রেল নিয়ে আলোচনায়

তপন পাল



প্রথম পর্ব – শিলিগুড়িতে

উতল হাওয়া লাগল আমার গানের তরণীতে। দোলা লাগে, দোলা লাগে, তোমার চঞ্চল ওই নাচের লহরীতে॥

শেষ কবে আমি দার্জিলিং মেলে চড়েছি? আজ্ঞে বাবু, ২৯ অক্টোবর, ২০১৭। তখন চাকরি করতাম এবং সেইসূত্রে প্রায়শই ডুয়ার্স যেতে হত। বিমানেই যেতাম আসতাম, তবে সেবারে বড়সাহেবকে বলে রেলগাড়িতে গিয়েছিলাম। চাকরিটা যাওয়ার পর রেলচর্চার সূত্রে, এবং ২০২২ -এর এপ্রিলে শিলিগুড়িতে ভারতীয় রেলমুগ্ধ সঙ্ঘের বার্ষিক সম্মেলন আয়োজনের সূত্রে, বেশ কয়েকবার শিলিগুড়ি যেতে হয়েছে – তিনবার বাদে সব যাত্রাই বিমানে; একবার শতাব্দীতে ফিরেছিলাম, আর বন্দে ভারতের উদ্বোধনী যাত্রায় গিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রায় ফিরেছিলাম।
এইবারে আমন্ত্রণ পেলাম সেপ্টেম্বরের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে শিলিগুড়ি ও দার্জিলিং এ আয়োজিত এক আলোচনাচক্রে; বিষয় Darjeeling Himalayan Railway – Past, Present and Future with Tea Tourism and Toy Train। এবার তাহলে যেতেই হয়। যাওয়ার টিকিটটা ১২৩৪৩ শিয়ালদহ হলদিবাড়ি দার্জিলিং মেলে। রেলগাড়িটি প্রবাদপ্রতিম, এবং অতি প্রাচীন; এবং এর আদিকাল রহস্যাবৃত। চালু হওয়া ইস্তক ইনি বহতা নদীর মতো এতবার যাত্রাপথ বদলেছেন যে সেই গোলকধাঁধাঁর মধ্যে দিয়ে আসল রেলগাড়িটিকে চিনে নেওয়াই দুষ্কর। শুধু নামটি বাদে বদলে গেছে সবকিছুই।
উইকিপিডিয়া বলছেন ১৮৭৮-এর পয়লা জানুয়ারি এই রেলগাড়ির চলার সূত্রপাত। কিন্তু এই তারিখ কি বিশ্বাসযোগ্য? শিলিগুড়ি টাউন রেলস্টেশন চালু হয় ১৮৭৮-এর ১০ জুন। তাহলে তার আগে দার্জিলিং মেল চালু হয় কীভাবে? দ্বিতীয়ত দার্জিলিং সমতলের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত হয় ১৮৮০ সালের ২৩ অগস্ট শিলিগুড়ি (টাউন)-কার্শিয়াং; আর দার্জিলিং পর্যন্ত লাইনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ১৮৮১ সালের ৪ জুলাই। তাহলে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার আগেই তার নামে রেলগাড়ি একটু রাম জন্মানোর আগেই রামায়ণ লেখার গল্পের মত হয়ে যায় না!
১৮৭৮ সালে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনটির সঙ্গে কলকাতা (পরবর্তীকালে শিয়ালদহ) স্টেশনের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয় দুই পর্যায়ে – কলকাতা থেকে পদ্মানদীর দক্ষিণপাড়ে দামুকদিয়া ঘাট পর্যন্ত Eastern Bengal State Railway-র সাড়ে পাঁচ ফুটের ১৮৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন; তারপর স্টিমারে নদী পেরিয়ে নদীর অপরপারের সারাঘাট থেকে শিলিগুড়ি North Bengal Railwayর ৩৩৬ কিলোমিটার মিটারগেজ লাইন। ১৯১২র টাইম টেবিলে দেখছি দার্জিলিং মেল শিয়ালদহ থেকে দামুকদিয়াঘাট পৌঁছাচ্ছে রাত আটটা আঠারোয়, আর সংযোগকারী স্টিমার ছাড়ছে রাত আটটা চুয়াল্লিশে, সারাঘাট পৌঁছাচ্ছে রাত নটা নয়ে। ওপারের রেলগাড়ি স্টিমারের লোক তুলে ছাড়ছে রাত নটা চুয়াল্লিশে।
১৯১৫ সালে হার্ডিঞ্জ সেতু (বর্তমানের বাংলাদেশে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি থেকে কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলা পর্যন্ত যুক্তকারী পদ্মানদীর ওপর ১.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ) নির্মিত হওয়ার পর সমগ্র কলকাতা-শিলিগুড়ি লাইনটি সাড়ে পাঁচ ফুটের ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয়। সান্তাহার অবধি ব্রডগেজ চালু হয় ওই বছরেই, আর সান্তাহার থেকে শিলিগুড়ি টাউন ১৯২৬ সালে। তারপর ভূ-রাজনৈতিক কারণে বদলে গেল অনেক কিছু। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরেও কিছুকাল দার্জিলিং মেল শিয়ালদহ-রানাঘাট-ভেড়ামারা - হার্ডিঞ্জ ব্রিজ - ঈশ্বরদী - সান্তাহার - হিলি - পার্বতীপুর - নীলফামারী -হলদিবাড়ি – জলপাইগুড়ি - শিলিগুড়ি পথে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে চলাচল করেছে; কারন র‍্যাডক্লিফ লাইনের উড়নচণ্ডেপনায় তার পশ্চিমে গঙ্গার ওপরে কোন রেলসেতু ছিলনা। কালকূটের 'স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গণে' উপন্যাসে সেই ইতিহাস বিধৃত। সান্তাহার - গুয়াহাটি রুটে চলাচলকারী অসম মেল এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করত দার্জিলিং মেল।
র‍্যাডক্লিফ লাইনের খামখেয়ালিপনা প্রবাদপ্রতিম। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে মালদা আর মুর্শিদাবাদ জেলা গিয়েছিল সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে; খুলনা আর যশোহর এসেছিল এপারে। মালদা আর মুর্শিদাবাদ এই দুই জেলায় চাকরি করেছি ১৯৮১ থেকে ১৯৯২। তখন বর্ষীয়ানদের মুখে শুনেছি কিভাবে ওই দুদিন কাটিয়েছিলেন বদ্ধ ঘরে, আতঙ্কে – এবং তাঁরা কতটা আশ্বস্ত হয়েছিলেন যখন ১৭ আগস্ট ভারতীয় সেনা শহরের দখল নিয়ে তেরঙ্গা উড়িয়েছিল। আর শ্রীহট্টের বঞ্চনা তো প্রবাদপ্রতিম 'মমতাবিহীন কালস্রোতে বাঙলার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি সুন্দরী শ্রীভূমি'।
তারপর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় রেলগাড়ির চলা বন্ধ হল। কলকাতা থেকে সাহিবগঞ্জ লুপ এর মাধ্যমে সাকরিগালি ঘাট, কখনও কখনও সাহিবগঞ্জ ঘাট; তারপর ফেরিতে গঙ্গা পেরিয়ে মনিহারিঘাট। তারপর মিটারগেজ এ কাটিহার এবং বারসোই এর মাধ্যমে কিষণগঞ্জ হয়ে শিলিগুড়ি। ১৯৪৯ সালে কিষাণগঞ্জ-শিলিগুড়ি লাইনটি মিটারগেজ করা হয়। আমার বাবার মুখে এই লাইনের কথা অনেক শুনেছি। ১৯৫৭ তে এ জি বেঙ্গলে যোগদানের পূর্বে তিনি চাকরিসূত্রে এই অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করতেন। আমার রোগাপ্যাংলা যুবক বাবা ডবল ব্রেস্টেড কোট পরে মিটারগেজের কাঠের কামরায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একটি সাদা-কালো ছবি বহুদিন আমাদের বাড়ির দেওয়ালে ঝুলত।
ফারাক্কা রেলসহ রাস্তা সেতু (২,২৪০ মিটার) ১৯৭১ সালে চালু হয়, পাতা হয় নতুন কিছু রেললাইন। তার ফলে বারহারোয়া-আজিমগঞ্জ-কাটোয়া লুপ লাইন, এবং বারহারোয়া থেকে গুমানি ত্রিকোণ এর মাধ্যমে সাহিবগঞ্জ লুপ লাইন সেতু পেরিয়ে মালদহ ও শিলিগুড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়। তদবধি দার্জিলিং মেল শিয়ালদহ - ডানকুনি জংশন - বর্ধমান জংশন – সাহিবগঞ্জ লুপ – বারহারোয়া জংশন (স্টেশনে ঢোকে না, বাইরে থেকে বাঁক নেয়) – চামাগ্রাম – মালদা টাউন - কুমেদপুর জংশন - বারসোই জংশন – কিষাণগঞ্জ - আলুয়াবাড়ি রোড জংশন – নিউ জলপাইগুড়ি জংশন হয়ে চলাচল করছে। ২০০৪ সালে অনেকগুলি বিরতি প্রত্যাহার করে রেলগাড়িটিকে সুপারফাস্ট ঘোষণা করা হয়। ২০২২ এর আগস্ট থেকে এর যাত্রাপথ নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে হলদিবাড়ি অবধি বর্ধিত হয়েছে। বর্তমানে এর বিরতি শিয়ালদহ ছেড়ে বর্ধমান জংশন (১০২ কিলোমিটার), বোলপুর শান্তিনিকেতন (১৫৩ কিলোমিটার), মালদা টাউন (৩৩৮ কিলোমিটার), কিষাণগঞ্জ (৪৮৬ কিলোমিটার), নিউ জলপাইগুড়ি জংশন (৫৭৩ কিলোমিটার), জলপাইগুড়ি (৬০৭ কিলোমিটার) ও প্রান্তিক স্টেশন হলদিবাড়ি (৬৩০ কিলোমিটার)।
২০০০ সালের পয়লা জুলাই শিয়ালদহ রাজধানী চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত দার্জিলিং মেল ছিল শিয়ালদহের সবচেয়ে ইজ্জতদার রেলগাড়ি। ৪৩ আপ ৪৪ ডাউন দার্জিলিং মেল তার হৃতগৌরবের কিছুটা ফিরে পায় ২০০৪ সালে, যখন পথিমধ্যের বেশ কিছু বিরতি প্রত্যাহৃত হয় ও রেলগাড়িটি সুপারফাস্টের স্বীকৃতি পায়।


আমাদের যাত্রা হল শুরু এখন, ওগো কর্ণধার। তোমারে করি নমস্কার।

অতএব নির্ধারিত তারিখে অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, আমি শিয়ালদহে। আমাদের মতো শহরতলিতে বড় হওয়া ছেলেপিলেদের কাছে শিয়ালদহ বহির্বিশ্বের ইন্টারফেস। ১৯৭৫-এ এই শিয়ালদহ দিয়েই কলেজযাত্রার শুরু, ২০১৯-এর এক বিষণ্ণ অপরাহ্নে এই শিয়ালদহ দিয়েই কর্মজীবনের সমাপ্তি। তাই মনে দম্ভ ছিল, শিয়ালদহ আমার চেয়ে ভালো কেউ চেনে না। কিন্তু অনেকদিন পর যাওয়া, করোনায় ঘরবন্দী, তারপরে যেটুকু ঘোরাফেরা করোনার ভয়ে বিমানে। চার বছর পরে শিয়ালদহে ঢুকে আমি বাঁশবনে ডোমকানা – এ কোথায় এলাম রে বাবা - এতো দেখি শপিং মল! এখানে মহেন্দ্র দত্তের ছাতা তো ওখানে কুকমি গুঁড়া মশলা, এইখানে সেনকো গোল্ড তো সেইখানে চন্দ্রাণী পার্লস, বাঁয়ে কেএফসি তো ডাইনে হলদিরাম। এর মাঝে শিয়ালদার সেই ইষ্টিশনটি গেল কই? তারপরে দেখি প্ল্যাটফর্ম সংখ্যা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে, হারিয়ে গেছে নয়ের এ, নয়ের বি আর নয়ের সি। দার্জিলিং মেল দেখাচ্ছে বারো নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে, কিন্তু আমার চেতনায় বারো নম্বর প্ল্যাটফর্ম দক্ষিণ শাখায়। তাও অনেক খুঁজেপেতে বারো নম্বর প্ল্যাটফর্ম পাওয়া গেল।
আমাদের রেলগাড়ি এল এইচ বি কামরার, বাইশটি কামরা – Loco – SLR - GS – GS – GS - S1 - S2 - S3 - S4 - S5 - S6 - S7 - B1 - B2 - B3 - B4 - B5 - B6 - B7 - A1 - A2 - H1 – EOG। আগে এই রেলগাড়িতে একটি মিলিটারি কামরা থাকতো কিন্তু ইদানীং আর দেখি না। গাড়িটিতে প্যান্ট্রি বা On board catering নেই, যদিও শুনেছি ঔপনিবেশিক যুগে এর প্যান্ট্রির আহার্য ছিল আহামরি গোত্রের।

আমার সংরক্ষণ বাতানুকূল প্রথম শ্রেণিতে, অর্থাৎ শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় কামরায়। কামরার ক্রমিক 213503C, অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের পুরাতন। উঠে দেখা গেল রেলের কিছু কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত অতি উচ্চ আধিকারিক ওই কামরাতেই যাচ্ছেন ওই আলোচনাচক্রে যোগ দিতে; পাশের A2 কামরায় আছেন কিছু নবীন রেল উৎসাহী। তারা আমাকে দেখে অবাক, একজন বলেই ফেললেন 'তুমি তো দাদা রেলগাড়িতে যাওয়ার লোক নও; হঠাৎ?' তাকে বোঝালাম, 'রেলগাড়ির আর বিমানের ভাড়া একই, কিন্তু আমার বাড়ি থেকে পাঁচ টাকার টিকিট কাটলেই শিয়ালদহ - সেখানে বিমানবন্দর যেতে হলে পেট্রল, চালকের পারিশ্রমিক নিয়ে অনেকগুলো টাকার ধাক্কা।' সে বলল, 'তুমি আজকাল এত ভাবছ নাকি?' বললাম, 'বাধ্য হয়ে, অবসর নিয়েছি তো! এখন অনেককিছুই ভাবতে হচ্ছে।'
একটি ৬,৩৫০ অশ্বশক্তির WAP 7 প্রজাতির বৈদ্যুতিক লোকো সারা রাস্তা আমাদের টেনে নিয়ে যাবে। সম্প্রতি সাহিবগঞ্জ লুপ লাইন ও বারহারোয়া নিউ জলপাইগুড়ি লাইন বৈদ্যুতায়িত হয়েছে বিপুল বিনিয়োগে – কিন্তু তাইতে দার্জিলিং মেলের গতিবেগ বাড়েনি – এখনও সে শিয়ালদহ থেকে ছাড়ে রাত দশটা পাঁচে, আর নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছায় পরদিন সকাল সোয়া আটটায়। অথচ ২০১৭ তে একই সময়ে শিয়ালদহ ছেড়ে সে নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছাতো সকাল আটটায়। যাত্রীদের যদি কোন সুবিধাই না হল, তাহলে এত পয়সা খরচা করে বৈদ্যুতায়িত করে কি লাভ হল বাপু! দার্জিলিং মেলের গড় গতিবেগ হাস্যকর, ঘণ্টায় ছাপান্ন কিলোমিটার – যদিও ডানকুনি জংশন থেকে খানা জংশন তার Max Permissible Speed ঘণ্টায় একশো ত্রিশ কিলোমিটার। প্রসঙ্গত, রেলগাড়িটি ISO 9001:2008 Certified।
এখন দার্জিলিং মেল নিউ জলপাইগুড়িতে যাত্রাবিরতি করে না। ২০২২-এর আগস্ট থেকে সে নিউ জলপাইগুড়িতে ডিজেল লোকো জোড়ে। তারপর জলপাইগুড়িতে বিরতি দিয়ে হলদিবাড়ি পৌঁছায় বেলা দশটায়। চালক মহোদয়দের সঙ্গে আলাপ হল; তাঁরা আমাদের নিয়ে যাবেন মালদা টাউন অবধি। সেখান থেকে চারজন চালক উঠবেন – দুজন বৈদ্যুতিক লোকোর চালক, দুজন ডিজেল লোকোর চালক। বৈদ্যুতিক লোকোর চালক দুজন রেলগাড়িটিকে নিয়ে যাবেন নিউ জলপাইগুড়ি জংশন অবধি। তারপর বৈদ্যুতিক লোকোর সামনে জোড়া হবে ডিজেল লোকো – চালিয়ে নিয়ে যাবেন ডিজেল লোকোর চালক দুজন। সোয়া দশটায় ছাড়বে গৌড় এক্সপ্রেস - সেও তখন প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেও আমার ভারি প্রিয় রেলগাড়ি – ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ আমি মালদায় চাকরি করতাম যে!
রেলগাড়ি ছাড়ল দশটা পাঁচে, আর এঁকেবেঁকে শিয়ালদহ থেকে বেরিয়ে খাল পেরোবার আগেই বামদিক থেকে ধেয়ে এল দার্জিলিং মেলের nemesis , দিনশেষের কল্যাণী লোকাল - সে দশটায় ছাড়ে। ছোটবেলা থেকে দেখছি, এই দুই রেলগাড়ির হাড্ডাহাড্ডি – মধ্যিখানে বিধাননগর রোডে থেমেও দমদম জংশন অবধি সে আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটল। কল্যাণী লোকালরা এইরকমই। আর এক কল্যাণী লোকাল, ৩১৩৩৩, বিকেল চারটে পঞ্চাশে ছাড়ে আর শিয়ালদহ-রাজধানীর সঙ্গে দমদম জংশন অবধি দৌড়ায়। মনে হয় থামতে না হলে সে শিয়ালদহ-রাজধানীর আগেই নয়াদিল্লি পৌঁছাত।
শিয়ালদহ থেকে চারটি লাইন বেরিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার গিয়েছে মাটি ফেলে উঁচু করা জমির ওপর দিয়ে। তার নিচে দিয়ে চলে গেছে অনেক রাস্তা, এঁকেবেঁকে চলে গেছে অনেক সর্পিল খাল। সাহেব প্রযুক্তিবিদদের দূরদৃষ্টি ঈর্ষণীয়; বর্ষার জমা জল যেন রেলগাড়ি চলাচলে বিঘ্ন না ঘটাতে পারে সেইজন্যই এমন ব্যবস্থা। রেললাইন বসানোর আগে, এতদঞ্চলের ভূমির স্বাভাবিক ঢাল পূর্বে হওয়ায় হুগলী নদী থেকে প্রচুর জল ছোট ছোট জলধারাবাহিত হয়ে এখন আমরা যাকে East Calcutta Wetlands বলি, সেখানে গিয়ে পড়ছিল। রেলপথ সেই স্বাভাবিক জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করায় শহরে জল জমছিল এবং নানাবিধ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছিলো – এমনটিই জানাচ্ছে সেকালের সংবাদপত্র। বিরক্ত হয়ে ১৮৬৫-তে Superintendent Engineer for the Department of Public Works in Bengal, Hugh Leonard মেটিয়াবুরুজের কাছে আকরা থেকে মোহনা অবধি হুগলী নদীর পূর্ব পাড় বরাবর পাঁচিল তোলেন – উদ্দেশ্য হুগলীতে জলপ্রবাহ বাড়ানো।
তবে আমার বিস্ময় অন্যত্র। সেই যুগে (১৮৬২-র ২৯ সেপ্টেম্বর শিয়ালদহ স্টেশনের পথ চলা শুরু Eastern Bengal Guaranteed Railway র হাত ধরে। তখন স্টেশনটির নাম ছিল বেলিয়াগুটটা, ১৮৮৭ সালের ১ এপ্রিল নাম বদল হয়। ক্যানিং লাইন চালু হওয়ার পরপরই চালু হয় রানাঘাট লাইন), যখন ছিল না বুলডজার আর্থমুভার, কিভাবে এই বিপুল পরিমাণ মাটি সরানোর কাজ হয়েছিল!
বিধাননগর রোড পেরোলাম। কর্মজীবনের শেষ তিন বছর আমার অফিস ছিল এই স্টেশনের গায়েই, জানালার মোটা কাচের ওপারে দশতলা আলোকোজ্জ্বল ভবনটি দেখে হৃদয়ে একটু যে চিনচিনানি বাজল না এমনটি নয়। তারপর কেষ্টপুর খাল, দমদম জংশন পেরিয়ে আমরা উড্ডীন। পেরিয়ে গেল বরাহনগর রোড, দক্ষিণেশ্বর। দক্ষিণেশ্বরে আমি কপালে হাত ছোঁয়ালাম না দেখে পাশের বর্ষীয়ান সহযাত্রীটি জানতে চাইলেন 'আপনি কি ব্রাহ্ম?' ভারি অবাক হলাম, আমার তিনকুলে কেউ কোনদিন ব্রাহ্ম হয়নি – পিতৃকুল হুগলী জেলার শাক্ত, মাতৃকুল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বৈষ্ণব, পিতা নাস্তিক, আমিও তাই।
বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা পাশাপাশি, আমরা বিবেকানন্দে (Wellingdon Bridge)। শ্যামবিটপীঘন-তট-বিপ্লাবিনী ধূসর তরঙ্গ ভঙ্গে পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে পেরিয়ে বালিঘাট, বালি হল্ট, রাজচন্দ্রপুর, Calcutta Chord Link Cabin - লাইন এখানে ত্রিধারা; ডাইনেরটি তীব্র বাঁক নিয়ে গেছে হাওড়া বর্ধমান জংশন কর্ড লাইনের বেলানগর স্টেশন, মাঝেরটি গেছে হাওড়া বর্ধমান জংশন কর্ড লাইনের ডানকুনি জংশন, আর বামেরটি গেছে ভট্টনগর বালটিকুরি বাঁকড়া নয়াবাজ হয়ে দক্ষিণ পূর্ব রেলের হেফাজতে। ২২২০১ শিয়ালদহ পুরী দুরন্ত এক্সপ্রেস এই লাইনে যায়।
Calcutta Chord Link West, ডানকুনি জংশন। ঘড়িতে পৌনে এগারোটা, গাড়ি এতক্ষণ ছিল একশো দশে, এবারে একশো তিরিশ নেবে। আমাদের কামরা রেকের একদম শেষে, তাই পাশাপাশি দুলুনি (roll motion) খুব বেশি। এবারে শুয়ে পড়তে হয়। শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম এই যে রাত্রির নৈঃশব্দ্য চিরে তীব্র আলো জ্বালিয়ে সশব্দে রেলগাড়ি যাচ্ছে, এতে রেললাইনের পাশের ঝোপঝাড়ের পোকামাকড়দের, বেজিদের, ব্যাঙেদের, সাপেদের, ইঁদুরদের; বা রেললাইনের পাশের উঁচু গাছে বাসা বাঁধা পাখপাখালিদের কতই না অসুবিধা হচ্ছে। রেলগাড়িটিকে দেখে, লোকোর হেডলাইট দেখে তারা এটাকে কি ভাবছে!!

এ দিন আজি কোন্‌ ঘরে গো খুলে দিল দ্বার। আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল কার।

ঘুমের মধ্যে পেরিয়ে গেল কামারকুণ্ডু জংশন, মশাগ্রাম জংশন, শক্তিগড় জংশন, বর্ধমান জংশন, খানা জংশন, আমেদপুর জংশন, সাঁইথিয়া জংশন, রামপুরহাট জংশন, নলহাটি জংশন; পেরিয়ে গেল কানা ক্যানাল, ঘিয়া, মশাগ্রামের দুই ডি ভি সি সেচখাল, বাঁকা, কুনুর, অজয়, কোপাই, বক্রেশ্বর, বাতাসপুরের খাল, ময়ূরাক্ষী, দ্বারকা, ব্রাহ্মণী, বাঁশলোই, পাকুড় খাল, গুমানি নদী; পেরিয়ে গেল বর্ধমান ও বোলপুরের বিরতি। ঘুম ভাঙল রাত সোয়া তিনটেয়, গাড়ি তখন Bonidanga Link Cabin পেরোচ্ছে। এমনিতেই আমি চারটেয় উঠি। যখন চাকরি করতাম, বড়সাহেবের দাঁতখিঁচুনির ভয়ে ভোর না হতেই উঠতে হত; গ্রহীতাবসর জীবনেও অভ্যাসটা রয়ে গেছে। তবু, কি বলবো একে – স্বজ্ঞা না উপজ্ঞা, নাকি পূর্বজন্মস্মৃতি। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ আমি চাকরি করতাম মালদায়, ৫৭ আপ ৫৮ ডাউন দ্বিসাপ্তাহিক হাওড়া - নিউ জলপাইগুড়ি জংশন - হাওড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস চালু হয় ১৯৮৩ তে; সে-ই এই লাইনের প্রথম দিনের বেলার রেলগাড়ি – তার দৌলতেই এই রেলপথের সঙ্গে আমার চেনাশোনা, ভাব ভালোবাসা, মান অভিমান। তখন কাঞ্চনকন্যা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, উত্তরবঙ্গ, পুরী কামাখ্যা, হাওড়া বালুরঘাট, কলকাতা হলদিবাড়ি, দক্ষিণ ভারত ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের সংযোগকারী রেলগাড়িসমূহ, পদাতিক – কেউ ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল দার্জিলিং মেল, কামরূপ এক্সপ্রেস, আর অধুনাবিলুপ্ত হাওড়া নিউ জলপাইগুড়ি প্যাসেঞ্জার ও হাওড়া নিউ বঙ্গাইগাঁও জনতা এক্সপ্রেস। তারা মালদহে পৌঁছাত গভীর রাতে, কোটাও ছিল অল্প। ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে মালদহবাসীদের একতম যোগসূত্র ছিল সপ্তাহে তিনদিন আসা সপ্তাহে তিনদিন যাওয়া গৌড় এক্সপ্রেস।
মালদায় এক কৃত্যক অগ্রজ ছিলেন চন্দননগরের লোক, এবং তিনি ছিলেন অতীব গৃহকাতর। গৌড় এক্সপ্রেস ছাড়ার সপ্তাহের তিনদিন তিনি অফিস ছুটির পর আমবাগানের মধ্য দিয়ে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে ঝলঝলিয়া স্টেশনে (মালদা টাউন) যেতেন এবং গৌড় এক্সপ্রেসের কামরাগুলির গায়ে সস্নেহে হাত বোলাতেন এই ভেবে যে এরা হুগলী জেলার ওপর দিয়ে যাবে। তার সম্বন্ধে বাজারে গুজব চালু ছিল যে একবার তিনি নাকি গৃহকাতরতায় আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু দু ঘণ্টা ঠা ঠা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনদিক থেকেই কোনও রেলগাড়ি না আসায় শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে আসেন।
Bonidanga Link Cabin থেকে ইউ টার্ন নিয়ে বনিডাঙ্গা, ফের গুমানি নদী পেরিয়ে বিন্দুবাসিনী, তিলডাঙা – তারপর সেই গুমানি ত্রিকোণ, ফিডার ক্যানাল পেরিয়ে New Farakka S Cabin, তারপর নিউ ফরাক্কা জংশন - বারহারোয়া আজিমগঞ্জ কাটোয়া লাইন এখানে এসে মিশল। তারপর New Farakka N Cabin পেরিয়ে সেতুতে। নিচে অনেক জল, তাই পেরিয়ে আমরা মালদহ জেলায়; চামাগ্রাম, খালতিপুর, জামিরঘাটা পেরিয়ে পাগলা নদী – সর্পিল নদীটি ফরাক্কার উত্তরে গঙ্গা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। লোককাহিনি বলে পাগলা হচ্ছে গঙ্গার পাগলাটে ছোট ভাই, দিদিকে সে বড় ভালোবাসত। বিবাহের পর দিদির স্বামীগৃহে গমন সে মেনে নিতে পারেনি, সততই সে দিদিকে খুঁজতো, তাই তো বারে বারে সে খাত বদলায়। তবে একদিন না একদিন দিদির সঙ্গে সে মিলবেই। তথ্যও তাই বলছে, বিগত এক শতকে পাগলা গঙ্গার ব্যবধান কমেছে অনেকখানিই। গৌড় মালদা পেরিয়ে, গঁদ্রাইল সেতু পেরিয়ে শহর শুরু, মালদা মেডিকাল কলেজ, মালদা মহিলা কলেজ, মালদা কলেজ পেরিয়ে রাজমহল রোডের উড়ালপুল, এর কাছেই এক সরকারি আবাসনের টঙের ঘরে আমার দাম্পত্যের শুরু। অগ্রজ সহকর্মীরা বলতেন, 'গোদাবরী তীরে, কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষচূড়ে। বাঁধি নীড় থাকে সুখে।' অবশেষে মালদা টাউন স্টেশন। স্টেশনটি অর্বাচীন, ১৯৭১ সালে ফরাক্কা সেতুর প্রেক্ষিতেই তার নির্মাণ। ১৯৫৬, এমনকি ১৯৬০ এর ব্র্যাডশতেও মালদা টাউন বলে কোন স্টেশনের উল্লেখ নেই। বারহারোয়া আজিমগঞ্জ কাটোয়া লাইনকে গঙ্গা পার করিয়ে উত্তরবঙ্গ উত্তর পূর্ব ভারতের সঙ্গে যুক্ত করতে ব্রডগেজ লাইন পাতা হলে এই স্টেশনের জন্ম। আরও একটু পিছিয়ে গেলে, লালগোলাঘাট থেকে স্টিমারে পদ্মা পেরিয়ে ওপারে গিয়ে গোদাগাড়িঘাট থেকে মিটারগেজের রেলগাড়ি ধরে আমনুরা রোহণপুর সিঙ্গাবাদ মালদা কোর্ট ওল্ড মালদা হয়ে কাটিহার। ১৯৪৩ এর ব্র্যাডশতে ১৯/২০ শিয়ালদহ কাটিহার প্যাসেঞ্জারের এই যাত্রা পথই দেখানো আছে। ১৯১৫য় হার্ডিঞ্জ সেতু চালু হওয়ার পরেও এই পথ চালু ছিল। সম্ভবত দেশভাগের পরবর্তীকালে তা বন্ধ হয়। একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। জেলাশাসকের সেরেস্তার সর্বকনিষ্ঠ আধিকারিক হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল রেলস্টেশন থেকে জেলাশাসকের নামে প্রেরিত নানাবিধ মাল খালাস করা। তখন দেখতাম অনেক মাল আসত মালদা কোর্ট স্টেশনে। প্রবীণ করণিকদের – তাদের অনেকেই দেশভাগের পর ওপার থেকে অপশন দিয়ে এপারে চাকরিতে বহাল – শুনতাম এটি ঔপনিবেশিক লিগাসি, দেশভাগের আগে জেলাশাসকের নামে প্রেরিত মাল মালদা কোর্ট স্টেশনে আসত, এখনও আসছে।
চল্লিশ বছর আগে যখন মালদায় থাকতাম, তখন মালদা বাচামারির গীতা আচার ছিল অতিখ্যাত। আমার সুবিস্তৃত আত্মীয়কুলে তার চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। তবে শেষবার যখন মালদা গেলাম মালদা ডিজেল লোকোশেড দেখতে, বিস্তর খুঁজেও গীতা আচারের দেখা মিললো না – তিনি গীতাবর্ণিত 'বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি'র মত নব নব রূপে দেখা দিয়েছেন। মালদা টাউন স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটি বেশ বড়সড় আচারের দোকান আছে। কিন্তু আমরা ঢুকবো চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে; দশ মিনিটের বিরতি – এর মধ্যে আমার বুড়ো হাড়ে অতিকায় ফুটব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে আচার কিনে ফের ফুটব্রিজ পেরিয়ে ফিরে আসা অনিশ্চিত। আর ফেরার সময় টিকিট ১২৩৭৮ নিউ আলিপুরদুয়ার শিয়ালদহ পদাতিক এক্সপ্রেসে, তিনি মালদা টাউন স্টেশনে পৌঁছবেন রাত পৌনে একটায়। অতরাতে নিশ্চয়ই আচারের দোকান খোলা থাকবে না।
আমি রেলের পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার একটি কিশোরকে ধরলাম। 'বাবা! বুড়ো মানুষের একটা উপকার করবে। আচার এনে দেবে?' সে বলল, 'টাকা দিন।' আমি তার হাতে টাকা দিয়ে বললাম 'পাঁচটা বড় বোতল নিও, চারটে আমাকে দিও, একটা তুমি রেখো।' সে টাকা নিয়ে আচারের দোকানদারকে ফোন করে দিল। রেলগাড়ি মালদা টাউন স্টেশনের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই দেখি আচারের দোকানদার পাঁচটা বড় বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জন্যে।
ঘড়িতে তখন সোয়া চারটে। দশ মিনিটের বিরতি। এল আমার ক্লান্ত হাতে ফুল-ঝরানো শীতের রাতে দিনের প্রথম কাপ চা। সেখান থেকে এগিয়ে ডাইনে ঘুরে মহানন্দা পেরিয়ে ওল্ড মালদা জংশন – এখান থেকে পূর্বদিকে একটি লাইন গেছে সিঙ্গাবাদ হয়ে বাংলাদেশের রোহণপুরের দিকে। তারপরে আদিনা, একলাখি জংশন – এখান থেকে পূর্বদিকে একটি লাইন গেছে বালুরঘাটের দিকে। নাগরি নদী পেরিয়ে মহানন্দা সেতু, সামশি, ভালুকা রোড, হরিশচন্দ্রপুর, কুমেদপুর জংশন, এখান থেকে পশ্চিমদিকে একটি লাইন গেছে কাটিহারের দিকে। এখানেই মালদা জেলা শেষ, এর পরেই বিহার। কিছুটা গিয়ে মুকুরিয়া জংশন - এখান থেকে পশ্চিমদিকে একটি লাইন গেছে কাটিহারের দিকে। তারপরেই বারসোই জংশন – এখান থেকে পূর্বদিকে গেছে রাধিকাপুর লাইন। আর কিছুটা গিয়ে কিষাণগঞ্জ। গাড়ি থামল, দুমিনিটের বিরতি, তখন বাজে সাড়ে ছটা।
সকাল হতেই রেললাইনের ধারে দেখা যেতে লাগলো সেই 'সর্বভারতীয়' পরিচিত দৃশ্য, নাইপুল (Sir Vidiadhar Surajprasad Naipaul; 17 August 1932 – 11 August 2018)-এর ভাষায় 'Indians defecate everywhere. They defecate, mostly, beside the rail tracks'; আমার চিন্তা বেড়ে গেল। উপমহাদেশে anatomically modern humans এর বসবাসের প্রমাণ পঁচাত্তর হাজার বছরের পুরাতন; আর রেলগাড়ি এখানে এসেছে বড়জোর দুশো বছর। এই দুশো বছরের আগের চুয়াত্তর হাজার আটশো বছর ভারতীয়রা কোথায় প্রাতঃকৃত্য সারতেন, বা ভারতীয়রা এই কাজের জন্যে রেললাইনকেই এত প্রাসঙ্গিক ভাবেন কেন – নাইপুল বেঁচে থাকলে তাকে জিজ্ঞাসা করতাম। নাইপুল পছন্দ না করতে পারেন, তিনি না জানতে পারেন যে আমাদের ক্রান্তীয় জলবায়ুতে দিন ও রাতের তাপমাত্রার তীব্র তারতম্যের জন্য রেললাইনের সঙ্কোচন প্রসারণে ভোরবেলার দিকে রেললাইনে প্রায়ই ফাটল ধরে, রেলের ভাষায় যাকে বলে RAILWAY TRACK CRACK। এই ফাটল দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। রেলকর্তৃপক্ষকে একরকম ফাটলের খবর দিয়ে প্রাণহানি এবং রেলের সম্পত্তিহানি শহুরে নাক সিঁটকানো বাবুরা রোধ করেন না, করেন এই সব গ্রামীণ প্রান্তিক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বস্তিবাসী মানুষেরা।
ওল্ড মালদা জংশন পেরিয়ে শুরু হয়েছিল আমবাগান, এইবার তার জায়গা নিল চা বাগান। পাঞ্জিপাড়া, ইকরচালা পেরিয়ে সেই গাইসল। ২ আগস্ট, ১৯৯৯; রাত পৌনে দুটো। দিল্লি থেকে আসা অবধ আসাম এক্সপ্রেস মুখোমুখি ধাক্কা মেরেছিল দিল্লিগামী ব্রহ্মপুত্র মেলকে; এই গাইসলে। কিষাণগঞ্জে সিগন্যালের ভুলে অবধ আসাম এক্সপ্রেস ভুল লাইনে চলে আসে। সেখান থেকে গাইসল উনিশ কিলোমিটার। এবং এই উনিশ কিলোমিটারে কেউ – রেলগাড়ির চালক, গার্ড, ইকরচালা ও পাঞ্জিপাড়া স্টেশনের স্টেশন মাস্টার, কেবিনম্যান, লেভেল ক্রসিঙের গেটম্যান – কেউ দেখল না যে রেলগাড়িটি ভুল লাইনে চলছে। একেই কি Collective Amnesia বলে? সরকারি হিসাবে মৃত ২৮৫, স্থানীয়রা বলেন হাজার, নব্বইজন সৈন্য সহ। দুর্ঘটনার পর আমি সেখানে গিয়েছিলাম। স্থানীয়দের অবিশ্বাস করার মত কিছু দেখিনি। দুর্ঘটনাকবলিত কামরাগুলির মধ্যে সাতটি ছিল জেনারেল কামরা – তাদের বহনক্ষমতা সরকারিভাবে বাহাত্তর; বাস্তবে একটি অসংরক্ষিত জেনারেল কামরায় কত যাত্রী থাকে তা কি আর আমরা জানিনা! এমনটাও শোনা গিয়েছিলো যে সেনাবাহিনীর কামরায় বিস্ফোরক পরিবাহিত হচ্ছিলো; সেইজন্যই দুর্ঘটনাকালে বিস্ফোরণ ঘটে অভিঘাত তীব্রতর হয়।
উপমহাদেশে রেলব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রথম দিন থেকেই অতীন্দ্রিয় আধিদৈবিকতার সঙ্গে তার প্রবল সম্পর্ক। সত্যজিৎ রায়ের ফার্স্ট ক্লাস কামরা বা অমিতাভ ঘোষের The Calcutta Chromosome সেই জনচেতনার অভিজ্ঞান। আর তার সবটুকুই কি কল্পনা! ৫ই মে, ২০১৫, দমদমগামী পাতাল রেলের চালক দেখেছিলেন নেতাজি ভবন আর রবীন্দ্র সদনের মধ্যে রেললাইন ধরে কে যেন হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। তিনি রেলগাড়ি থামিয়ে দেন, কন্ট্রোলে জানানো হয়, বিস্তর খোঁজাখুঁজি হয়; কিন্তু কাউকে পাওয়া যায় নি। রেলগাড়ির চালকরা সদাসতর্ক মানুষ, তাদের দৃষ্টিশক্তি ঈর্ষণীয়। তবুও...। ভারতের নানা জায়গা থেকে রেলগাড়ির চালকদের মুখে আমি এমন অনেক গল্প শুনেছি। খোদ কলকাতার বুকের উপরে টালিগঞ্জ স্টেশনে একবার অমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। গাইসল তেমনই এক উদাহরণ। স্থানীয়রা বলেন ওই দুর্ঘটনার পর থেকে স্টেশনটি হানাবাড়ি; চলন্ত রেলগাড়ির আওয়াজ শোনা যায় যখন তখন, এক তরুণ যুক্তিবাদী রেল অনুরাগী আমাকে একবার জানিয়েছিল যে সে ছবি তুলবে বলে চলন্ত রেলগাড়ির জানালার পাশে ক্যামেরা বাগিয়ে বসেছিল, এবং ঠিক ওইখানে গিয়ে ক্যামেরা পাগলামো শুরু করেছিল। তারপরেই আবার সব ঠিকঠাক।

মেঘলা আকাশ, রেললাইনের পাশে চা বাগান, গাছপালা। গাড়ি চলছে দ্রুত, সরে সরে যাচ্ছে দৃশ্যপট। তারপর আলুয়াবাড়ি রোড জংশন – শিলিগুড়ি শাখা লাইন এখান থেকে শিলিগুড়ি গেছে। কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস এই পথে যায়। রেলগাড়ির কামরায় উঠে এল বয়েলড দেশি ডিম। তাই দেখেই আমার আমার মন বলে, 'চাই চা ই, চাই গো– যারে নাহি পাই গো।' সকল পাওয়ার মাঝে আমার মনে বেদন বাজে 'নাই, নাই নাই গো।'
ধূলাবাড়ি, দাহুক নদী পেরিয়ে মাঙ্গুরজান। তিন মাইল হাট, ধুমডাঙ্গি পেরিয়ে ফের মহানন্দা; তাকে পেরিয়ে চটেরহাট। নিজবাড়ি, রাঙ্গাপানি – শহর শুরু। তার পরেই নিউ জলপাইগুড়ি জংশন। তখন বাজে আটটা দশ।
শিলিগুড়ির প্রবীণদের কাছে শুনেছি, একদা শিলিগুড়ি শহরের জীবনচর্চা ছিল দার্জিলিং মেলের সুরে বাঁধা। সকালে সে ঢুকলে শহর ঘুম থেকে জাগত, সন্ধ্যায় সে ছেড়ে গেলে মানুষজন শুতে যেত। দার্জিলিং মেলের যাত্রাপথ নিউ জলপাইগুড়ি জংশন থেকে হলদিবাড়ি অবধি বর্ধিতকরণ তাই অনেক শিলিগুড়িবাসীর মনেই বুকে বেজেছিল গোপন দুখে; মর্মে রেখে গেছে গভীর হৃদয়ক্ষত।
রিটায়ারিং রুমে আশ্রয়।

শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে? আঘাত হয়ে দেখা দিল, আগুন হয়ে জ্বলবে ॥

অতঃপর! এখন আর দেরি নয়, ধর্‌ গো তোরা হাতে হাতে ধর্‌ গো। আলোচনাচক্রের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান শিলিগুড়ি জংশন স্টেশনে বেলা একটায়। সংগঠক কর্তাব্যক্তিরা কেউ সেখানে থাকতে পারবেন না কারণ পরবর্তী অনুষ্ঠানটি অর্থাৎ মূল আলোচনাচক্র শহর থেকে কিছুটা দূরে সুকনার কাছে গুলমা মোহরগঞ্জ চা বাগানে। তাঁরা সকালবেলাতেই চলে গেছেন সেখানে। শিলিগুড়ি জংশন স্টেশনের অনুষ্ঠানের দায়িত্বে তিনজন, তাদের মধ্যে প্রবীণতম হওয়ার সুবাদে আমি তাদের নেতা।
একদা শিলিগুড়ি জংশন ছিল এই এলাকার প্রধান রেলস্টেশন। দেশভাগের পর শিলিগুড়ি থেকে কলকাতার ব্রডগেজ রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় কারন মধ্যবর্তী রেলপথের অনেকটাই চলে যায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল পরিচালিত স্টেশনটিতে বর্তমানে প্ল্যাটফর্ম ছটি, পাঁচটি ব্রডগেজ ও একটি দু ফুটের ন্যারোগেজ। নিউ জলপাইগুড়ি – আলিপুরদুয়ার - শামুকতলা রোড, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে এবং কাটিহার - শিলিগুড়ি লাইন এখানে মিশেছে। ১৯৪৯ এ পথ চলা শুরু করে এই স্টেশন, বৈদ্যুতায়িত হয় ২০২০ তে। Executive Lounge আমাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল - সেখানেই জমায়েত।

আমাকে কিছুই করতে হল না। নব্য প্রজন্ম চমৎকারভাবে পুরো কার্যক্রমটি সামলালেন। পারস্পরিক পরিচিতি, রেলচর্চায় তাদের উৎসাহের ক্ষেত্র বর্ণনা, শুভেচ্ছা বিনিময়, স্বল্প বক্তব্যে পাহাড়ে চা শিল্প, পর্যটন শিল্প ও খেলনা রেলগাড়ির প্রাসঙ্গিকতার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার আর্থ সামাজিক ইতিহাস বর্ণন ইত্যাদি ইত্যাদি – শেষ বিষয়টি এই আলোচনাচক্রের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যায়।

তারপর অনেকখানি হেঁটে আমরা দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের লোকোশেডে। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে তাদের লোকো শেড ও ওয়ার্কশপ দর্শন। জায়গাটি UNESCO Heritage Site। খেলনা রেলগাড়ির লোকো ও কামরার রক্ষণাবেক্ষণ হয় এখানে। অনেকগুলি ভিস্তাডোম কামরা তৈরি হচ্ছে দেখলাম। ১৯১১ সালে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে তাদের একমাত্র Garratt-type of articulated steam loco (built by Beyer Peacock in UK) পান। ১৯৪৮ সালের ২০ অক্টোবর ভারত সরকার দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কিনে নেন। ভারতীয় রেলের অংশ হয় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে। এখন এটি পূর্বোত্তর সীমান্ত রেলের কাটিহার বিভাগের অন্তর্গত।

তৎপরে হিলকার্ট রোড ধরে, পাঁচাই নদী দুবার পেরিয়ে দশ কিলোমিটার দূরের গুলমা মোহরগঞ্জ চা বাগানে। পথে ছুঁয়ে গেলাম শহরের প্রাচীনতম স্টেশন Siliguri Town (SGUT)। দার্জিলিং মোড় পেরিয়ে ডাইনে ঘুরে পাঁচাই নদী; এই বর্ষায় তাইতে ভালোই জল। সেই নদী দুবার পেরিয়ে গুলমা মোহরগঞ্জ চা বাগান। ১৮৮৬ সালে, যখন চা বাগান শিল্পে সাহেবদের একাধিপত্য, বাঙালি উদ্যোগপতি বিপ্রদাস পালচৌধুরী মোহরগঞ্জ চা বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩০ সালে তার পুত্র অমিয় পালচৌধুরী এক ব্রিটিশ কোম্পানির কাছ থেকে সংলগ্ন গুলমা চা বাগান কিনে নেন। সেই পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের হাতে এখন তরাই পাদদেশের গর্ব গুলমা মোহরগঞ্জ চা বাগান, বার্ষিক উৎপাদন ৭০০ মিলিয়ন কাপ চা। উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গেই প্যাকেজিং হয় বলেই তাদের চায়ের এত সুনাম।

চা বাগান কর্তৃপক্ষ চা বাগানটি ঘুরিয়ে দেখালেন। দেখালেন চাষ থেকে পাতা উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ থেকে প্যাকেজিং। প্রক্রিয়াকরণের জন্য মস্ত কারখানা। এক কাপ চায়ের পিছনে যে এত মানুষের এত শ্রম থাকে তা আগে কে জানত! তারা বোঝালেন কাকে বলে ফার্স্ট ফ্লাশ আর কাকে বলে ফ্লাওয়ারি অরেঞ্জ পিকো; খাইয়ে দেখালেন তাদের পারস্পরিক পার্থক্য। ছাঁদা বাঁধতে প্যাকেট প্যাকেট চা-ও দিলেন অকাতরে।

Darjeeling Himalayan Railway – Past, Present and Future: With Tea, Tourism and Trains আলোচনাচক্রের সারস্বত পর্যায়টি ছিল এইখানে – রেলচর্চাকারীরা ছাড়াও ছিলেন উচ্চপদস্থ রেল আধিকারিকেরা, চা শিল্পের লোকেরা, পর্যটন শিল্পের লোকজন। বিলাতের Darjeeling Himalayan Railway Society-র সদস্যরা যোগ দিলেন সশরীরে ও ভিডিও মাধ্যমে।

Darjeeling Himalayan Railway-র আছে এক বর্ণাঢ্য অতীত; কিন্তু অতীত ধুয়ে খেয়ে তো পেট ভরবে না; বাঁচতে হবে বর্তমানে, ভবিষ্যতের জন্য। আলোচনাচক্রে বক্তারা সেই পথেরই সন্ধানী। Darjeeling Himalayan Railway এখন লাভের মুখ দেখছে, পর্যটকদের জন্য তাদের জয়রাইডগুলির হাত ধরেই এই ঘুরে দাঁড়ানো। সারা বিশ্ব যখন বাস্পীয় লোকোকে বিদায় জানাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, Darjeeling Himalayan Railway 'পুরাতনকে বিদায় দিলে না যে ওগো নবীন রাজা। শুধু বাঁশি তোমার বাজালে তার পরান মাঝে ওগো নবীন রাজা' - কু উউউউউউ বাঁশি বাজিয়ে Darjeeling Himalayan Railway র বাষ্পীয় লোকোরা আজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা ৩৬৫ দিনই বাষ্পীয় লোকো চালান। নীলগিরি মাউন্টেন রেলওয়ে ব্যতিরেকে পৃথিবীর আর কোন সংস্থা এমনটি করেন কি না আমার জানা নেই।
Siliguri Town (SGUT) স্টেশন নিয়ে আলোচনা গড়াল অনেকদূর। বস্তুত এই আলোচনাচক্রের উৎসমূল ওই স্টেশন। হাওড়া নিউ জলপাইগুড়ি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের উদ্বোধনী যাত্রায় যাওয়া, আর নিউ জলপাইগুড়ি হাওড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রায় ফেরা – এর মাঝে হাতে ছিল একটি দিন – ৩১ ডিসেম্বর ২০২২। তখন শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন খুব খুঁটিয়ে দেখি - দু ফুটের ন্যারোগেজ ও সাড়ে পাঁচ ফুটের ব্রডগেজ – সঙ্গে স্মারকরূপে কিছুটা মিটারগেজ লাইন। দুটি ব্রডগেজ প্ল্যাটফর্ম, একটি ন্যারোগেজ। North Bengal State Railway-র এই স্টেশনের পথ চলা শুরু ১৮৮০-তে, বৈদ্যুতায়িত ২০২০-তে। স্টেশনের গায়ের হকার্স কর্নার চিরে ন্যারোগেজ লাইন হ্যানয়ের Train Street বা থাইল্যান্ডের Maeklong Railway Market-এর কথা মনে পড়ায়। দার্জিলিং মেল একদা এই স্টেশন থেকেই ছাড়ত। সব ছাপিয়ে আমাদের বিস্মিত করেছিল স্টেশনটিকে ঘিরে ক্রমেই জবরদখল হয়ে যেতে থাকা বিশাল জমি। শহরের কেন্দ্রস্থলে এত প্রাচীন এই স্টেশনটির দুর্দশা আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। তারপর আমাদের এক তরুণ বন্ধু বিলাতের Darjeeling Himalayan Railway Society-কে এ বিষয়ে দীর্ঘ চিঠি লেখেন এবং তারা সক্রিয় হন। তারই পরিণতি এই আলোচনাচক্র।

স্থানীয়দের একটি দীর্ঘকালীন দাবি ১২০৪১ হাওড়া নিউ জলপাইগুড়ি শতাব্দী এক্সপ্রেস ও ১২০৪২ নিউ জলপাইগুড়ি - হাওড়া শতাব্দী এক্সপ্রেসকে শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন অবধি নিয়ে আসা হোক, কারণ নিউ জলপাইগুড়ি জংশন বস্তুত শহরের বাইরে; শহরের জনগণ তাই ভোররাতে রেলগাড়ি ধরতে বা প্রায় মাঝরাতে রেলগাড়ি থেকে নেমে বাড়ি পৌঁছতে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়েন। কিন্তু পরিকাঠামোগত ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় তা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষিতে স্টেশনটিকে বাঁচিয়ে রাখতে তার বাণিজ্যিক ব্যবহার ছাড়া গতি নেই। শহরের কেন্দ্রে স্টেশনটির জমিতে একটি ম্যল গড়ে উঠলে, স্টেশনটি থেকে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের নামাঙ্কিত টুপি, চাবির রিং, ফ্রিজ ম্যাগনেট, ব্যাগ ইত্যাদি স্মারক বিক্রির ব্যবস্থা হলে স্টেশনটি হৃতগৌরব হয়তো ফিরে পাবে।
তারপর চা বাগানের কর্মীদের আদিবাসী নৃত্য। অতঃপর নৈশভোজ। গভীর রাত্রে নিউ জলপাইগুড়ি জংশনের রিটায়ারিং রুমে প্রত্যাবর্তন।

(আগামী সংখ্যাতে সমাপ্য)

হিসাবশাস্ত্রের স্নাতকোত্তর শ্রী তপন পাল West Bengal Audit & Accounts Service থেকে অবসর নিয়েছেন সম্প্রতি। তাঁর উৎসাহের মূল ক্ষেত্র রেল - বিশেষত রেলের ইতিহাস ও রেলের অর্থনীতি। সে বিষয়ে লেখালেখি সবই ইংরাজিতে। পাশাপাশি সাপ নিয়েও তাঁর উৎসাহ ও চর্চা। বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ফ্যান ক্লাবের সদস্য শ্রী পালের বাংলায় ভ্রমণকাহিনি লেখালেখির প্রেরণা 'আমাদের ছুটি'। স্বল্পদূরত্বের দিনান্তভ্রমণ শ্রী পালের শখ; কারণ 'একলা লোককে হোটেল ঘর দেয় না।'

 

HTML Comment Box is loading comments...

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

Cannot connect to the Host