাদ গাড়ি হলদোয়ানির সমতল ভূমি পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরল। একে একে ভাওয়ালি – রানিক্ষেত – গোয়ালদাম – থারোলি - দিওয়াল – মুন্ডোলি হয়ে লোহারজং যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে রাত পৌনে দশটা। লোহারজং থেকে রূপকুণ্ড যাওয়ার দুটো ট্রেক রুট বিভক্ত হয়ে গেছে, একটি ওয়ান ও অপরটি দিন্দাগ্রাম হয়ে। অনেকে ওয়ান থেকে শুরু করে দিন্দাতে শেষ করে আবার দিন্দা দিয়ে শুরু করে ওয়ানেও শেষ করা যায় অথবা ওয়ান থেকে শুরু করে ওয়ানেও শেষ হয়।
মিনিট দশেকের বিরতির পর গাড়ি ছাড়ল ওয়ান-এর উদ্দেশ্যে। লোহারজং থেকে ওয়ানের দূরত্ব ১৪ কিমি। ইতিমধ্যে হাওয়ায় বেশ হিমেল আমেজ। নিশুতি রাতে সামনের পাহাড়গুলোর গায়ে একটা দুটো আলো দেখা যাচ্ছে। যেন মনে হচ্ছে এক ঐরাবতের গায়ে জোনাকি লেগে রয়েছে। রাস্তা বেশ খারাপ, আর দুর্ধর্ষ সব হেয়ারপিন বেন্ড। এভাবে দশ মিনিট গাড়ি চলার পর হঠাৎ বাঁক ঘুরতে দেখি এক হিমালায়ান আইবেক্স। এতবার হিমালয়ের আনাচে কানাচে ঘুরেও যা কোনদিনও দেখতে পাইনি। আইবেক্সটা হঠাৎ রাস্তায় নেমে আসায় ড্রাইভার জোর ব্রেক কষে গাড়ি দাঁড় করালেন। আমরা আনন্দে আত্মহারা, বেচারা প্রাণীটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পাহাড়ের জঙ্গলে উঠে গেল। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পরের বাঁকটা নিতেই আমরা স্তম্ভিত। রাস্তার ধারে পাহাড়ের গা ঘেঁষে আরও একটি জন্তু। প্রকাণ্ড তার লেজ। লাল জ্বলন্ত তার চোখ। দৃশ্যটা আমাদের চোখে ধাতস্থ হতে বুঝতে পারলাম, এটি একটি পূর্ণবয়স্ক লেপার্ড। এসেছি ট্রেকিং করতে, কিন্তু দর্শন মিলল দুটি বিরল প্রজাতির প্রাণীর – এ তো মেঘ না চাইতেই জল। ড্রাইভার সাহেব জানালেন – 'আপনারা ভাগ্যবান। এই রাস্তায় আইবেক্স দেখা গেলেও লেপার্ড দেখা যায় কদাচিৎ।'
ওপরে উঠে কেমন একটা হয়ে গেলাম। যখন ওয়ান-এ পৌঁছালাম, ঘড়ির কাঁটায় রাত সাড়ে দশটা। রাস্তায় অপেক্ষা করছিল আমাদের গাইড বলবীর সিং বিস্ত। বলবীর নিয়ে এল তার নিজের বাড়িতে। এত রাতেও বাড়ির অন্যান্য সভ্যদের উষ্ণ অভ্যর্থনায় আমরা আপ্লুত। গরম জলে হাত মুখ ধুয়ে গরম গরম রুটি, চানা, ও মিক্সড সবজি খেয়ে কম্বলের তলায় ঢুকে পড়লাম। পরদিন পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে, প্রাতরাশ সেরে তৈরি হয়ে নিলাম আমাদের প্রথমদিনের ট্রেকিং-এর জন্য। আজকের গন্তব্য 'ঘারোলি পাতাল'। দূরত্ব ৮ কিমি, উচ্চতা ১০,০০৮ ফুট। ওয়ান জিপ স্ট্যান্ড থেকে পাঁচশো মিটার এগোতেই পাইনের জঙ্গলের মধ্যে পড়ল লাটু দেবজীর মন্দির। বলবীরের বক্তব্য অনুযায়ী রূপকুণ্ডের যাত্রা শুরুর আগে লাটু দেবজীর অনুমতি নিয়েই এগোতে হয়। দেবতার কাছে সফল ও সুস্থ ভাবে ফেরার প্রার্থনা জানিয়ে এগিয়ে চললাম। ২ কিমি. হাল্কা চড়াই ভেঙে পৌঁছলাম 'রানকা দ্বার'। জায়গাটা বেশ সুন্দর। এখানে বনদপ্তরকে সচিত্র পরিচয়পত্র দেখাতে ও প্রবেশ মূল্য জমা দিতে হয়। এখান থেকে আশপাশের পাহাড়, জঙ্গল, নিচে ফেলে আসা ওয়ান গ্রামের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ দেখতে পাওয়া গেল। পথ ধীরে ধীরে ওক-পাইনের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নীলগঙ্গার দিকে নামতে থাকল। নীলগঙ্গা পেরোতেই আবার চড়াই শুরু। এরপর থেকে জঙ্গল আরও ঘন হয়ে উঠল। বলবীরের নানা অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে বেলা তিনটে নাগাদ পৌঁছলাম 'ঘারোলি পাতাল।'

পৌঁছে দেখি একটি নামজাদা ট্রেকিং গ্রুপ গোটা মাঠ জুড়ে তাদের তাঁবুর মেলা বসিয়েছে। এই শান্ত পরিবেশে নিজেদের প্রকৃতির মধ্যে সম্মোহিত রাখতে একটু উঁচু জায়গাতেই তাঁবু ফেললাম। যেখান থেকে পুরো 'ঘারোলি পাতাল' দেখা যাচ্ছে কিন্তু ট্রেকিং গ্রুপের কোলাহল অতটা কানে আসছে না। পাহাড়ের সন্ধে খুব চুপিসাড়ে নেমে এল। বাকি ট্রেকারদের সঙ্গে গল্পগুজব করতে করতে এখানকার একমাত্র অস্থায়ী ধাবাতে আটটা নাগাদ আমাদের রাতের খাবারের ডাক পড়ল। কনকনে ঠান্ডায় গরম গরম খিচুড়ি, পাঁপড় স্যাঁকা, ডিমভাজা ও ঘি – সারাদিনের ক্লান্তিকে এক নিমেষে দূর করে দিল। রাত বাড়তে থাকায় ঠান্ডাও বাড়তে থাকল। তাই আর সময় নষ্ট না করে তাঁবুতে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় বলবীর বেড টি দিয়ে ঘুম ভাঙাল। তাঁবুর বাইরে এসে দেখি চারদিকে প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা লেগে রয়েছে। গাছ থেকে শুকনো পাতা খসার আওয়াজও যেন কানে বিঁধছে। পুব আকাশে হাল্কা মেঘের আমেজ। বেলা বাড়লে আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। আজকের গন্তব্য 'বেদিনী বুগিয়াল' (ঊচ্চতা ১১,৬০০ ফুট) ভায়া 'আলি বুগিয়াল'; আলু পরোটা আর কফি খেয়ে যখন যাত্রা শুরু করলাম ঘড়িতে সকাল সাতটা। পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তায় এবার ভালোই চড়াই-এর স্বাদ পাচ্ছি। ক্রমে ক্রমে ট্রি-লাইন পাতলা হতে শুরু করেছে। ঘন মহীরুহের বদলে চোখে পড়ছে ছোট ছোট রডোডেনড্রনের ঝোপ। এবারও এপথে চলতে গিয়ে দেখা হল কলকাতা থেকে আসা সেই ট্রেকিং দলের। আলাপ হল ওদের ট্রেক লিডার কমবয়সী কিন্তু অভিজ্ঞ সুচেতনের সঙ্গে। এখানে বেশ কিছু জায়গায় রাস্তা খুব পিচ্ছিল ও কাদায় ভর্তি। তাই একটু সচেতন হয়ে সুচেতনের বিভিন্ন ট্রেকিং অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে পৌঁছে গেলাম আলি বুগিয়াল। এশিয়ার বৃহত্তম এই বুগিয়াল বা ঘাস জমি। সমগ্র বুগিয়ালটি বিস্তৃত কুড়ি বর্গকিমি জায়গা জুড়ে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই সবুজ গালিচায় ঘুরে বেড়ালে ঘোড়া ও ভেড়ার দলের সঙ্গে নীল আকাশের সামিয়ানার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই অনায়াসে সারাটা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। ক্যালেন্ডারের ছবির মতন আলি বুগিয়াল দেখতে গিয়ে কখন যে দেড় ঘণ্টা কেটে গেছে বুঝতে পারিনি। তাই আর দেরি না করে হাঁটা শুরু করলাম বেদিনীর উদ্দেশ্যে।

আলি থেকে বেদিনী যাওয়ার রাস্তা প্রথম দিকে চড়াই হলেও পরের দিকে বুগিয়ালের ঢালের মধ্য দিয়ে নেমে যেতে দারুণ লাগল। বেদিনীতে পৌঁছালাম বেলা তিনটেয়। সেখানে পৌঁছে দেখি এ তো ট্রেকারদের মহামিলন বসেছে। যতটা সম্ভব নিজেদের তাঁবু এক কোলাহলহীন না হলেও অপেক্ষাকৃত শান্ত জায়গায় লাগালাম। ক্রমে আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে শুরু করল। দেখতে দেখতে ধূম্রাকৃতি মেঘের চাদর সমগ্র জায়গাটা গ্রাস করে নিল। শুরু হল হাল্কা থেকে মাঝারি বৃষ্টি। তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার দাপাদাপি। ত্রিশূল ও নন্দাঘুন্টির পাদদেশে এসেও তাদের দেখতে না পাওয়ায় এক তীব্র আক্ষেপ হল। এখানেও অস্থায়ী ধাবাতে বাকি ট্রেকারদের সঙ্গে গল্প করে রাত আটটার মধ্যে খাবার খেয়ে তাঁবুতে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে শুয়ে পড়লাম।

সারারাত হাওয়ার দাপটে ভালো করে ঘুম হল না। ভোর হতে দেখি আবহাওয়ারও বিশেষ কিছু পরিবর্তন নেই। বরং নীচ থেকে আরও মেঘ এসে ওপরে জমা হচ্ছে। সময় নষ্ট না করে চটজলদি তৈরি হয়ে নিলাম আমাদের পরের গন্তব্য 'পাত্থার নাচানী' -র জন্য। উচ্চতা ১২,৭০০ ফুট, দূরত্ব ৫ কিমি., ২০০ মিটার মতো এগোতেই পড়ল 'বেদিনী কুণ্ড।' বিস্তৃত ঘাসজমির মধ্যে এই কুণ্ড বেশ দৃষ্টিনন্দন। এই মাঠ বা ঘাসজমির অপর নাম হল 'শিরদোতা', অর্থাৎ এখানে দেবী দুর্গা মহিষাসুরের মুণ্ডচ্ছেদ করেছিলেন! বেলা বাড়তে থাকলে মেঘ কাটতে শুরু করল। মেঘের আড়াল থেকে প্রথমে দৃশ্যমান হল ত্রিশূল ও নন্দাঘুণ্টি, বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে চৌখাম্বা, নীলকণ্ঠ, বন্দর পুঞ্ছ ও আদি পর্বতের মাথা। নীল আকাশের ক্যানভাসের ওপর দন্ডায়মান ত্রিশূল ও নন্দাঘুন্টি ও চারপাশে বিস্তৃত সবুজ বুগিয়ালের দৃশ্য শুধু লিখে কেন DSLR-এও ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। মানুষ যে কত ক্ষুদ্র এই বৃহত্তর প্রকৃতির কাছে তা হয়ত এই বিশালত্বের পাদদেশে দাঁড়ালে তবেই অনুভব করা যায়।

প্রকৃতির রঙের ছটা দেখতে দেখতে দু কিমি দূরে 'ঘোড়ালোটানি'-তে এসে পৌঁছলাম, ঘোড়ালোটানি থেকে দেড় কিমি এগোতেই চোখে পড়ল কালিডাক পিক। এখান থেকে পাত্থার নাচানী দেড় কিমি - রাস্তা সংকীর্ণ হলেও মোটামুটি সমান্তরাল। পাত্থার নাচানী পৌঁছালাম বেলা একটায়। 'ঘারোলি পাতাল'-এর পর এই পাত্থার নাচানীর কয়েকটি বিশেষ জায়গাতেই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। এখানে রয়েছে দুটি অস্থায়ী ধাবা ও বনদপ্তরের ফাইবার টেন্ট-এর ব্যবস্থা। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়াতে আমরা পাত্থার নাচানীতে না থেমে খানিকটা এগিয়ে রইলাম 'কালু ভিনায়ক'-এর দিকে। সন্ধে থেকে বৃষ্টি শুরু হল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে তার প্রকট মূর্তি ধারণ করল। সঙ্গে দুর্দান্ত হাওয়ার দাপট। মনে হচ্ছে এই বুঝি তাঁবু সমেত আমাদের উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে।
সকালেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হল না। ঘন মেঘের কুয়াশায় দশ মিটারের বেশি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। বলবীরের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করলাম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে আর ওপরে ওঠা সম্ভব নয়। কুকিং টেন্ট ও টয়লেট টেন্ট এত হাওয়ায় লাগানো সম্ভব হচ্ছে না, তাই ক্যাম্পসাইট পরিবর্তন করে পাত্থার নাচানীতেই নেমে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেখানে অন্তত বনদপ্তরের ফাইবার টেন্ট-এ থাকা ও অস্থায়ী ধাবাতে খাবার পাওয়া যাবে। পৌঁছে দেখলাম আমাদের মতো অনেক ট্রেকাররাই প্রকৃতির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শুরু হল ধৈর্যের পরীক্ষা। নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে নামতে না পারলে ফেরার ট্রেন মিস করার সম্ভাবনা আছে। অবশেষে প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি শান্ত হল দুপুর তিনটেয়। ক্রমে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করল। হাওয়ার দাপটও কিছুটা কমেছে। আরও একটি ট্রেকিং গ্রুপ, তাদের গাইড, আমরা ও বলবীর মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আবহাওয়ার এই সুযোগটা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না । ঠিক করলাম রাতেই আমরা ট্রেক করব। পাত্থার নাচানী থেকে কালু ভিনায়ক (১৪১৮৬ ফুট) দু কিমি, সেখান থেকে এক কিমি দূরের 'বাগুয়াবাসা' হয়ে পাত্থার নাচানীতে ফিরে আসব। গাইডরা কিছুতেই প্রথমে রাজি হতে চাইছিল না, তাদের ভাষায় এটা শুধু দুঃসাহসিক নয় পাগলামোও বটে। আমরা গোঁ ধরে বসলাম, কালও যদি সকাল থেকে প্রকৃতির এই বিড়ম্বনা শুরু হয় তাহলে এত কষ্ট করে এত দূর এসে আমাদের ফিরে যেতে হবে। অবশেষে আমাদের দৃঢ় মনোভাব দেখে গাইডরা রাজি হল। বাইরে তখন চাঁদের আলোর বন্যা বয়ে চলেছে। ত্রিশূলের মাথার ওপর চাঁদ যেন রুপো গলানো জল সমস্ত পাহাড়ের ওপর ঢেলে দিয়েছে। আর লক্ষ লক্ষ তারা মণি মানিক্য, জহরতে খচিত কালো চাদর দিয়ে সেই পর্বতশৃঙ্গকে জড়িয়ে ধরেছে। এ দৃশ্য আমৃত্যু আমার স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী হয়ে রইল।

ঈশ্বরের কাছে আমাদের সুস্থ ও সফলভাবে ফিরে আসার প্রার্থনা জানিয়ে রাত দশটায় ছ'জনের দল ও দু'জন গাইড মিলে যাত্রা শুরু করলাম। সঙ্গে শুধু প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস - জল, শুকনো খাবার, ওষুধ, পঞ্চো, হেডলাইট, ক্যাম্প্রন, টর্চ ও ওয়াকিং স্টিক। বলবীর জানাল তার জীবনেও এমন দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা এই প্রথম, বাইরের তাপমাত্রা তখন হিমাঙ্কের নিচে। গাইডদের সতর্ক প্রহরায় আমরা সন্তর্পণে এগিয়ে চললাম। একটা ভুলের মাশুল এখানে অনেক। দলের প্রত্যেকে একে অপরের প্রতি খুব সচেতন। ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা, পৌঁছলাম কালু ভিনায়াক। এই পথে সবথেকে খাড়াই রাস্তা হল পাত্থার নাচানী থেকে কালু ভিনায়াক। একটা ছোট পাথরের মন্দিরের ভিতরে 'বিনায়ক' অর্থাৎ গণেশের কৃষ্ণবর্ণের মূর্তি রয়েছে। ক্ষণিকের বিরতি নিলাম এখানে। বেশ কিছু জায়গায় হাল্কা বরফের আস্তরণ। তাপমাত্রা আরও নিম্নগামী মনে হল। এই অবস্থায় বেশিক্ষণ বসে থাকলে হাইপোথারমিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আবার হাঁটা শুরু করলাম বাগুয়াবাসার দিকে। দূরত্ব ১.৮ কিমি.। রাস্তা খুব খাড়াই নয়, তবে চারদিকে হাজার হাজার পাথরের ব্লক পড়ে রয়েছে। এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে 'বাগুয়াবাসা'-য় পৌঁছলাম যখন, ঘড়িতে রাত তিনটে।

বাগুয়াবাসা হল রূপকুণ্ডে পৌঁছানোর শেষ ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড। সব ট্রেকারই অন্তত একটা রাত বাগুয়াবাসাতে কাটায় উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানানোর জন্য। বাগুয়াবাসাতেও রয়েছে একটি অস্থায়ী ধাবা। বনদপ্তরের ফাইবার টেন্ট-এ ক্ষণিকের বিরতি ও হাল্কা খাওয়া দাওয়ার পর আবার হাঁটা শুরু করলাম শেষ গন্তব্য রূপকুণ্ডের পথে। গাইডরা বলতে থাকল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসতে হবে। বেলা বাড়লেই বরফ নরম ও পিচ্ছিল হতে শুরু করে। বাগুয়াবাসা থেকে রূপকুণ্ডের দূরত্ব মাত্র তিন কিমি। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে হিমালয়ের এমন অপরূপ নৈসর্গিক শোভা এই ট্রেক রুটের কোথাও আর দেখা যায় না। দিনের আলোয় এখান থেকেই জুনার গলি পাস ও রূপকুণ্ডের রাস্তা দেখতে পাওয়া যায়। চতুর্দিকে শুধু পাথর, কোথাও কোথাও মোটা বরফের চাদরের আস্তরণ - ক্যাম্প্রন পরে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছি। প্রথম এক ঘণ্টা হেঁটে 'ছিরিং'-এ পৌঁছালাম। এখান থেকে রূপকুণ্ডে ওঠা শুরু। বরফের ওপর দিয়ে সাপের মত এঁকেবেঁকে চলেছে রাস্তা। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকায় খুব তাড়াতাড়ি দম শেষ হয়ে আসছে। কিছুটা এগিয়েই সকলকে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। আকাশের আলো-আঁধারি ভাব যখন কাটতে শুরু করেছে রূপকুণ্ড দেখা দিল চোখের সামনে। ত্রিশূল ও নন্দাঘুন্টির মধ্যে একটি বাটির মতো আকৃতির এই রূপকুণ্ড। সমস্ত কুণ্ডটি জমে এক নীলাভ বলয় সৃষ্টি করেছে। পাড় থেকে কুণ্ড পর্যন্ত মোটা বরফের আস্তরণ।
দড়ি ও আইস-অ্যাক্স না থাকায় আমরা নিচ অবধি পৌঁছতে পারলাম না। তাই কুণ্ডের ওপর অংশে দাঁড়িয়েই তার অপরূপ শোভাকে চোখ ভ'রে উপলব্ধি করলাম। বছর দু-তিন মাস ছাড়া সর্বদাই বরফ জমে থাকে এই কুণ্ড। চারদিকে প্রচুর বরফ থাকায় সেই বহুচর্চিত নরকঙ্কালগুলোও দৃশ্যমান হল না। শুধু একটি পাথরের ওপর একটি খুলি ও কিছু হাড়-গোড় দেখেই মনকে সান্ত্বনা দিলাম। বহু কষ্ট করে পৌঁছনো সেই আকাক্ষিত রূপকুণ্ডকে ছেড়ে আসতে মন চাইছিল না। কিন্তু ফের প্রকৃতির ভ্রূকুঞ্চন দেখে আর সময় নষ্ট না করে ফেরার পথ ধরলাম।

কি কি নেবেন -
যেকোন ট্রেক এর জন্য ব্যাকপ্যাক খুব জরুরী। মনে রাখতে হবে তাতে যেন চলার পথের সকল প্রয়োজনীয় জিনিস থাকে ও সবমিলিয়ে ওজন দশ কেজির মধ্যে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজনীয় জিনিসের একটি তালিকা দেওয়া হল -
১) ব্যাকপ্যাক যেন পঞ্চাশ লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য ব্যাগ কভার বা প্লাস্টিক সিট থাকা দরকার।
২) স্লিপিং ব্যাগ, ইনার সহ (ভাড়া পাওয়া যায়)।
৩) ক্যাম্পিং টেন্ট, স্লিপিং ম্যাট্রেস (ভাড়া পাওয়া যায়)।
৪) হাই অ্যাঙ্কেল, ওয়াটার প্রুফ, ভালো গ্রিপিং ও হাল্কা জুতো। (উদাহরণ- Quecha, Forclaz-500)।
5) স্লিপার, ক্যাম্প্রন (বরফের উপর হাঁটার জন্য), তিন জোড়া উলেন মোজা।
৬) ১০০% U/V প্রোটেক্টেড সানগ্লাস, সান ক্রিম, বোরোলীন বা কোল্ড ক্রিম, সাবান, স্যানিটাইজার, ভেজা বা শুকনো টিস্যু।
৭) ওয়াকিং স্টিক (ভাড়া পাওয়া যায়)।
৮) ছুড়ি ও দড়ি, পলিথিন (আবর্জনা এক জায়গায় রাখার জন্য) ফেভিকুইক, সেফটিপিন, কর্পূর।
৯) জোরালো টর্চ ও হেড ল্যাম্প।
১০) দু/তিন জোড়া হালকা জামা কাপড়, ট্র্যাক সুট, ফুল সোয়েটার, কান ঢাকা টুপি বা বালাকোভা, থার্মোকট, ওয়াটারপ্রুফ গ্লাভস, ফেদার জ্যাকেট (ভাড়া পাওয়া যায়) উইঞ্চিটার, পঞ্চো অথবা রেনকোট।
১১) খাবারের মধ্যে – শুকনো ফল, বিস্কুট, গ্লুকোজ, লজেন্স, বাদাম, ছোলা, ছাতু। এছাড়া অস্থায়ী ধাবায় খাওয়া দাওয়া গোটা রুট জুড়েই আছে।
১২) ওষুধ: - কম্বিফ্লেম, র‍্যান্ট্যাক-১৫০, ক্রেপ ব্যান্ডেজ, ব্যান্ড এড, ডাইজিন, কটন বল, ও.আর.এস., মেট্রোজিল, নরফ্লক্স, স্যারিডন, ভলিনি স্প্রে বা বাম, মাসল রিল্যাক্টেন্ট মেডিসিন (মায়োস্পেস), কোকা-৬০, প্যারাসিটামল, বেটাডাইন লোশান, ডেটল। এছাড়া কেউ যদি কোন ওষুধ আগে থেকে ব্যবহার করে থাকেন, তা অবশ্যই সঙ্গে নেবেন। ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে ভুলবেন না।
১৩) ক্যামেরা ও ক্যামেরার বাড়তি ব্যাটারি ও পাওয়ার ব্যাঙ্ক
১৪) নৈনিতাল ও আলমোড়াতে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের এটিএম আছে। তাই প্রয়োজনীয় টাকা সেখান থেকে তুলে নেওয়া ভালো। এর ওপরের ছোট জনপদের এটিএমগুলোতে লিঙ্ক ফেলিওরের সম্ভাবনা থাকে।

কিভাবে যাবেন -
হরিদ্বার থেকে ওয়ানের দূরত্ব: ৩০০ কিমি, বাসে যেতে সময় লাগে মোটামুটি বারো ঘণ্টা
* বাস সার্ভিস ঋষিকেশ থেকে লোহারজং-এর মধ্য দিয়ে ওয়ান পর্যন্ত। ছাড়ার সময়ঃ- উভয় জায়গা থেকেই ভোর 4.00 টে।
ড্রাইভারের ফোন নম্বরঃ 07361720082/ 09760220082

লালকুঁয়া থেকে ওয়ানের দূরত্ব ২৬০ কিমি, সময় লাগে মোটামুটি দশ ঘণ্টা
শেয়ার জিপ ভাড়া পাওয়া যায় হালদিয়ানি থেকে দিয়াল (ভায়া গোয়ালদাম)। দিয়াল থেকে লোহাজং যাওয়ার বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা আছে। দিয়াল থেকে বাস ছাড়ে বিকেল 4.30 টে এবং ওয়ান-এ পৌঁছায় সন্ধ্যা 6.30 টা। দিয়াল থেকে শেয়ার জিপও ভাড়া পাওয়া যায়। গাড়ি বুকিং-এর জন্য সরাসরি ফোন করতে পারেন - মহেশ, ফোনঃ- 09410556851 / 09557436527
* প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা ধসের জন্য সময়সূচী পরিবর্তন হতে পারে। তাই আগে থেকে বাস বা গাড়ির ড্রাইভারের সাথে কথা বলে রাখাই ভালো।

কোথায় থাকবেনঃ-
লোহারজং-এ ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের কাছে পিঠে থাকার জায়গা অনেকগুলোই আছে। ওয়ানে হোটেল/হোম স্টে ছাড়াও গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগমের ডরমেটরি ট্রেকারস হাটও রয়েছে, জিএমভিএন ওয়েবসাইটে গিয়ে আগে থেকে বুকিং করা যায়। এছাড়া দুটি ফরেস্ট হাটও রয়েছে। বাকী ট্রেকপথে নিজেদের তাঁবু নিয়ে যাওয়াই বাঞ্চনীয়। গাইডকে জানিয়ে রাখলে সেও আগে থেকে তাঁবুর ব্যবস্থা করে রাখে।

রূপকুণ্ড ট্রেক রুট ম্যাপ || ট্রেকের আরো ছবি - -

বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত অনিরুদ্ধের ছোটবেলা থেকেই নানান ভ্রমণ পত্রিকা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, জিম করবেট পড়ে, বিভিন্ন লেখায় বর্ণিত জায়গাগুলিকে দেখার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন কলেজে উঠে। ২০০৫ থেকে আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের আনাচে-কানাচে তথা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ও কর্মসূত্রে বিদেশের এমন অনেক জায়গা দেখেছেন, যার নাম হয়তো কম মানুষই শুনেছেন। জীবনে খুব সহজ তিনটি বিষয়ে বিশ্বাস করেন – যা দেখব, যা শিখব এবং যা খাব - তাই-ই সঙ্গে যাবে, বাকি সব এই পৃথিবীতেই পড়ে থাকবে। সেই লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করতে পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্রের অমোঘ টানে নিরন্তর ছুটে চলেছেন।

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

Cannot connect to the Host