নন্দাকিনীর উৎসমুখে

সুদীপ্ত দত্ত


~ রন্টি স্যাডল ট্রেক রুটম্যাপ || রন্টি স্যাডল ট্রেকের আরও ছবি ~

নন্দাকিনীর উৎস ও রন্টি স্যাডল

রাতে আর ঘুম হল কই? হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় রাতের অন্ধকারেই নিয়ে নিতে হল রন্টি অভিযানের প্রস্তুতি। ঘড়ির কাঁটায় তখন পাঁচটা দশ,রওনা হয়ে গেলাম অন্ধকার পাথুরে পথ ধরে। রাতের অন্ধকারে পাহাড়ি ছাগলের উপস্থিতি মাঝেমাঝেই টের পাওয়া যাচ্ছে। মাথায় একটা হেডল্যাম্প লাগিয়ে এবড়োখেবড়ো পথে হোঁচট খেতে খেতে চারজনে জোট বেঁধে এগোতে লাগলাম। গাইড আনন্দ পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল আর পোর্টার বিনোদ দলের পেছনে থেকে আশেপাশের সমস্তরকম বিপদের দিকে নজর রাখছিল। ঘন্টাখানেক এভাবে চলার পর আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটে উঠতে লাগল। সেই আলো-আঁধারিতে সামনের যে পথ চোখে পড়ল তার বিবরণ ভাষায় বোঝানো বেশ কঠিন। অনেকটা ডাইনোসরের পিঠের মতো একটা পাহাড় সামনের দিকে প্রায় মাইলখানেক এগিয়ে গেছে আর তার পিঠের ওপর দিয়ে যে চলার পথ রয়েছে তা এতটাই সরু যে একটা পায়ের পাশে অন্য পা'টি ফেলা খুবই কঠিন। পুরো পাহাড়টাই অনেকটা কাঠকয়লার ছাইয়ের মত ধূসর রঙের পাথরকুচি দিয়ে তৈরি, আর সেই পাথরের ওপর পা রাখলে মাঝে মাঝেই তা গড়িয়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ছে।

'ডাইনোসরের পিঠ'এর দুপাশেই খাড়া ঢাল নিচে নেমে গেছে দুটো গিরিখাতের দিকে। এর মধ্যে একটা গিরিখাতে বয়ে চলেছে নন্দাকিনী নদী, অন্য গিরিখাতটা আপাতত শুকনো হলেও দুটোই আসলে একই নদীর খাত। এই গিরিখাতের আঞ্চলিক নাম 'রন্টি নালা' বা মনোরম নদীখাত। কিন্তু গিরিখাতের এই সৌন্দর্য উপভোগ করার উপায় কোথায়? একটু অন্যমনস্ক হয়ে পা ফেললেই যে গড়িয়ে যেতে হবে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ঘন্টাখানেক ধরে সেই সরু রাস্তা দিয়ে এগোতে এগোতে একসময় তা ঢালু হয়ে এক সমতলে এসে মিশল। সমতল জমির একপাশে ছোট্ট এক মন্দির দেখতে পেলাম, আর এই নির্জনেও দেখতে পেলাম কয়েকজন হাই-অল্টিচিউড পোর্টারের উপস্থিতি, কোনও অভিযাত্রী দলের মালবাহক হয়ে ওঁরা এসেছেন এই দুর্গম পথে।
সমতলে পৌঁছানোর ঠিক মুখে একটা সরু নালা পেরোতে হল, এই নালাটাই নন্দাকিনী নদীর উৎস। সরু নালার মতো নন্দাকিনী এসে মিশেছে সমতল এই জমিতে এবং পুরো জমিটাই ঢেকে গেছে সাদা জমাটবাঁধা বরফে। এই বরফেঢাকা সাদা জমিটাই পবিত্র হোমকুণ্ড - স্থানীয় ভাষায় হোমকুনি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বরফঢাকা জমিই লেকের আকার নেয় আর সেখান থেকেই বয়ে চলে খরস্রোতা নন্দাকিনী। পুরো অঞ্চলটা পাহাড়ে ঘেরা আর তাদের বেশ কয়েকটি থেকে নেমে এসেছে ভয়ালদর্শন হিমবাহ। মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মন্দিরের চালাটা তামা বা ওই জাতীয় চকচকে লাল রঙের কোনও ধাতুর তৈরি। যশবন্ত সিং নামক এক ভক্ত কিছুদিন আগে এই মন্দিরটি বানিয়েছেন। কাছাকাছি লেকের ঠিক পাশেই আরো একটি পাথরের তৈরি ছোট মন্দির দেখতে পেলাম, এটি দেবী শেরওয়ালীর মন্দির। এটি বেশি পুরানো, এখনও নিয়মিত পুজো হয় এখানে।

প্রতি বারো বছর অন্তর এক মস্ত মেলা বসে হোমকুণ্ডে, দূরদূরান্ত থেকে এসে অসংখ্য পুণ্যার্থী দেবতার উদ্দেশ্যে পূজার দান উৎসর্গ করে যায়। এই উৎসবকে বলা হয় 'বড়া নন্দা যাত' বা 'নন্দাদেবী রাজ যাত্রা'। আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই প্রথা প্রায় হাজার বছরের পুরানো হলেও তা বাইরের জগতের লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গিয়েছিল,বিশ শতকের গোড়ার দিকে বিভিন্ন পর্বত অভিযান ও সার্ভের সময় এই অজানা-অচেনা জগৎ ব্রিটিশদের নজরে আসে। জুনারগলি বা শিলা সমুদ্রের মত এখানে উচ্চতানির্দেশক কোনও সাইনবোর্ড চোখে পড়ল না,তবে ইন্টারনেট ঘেঁটে যেটুকু জেনেছিলাম এখানকার উচ্চতা চার হাজার মিটারের আশেপাশে হবে। হোমকুণ্ড থেকে অভিযাত্রীরা নন্দাঘুন্টি অভিযানে রওনা দেন,এখানেই তৈরি হয় ওঁদের বেস ক্যাম্প।
কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম হোমকুণ্ডে। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল মানবদার শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাবুদাও পায়ের ফোস্কা নিয়ে চলাফেরায় খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। কুণ্ডের একপাশে উঁকি মারছে রন্টি স্যাডল, আমাদের লক্ষ্য যে সেখানেই। কিন্তু মানবদা আর বাবুদা স্যাডল পর্যন্ত যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে এখান থেকেই আবার দোদাং ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমি আর ক্যাপ্টেন সুখেনদা স্যাডল পর্যন্ত পৌঁছানোর একটা চেষ্টা করে দেখব বলে স্থির করলাম। মানবদা আর বাবুদা আমাদের শুভেচ্ছা জানাল যাতে সফল হতে পারি। স্যাডলের ওপরের ঠান্ডা হাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানবদার মাফলারটা চেয়ে নিলাম। সকাল তখন সাড়ে সাতটা, রওনা দিলাম স্যাডলের পথে।

হোমকুণ্ডের নতুন মন্দিরের পাশ দিয়ে লেকের ঠিক উলটোদিকে একটা নুড়ি-পাথরের ঢাল ওপরের দিকে উঠে গেছে। প্রথমে আনন্দ আর ক্যাপ্টেন এবং তার পেছন পেছন আমি আর বিনোদ সেই ঢাল বেয়ে এগিয়ে চললাম। কিছুটা এগোতেই নুড়ি-পাথরের জায়গা নিল বড় বড় বাদামি-সবুজ রঙের বোল্ডার। যত এগোতে থাকলাম চলার পথ ততই সরু হতে থাকল। আকাশনছোঁয়া উঁচু উঁচু বাদামি পাহাড়ের সারি সরু পথের দুপাশে যে দেওয়াল তৈরি করেছে তা টপকে ওপাশের জগতকে কল্পনায় আনাও একপ্রকার অসম্ভব। অনুসরণ করার মতো একটা খুব সরু পায়েচলা পথ বোল্ডারের ওপর নজরে পড়ল, সেটি ধরেই চড়াই বেয়ে ওপরে উঠতে থাকলাম। এতটা চড়াই পথে চলতে দমে কিছুটা ঘাটতি হতে শুরু করল। ক্যাপ্টেন মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স পাস করা অভিযাত্রী, একজন রক ক্লাইম্বিং প্রশিক্ষকও বটে। আনন্দকে সঙ্গে নিয়ে তরতর করে ওপরে উঠে মুহূর্তে চোখের আড়ালে চলে গেল। কিছুটা পথ যাওয়ার পর বোল্ডার জোনও শেষ হয়ে এল। সামনে তাকিয়ে দেখলাম স্বচ্ছ বরফেঢাকা এক নুড়ি-পাথরের চড়াই, আর এতক্ষণ ধরে পথ দেখানো সেই সরু পায়েচলা রাস্তাও আমায় একলা রেখে কোথায় যেন লুকিয়ে পড়ল! পথ খুঁজে পাওয়ার আশায় সামনের দিকে তাকালাম।

সামনের পথের পুরোটাই শক্ত পিছল বরফে ঢাকা, তার ওপর দিয়ে হেঁটে চলা একপ্রকার অসম্ভব। বরফের ওপর দিয়ে চলার জন্য জুতোর নিচে একধরনের ধাতুর তৈরি কাঁটা বা ক্র্যাম্পন রবারের ফিতে দিয়ে বেঁধে নেওয়া হয়, কিন্তু এই যাত্রায় আমরা তা সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। অন্য কী উপায় নেওয়া যায় তার খোঁজ করতে করতে সামনের বরফের জরিপ করতে থাকলাম। স্বচ্ছ বরফের স্তর বেশ কিছুটা ওপরে উঠে সরু হয়ে দুধসাদা তুষারের একটা আঁকাবাঁকা সর্পিল রেখা তৈরি করেছে। নুড়িপাথর আর বড় বোল্ডারের দুটো ধাপ থাকায় এই বরফের রেখাটি খুব কাছের হোমকুণ্ড মন্দির থেকে দেখা যায় না কিন্তু দোদাং,ঘিউথাপ্পান এমনকি কালো বিনায়কের মন্দির থেকেও দেখতে পাওয়া যায়।বেশ কিছুক্ষণ ধরে রাস্তা খুঁজতে থাকার পর বিনোদ পাশে এসে দাঁড়াল। পিছল বরফের ওপর দিয়ে সরাসরি হাঁটা না গেলেও তার বাঁদিকে গলন্ত বরফের ওপর পড়ে থাকা বড় পাথরের ওপর সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাওয়ার কায়দাটা বিনোদই আমায় শিখিয়ে দিল। অনেক কষ্টে পিছল বরফ পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম গড়ানো পাথরের রাজ্যে। বরফের রেখার বাম পাশ দিয়ে গড়ানো পাথরকুচির ওপর পা ফেলে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনেক কষ্টে হাঁচোড়পাঁচোড় করে যতটা ওপরে উঠি একটু পড়েই আবার গড়িয়ে আগের জায়য়গায় নেমে আসি,অনেকটা সেই তেলমাখানো বাঁশের অঙ্কের মতো!এই গড়ানো পাথর দুপাশে পাহাড়ের দেয়াল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পাথরে ধ্বস নামার সম্ভাবনাও বাড়তে থাকে,আর সত্যিই যদি একবার সেরকম কিছু ঘটে তাহলে… আর ভাবতেই ইচ্ছে করল না। বারবার ওপরে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল,এ যাত্রা বোধহয় আর শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো হল না। সামনের দিকে অনেক দূরে দুটো বিন্দুর মতন ক্যাপ্টেন আর আনন্দকে দেখতে পেলাম একরকম হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছে, তবে প্রায় স্যাডল পর্যন্ত পৌঁছেই গেছে ওরা। এদিকে বিনোদ উৎসাহ দেওয়ার বদলে বলতে থাকল, "এভাবে চললে সারা দিনেও পৌঁছানো যাবে না"! একটু জিরিয়ে একটা লম্বা দম নিয়ে শেষবারের মতন আরেকটা চেষ্টা করলাম। এবার গড়ানো পাথর বেয়ে একটু ওপরে উঠেই টিকটিকির মতন শুয়ে পড়ে হাত-পা-শরীর দিয়ে নিচের দিকে পড়ে যাওয়া আটকানোর চেষ্টা করলাম। এতে কাজ হল,বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় গড়ানো খাড়া পথটা পার করতে পারলাম। পরের পথেটুকুতে পাথর থাকলেও চড়াই ততটা বেশি নয় তাই পায়ে হেঁটেই এগোনো সম্ভব হল। খুব আস্তে শরীরের ওপর ব্যালেন্স রেখে স্যাডলের চূড়ার কাছে পৌঁছাতেই আনন্দ আর ক্যাপ্টেনকে দেখতে পেলাম। শেষ পথটুকু মনের আনন্দে প্রায় ছুটে চলতে গিয়ে এক গোল বাঁধল। গড়ানো পাথরের চড়াই বেয়ে ওঠার সময় সঙ্গে আনা ট্রেকিং পোলটা পিঠের ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ মাথায় পৌঁছানোর একটু আগেই তা পিঠ থেকে ছিটকে গড়ানো পাথরের সঙ্গে নিচে পড়ে গেল। তখন সেদিকে তাকানোর ইচ্ছেও করল না, আমায় পৌঁছাতে দেখে ক্যাপ্টেন দুহাত বাড়িয়ে দিল, আমিও ছুটে গিয়ে ক্যাপ্টেনকে জড়িয়ে ধরলাম। "পেরেছি ক্যাপ্টেন পেরেছি" বলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম। ক্যাপ্টেনের মুখেও তখন ফুটে উঠেছে অসম্ভবকে সম্ভব করার এক পরম তৃপ্তি।

এর আগে দু-দুবার এপথে এসেও ভাগ্য সহায় না হওয়ায় সুখেনদার এই রন্টি স্যাডল পর্যন্ত পৌঁছানো হয়নি। একবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর তুষারপাতের জন্য ওঁকে ভাগুয়াবাসা থেকেই ফিরে যেতে হয়েছিল। অন্যবার দলের একজন অভিযাত্রী অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর জুনারগলি পর্যন্ত পৌঁছেও আর এগোনো সম্ভব হয়নি। তাই স্যাডলে পা দেওয়ার পর আবেগে ভেসে যাওয়া ক্যাপ্টেনের পক্ষে খুব অস্বাভাবিক নয়, তবু নিজের স্বভাবমত সেই আবেগ মনের মধ্যে ধরে রেখেই চারপাশের অজানা পৃথিবীকে দুচোখ ভরে দেখতে লাগল। সেই কবে পয়লা অক্টোবর রওনা দিয়েছিলাম লোহাজং থেকে আর তারপর দিনক্ষণ ভুলে টানা সাতদিন হেঁটে এই গড়ানে পাথরের পাহাড়ে চড়তে পেরেছি তা কি কম পাওনা?
যেখানে পৌঁছেছি তা অনেকটা ঘোড়ার পিঠের মতো, বা বলা ভালো ঘোড়ার পিঠে লাগানো আধখানা চাঁদের আকারের জিনের মতো। এমাথা-ওমাথা একটা মসৃণ লম্বা শিরা রয়েছে যার এপাশ-ওপাশ দুদিকেই পাহাড়ের ঢাল। জিনের দুমাথায় যেমন সওয়ারির বসার সুবিধার জন্য দুটো উঁচু অংশ থাকে সেরকম লম্বা শিরার দুমাথায় দুটো কালো এবড়োখেবড়ো পাথরের টিলা রয়েছে। ব্রিটিশ অভিযাত্রী ডঃ লংস্টাফের ইচ্ছে অনুযায়ী "রন্টি নালা"র খুব কাছে ঘোড়ার জিনের আকৃতির এই পাহাড়-শিরা বা রিজটির নাম রাখা হয়েছে "রন্টি স্যাডল"। এখানেও "সমুদ্রতল থেকে উচ্চতা" নির্দেশ করে এরকম কোনো সাইনবোর্ড নেই, থাকার কথাও নয়, তবে ইন্টারনেট মতে এর উচ্চতা ৫৩০০ মিটারের কাছাকাছি, অর্থাৎ হোমকুণ্ড থেকে এই কয়েক ঘন্টায় প্রায় বারো-তেরোশো মিটার ওপরে উঠে এসেছি।
"রন্টি স্যাডলের" লম্বা শিরার ওপর পড়ে থাকা তুলোর মতো তুষারের বেশ কিছু অংশ সূর্যের তাপে গলে গেছে, তবে সেই তুষারের নিচের জমাট বরফের হেরফের হয়নি। স্যাডলের একপাশের ঢাল বেয়ে উঠে এসেছি, আর অন্য পাশ? তা জানার জন্যেই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম জমে থাকা পিছল বরফের দিকে। স্যাডলের একেবারে মাথায় পৌঁছতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো জনমানুষহীন, প্রাণহীন, মানবসভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্পূর্ণ অজানা এক জগত।

স্যাডলের ওপাশে রয়েছে বাদামী-সোনালী পাহাড়ে চারদিক ঘেরা বরফে ঢাকা এক উপত্যকা। দেখতে অনেকটা কড়াইয়ের মতো,চারধারে মসৃণ পাহাড়ের আর তার একেবারে তলার অংশে জমে রয়েছে সাদা বরফের স্তর। স্যাডল থেকে যে ঢালটা সেই উপত্যকার দিকে নেমে গেছে তার পুরোটাই সাদা বরফে ঢাকা, একবার পা হড়কালে একেবারে নিচ পর্যন্ত পিছলে যেতে হবে, আর এ পথে উঠে আসার কোনও উপায় থাকবে না। স্যাডল পেরিয়ে ওপাশে যে কোনো ট্রেকিং হয় না তা নয়,তবে সেই পথ খুবই দুর্গম। গোলাকার উপত্যকার ধার দিয়ে একটা হালকা পথের আভাস চোখে পড়ল যা উপত্যকার শেষ মাথায় গিয়ে পাথরের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে, হয়তো সেই পথও গিয়ে মিশেছে অন্য কোনও এক অজানা জগতে!

স্যাডলের ওপরে সবসময়ই ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে, ব্যাগে মানবদার মাফলারটা থাকা সত্ত্বেও সেটা কাজে লাগানো হয়নি। এবার সেই মাফলারকেই পতাকার মতো মেলে ধরে আমরা অভিযানের সাফল্য সেলিব্রেট করলাম। মানবদা আর বাবুদা এ পর্যন্ত পৌঁছতে পারলে না জানি কত আনন্দই করতে পারতাম, ওদের ভীষণভাবে মিস্ করলাম ক্যাপ্টেন আর আমি। অজানা উপত্যকা থেকে চোখ ফিরিয়ে আশেপাশের পাহাড়গুলোকে দেখতে থাকলাম। উপত্যকার দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাঁদিকে রয়েছে রন্টি পর্বত আর ডাইনে বেথারতোলি। এছাড়াও আরও অনেক অচেনা পাহাড়ের চূড়াও উঁকি মারছিল তাদের পাশ থেকে। স্যাডলের বাঁদিকে নন্দাঘুন্টিকে আরো কাছ থেকে দেখা গেল। যে পথে এসেছি সেদিকে ফিরতে ত্রিশূল পাহাড়ের চূড়াগুলোর পেছন দিকটা নজরে এল। আর দূরে স্পষ্টভাবে চোখে পড়ল জুনারগলি, যে গিরিপথ মাত্র একদিন আগেই পার হয়ে এসেছি।
সেই সক্কালে দোদাং থেকে রওনা দিয়েছিলাম, বেলা প্রায় বারোটা বাজে, খিদে তেষ্টা পাবে না তা কী হয়? সামান্য কিছু টিফিন দোদাং থেকেই প্যাক করে নিয়ে এসেছিলাম,স্যাডলের ওপর পা ছড়িয়ে বসে তাই দিয়েই দুপুরের খাওয়া সারা হল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাভালাঞ্চ নামার সম্ভাবনা বাড়তে থাকে, তাই আর কিছুক্ষণ সময় কাটানোর ইচ্ছে থাকলেও মাত্র আধঘন্টা স্যাডলে থেকেই ফেরার পথ ধরতে হল। নামার সময় আনন্দ গড়ানো পাথরের ওপর ছিটকে পড়ে যাওয়া ওয়াকিং পোলটা উদ্ধার করে দেওয়ায় আবার চলার অবলম্বন ফিরে পেলাম। মোরেন বেয়ে নিচে নামা আরেক ঝক্কি, সোজা হয়ে নামতে গেলেই গড়িয়ে পড়তে হয়। আনন্দ শিখিয়ে দিল কিভাবে সাইড হয়ে ওপরে এক পায়ের সাপোর্ট নিয়ে আরেক পায়ে ভর দিয়ে নামতে হবে। তাতেও যে খুব মসৃণভাবে নামা গেল তা নয়, তবে বেশ কিছুটা সুবিধা হল বৈকি। তার মধ্যেও একবার পিছল বরফে পড়ে বিপজ্জনকভাবে নিচের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিলাম, বিপদ বুঝে আনন্দ দৌড়ে এসে না বাঁচালে সে যাত্রায় বেশ দুঃখ ছিল কপালে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মোরেন পার হয়ে বড় বোল্ডারের স্তরে এসে পৌঁছালাম, অর্থাৎ এরপর আর ভয়ের কিছু নেই। তবে এতক্ষণের ধকলে পা আর চলতে চাইছিল না, খুব ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকলাম। হোমকুণ্ড থেকে স্যাডল পর্যন্ত যে পথ চার ঘন্টায় উঠেছিলাম মাত্র সোয়া দুঘন্টায় সেই পথে নিচে নেমে এলাম।
এবেলায় হোমকুণ্ড আর শুধুই বরফেঢাকা সমতল জমি নয়, বরফগলা জল জমা হয়ে তা রীতিমতো লেক হয়ে উঠেছে। যে নালা পেরিয়ে মন্দিরের কাছে পৌঁছেছিলাম তা এখন আর শান্ত নেই, সরু পাহাড়ি নদীর আকার নিয়েছে। রন্টি স্যাডলের মোরেন বিছানো পথ আর তার দুপাশের দেওয়ালের ওপর যে সাদা বরফ জমে ছিল তাও এতক্ষণে গলতে শুরু করেছে। সেই জল নালা বেয়ে জোরালো স্রোতে নেমে এসে হোমকুণ্ডে মিশছে। ভাবতে খুবই অবাক লাগছিল যে নুড়িমেশানো বরফের ওপর দিয়ে একটু আগেই আমরা হামাগুড়ি দিয়েছি, শরীরটাকে কোনো রকমে টেনে হিঁচড়ে ওপরে তুলেছি আর তারপর হেঁটেও বেড়িয়েছি তার থেকেই কি না তৈরি হয়েছে আস্ত একটা নদী - নন্দাকিনী!
চারদিক পাহাড়ে ঘেরা থাকায় দুপুর পেরোনোর আগেই সূর্যের আলো কমে আসতে লাগল। ক্যাপ্টেন আগেই ফেরার পথ ধরেছে,হোমকুণ্ডের মন্দিরগুলোর সামনে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমিও দোদাং-এর পথে পা বাড়ালাম। "ডাইনোসরের পিঠ"এর পথ দিয়ে যখন দোদাং এসে পৌঁছালাম তখন বিকেল সাড়ে তিনটে। দেখা হল এক বাঙালি পর্বত অভিযাত্রীদলের সাথে, ওরাও দোদাংয়ে ক্যাম্প করেছে। এখান থেকে রওনা দেবে ত্রিশূল পাহাড়ের দিকে। হোমকুণ্ড থেকে ফিরে এসে মানবদা আর বাবুদা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। সারা দিনের ক্লান্তি ভুলে অজানা-অচেনা পৃথিবীর যে ছবি একটু আগেই দেখে এসেছি সে অভিজ্ঞতা ওদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে লাগলাম। খুব শিগগিরই সামনের রূপোলি পাহাড়ে চকচকে আলোর ঝলকানি দেখিয়ে সূর্য আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। একটু পরেই রাতের খাবার খেয়ে কনকনে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে আশ্রয় নিলাম। দোদাংয়ে আগের রাত কেটেছিলো চাপা টেনশনে, কিন্তু এরাতের পুরোটা জুড়েই ছিল রন্টি স্যাডলের স্বপ্নের দেশ।

নদী পেরিয়ে জঙ্গলের পথে

সকালের লালরঙা সূর্য পাহাড়ঘেরা দোদাং ক্যাম্পসাইটের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। আগের দিনের মতো এদিন অতটা সকালে না বেরোলেও চলবে,তাই স্লিপিং ব্যাগের ভেতরেই আরেকটু বেশি সময় কাটানো গেল। এদিন চ্যালেঞ্জ একটাই, জোরালো স্রোতে বয়ে চলা পাহাড়ি নদী নন্দাকিনীকে পায়ে হেঁটে পার হওয়া। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতে জলের পরিমাণ বাড়তে থাকে, তাই বেশি দেরি হয়ে গেলে আর ওপারে যাওয়া সম্ভব হবে না! হালকা ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল আটটার মধ্যেই দোদাংকে গুডবাই জানাতে হল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেই আরেকটি ক্যাম্প দেখতে পেলাম, এখানেও বাঙালি টিম। কাল বিকেলে দোদাং পৌঁছেছে,এখন রন্টি স্যাডল যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এত দেরিতে রওনা দিয়ে কী করে স্যাডল পর্যন্ত পৌঁছাবে তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না। ক্যাপ্টেন বলল হয়তোবা হোমকুণ্ডে আরেকটি ক্যাম্প করবেন ওঁরা।
পুরনো পথে কাঠের পুল পেরিয়ে বোল্ডার জোন টপকে একটু পরেই নদীর ধারে এসে পৌঁছলাম। সকাল সবে নটা বাজে, এর মধ্যেই নন্দাকিনীতে জলের বেগ যথেষ্ট বেড়ে গেছে। এখন নালার আকারে থাকলেও ক্রমশই তা আরও চওড়া হচ্ছে।

আনন্দ নদীর ধার বরাবর এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করে নিরাপদে পেরোনোর মত জায়গার খোঁজ করতে লাগল। কিছুটা জল,কিছুটা পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে-লাফিয়ে পার হওয়ার মতো একটা পথ পাওয়া গেল বটে তবে সেখানে জলের নিচে জমে রয়েছে সবুজ শ্যাওলা আর পাথরগুলোও বেশ নড়বড়ে। গাইড হিসেবে আনন্দই প্রথমে এগিয়ে গেল পথ দেখানোর জন্য। জলে পা দেওয়া মাত্রই শ্যাওলায় পা পিছলে চিৎপাত হয়ে পড়ল,তবে চটজলদি উঠে দাঁড়িয়েই বলে উঠল - "অ্যায়সা চলতা হ্যায়, চলতা হ্যায়"! চোট-আঘাত বেশি কিছু লাগেনি,তবে জামা-প্যান্ট ভিজে একসা। তা হোক, কিন্তু এই পথে অন্তত নদীটা পেরোনো যাবে, তাই আমরাও পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। জুতো খুলে কোমরে বাঁধলাম আর ট্র্যাক-প্যান্টের পায়ের কাছটা যতটা পারলাম গুটিয়ে নিলাম। নিজে ভুক্তভোগী হওয়ায় আনন্দ খুব ভালোভাবেই রাস্তা দেখাতে লাগল,কোথায় শ্যাওলায় পা পিছলাবে আর কোন পাথরটা গড়িয়ে যাবে সে ব্যাপারে আগে থাকতেই সতর্ক করে দিতে থাকল। তারপরও প্রয়োজনে হাত ধরে তীব্র জলের স্রোতের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করল। দু'একবার পা হড়কানো ছাড়া বেশ নিরাপদেই নদীর ওপারে গিয়ে উঠলাম। নদী পেরিয়ে বেশকিছু বোল্ডারের ওপর দিয়ে হেঁটে-লাফিয়ে একটা গড়ানো পাথরের খাড়া রাস্তা বেয়ে পাহাড়ের ওপরের ঘাসেঢাকা জমিতে এসে পৌঁছালাম।
নন্দাকিনী নদী পার হতে সময় লেগেছে প্রায় পৌনে একঘন্টা, তবে এর পরের রাস্তা খুব কঠিন নয়,তাই সবুজ ঘাসের ওপর বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়ার ফুরসত পাওয়া গেল। এখান থেকে শিলা সমুদ্রের সেই পাথরের নদী, মোরেন জোন আর স্নাউট পয়েন্ট সামনাসামনি দেখা যাচ্ছে। কালো রঙের হিমবাহটাও তার ওপরে হাঁ করে রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে বাদামি-সবুজ ঘাস আর বুনো ফুলে ঢাকা রঙিন পাহাড়, আগের দিন পাহাড়গুলোতে যে রুক্ষতা দেখেছি এখানে তার বিন্দুমাত্র নেই। নির্জন পাহাড়ের খাতে নন্দাকিনী নদী বয়ে চলার জোরালো শব্দে যেন চারপাশে একটা প্রাণের ছোঁয়া অনুভব করতে পারছিলাম।

টেন্টগুলো যে পাতা হয়েছে একটা মস্ত পাথরের আড়ালে তা জুনারগলি থেকে নামার সময়ই দেখতে পেয়েছিলাম। এই কালো পাথরটা নাকি কোনও সময় পাহাড় থেকেই নেমে এসেছিল, আর ওর দৌলতেই প্রচন্ড ঝোড়ো হাওয়া থেকে আমাদের টেন্টগুলো বেঁচে যাচ্ছিল। পাথরের আরেক পাশে শেফার্ডদের ঘরের মত পাথরের টুকরো দিয়ে ঘিরে তার ওপর প্লাস্টিক বিছিয়ে বানানো হয়েছে রান্নাঘর। আমাদের কুক, পোর্টার আর গাইড এখানেই রাত কাটাবে বলে ঠিক করেছে। আমাদের টেন্টের কাছে কতগুলো ছোটো ছোটো আলগা পাথরবসানো মন্দির রয়েছে, এখানে বিগ্রহের বদলে রয়েছে এক একটি ছোট পাথরের অংশ আর ত্রিশূল। অধিকাংশ ট্রেকিং দল রূপকুণ্ড থেকেই ফিরতি পথ ধরে, জুনারগলি পেরিয়ে এপথে বড় একটা কেউ আসে না, তাই আগের ক্যাম্পগুলোর মত ঘিঞ্জি পরিবেশ এখানে নেই। আমাদেরও নির্জন শিলাসমুদ্রের সৌন্দর্য অন্য কারোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে হল না।
ত্রিশূল পাহাড়ের ঠিক পায়ের কাছে শিলাসমুদ্রের চারদিকই উঁচু পাহাড়ে ঘেরা। ত্রিশূল আর ডানদিকের বরফঢাকা একটা নাম না জানা পাহাড় এতটাই কাছে যে মনে হয় এই বুঝি সামান্য হাঁটলেই ওদের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়া যাবে। দুটো পাহাড়ের মাথাই দুধসাদা তুষারে ঢাকা আর সেই তুষারের নদী পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে এই উপত্যকার দিকেই। শুনেছি সময় সময় এই তুষারে ধ্বস বা অ্যাভালাঞ্চ নামে, সেই ধ্বস যদি বড় রকমের কিছু হয় তবে কী যে হবে তা ভাবতেও ভয় হচ্ছিল। তবে ছোটখাটো অ্যাভালাঞ্চ এখানে লেগেই থাকে আর তাতে যে বরফ খসে পড়ে তা থেকেই তৈরি হয়েছে এক মস্ত হিমবাহ।
সামান্য বিশ্রামের পর আবার জলের ধারাকে বাঁ পাশে রেখে পাহাড়ের ওপরের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম। একটু পরে খচ্চরের পিঠে ব্যাগপত্তরগুলো চাপিয়ে বিনোদ, মনিন্দর আর হিরা সিং পাশ কাটিয়ে হাত নাড়াতে নাড়াতে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর একটা কাঠের সেতুর কাছে এসে পড়লাম। এ জায়গাটার নাম চন্দনিয়া ঘাট। দোদাং-এর পুল-এর মতো এখানকার সেতুতেও সবুজ রঙ করা। পুলের নিচে বয়ে চলা নন্দাকিনী এখন নালা থেকে নদীতে পরিণত হয়েছে। ওপর থেকেই তার জোরালো স্রোত সম্পর্কে খুব ভালোই আন্দাজ করা যাচ্ছিল। পুল পেরিয়ে পাহাড়ের গায়ে ধাপকাটা একটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়লাম।

পাহাড়ের গায়ে গজিয়ে ওঠা উঁচু উঁচু বার্চ গাছের জঙ্গল খুব একটা ঘন নয়। নদী পেরোনোর পর নন্দাকিনী এখন আমাদের ডান দিক দিয়ে বইছে। তবে এই জঙ্গলের রাস্তা একেবারে নির্জন নয়, পথে কিছু মালবাহকের দেখা পাওয়া গেল। আর কিছুটা এগোতে একটা পাহাড়ি ঝরনা দেখতে পেলাম। এই ঝরনার জল নেমে আসছে পাহাড়ের অনেক ওপর থেকে আর তার স্রোতের তেজও কিছু কম নয়। কয়েকটা নড়বড়ে পাথরের ওপর পা ফেলে সেই জল পেরোনো গেল। জঙ্গলে ঢোকার পর থেকে মাঝে মাঝেই আনন্দ কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল,আবার কিছুক্ষণ পরে সামনে এসে উদয় হচ্ছি্ল। তবে এখানে পায়ে চলার পথ বেশ স্পষ্ট হওয়ায় রাস্তা চিনে নিতে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছি্ল না। হঠাৎই দেখি পাহাড়ের খাদের ওপর ঝুলে পড়া একটা লম্বা গাছের ওপর আনন্দ পা ঝুলিয়ে বসে রেডিও শুনছে! আমরা সেখানে পৌঁছাতেই অদ্ভুত দক্ষতায় গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। বার্চ গাছের জঙ্গলের পর এল বাঁশের বন। অগুনতি গাছ পেরিয়ে মাইলের পর মাইল কেমন যেন সম্মোহিতের মত হাঁটতে থাকলাম। প্রায় পৌনে দুটোর সময় এক জায়গায় এসে কিছু লোকজনের দেখা মিলল। বুঝলাম জনবসতি এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। একটা সাইনবোর্ডও চোখে পড়ল, তাতে গ্রামের নাম লেখা রয়েছে "জামুনডালি"। এখানে সামান্য কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার জঙ্গলের পথ ধরলাম। আরো একঘন্টা পথ চলার পর একটা পাথরের ছোট মন্দির চোখে পড়ল। মন্দিরে বিগ্রহের বদলে রয়েছে একটি বড় শিলা আর ত্রিশূল। পাশেই একটা সাইনবোর্ড জানিয়ে দিচ্ছে অবশেষে "লাটা কৌপড়ি"তে পৌঁছেই গেছি। সামনে একটা রাই ক্ষেতের পাশে আমাদের সবুজ টেন্টগুলো চোখে পড়ল, বিনোদ, মনিন্দররা অনেক আগেই এখানে পৌঁছে গেছে।

চারদিক জঙ্গলেঘেরা লাটা কৌপড়িতে নজরকাড়া কোনও সৌন্দর্য নেই,তবে টেন্টের সামনে ঘাসেঢাকা বেশ কিছুটা খোলা জমি রয়েছে,তার ওপরে মেঘের আড়াল থেকে একটা বরফসাদা পাহাড়ের চূড়া উঁকি মেরে আগের কদিনে কাটিয়ে আসা পাহাড়ি ক্যাম্পগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সাইনবোর্ডের লেখা অনুযায়ী এখানকার উচ্চতা ৩০৯৫ মিটার, তবে এতটা পথ পেরিয়ে আসার পর এই উচ্চতা এখন শুধুই একটা সংখ্যা, শারীরিক সমস্যা বা প্রতিকূল পরিবেশের জন্য কোনোরকম অসুবিধা এখন আর অনুভব হচ্ছে না। টেন্টের সামনের জমিটা কিছুটা ঢালু হয়ে একটা শুকনো নালার আকার নিয়েছে, তার ওপারে ঘন জঙ্গল। বিকেলে সেখানে ভেড়ার পাল চড়ে বেড়াতে দেখলাম। জঙ্গল হলেও এখানে খচ্চরগুলোর খাওয়ার জন্য ঘাস পাওয়া যায় না। বিনোদ দেশোয়ালি গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে নিচের কোথা থেকে পিঠে করে সেই ঘাস বয়ে নিয়ে এল। জঙ্গলের মধ্যে দিনের চেয়ে রাত অনেক বড়, তাই সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরী হল না। আমাদের টেন্ট থেকে রান্নার তাঁবু কিছুটা দূরে, একটু পরে পরেই সেখান থেকে স্যুপ, চা-বিস্কুট, ন্যুডলস আসতেই থাকল। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পফায়ার করা হবে বলে আশপাশ থেকে শুকনো ডালপালা জোগাড় করা হল।

সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে হিমবাহের বরফ গলার আগেই মোরেন জোন পেরিয়ে যাওয়ায় অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম। এর পরের পথ বিশেষ চ্যালেঞ্জিং নয়। কখনও পাহাড়ের গায়ে খয়েরি-সবুজ ঘাসের মাঝে মাটির পথ আবার কখনও নদীর ধারের পাথুরে পায়ে চলা পথ ধরে ধীরেসুস্থেই চলতে থাকলাম। পথে চড়াই কম, মোটামুটি সোজা রাস্তাই বলা যায়। বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটার সময় ঘেউথাপ্পানের কাছাকাছি পৌঁছে বিশ্রামের সময় হল। আনন্দ জানাল ব্যাগপত্তর আর রান্নার সরঞ্জাম নিয়ে বিনোদরা এখনও এসে পৌঁছায়নি, তাই বেশ কিছুটা সময় রয়েছে এই সুন্দর জায়গাটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার জন্য। রোদের তাপ আস্তে আস্তে বাড়ছে, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসছে। সামনে প্রবল স্রোতে বয়ে চলেছে নন্দাকিনী নদী, কিন্তু তার জল বালি-পাথরে ভরা। ক্যাপ্টেন শিখিয়ে দিল যে নদীর ধারের দিকে শ্যাওলাপড়া জমির ওপর দিয়ে যে জল বয়ে যায় সেই জল অনায়াসে খাওয়ার জন্য নেওয়া যেতে পারে। সেইমতোই আমরা বোতলে ঠাণ্ডা জল ভরে নিলাম আর প্রাকৃতিক কোল্ডড্রিঙ্কস-এ গলা ভেজালাম। ব্যাগ থেকে আস্তে আস্তে বিস্কুটের প্যাকেট আর শুকনো খাবার বেরিয়ে এল, তাই দিয়েই দুপুরের টিফিন সারা হল। আনন্দ সেই লোহাজং থেকে একখানা রামধনুর মতো সাতরঙা ছাতা নিয়ে পথ চলছিল, এখানে এসে সেটা মেলে রোদের আড়াল খোঁজার চেষ্টা করল। নদীর ধারের এই জায়গা থেকে আঁকাবাঁকা নন্দাকিনীকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া যায়। পরের পথের প্রায় পুরোটাই পাথুরে আর সাদা ছাইয়ের মতো রঙের।
কিছুক্ষণ পর রাঁধুনি আর পোর্টাররা এসে পড়লে আবার এগোতে শুরু করলাম। এপথে কোথাও কোথাও পথের ধারে লাল রঙের বাহারি পাতার গাছ, কোথাও ছোট ছোট বুনো ফল দেখতে পেলাম। কোথাও কোথাও দু-এক গোছা জংলি ঘাসও রয়েছে, কিন্তু তা খচ্চরের খাবার জোগানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তাই বিনোদ আর মনিন্দর অনেক দূর থেকে জোগাড় করা ঘাস পিঠে-মাথায় করে বয়ে নিয়ে চলেছে পরের ক্যাম্পের দিকে।
নন্দাদেবী ন্যাশনাল পার্কের এই বনে সতর্কতা মেনে আগুন জ্বালানো হয়ে থাকে। দূরের পাহাড়ি বনের মধ্যেও মেষপালকদের জ্বালানো আগুনের লাল আভা দেখতে পাওয়া গেল। আনন্দের কথানুযায়ী এই বনে বাঘ, ভাল্লুক ইত্যাদি হিংস্র জন্তু-জানোয়ার রয়েছে, তাদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে আগুন জ্বালানো খুবই জরুরি। ক্যাম্পফায়ারের আগুন যাতে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায় তাই আশপাশ ভালোভাবে পরিষ্কার করে সেখানে শুকনো ডালপালাগুলো জড়ো করা হল। দিনের আলো নিভে যেতে আগুন জ্বলে উঠল। সেই আঁচে সেঁকে নিলাম নিজেদের। জমাট ঠান্ডার ভাবটা কাটতেই গলা দিয়ে গুনগুন সুর বেরোতে লাগল,আর কিছু পরেই সেই গুনগুনানি গানের আকার নিল। বাবুদা শিল্পী মানুষ,গানের গলাটাও চমৎকার,একার চেষ্টাতেই আমাদের বেসুরো গলায় সুর-তাল-লয় বসিয়ে দিচ্ছিল। একটু পরে বিনোদ-মনিন্দর-আনন্দরাও এসে যোগ দিল। সব মিলিয়ে হয়তো গানের আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না তবে বাঁচোয়া এই যে তার নিন্দেমন্দ করার মতো আশেপাশে আর কেউ ছিলনা।
ক্যাম্পফায়ারের মাঝেই ক্যাপ্টেন একবার টয়লেট সারতে টেন্টের পেছনে জলার দিকে গিয়েছিল,একটু পড়ে দেখি প্রায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে। বলল, জলার কাছাকাছি অন্ধকারের মধ্যে সে একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ দেখতে পেয়েছে! সেদিকে একনাগাড়ে টর্চের আলো ফেলে রাখায় অবশেষে তা জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেছে। তবে রাতের অন্ধকারে যে জন্তু ঘোরাঘুরি করে তা কতটা নিরীহ সে নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। বারকয়েক শুকনো ডালপালা দেওয়ার পরেও একসময় ক্যাম্পফায়ারের আগুনের আঁচ আস্তে আস্তে কমে এল। এরপর ধিকিধিকি করে যে আগুন জ্বলবে তাতেই বুনো জন্তুরা আর এমুখো হবে না। রাত বাড়লে খাওয়াদাওয়া সেরে শোওয়ার বন্দোবস্ত করলাম, কিন্তু গাইড-পোর্টাররা টেন্টের আশপাশ দিয়ে একরকম অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে ঘুরতে লাগল। কাছাকাছি কোনও বুনো জন্তু থাকলে নাকি এরকম আওয়াজে সেগুলো দূরে সরে যাবে। রাতে টেন্ট থেকে বেরোতে হলে কী অভিজ্ঞতা হতে পারে সেই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই ঘুমিয়ে পড়তে হল।

রং-তুলিতে আঁকা সুতোল

সকালে ঘুম ভাঙলেও গাইড-পোর্টারদের গলা না শোনা পর্যন্ত টেন্টের বাইরে পা রাখলাম না। শেষমেশ সূর্যের আলোর রেখা দেখা যেতে আড়মোড়া ভেঙে টেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। চা আর জলখাবার খেয়ে সাড়ে আটটার মধ্যে লাটা কৌপড়ি ছেড়ে সামনের শুকনো নালা থেকে ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে যাওয়া পথে রওনা দিলাম। এখানে আরো একটি বাঙালি দলের ক্যাম্প চোখে পড়ল,এরাও একই পথে রওনা দেওয়ার তোড়জোড় করছে। নামার পথে কতগুলো শ্যাওলাপড়া সিঁড়ি রয়েছে আর তার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড় থেকে চুঁইয়ে পড়া জলের ধারা। পুরো সিঁড়িটাই বেশ পেছল,সাবধানে পা না ফেললে যে কোনও সময় চিৎপটাং হতে হবে। পায়ে চলা একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে গিয়ে কাদামাখা জঙ্গলের পথ ধরলাম। এই স্যাঁতস্যাঁতে পথে সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া সাধ্যের বাইরে। অগুনতি পাথরের সিঁড়ি আর কাদামাখা রাস্তা পেরোতে পেরোতে এই ট্রেকিংয়ে প্রথমবারের মত বিরক্তি এবং একঘেয়ে লাগতে শুরু করল। প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা এভাবে চলার পর দূরে পাহাড়ের ওপর একটা গ্রামের দেখা পেলাম,কিন্তু ওই পর্যন্তই। আরো ঘন্টাখানেক পথ চলতে হল লোকালয় খুঁজে পেতে। বেলা প্রায় একটার সময় তাতড়া বলে একটা গ্রামে এসে উঠলাম। আর পাঁচটা পাহাড়ি গ্রামের সঙ্গে এর বিশেষ কোনও তফাৎ নেই। পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে চাষ করা হয়েছে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে এখানে রাস্তার পাশে একটি ছাউনি করা রয়েছে আর তার পাশে রয়েছে সবুজ ঘাসে ঢাকা জমি। লোকালয়ের দেখা পেয়ে কিছুটা হলেও একঘেয়ে ভাবটা দূর হল। এতক্ষণ পর খেয়াল করলাম সবাইকে পেছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে এসেছি। গতি কমিয়ে চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালাম,সামনে রাস্তা ডানে-বাঁয়ে দু'ভাগ হয়ে গেছে, কিন্তু কোন রাস্তায় সুতোল যাওয়া যাবে তা বুঝে উঠতে পারলাম না। কারো দেখা পেলাম না যে সঠিক পথটা দেখিয়ে দেবে। কোনও উপায় না দেখে সেখানে বসেই সময় কাটাতে লাগলাম। প্রায় পৌনে একঘন্টা এভাবে কাটার পর একদল পোর্টারের দেখা মিলল, তাদের কাছে জানতে পারলাম মানবদারাও খুব কাছেই এসে পড়েছে। ওরাই আমাকে সুতোল যাওয়ার জন্য বাঁদিকের রাস্তা দেখিয়ে দিল। সেই পথ ধরে আরও আধঘন্টা এগোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল রংবাহারি ছবির মতো একটা গ্রাম।

একটু এগিয়ে যে পাথরের সিঁড়ি উঠেছে তার ওপর থেকে গ্রামের একটা দিক চোখে পড়ে। সেখানে সবুজ পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে চাষ করা মোরগ ফুলের মতো দেখতে লাল-হলুদ রামদানার গাছ থরে থরে সাজানো। পাহাড়ের ঢালে বসানো রয়েছে টিনের চালওয়ালা কয়েকটি পাথরের বাড়ি। মাটির রাস্তা গ্রামের পাশ দিয়ে গিয়ে একটা পায়ে চলার লোহার ব্রিজে মিশেছে। ছোট-বড় সব শিল্পীই যে এই গ্রামের ছবি তাঁর রংতুলিতে ফুটিয়ে তুলতে চাইবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতোল গ্রামটা বেশ বড়, গ্রাম পঞ্চায়েতের আওতায় রয়েছে অনেকটা অঞ্চল, এমনকি হোমকুণ্ডও সুতোল এই পঞ্চায়েতের মধ্যেই পড়ে। গ্রামের রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে আরো প্রায় পৌনে একঘন্টা হেঁটে একটা পাহাড়ের ঢাল থেকে নিচের দিকে নন্দাকিনী নদী চোখে পড়ল আর সেই নদীর ওপারে সবুজ টেন্টগুলো দেখতে পেলাম। একটা ব্রিজ পেরিয়ে বিকেল তিনটের সময় ক্যাম্পে পা রাখতেই বিনোদ এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানাল,এখানেই আমাদের নয়দিনের ট্রেকে ইতি পড়ল।

সুতোল একটা প্রাণোচ্ছল গ্রাম, নির্জন পাহাড়ে এতগুলো দিন কাটানোর পর এখানে বিকেলবেলায় ছোট ছোট বাচ্চাদের হইচইয়ে মুহূর্তেই যেন চেনা পৃথিবীতে ফিরে এলাম। ক্যাম্পের সামনের নদীর মাঝে একটা ছোট শিবমন্দির আর ব্রিজের ওপারে একটা ছোট পাহাড়ের ওপর বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি। নদীর তীরে রামদানার খেতে বাঁধা রয়েছে কয়েকটি পোষ মানানো ঘোড়া। ক্যাম্পের পেছনদিকে একটা গাছপালায় ঢাকা সবুজ পাহাড়, সেখানে ঘোড়া আর খচ্চরের দল নিশ্চিন্তে চড়ে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ের গা বেয়ে খুব সরু একটা পায়ে চলা পথ ওপরে উঠে গেছে। সন্ধ্যা নেমে আসতেই রাখালছেলেরা একে একে সে পথ দিয়ে নেমে এসে গ্রামের দিকে এগোতে লাগল। বাড়ি থেকে লজেন্স নিয়ে এসেছিলাম, এতদিন সেগুলো দেওয়ার মতো কাউকেই খুঁজে পাইনি, এখানে বাচ্চাদের হাতে বিলিয়ে দিতে থাকলাম। একটা ছোট্ট মেয়ে গাছের ডাল নিয়ে পোষা গরুটাকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে চলেছে, পেছন পেছন তার ঠাকুমা পাহাড় থেকে তুলে আনা সবজি মাথায় করে নেমে আসছে। আমরা তাদের হাতে কয়েকটা লজেন্স দিতে বয়স্ক ঠাকুমা তার ঝুড়ি থেকে বড় বড় খিরা আমাদের হাতে তুলে দিল। গ্রামের মানুষের এই সরলতা কি আর ব্যস্ত শহরে খুঁজে পাওয়া যায়?

রাতে হিরা সিং হরেক রকম খাবারের আয়োজন করেছে, ভাত-ডাল-রুটির সঙ্গে ডিমের কারি, আলুর তরকারি ছাড়াও হালুয়াজাতীয় এক ধরণের মিষ্টি বানিয়েছে। আনন্দ, বিনোদ, মনিন্দরদের মনে একটা খুশির ছোঁয়া, এত দিন পরে যে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। রাতে কিচেন-টেন্টে তাসের আড্ডা বসল, রেডিওতে চলল গাড়োয়ালি গান। বাড়ি ফেরার প্ল্যান ঠিক করতে করতে রাত গড়িয়ে গেল, ট্রেকের টুকরো ছবি মনে ভাসতে ভাসতে দুচোখ জড়িয়ে এল ঘুমে।

বিদায় বেলায়

সকাল সকাল বাড়ি ফেরার তোড়জোড় শুরু হল। সুতোল থেকে ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার গাড়ি মেলে, সেই গাড়ি রিজার্ভ করে নন্দপ্রয়াগ পর্যন্ত যাওয়ার বন্দোবস্ত করা গেল। এতদিনের সঙ্গী হওয়া আনন্দ, বিনোদ, মনিন্দর আর হিরাদের বিদায় জানানোর সময় নিজেদের আবেগকে বশে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। কচিকাঁচাদের পাহাড়ি পথে ব্যাগ পিঠে স্কুল যাওয়া দেখতে দেখতে বাড়ির কথা মনে পড়তে লাগল, আজ ছয়দিন পর আবার যোগাযোগ করা সম্ভব হবে বাবা-মা-বোনের সঙ্গে। অন্যান্যবারের মত এবারেও দুর্গাপুজোর আনন্দ থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেলাম, সে আনন্দের অংশীদার হয়ে রইল পাহাড়-নদী আর বরফের এক স্বপ্নরাজ্য রন্টি স্যাডল।

[লেখাটির বেশকিছু তথ্য Bill Aitken-এর লেখা "Touching upon the Himalaya: Excursions and Enquiries" বই থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়াও "The Alpine Journal 1979, Vol 84 No 328" পত্রিকায় প্রকাশিত P.J. Horniblow-এর লেখা "In the steps of Shipton" এবং "Himalayan Journal, Vol 09, 1937" পত্রিকায় প্রকাশিত Eric Shipton-এর লেখা "Survey Work in the Nanda Devi Region" প্রবন্ধ দুটি থেকেও অনেক তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।]

~ সমাপ্ত ~

~ রন্টি স্যাডল ট্রেক রুটম্যাপ || রন্টি স্যাডল ট্রেকের আরও ছবি ~

'আমাদের ছুটি' আন্তর্জাল ভ্রমণপত্রিকার সহসম্পাদক সুদীপ্ত দত্ত ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নিরালার খোঁজে। নতুন জায়গার সাথে মিশে আপন করে নেন সেখানকার জীবন, সংস্কৃতি আর খাদ্যাভ্যাস। তারপর তাঁর প্রিয় পত্রিকাটির পাঠকদের সাথে ভাগ করে নেন সেই যাত্রাপথের খুঁটিনাটি।

 

 

HTML Comment Box is loading comments...

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

For any queries/complaints, please contact admin@amaderchhuti.com
Best viewed in FF or IE at a resolution of 1024x768 or higher