পরিত্যক্ত মন্দিরের দেশ কাম্বোডিয়া

মলয় সরকার


অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম কোথায় যাই কোথায় যাই। সেই কবে আমেরিকা থেকে এসেছি তারপর দেশের বাইরে আর যাওয়া হয়নি। দেশের বাইরে বলেই নয়, দেশের মধ্যেও অনেক জায়গা আছে যা আমার দেখা হয়নি। যখন মনে হল, টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি কাছাকাছি কোন টিকিট নেই, সব একমাস পর। এদিকে গিন্নি, মেয়ে সব ঝোঁক ধরেছে কোথাও একটা চল। শেষমেশ ওদের বললাম, এই বর্ষায় দার্জিলিং-এর কোনো গ্রামে গিয়ে বসে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝে চুপচাপ বর্ষা উপভোগ করব – একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে। এই বলে কাউকে আর কোন সুযোগ না দিয়ে ঝট করে দেখলাম, টিকিট পাওয়া যাচ্ছে নিউ জলপাইগুড়ির, কেটে নিলাম। তারপর আলোচনা শুরু হল - কোথায় যাব কোথায় থাকব এইসব। বন্ধুরা বলে এই বর্ষায় দার্জিলিং যাচ্ছ, কোথায় ধ্বস নামবে আটকে পড়বে। সব কবিগিরি তখন বেরিয়ে যাবে – বর্ষায় পাহাড়ের কবিত্ব করা বুঝবে তখন। ছেলে রাতে শুনে বলে, সত্যিই তো, এখন দার্জিলিং যাচ্ছ! এক কাজ কর, তোমরা আমাকে আজকের রাতটা সময় দাও, একটু ভেবে দেখছি।
পরদিন সকালে বলে, তোমরা সুটকেশ গুছোও, টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছি ই-মেলে। সে কী, কোথাকার টিকিট? আর আমি যে এত টাকার টিকিট কাটলাম!
- যাচ্ছ, কাম্বোডিয়া।
- কাম্বোডিয়া? আঁতকে উঠি আমি। কোথায় দার্জিলিং আর কোথায় কাম্বোডিয়া!
- টিকিট ক্যানসেল করে দাও। যা কাটে, কাটবে। আমি টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছি, হোটেলের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তুমি খালি একটু পড়াশোনা করে নাও কোথায় থাকবে, কী কী দেখবে, জায়গাটার সম্বন্ধে একটু ভাল করে নোট করে নাও।
বুঝলাম ছেলে যখন বলেছে, তখন যেতেই হবে। ওর জেদের কাছে হার মানতেই হবে।

কদিন ধরে চলল একটু লেখা পড়া, ইতিহাস ভূগোল তো শুধু নয়, বর্তমান টাকার দাম, যানবাহন, ব্যবসা বাণিজ্য, ট্যাক্সি রিক্সা, দেখার জায়গা, কীভাবে যাব, কোথায় থাকব, কী খাব, কোথায় খাব, এমন কী টয়লেট-এর কী ব্যবস্থা সেটা পর্যন্তও, কারণ, আমি দেখেছি, টয়লেটের ব্যবস্থা এক এক জায়গায় এক একরকম। সব জায়গাতেই একই রকম নয়। জানা না থাকলে অসুবিধায় পড়তে হয়।
মেয়ে আর গিন্নি তো লাফিয়ে উঠল। খাতা পত্র নিয়ে বসলাম – ডিজিটাল, পেপার দুভাবেই নোট করতে লাগলাম। এবার ছেলে বলল, টিকিট পাঠিয়েছি এয়ার এশিয়াতে যাওয়া, আসাও তাই। এয়ার এশিয়ার নামে আমার একটু বিতৃষ্ণা আছে। ওদের ফ্লাইটে একটু জলও দেয় না, আর মালের সাত কেজির ব্যাপারে এতই কড়া, যে অন্য কারোর সঙ্গে তুলনা হয় না। ছেলেকে বললাম বাড়তি লাগেজের কিছু ব্যবস্থা রেখো। ও বলল, তোমার বলার আগেই সে ব্যবস্থা করে রেখেছি, বাড়তি পঁচিশ কেজির একটা ব্যাগ নিতে পারবে। ওদের ব্যাপারে গত ট্যুরে ব্যাংকক থেকে আসার সময় কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এবার আর সেটার পুনরাবৃত্তি চাই না।
যাক মালপত্র ওজন করে মেপে আমরা তৈরি। রাত এগারোটার মধ্যে এয়ারপোর্টে হাজির। সব নির্ঝঞ্ঝাটে মিটে গেলে কিছুক্ষণ বসে প্লেনে ব্যাংককের ডি মুয়াং এয়ারপোর্টে পৌঁছানো গেল। সেখান থেকে আবার প্লেনে সিয়েম রিপ এয়ারপোর্টে নামলাম। ছোট এয়ারপোর্ট -আমাদের ডিব্রুগড় কী জোড়হাটের মত। হেঁটে বেরোতে গিয়ে প্রথমেই পড়ল ভিসা কাউন্টার। ওরা জনপ্রতি তিরিশ ডলার আর একটা ফটো চাইল পাশপোর্টের সঙ্গে। কোন প্রশ্ন নয়, সময় নেওয়া নয়, ঠিক পাঁচ মিনিটও বোধ হয় লাগেনি। সঙ্গে সঙ্গে ভিসা হয়ে গেল। আমি যত দেশ ঘুরেছি সব চেয়ে কম সময় বোধ হয় এখানেই নিল। অবশ্য এক হাজার টাকা বাড়তি দিলে ব্যাংককেও তাড়াতাড়ি হয়।
উল্টোদিকেই ইমিগ্রেশন। সেখানে এক মিনিট, ব্যস, কাজ শেষ। বাইরে বেরিয়ে দেখি নাম লেখা কাগজ নিয়ে অনেকেই দাঁড়িয়ে, তার মধ্যে আমাদের টুকটুক ড্রাইভারও ছিল। ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারে। ছোট এয়ারপোর্ট, আংকোরভাট-এর জন্যই তৈরি। বেরিয়ে রাস্তা দেখে মনে হল ভারতেরই কোনো মফস্বল শহরে নেমেছি। চারপাশে গাছপালা, মানুষজন, দোকানপাট রাস্তাঘাট - যেন মনে হল বাঁকুড়া বা বর্ধমানের কোথাও এসেছি।
হোটেলে পৌঁছানো গেল - নাম ট্রাভেলহোম আংকোর। রিসেপশনিস্ট ছেলেটি খুব ভদ্র। নাম বলল, মং। এরা আমাদের মতোই দুহাত জোড় করে অভিবাদন করে। প্রথমেই কুশল প্রশ্ন সঙ্গে একটি প্লেটেকিছু ফলের টুকরো ও নরম পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করল। এর আগে অনেক জায়গার হোটেলে গিয়েছি, কিন্তু কোথাও এরকম অভ্যর্থনা পাইনি। হোটেলে পৌঁছাতে বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা হয়ে গিয়েছিল। কাজেই সকালটা খেয়ে ঘুমিয়ে কাটালাম।
ঘরটি বেশ। তবে তেতলায়। সবথেকে আশ্চর্য লাগল এদের সিঁড়ি দেখে। সিঁড়িগুলো বেশ খাড়াই আর পা ফেলার জায়গাটা একটা পায়ের যতটা স্বাভাবিকভাবে জায়গা লাগে তার অর্ধেক। ভাবলাম, এদের জায়গা কম, তাই হয়তো এভাবে করেছে। পরে দেখি শুধু এদের নয়, বেশিরভাগ ঘর আর হোটেলেই এই রকম সিঁড়ি। এর রহস্য পরে বুঝেছি। আংকোরভাট মন্দির বা অন্য অনেক মন্দিরের একই রকম সিঁড়ি। এই নিয়ে পরে বলার ইচ্ছা রইল।
হোটেলে বেশি লোকজন দেখলাম না। ম্যানেজার ছেলেটিকে বললাম, ঘুরতে যাব, ব্যবস্থা কর। টুকটুকেই যাব। টুকটুক হল একটা হোন্ডা (বেশিরভাগই তাই) বাইকের পিছনে বসার জায়গাটি বাদ দিয়ে সেখানে একটি এক্কা ঘোড়ার গাড়ির পিছন দিকটা বা বসার অংশটা জোড়া, অর্থাৎ এক্কা গাড়িই কেবল ঘোড়ার বদলে হোণ্ডা বাইক টানছে। মুখোমুখি চারজন বসতে পারে ভালভাবে।

এদের কারেন্সি রিয়েল এবং আমেরিকান ডলার সমান তালে চলে। এক ডলারের মোটামুটি দাম ধরছে চার হাজার রিয়েল। এবার ধরা যাক,যদি কোথাও আড়াই ডলার দিতে হয় ওরা দেবে বা নেবে দুই ডলার দুহাজার রিয়েল বা দশ হাজার রিয়েল বা সমপরিমাণ মুদ্রা। অর্থাৎ একেবারে মিলিয়ে মিশিয়ে চলে। তবে মনে হল বিদেশিদের কাছে ডলারটাই বেশি চায়। যাই হোক, ওদের নির্ধারিত রেট দেখাল, মোটামুটি দিনপ্রতি পনের ডলার। আংকোরথোমকে ওরা দুভাগে ভাগ করে দুদিনে দেখাচ্ছে। একটা ছোট বৃত্ত, একটা বড় বৃত্ত। ছোট বৃত্তের মধ্যে আছে আংকোরভাট, বায়োন মন্দির, টা কেও, টা প্রম, বান্তে কড়েই, এবং তার উলটোদিকে রাজকীয় স্নানের দিঘি - শ্রাস শ্রাং ; তা এতে যত সময়ই লাগুক। তবে মোটামুটি দেখলাম, যদি শান্তভাবে, না দৌড়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়, তাহলে এই দেখতেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তা ছাড়া সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার পর সব মন্দিরে প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়।
আর বড় বৃত্তে, আংকোরথোম ছাড়িয়ে আরও দূর দিয়ে ঘুরিয়ে অন্য মন্দিরগুলো দেখাবে, যার মধ্যে আছে প্রিয়া খান, নিক পিন, টা সোম, হয়ে ইস্ট মেবোন ঘুরে প্রি রুপ। এ ছাড়া সেন্ট্রাল আংকোরথোম-এ আছে, বায়োন মন্দিরের কাছে, টেরাস অফ এলিফ্যান্টস, টেরাস অফ লেপারস কিং বা বাফুওন। অর্থাৎ দুদিনেই পনের ডলার করে। রাজি হলাম। এছাড়া ছিল টোনাল স্যাপ টুর, যেটা ওরা বলল আলাদা যেতে হবে। বললাম সেটা পরে ভাবা যাবে। কথাবার্তা হয়ে গেল ম্যানেজারের সঙ্গে। সে বলল, কাল সকালে তৈরি থাকবেন আটটায়। টুকটুক এসে যাবে। আর আজকে সন্ধ্যায় যান এখানে কাছেই একটা হোটেলে ট্র্যাডিশনাল কাম্বোডিয়ান নাচের সঙ্গে বুফে। হোটেলের নাম কুলেন রেস্টুরেন্ট (Koulen Restaurant)। আমাদের এখানে হলে টোটো ভাড়া হয়ত দশ টাকাও হত না, টুকটুকওয়ালা কিন্তু নির্বিবাদে পাঁচ ডলার চেয়ে বসল। হোটেল ম্যানেজারটিও তা সমর্থন করল। কী আর করি, নতুন এসেছি, কত দূর কিছু জানি না । দিলাম বাধ্য হয়ে। সে বলল আবার শেষ হলে এসে নিয়ে যাব। ওদের ভাষাও বুঝছি না, ইংরেজিও সবাই বোঝে না। যেটুকু বোঝে বা বলে তা দিয়ে কাজ চালানো মুশকিল। যাই হোক, কুলেন রেস্টুরেন্ট কাছেই।
পৌঁছে দেখি হোটেলের একটি ছেলে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আপ্যায়নের জন্য। নামতেই বলে, টেবিল বুকিং আছে? বললাম, নেই। ও তখন ভিতরে নিয়ে গেল। আমি তো ভিতরে ঢুকে হতভম্ব। এক বিশাল চত্বরে পরপর অনেক সারিতে চারজন, ছজন হিসাবে খাবার টেবিল সাজানো আছে। আর প্রত্যেক টেবিলে নম্বর দেওয়া আছে। আমাদের একটা টেবিলে নিয়ে বসাল। দেখি বিভিন্ন টেবিলে বিদেশিদের ভিড়। চারিদিক সুন্দর কম ঔজ্জ্বল্যের নানা রঙের আলো দিয়ে সাজানো। সামনে একটি ছোট অথচ সুন্দর স্টেজ। বুঝলাম, এদের নামটা এতোই ছড়িয়েছে যে বিদেশিরা যারা এখানে বেড়াতে আসে এখানে একবার ঢুঁ মেরেই যায়। সেভাবেই ব্যবস্থা আছে। এদের রেট একেবারে নির্দিষ্ট, বারো ডলার জনপ্রতি। তাতে বুফে ডিনার ও নাচ দেখা দুটোর দামই ধরা আছে। এছাড়া যদি কেউ কিছু নেয়, কোনো পানীয়, আইসক্রীম বা অন্য খাবার - তার দাম আলাদা। মেনুকার্ড টেবিলে দেওয়া আছে আর পাশে পাশে তৎপর ওয়েটাররা ঘুরছে হুকুম তামিলের জন্য। যখন ঢুকলাম তখন অত ভিড় ছিল না, কিন্তু ক্রমশঃ ভিড় বাড়তে লাগল। সন্ধ্যা সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত অনুষ্ঠান। পাশেই বুফের জন্য একটা জায়গা করা আছে। সেখানে যে কত দেশের আর কত রকমের খাবার আছে কে জানে! আমরা যতগুলো বুঝতে পারলাম নিয়ে আস্বাদ নিলাম। এদের মিষ্টিতেও মনে হল চালের আধিক্য বা চাল দিয়েই তৈরি। প্রথমে কিছু কাম্বোডিয়ার বাজনা হল। তারপর এখানকার বিখ্যাত অপ্সরা নৃত্য ও নানা স্থানীয় নাচ যেমন জেলেদের নাচ, নারকেল মালা দিয়ে নাচ এইসব ছ-সাতটা নাচ হল। খুব ভাল লাগল। তার মাঝেই ছিল খাওয়া দাওয়া। তবে অপ্সরানৃত্য সত্যিই সুন্দর। শিল্পীরা যে সাজে সেজেছে, মনে হল সত্যি অপ্সরাদের নাচই দেখছি। নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম এই পরিবেশে । মনে হচ্ছিল স্বর্গের নৃত্যসভায় হাজির হয়েছি আমি। সত্যি অপ্সরারা এদের থেকে সুন্দর হয় কিনা জানি না। এরা প্রায় বিগত পনের বছর প্রতিদিনই এই অনুষ্ঠান করে। অনলাইনেও এদের টেবিল বুকিং হয়।
'আংকোর ভাট' কথাটার মধ্যে আংকোর অর্থ শহর বা নগর। এই 'নগর' শব্দটি থেকেই আনগর বা আংকোর এসেছে। আর ভাট বা ওয়াট আমাদের মঠ বা মন্দিরের সমার্থক। ওদের জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের ভাষার আদি কী? ওরা বলল, সংস্কৃত। পরে আমি দেখেছি আমাদের অনেক শব্দের সাথে ওদের শব্দের মিল আছে। তার মধ্যে মরিচ শব্দটি ওদের ভাষাতেও একই 'মরিচ'। এরকম অনেক শব্দ, হয় কিছু পরিবর্তিত হয়ে বা অবিকৃত হয়ে ওদের ভাষায় আছে। ওদের ভাষার নাম খমের (khmer)। এটা হিন্দু ও বৌদ্ধদের ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত ও পালির মিশ্রণে তৈরি।
পরের দিন সকালে আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। মনটাও বেশ চকচকে। হোটেলের ম্যানেজার মং জানাল, আপনার টুকটুক হাজির। আমরা তৈরি হওয়ার আগেই দেখি টুকটুক এসে উপস্থিত। একটা ছেলে - বয়স বেশি নয়, ওই পঁচিশ মত হবে, সে-ই আজকের সারথি আমাদের। একটু দাঁড়াতে বলে ব্রেকফাষ্ট সেরে নিয়ে উঠলাম রথে। চারজনের সিটে তিনজনে আরাম করে বসলাম।
ছুটল রথ। রাস্তাঘাট মোটামুটি আমাদের সাধারণ শহরের মতই, তবে নোংরা নয়। শহরের বাইরেটা একটু গ্রাম্য ভাব। শহরের একটু বাইরে, বোধ হয় ৩-৪ কি মি দূরে একটা বড় মিউজিয়ামের সামনে টিকিট কাউন্টারে নিয়ে গেল। এরকম টিকিট আমি আগে দেখিনি। কাউন্টারে একটা ক্যামেরা লাগানো আছে। তার দিকে চোখ রেখে দাঁড়াতেই একেবারে ফোটোসমেত টিকিট এসে গেল। কাজেই প্রত্যেককে আলাদা করে টিকিট কাটতে হল। একজন যে একসঙ্গে তিন-চারটে টিকিট কেটে নেবে, তা হবে না।

যাই হোক, টিকিট হয় একদিনের, নয় তিন দিনের। একদিনের টিকিটের দাম সাঁইত্রিশ ডলার, তিনদিনের বাষট্টি ডলার ও সাত দিনের বাহাত্তর ডলার। ক্রেডিট কার্ডেও কাটা যায়। পুরো আংকোরথমে যত মন্দির আছে সব কিছু দেখার জন্য এই টিকিটটা লাগবে। তাই যে কদিন ওখানে দেখার জন্য ঘুরব টিকিটটা সবসময় সঙ্গে রাখতেই হবে। প্রত্যেকটা দর্শনীয় স্থানে এটা দেখতে চাইবে। দামটা একটু অস্বাভাবিক বেশি মনে হল। কী আর করা যায়, চিনেও দেখেছি মনাস্ট্রিগুলোতে ঢুকতে অনেক টাকা লাগে। তিনদিনের টিকিট নিলাম বাষট্টি ডলার করে। কাছেই একটা চেকপয়েন্টে টিকিট চেক করিয়ে এগোলাম। নীল আকাশে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, চারিদিকে সবুজের মেলা - গাছে গাছে।

প্রথমেই গেলাম আমার বহুদিনের স্বপ্ন আংকোরভাটে। দূর থেকে তার চূড়া দেখে মন এক অভূতপূর্ব চরমপ্রাপ্তির আবেশে ভরে উঠল – এর কথা এতদিন দূর থেকে শুনেছিলাম, বইয়ে পড়েছি, মনে মনে কত ছবি এঁকেছি। সেই আংকোরভাট, মনে এল ছেলেবেলায় পড়া ছন্দের জাদুকরের সেই অবিস্মরণীয় পদ -
"স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে
বরভূধরের ভিত্তি
শ্যাম কম্বোজে ওঙ্কার-ধাম
মোদেরই প্রাচীন কীর্তি।"
চারধারে গাছে ঘেরা, গাড়ি রাখার জায়গায় এসে চালক বলল, একটা গাইড নিয়ে নিন, বুঝতে সুবিধা হবে। নিলাম পনের ডলার দিয়ে।

এগিয়েই দেখি এক বিরাট খাল বা পরিখা দিয়ে ঘেরা অদূরেই হাতছানি দিচ্ছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হিন্দু মন্দির (বর্তমানে বৌদ্ধ মন্দির)। পার হলাম এক ভাসমান প্লাস্টিকের ব্রিজের ওপর দিয়ে। পাশে রয়েছে পুরানো আদি ব্রিজ, যা এখন নাকি জাপান সরকার পুনর্নির্মাণ করছে। গাইডকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই পরিখা কেন? বলল, মন্দিরটাকে স্বর্গ ভাবা হয়। তাই কষ্ট করে মর্ত্যের জল পেরিয়ে স্বর্গ লাভ করতে হবে।
আসল তথ্য যা পণ্ডিতেরা বলেছেন তা হল –
এই যে বিশাল মন্দির, এর নির্মাণকাজে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ টন স্যাণ্ড স্টোন বা বেলেপাথর লেগেছিল যেগুলোর প্রত্যেকটা ছিল প্রায় এক দশমিক ছয় টন। এগুলো আনা হয়েছিল ৫৫ মাইল দূরের কুলেন পাহাড় থেকে। এই বিশাল পাথরের আমদানি করতে তাদের সহজ রাস্তা নিতে হয়েছিল - তা হল জলপথে। এইজন্য তাদের অনেক খাল কাটতে হয়েছিল। এই খালেরই অবশিষ্ট হল বর্তমান খাল। এছাড়াও শহরে বেশ কিছু খাল এখনও রয়েছে আর বাকী অনেক বুজে গেছে। খালের ধারে অনেক জায়গায় একই পাথর পড়ে থাকা দেখে এই সিদ্ধান্তে আসা সহজ হয়েছে। পাথরগুলি মনে হয় যেখানে কাটা হয়েছে সেখান থেকেই মাপ ঠিক করে আনা হয়ে ছিল, এখানে এনে পরে কাটা হয়নি। প্রতিটা পাথরে ছোট ছোট গর্ত আছে, যেটা দেখিয়ে গাইড বলল এই গর্তগুলো দিয়ে ধরে পাথরগুলো আনা হয়েছে। পাথরগুলো আনতে দশ ঘণ্টা করে সময় লেগেছে এই রাস্তায় – নাহলে হয়তো আরও সময় লাগত। এতেই প্রায় তিন লক্ষ লোক ও ছহাজার হাতির পঁয়ত্রিশ বছর সময় লেগেছিল মন্দিরটা তৈরি করতে। অঞ্চলটা দীর্ঘদিন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। তবে এর আবিষ্কার নিয়ে বহু মত আছে। একদল বলেন, ফরাসী প্রকৃতিবিদ হে্নরি মহুত ১৮৬০ সালে একে আবিষ্কার করেন। আর একদল বলেন, না, আংকোরভাট কখনও হারায় নি, কাজেই আবিষ্কারের প্রশ্ন নেই। তবে অন্যান্য মন্দিরগুলো দেখলে বোঝা যায়, যেভাবে আজ তারা বড় বড় গাছের শিকড়ের তলায় প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে, তা দীর্ঘদিন অবহেলিত এবং লোকচক্ষুর আড়ালে না থাকলে সম্ভব হত না।
গাইড দেখাচ্ছিল, যে সেতু দিয়ে পেরোচ্ছি তা অস্থায়ী সেতু। পাশেই পুরানো আসল সেতু যেটার নাম স্পীয়ান হার্ল । সেটা এখন জাপানের সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মেরামত করছে। দু-এক বছর বাদে মেরামত হলেই খুলে দেওয়া হবে। ১৯০ মিটার চওড়া খালটির ওপর বর্তমানে যে ভাসমান প্লাস্টিকের সেতু আছে, সেটিও বেশ মজবুত।

ঢোকার মুখেই গাইড দেখাল, বন্দুকের গুলির দাগ, আমেরিকানদের আক্রমণের চিহ্ন, যেমনটি দেখেছিলাম অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে। প্রবেশপথের মুখেই দেখি কয়েকটি তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে পোষা হাতির কানের মত পাতার খড়খড় আওয়াজ তুলছে। ঢুকলাম পশ্চিমদ্বার দিয়ে। মন্দিরের চারদিকে চারটি দরজা আছে। এই দিকটাতে পাশাপাশি দুটি মন্দিরের মত দরজা আছে, মাথাগুলো দেখে মনে হল কোনো কারণে ভেঙে ছোট হয়ে গেছে। গেট দিয়ে ঢুকে দেখি চওড়া সুদীর্ঘ বাঁধানো পথ চলে গেছে সোজা মন্দির পর্যন্ত। দুপাশে সবুজ ঘাসেভরা মাঠ, মাঝে মাঝে কিছু তাল গাছ রয়েছে। অনেকে দেখলাম তাল রস বিক্রি করছে। তবে, তখন যা বেলা আর রোদ, সে রস আর সাধারণ রস নেই, নিশ্চয় মদিরায় পরিণত হয়েছে। সে রসের রসিক নাগর নই, অগত্যা এগোলাম বাঁধা রাস্তা ধরে। গাইড দেখাচ্ছিল, প্রতি পাথরের ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে কিছু ফুটোর দিকে। বলল, এই ফুটোগুলো দিয়ে পাথরগুলোকে কুলেন পর্বত থেকে এখানে আনা হয়েছে। একটু এগোতেই দেখলাম রাস্তার দুপাশে দুটি পরিত্যক্ত মন্দিরমত। সেগুলো নাকি ছিল লাইব্রেরি। গেলাম দেখতে। আপাতত ফাঁকা পাথরের ঘর।

এখান থেকেই লক্ষ্য করতে লাগলাম এদের সিঁড়ির ধরণ। সব বেশ খাড়াই আর প্রতিটি ধাপ বেশ কম চওড়া। উঠতে কষ্ট হয় আর পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। বাঁধা রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকের মাঠের ওপর দিয়ে চললাম। দুপাশে দুটি জলাশয় আছে। অন্যসময় পদ্মফুলে ভর্তি থাকে, এখন অল্প ছিল। চারপাশে অনেক তালগাছ রয়েছে আমাদের দেশের যে কোনো গ্রামের মত। বাঁদিকের জলাশয়ের পাশে কিছু দোকান আছে - ছবি বা হাতের কাজের। সেদিকে না দেখে এগোলাম সামনের দিকে, যা দেখতে এতদূরে ছুটে এসেছি।

মূলমন্দিরের বাঁদিকের দরজা দিয়ে ঢুকলাম। অবশ্য বাঁধা রাস্তা যেমন এসেছে তেমন প্রধান দরজা দিয়েও ঢোকা যায়।
ঢুকে দেখলাম দেওয়ালে পুরো রামায়ণের ছবি চিত্রিত করা। হনুমান, বানরসেনা, রাম রাবণ সবাই রয়েছে। তবে এখানে রাবণের মাথা পাশাপাশি নয় ওপরে ওপরে। ছবিগুলো ঠিক খোদাই নয়, পাথরের ওপর ছেনিজাতীয় কিছু দিয়ে রেখা ছবি। দেওয়াল জুড়ে চলেছে এই ছবি। তবে কোন কোন জায়গায় বেশ অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। গোটা মন্দিরটাই বেলে পাথরে তৈরি। সেকারণে এবং সঠিক যত্ন না নেওয়ার জন্য চতুর্দিকে মসজাতীয় শ্যাওলায় মন্দিরে প্রাচীনত্বের ভাব বেশি করে ফুটে উঠেছে।

বাঁদিক থেকে এগিয়ে প্রধান দরজার দিকে এলাম বারান্দা দিয়ে। সামনেই অষ্টভুজ এক দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্তি। এরকম বুদ্ধমূর্তি আগে কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মূর্তির রঙ কালো। গায়ে সোনালি হলুদ রঙের এক টুকরো কাপড় উত্তরীয়ের মতো দেওয়া আছে।

গাইডকে জিজ্ঞাসা করতে বলল, এটা আসলে বিষ্ণুমূর্তি ছিল। যখন এই মন্দির বৌদ্ধমন্দিরে পরিবর্তিত হয় তখন সমস্ত মূর্তির মাথা কেটে বুদ্ধের মাথা লাগানো হয়েছে। ফলে এক জগাখিচুড়ি তৈরি হয়েছে। ধর্মের লড়াই বা রাজনৈতিক লড়াইতে পড়ে শিল্পের কেমন অপমৃত্যু হয় তার প্রকৃষ্ট নিদর্শন আংকোরভাট মন্দির। পরে লক্ষ্য করেছি শুধু এখানে নয় সারা সিয়েম রিপ জুড়েই এই অবস্থা।
রাস্তার ধারে যেখানেই কোনো নালা বা ছোট খালের ওপর ব্রিজ আছে, সেগুলির রেলিং হিসাবে সমুদ্রমন্থনের ছবি অনুযায়ী একটা নাগের (বাসুকি) দুদিক ধরে, একদিকে দেব ও অন্যদিকে অসুর টানছে। ফলে নাগ রেলিং-এর কাজ করছে। এখানেও দেব বা অসুরের মাথা পালটানো আছে।

পরে জেনেছি, এই অষ্টহস্ত বিষ্ণুর কল্পনা ভারতের দাক্ষিণাত্যের রীতি। যেহেতু এখানে একসময় দাক্ষিণাত্যের রাজারা (৩য়- ৯ম শতাব্দী পর্যন্ত পল্লব রাজা এবং ৯ম-১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত চোল রাজারা) রাজত্ব করেছেন, তাই এখানকার ভাষা, লিখণ শৈলী, স্থাপত্য, সংস্কৃতি সমস্তই দাক্ষিণাত্য প্রভাবিত।
এবার এগোলাম সামনের দিকে। চতুর্দিকে স্থাপত্য রক্ষা করার দুর্বল প্রচেষ্টা। মধ্যে মধ্যে কাঠের খুঁটি বা ওইধরণের কিছু দিয়ে ঠেকা দেওয়া আছে। মনে হল যে কোনো মুহূর্তে এটা পড়ে যেতে পারে।

মন্দিরটা চৌকোণা ধরণের। চারদিকে করিডোর আছে। দাক্ষিণাত্যের রীতি অনুযায়ী প্রত্যেক তলায় মাঝখানে জলের কুণ্ড আছে । তিনতলা মন্দির। ওরা বলল, নীচের তলাটা পাতালের রূপক, মাঝের তলাটা মর্ত্য ও একেবারে ওপরের তলাটি স্বর্গ। সেখানে আসল দেবতার অধিষ্ঠান। মন্দিরটি বিষ্ণুর অবস্থান, মেরুপর্বতের অনুকরণে তৈরি। চারধারে চারটি চূড়া আর মাঝে একটি সবথেকে উঁচু চূড়া।

দেওয়াল জুড়ে বিভিন্ন ভঙ্গীর নৃত্যরতা অপ্সরার মূর্তি খোদিত। সেগুলি কাম্বোডিয়ার রীতি অনুযায়ী পোষাকে এবং মুকুটে সজ্জিত। মূর্তিগুলি একেবারে জীবন্ত।

দু-একটি জায়গায়, যদিও খুবই অল্প, ছাদের সিলিং-এ রঙের কাজ দেখলাম। যেখানে যা মূর্তি আছে বা খোদাই আছে সব কিছুতেই হিন্দুত্বের ছাপ স্পষ্ট।

এখান থেকে দ্বিতলে উঠলাম। সিঁড়ি তুলনায় অনেক প্রশস্ত তবে পা রাখার জায়গাটি সরু। ফলে সাবধানে উঠতে হল। উঠে দেখলাম অনেক জায়গায় মেরামতি চলছে। আর তাছাড়া মূল তৃতীয় তলটি দ্বিতীয় তল থেকে সোজাসুজি ওঠেনি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে মূল মন্দিরের মাঝে বেশ খানিকটা চত্বরমতো আছে চারিদিকে।

তবে এখানে যে তৃতীয় তলে ওঠার সিঁড়ি দেখলাম তাতে বুঝলাম যে, আমার আর স্বর্গের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা হল না। সে কী সরু সরু আর খাড়াই সিঁড়ি আমি জীবনে কখনও দেখি নি। বুঝতে পারলাম না এই সিঁড়ি যারা ব্যবহার করত, তাদের কি কেউ বুড়ো হত না বা পড়ে যাবার ভয় থাকত না! এমনকী রাজা বা মেয়েরা কী করে উঠতেন! মন্দিরের দুদিকেই একই ধরনের সিঁড়ি এবং আরও আশ্চর্য, সিঁড়ির দুপাশে ধরার কোন রেলিং নেই। গাইডকে জিজ্ঞাসা করতে যা বলল, বিশ্বাস হল না। বলল, স্বর্গে ওঠার রাস্তা তো সহজ হয় না, তাই এই ব্যবস্থা। আর সবাই দুহাত দিয়ে গুঁড়ি মেরে উঠতেন। তবে এই ব্যবস্থার কারণ বা ওঠা নামার কোন সহজ উপায় বোধগম্য হল না। খাড়াই উঁচু সিঁড়ি আমি ব্যাংককেও দেখেছি – কোন কোন জায়গায় ওঠা নামাতে বেশ ভয় লাগছিল। কিন্তু এখানে দেখলাম এই সিঁড়িতে ওঠা অসম্ভব। তখন বুঝলাম এই মন্দিরের সিঁড়ির ধরণ থেকেই এখানকার বাড়িগুলির ওই খাড়াই সিঁড়ির ধারণা এসেছে। তবে গাইডের ওই স্বর্গে ওঠার যুক্তিটা ঠিক নয়, কারণ ছোট বড় সব মন্দিরেই এই ধরণের সিঁড়ি আছে। সুতরাং এর অন্য কারণ আছে যা হয়ত এদের জানা নেই। কিন্তু মন্দিরের পিছনদিকে গিয়ে ভুলটা একটু ভাঙল। কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছেন সমস্যাটি কী। তাই পিছনদিকে অপেক্ষাকৃত কম খাড়াই একটি কাঠের, হাতলওয়ালা সিঁড়ির ব্যবস্থা করেছেন এবং প্রহরী আছে সেটির ব্যবহার সীমিত করার জন্য। তারা একসঙ্গে বেশি লোককে উঠতে দিচ্ছে না। টুপি পরে যাওয়া নিষেধ। জামাকাপড়েরও বিধিনিষেধ আছে। ছোট মিনি স্কার্ট পরে যাওয়া যাবে না। আমি তো সেটিতেও বেশ ভয়ে ভয়ে উঠলাম। এই রকম সিঁড়ির ব্যবস্থা আরও কয়েকটি জায়গায় দেখেছি। আর যেখানে নেই সেখানে উঠতে পারি নি। মন্দিরে দ্বিতলে ত্রিতলে বেশ কয়েকটি অন্ধকার ঘরে বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। তেমন আড়ম্বরে না হলেও মনে হল সেগুলিতে পূজা হয়। বেশ কয়েকটি মূর্তির হয় মাথা কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই ব্যাপার রোমে সিস্টিন চ্যাপেলেও দেখেছি। পৃথিবীর বহু জায়গায় এই ভাবে শিল্পের অমর্যাদা করা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। নিরীহ মূর্তিগুলি নষ্ট করায় কী বীরত্ব প্রকাশ পায় জানি না। মন্দিরের স্বর্গে বা ত্রিতলে উঠে যে কী অদ্ভুত আনন্দ হল তা বলে বোঝাতে পারব না। মনে হল জীবনের একটা অনেক বড় না দেখা জিনিসের আস্বাদন করলাম। চতুর্দিকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, দিগন্তে দেওয়াল আর ঘন সবুজ গাছের পরিধি। নামতে ইচ্ছা করছিল না। বলা হয়নি, গাইড ছেলেটি তিনতলায় ওঠার আগেই তার প্রাপ্য নিয়ে বিদায় হয়েছে।
এবার বলি এই মন্দির সম্বন্ধে যা জানা গেছে, অল্প কথায়। এই মন্দিরের একটি অদ্ভুত ব্যাপার হল, যা অন্য কোথাও হয় না, মন্দিরটি পশ্চিমমুখী। ফলে মনে করা হয় এটি পূজার জন্য নয়, রাজাদের মৃত্যুর পরে পারলৌকিক কৃত্য করার জন্য তৈরি হয়। মৃতের ভস্মাবশেষ রাখার মত কিছু কলস পাওয়া গেছে। তা থেকে এই ধারণা হয়েছে। এ ছাড়া ধারণা হচ্ছে বিষ্ণুর আবাসস্থান, মেরু পর্বত পশ্চিমে, তাই এটি পশ্চিমমুখী। তবে এই মন্দিরে পূজা হওয়ার পক্ষে বেশি সমর্থন মেলে নি। খমের রাজারা কোন কারণে এই শহর পরিত্যাগ করে মেকং নদীর ধারে নম্পেনে চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিন এই মন্দিরশহর পরিত্যক্ত হয়ে জঙ্গলে পরিণত হয়। পরে ১৮৬১ সালে ফরাসিদের হাতে পুনরাবিষ্কার হওয়ায় আবার এটি প্রাণ পায়। তৈরি হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণের রাজত্বকালে।
বেরিয়ে এলাম স্বপ্নের মন্দির থেকে। বাইরে এসে ডাব খাওয়া হল। এত বড় ডাব আমি কোথাও দেখিনি। এক-একটা ডাব এক ডলার । তবে তার যেমন জল তেমন শাঁস। একটা ডাবের জল আর শাঁস মিলিয়ে দু থেকে তিনজনের পেট ভরে যাবে।
তৃপ্ত হৃদয় নিয়ে বের হলাম। তবে মনে হল যেন আগে পায়েস খেয়ে পরে তিতো সুক্তো খাওয়ার মত ব্যাপার হবে এরপর। অন্য মন্দির আগে দেখে নিয়ে পরে এখানে এলে হয়তো ভাল হত। আগেই প্রধান দর্শনীয় দেখে নিলে পরেরগুলোর আকর্ষণ কমে যায়।

~ ক্রমশঃ ~


অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক আধিকারিক মলয় সরকার বর্তমানে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষা স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উন্নয়নে বিশেষভাবে যুক্ত। এছাড়া পড়াশোনা ও লেখালিখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। নেশা দেশ-বিদেশ ভ্রমণ এবং উদ্যানচর্চা।

 

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

For any queries/complaints, please contact admin@amaderchhuti.com
Best viewed in FF or IE at a resolution of 1024x768 or higher