ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি - ৩য় পর্ব

আগের পর্ব – দ্বিতীয় পত্র


ভ্রমণকারী বন্ধুর পত্র - লাদাখ পর্ব

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

~ লাদাখের আরও ছবি ~

তৃতীয় পত্র



বন্ধুবর,

বেশ লাগছে জানো এই প্রায় অপার্থিব জগত। অন্তত আমার অনুভবে অপার্থিব। শরীরটা খারাপ। খুব ভোরে উঠতে পারছি না। সবার সঙ্গে ছাদে উঠে সকাল দেখা হচ্ছে না। না হোক। ওই তো আমার চোখের সামনে কাচের টানা জানলার ওপারে পাহাড়ের গায়ে লেহ্ প্যালেসের ভাঁজে ভাঁজে সকাল হচ্ছে যে, ওর মধ্যে বুঝি মায়া নেই?

১৬/১০/২০১৫
সকাল ৯টা, লেহ্
ঝকঝকে দিন। আজ রওনা প্যাংগং লেকের দিকে। প্রথমদিনের থিকসে মনাস্টারি যাওয়ার পথেই এগোনো। নুব্রা থেকে লেহ্ না ফিরে সরাসরিই চলে যাওয়া যেত প্যাংগং-এর অভিমুখে – আঘাম, শায়ক হয়ে – তাতে একটা দিন হাতেও থাকত। তেমনি প্যাংগং লেকের পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে চুসুল হয়ে আরেক নির্জন গিরিপথ কাকসাং লা পেরিয়ে হানলে। সেখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম উঁচু অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি – ১৪,৭৫০ ফিটে। হানলে গ্রামের খানদুয়েক হোমস্টের কোনওটায় থাকলে হাত বাড়ালেই যেন ছুঁয়ে দেওয়া যাবে তারায় তারায় ভরা রাতের আকাশকে। হানলে থেকে চলে যাওয়া যায় সো মোরিরি-র পথে। অর্থাৎ লেহ্ থেকে নুব্রা ঘুরে একেবারে প্যাংগং-সো মোরিরি দেখে নেওয়া যেতে পারে। বারবার লেহ্ ফিরে এসে আবার পরদিন রওনা না হলেও চলে। কিন্তু আমরা এসেছি লাদাখের ট্যুরিস্ট সিজনের একেবারে শেষে – অনেক জায়গাতেই হোটেল-হোমস্টে যেমন বন্ধ হয়ে আসছে, তেমনি পথে গাড়ির চলাচলও কমে এসেছে। নুব্রা থেকে শায়কের ওই পথের অবস্থা খুব ভাল নয়, যদি গাড়ি কোনওভাবে গণ্ডগোল করে, তাহলে সাহায্য পাওয়ার জন্য দু-একদিন সেখানেই অপেক্ষা করতে হতে পারে! তাছাড়াও অবশ্য প্যাংগং থেকে সোমোরিরির ওই পথে যাওয়া নির্ভর করবে চুসুলে পৌঁছানোর পর সেনাবাহিনীর অনুমতি যদি মেলে তবেই। তাই আমাদের এই বারবার লেহ্ ফিরে আসা – আর পরদিন আবার রওনা। লেহ্ থেকে কারু হয়ে এই পথে গাড়ির চলাচল তুলনামূলকভাবে বেশি।
রাস্তার দুপাশে হলদে-সবুজ গাছের সারি। দূরে বরফ মাথা পাহাড়। আরও এগিয়ে পথের পাশে নীল জলে শ্যে প্যালেসের ছায়া। আকাশে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ। দূরে স্টাকনা গুম্ফা। পথের পাশে নীল সিন্ধু বয়ে চলেছে। ছবি তুলতে আর ইতিউতি ঘুরতে নেমে গেছে সবাই। আমি জানলার ধারে খাতা-পেন নিয়ে একা বসে আছি। আলস্য! 'যাবার আগে এই কথাটা জানিয়ে যেন যাই/ যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই...'
বাঁদিকে গায়ের কাছে ন্যাড়া পাহাড়। ডানদিকে পাহাড়ের সারি কিছুটা দূরে, তারও পেছনে বরফ মাথা পাহাড়েরা উঁকি দিচ্ছে। উপত্যকা জুড়ে সবুজ-হলুদ গাছ। সিন্ধুর নীল জল বয়ে চলেছে। আর এইসবই ঝলসাচ্ছে রোদ্দুরে।
তুমি বলতেই পার একই দৃশ্য। সত্যি লিখতে গিয়ে আমারও মনে হচ্ছে যেন পথের ক্যানভাসে একই ছবি আঁকছি বারংবার। অথচ বন্ধুবর, একবার এখানে এসে দেখো। প্রতিদিন প্রতিটা মুহূর্ত নতুন লাগবে। ফিরতে ইচ্ছা করবে না এই অপার্থিব ছেড়ে, সত্যি।
পরপর পেরোচ্ছি – পৌনে দশটায় কারু চেক পয়েন্ট, তারপর রেম্বেক মনাস্ট্রি, সাকতি।
রাস্তায় কদাচিত স্থানীয় মানুষজন চোখে পড়ছে।
উপত্যকার মাঝ বরাবর এঁকেবেঁকে চলা রুক্ষ রাস্তা আবার পাহাড়ে উঠছে। ঝাঁকুনিতে লেখাই যাচ্ছে না ছাই। তায় আবার ঠান্ডা বাড়ছে হু হু করে।
'সানশাইন অন মাই সোলডার মেকস মি হ্যাপি...'
অনেকটা উঠে গেছি পাহাড়ের গা বেয়ে – ঠান্ডা ক্রমশ বাড়ছে। আর কিলোমিটার পাঁচেক গেলেই চ্যাং লা পৌঁছাব।

বেলা ১১টা, চ্যাং লা
বরফে ঢাকা চ্যাং লায় খানিকক্ষণ থামা। ১৭,৫৮৬ ফিট। মিলিটারি ট্রাক ও অন্য দু-একটা গাড়িও দাঁড়িয়ে রয়েছে। গ্লাভস খুলে লিখতে গেলে হাত জমে যাচ্ছে। নেমে পড়ি গাড়ি থেকে। যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বরফের মজা উপভোগ করছে। বরফের ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ের বাদামী শরীর কোথাও দেখা যাচ্ছে কোথাও বা একেবারেই না। ঝকঝকে নীল আকাশ। মাঝে মাঝে সাদা মেঘের টুকরো। পথের ধারে লেহ্‌ পর্যটন বিকাশ দপ্তরের পরিচালনায় কফিশপ, টুকিটাকি স্মারক-ও বিক্রি হয়। বেচারি চ্যাং লা – খারদুং লা (১৭,৫৮২ ফি.)-এর থেকে সামান্য উঁচু হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ যাত্রীই খারদুং লা-কেই বড়ভাই বলে জানে!
বুইয়ের একটা লোমওলা কুকুর বন্ধু জুটে গেছে দেখছি। এক জায়গায় কুকুরের বেশ একটা ছোটখাটো দল জড়ো হয়েছে। এটা একটু দলছাড়া হয়ে ঘুরছে।
আমরা রওনা দেওয়ার সময় প্যাংগং-এর দিক থেকে এসে দাঁড়াল একজন বাইকার। মোটরবাইকের পিছনে বাঁধা তার জিনিসপত্র। অ্যাডভেঞ্চারের কথা কল্পনাই করে গেলাম সেই ছোটবেলায় চাঁদের পাহাড়ের দিনগুলো থেকে – অর্ধেক জীবন পেরিয়ে এলাম – এইরকম বরফঢাকা আলগা নুড়িছড়ানো পাহাড়ি পথে – প্রায় ১৮০০০ ফিট উঁচুতে একাকী মোটরবাইক চালিয়ে অদেখার উদ্দেশে যাওয়া হল কই?
আবার এগিয়ে চলা। পথের দৃশ্য অনেকটা একই। কোথাও বাদামী পাহাড় কোথাও সাদা-বাদামীতে, কোথাও একেবারে সাদা। বরফের ভেতর দিয়ে মাথা তুলে রয়েছে বড় বড় পাথর আর ওদেরই গায়ে গায়ে জন্ম নিয়েছে শ্যাওলার মতো আগাছার দল।
চ্যাংথাং পেরিয়ে গেলাম।

১১-৪৫, সোলতাক লেক
১৬,১৯০ ফিট উচ্চতায় সোলতাক লেকের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। মাথার ওপরে একটা ঈগল ডানা মেলে উড়ে গেল।
মিলিটারি বেস এই সোলতাক। যদিও কোথাও জন-মনিষ্যি দেখা যাচ্ছেনা। টলটলে নীল জলের সরোবর শান্তভাবে শুয়ে আছে নির্জনে, ফিকে হলুদ-খয়েরি পাহাড়দের মাঝে।

১২-৩৫, তাংস্তে গ্রাম
একটু আগেই দুরবুক গ্রাম পেরিয়ে এসেছি। অ্যাডভেঞ্চারের ইচ্ছে থাকলে নুব্রা থেকে সরাসরিই চলে আসা যেত এই দুরবুকেই আগেই তো বলছিলাম তোমাকে। গা ছমছমে নির্জন সেই বোল্ডারপ্রতুল রাস্তায় যাওয়া হল না এযাত্রায় – সাহসে না কুলানোয়। অনেকটাই নীচে নেমে এসেছি এখন। সাড়ে তের হাজার ফিটে। বরফ নেই আর। ছড়ানো পাথর আর লালচে শ্যাওলায় বিস্তীর্ণ তাংস্তে ভ্যালি। শ্যাওলার নিচে জল রয়েছে। ইয়াক চোখে পড়ল বেশ কয়েকটা। এছাড়া পোষা ভেড়া আর বিস্তর লোমওলা কুকুর। ভ্যালি পেরিয়ে তাংস্তে গ্রাম। মিলিটারি চেকপোস্ট। পথের ধারের দোকান থেকে খিদের মুখে গরম গরম ম্যাগি খাওয়া হল।
প্যাংগং লেকের ধারে ঠান্ডায় রাত কাটাতে না চাইলে খানিক কম উচ্চতার এই তাংস্তেতে থাকেন কেউ-কেউ। অবশ্য যাঁরা প্যাকেজ ট্যুরে বেড়াতে আসেন, তাদের সাধারণত লেহ্ থেকে ভোর-ভোর রওনা করিয়ে প্যাংগং লেকের ধারে খানিকক্ষণ কাটিয়ে আবার বেলাবেলি লেহ্ ফিরিয়ে নিয়ে যান এজেন্সির লোকজনেরা।
একদিকে ন্যাড়া পাহাড়। অন্যদিকে পাহাড়ের গায়ে অল্প অল্প আগাছা চোখে পড়ছে। পথে একটা ছোট লেক পড়ল। জল-শ্যাওলার বদলে বালি আর বালি। বালি দেখে সৌম্য আবার উট খুঁজছিল।
একটা ব্রিজ পেরোলাম। মানে বাঁ দিকের পাহাড়ের গা থেকে সরে গিয়ে এবারে ডান দিকের পাহাড়ের গা বেয়ে চলা।
তারপর আবার চলা হলুদ পাহাড়ের সঙ্গে সঙ্গে – কখনো খানিক নামা, আবার ওঠা। হঠাৎ গাড়ি থামাল তুন্ডুপ – আমাদের ড্রাইভার। বাঁদিকে দুই পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে অনেকটা দূরে নিচে উঁকি দিচ্ছে ঘন নীল জলের হাতছানি – প্যাংগং সো।

বেলা ৩-০০, প্যাংগং সো
পথের বাঁ দিকে খানিক নিচে নীল জলের লেকের পাড় ঘিরে বাদামী আর কালচে পাহাড়ের মাথায় ছবির মতো সাদা মেঘেরা আটকে রয়েছে যেন। ডানহাতে লুকুং গ্রাম এখন প্রায় ফাঁকা। অফ সিজনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে রিসর্টের কাঠের বাড়ি। টেন্টগুলোর আচ্ছাদন খুলে নেওয়া হয়েছে – সারি সারি সিমেন্টের খালি চাতালে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াশবেসিন আর ইওরোপিয়ান কমোডগুলো দেখলে বোঝা যায় সাড়ে চৌদ্দ হাজার প্যাংগং সো এখন বেশ জনপ্রিয় ট্যুরিস্টদের কাছে। গ্রামের গা ঘেঁষে রঙিন রঙিন বৌদ্ধ পতাকারা মাথা তুলে আছে, পেছনে রাস্তার ওপারে ঝুঁকে আছে তুষারাবৃত শিখরের সারি।
ঢাল বেয়ে গাড়ি নেমে আসে জলের কাছে। কোথাও তার রঙ নীল। কোথাও বা খানিক ঘন হয়ে সবুজ হয়ে এসেছে। জলের আয়নায় মুখ দেখছে পাহাড় আর মেঘেরা। বালির রঙ সাদা আর হালকা হলুদে মেলানো মেশানো। লেকের বাঁপাশে সরু বালিপথে হাঁটলে দুপাশেই নীল জল – মনে পড়ে যাবেই 'থ্রি ইডিয়টস্‌' সিনেমার শেষদিকটা – যেখানে বেশ কয়েক বছর পর আবার দেখা হয় তিন বন্ধুর। জলে আর পাড়ে অজস্র সীগাল। তাদের কারোর রঙ পুরোই সাদা, কেউ বা সাদাতে-কালোতে। হঠাৎ হঠাৎ এক ঝাঁক উড়াল দিচ্ছে। তৈরি হচ্ছে এক একটা চিত্রকল্প।
প্যাংগং লেকের আকারে লম্বাটে ধরণের - প্রায় ১৩৪ কিমি দৈর্ঘ্যের ষাট শতাংশই চিনের সীমানার মধ্যে। আমরা আছি এখন লেকের পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে, পুবদিকে লেকের ধার দিয়ে স্প্যাংমিক, মান, মেরাক গ্রাম পেরিয়ে রাস্তা বেঁকে গেছে চুসুলের দিকে – আর খানিক দূর এগোলে প্যাংগং-এর মাঝ বরাবর চিন-ভারত নিয়ন্ত্রণ রেখা – এই নীল জল, এই পাখিগুলো জানে কি সে কথা?
সিজন ফুরিয়ে এলেও এখনো কিছু কিছু ট্যুরিস্ট এসেছে আমাদের মতই প্যাংগং-এর আকর্ষণে। যে যার মতো ঘুরে বেড়ায় অলস পায়ে। আমিও পায়ে পায়ে জলের ধারে দাঁড়াই এসে। জল ছুঁয়ে নিই দুহাতে।
মুগ্ধ হই সেই নির্জন নীলে।
দীপের ডাকে খেয়াল ফেরে। মেয়ের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে হঠাৎ করে। আমরা দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অক্সিজেন দিতে খানিক বাদে কিছুটা ঠিক হয়। লাদাখ ভ্রমণের এইদিন থেকে অক্সিজেনের সিলিন্ডারটা মোটামুটি আমাদের তিনজনের সঙ্গে সঙ্গেই ছিল। দীপ আর বুইয়ের বেশ কয়েকবার শ্বাসকষ্ট হয়েছে। আমারও পরে একদিন। বাকী সঙ্গীদের অবশ্য কোনও শারীরিক অসুবিধে হয়নি।
বুইয়ের শরীর একটু ঠিক হলে আবার তিনজনে জলের কাছে এসে দাঁড়াই। মনটা একটু খারাপই হয়ে গেছে তিনজনেরই। হাই অল্টিচ্যুডের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ তো রোজই খাওয়া হচ্ছে।
লেকের ধারে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে আবার মনটা খানিক হালকা হয়ে যায়। সন্ধে নেমে আসছে নীল জলের বুকে।
এখানে থাকব কী থাকব না ভাবতে ভাবতে থাকাই ঠিক হল শেষপর্যন্ত। লেকের ধার থেকে উঠে এসে গ্রামের দিকে গাড়ি এগোল স্প্যাংমিক গ্রামের দিকে।
পাথরের নীচু নীচু দেওয়ালের মাঝে মাঝে হলদেটে ঘাসজমি, ফাঁক দিয়ে পাথরবিছানো পথ। ইতিউতি ঘরবাড়ি – কিন্তু লোকজন দেখা যাচ্ছে সামান্যই। সেনাবাহিনীর চৌকি আছে। এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাতের আস্তানা খুঁজতে বেরোয় সঙ্গীরা। বিকেল ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। হোম স্টে – সাসোমা - ছাই রঙের বাড়ির দেওয়ালে আর জানলা বরাবর সাদা দাগ টানা।
বাড়ির সামনে তাঁত বুনছেন এক লাদাখি বৃদ্ধা – মুখে বয়সের আঁকিবুকি। সৌম্য নাম দিল চরকা বুড়ি। ইনিই সাসোমা – হোমস্টে চালানোয় সাহায্য করেন ওঁর মাঝবয়সী হাসিখুশি মেয়ে।
পাহাড়ের গায়ে নীল সরোবর ছুঁয়ে শান্ত গ্রামে সন্ধ্যা নেমে আসছে ক্রমশ। জানলার ধারে বসে লিখছি। সব মিলিয়ে বাড়িতে গোটা পাঁচেক ঘর - তার তিনটে আপাতত আমাদের দখলে। আর কোনও যাত্রীর আসার সম্ভাবনা নেই এই সময়ে। এলেও অবশ্য সাসোমা ও তাঁর মেয়ের থাকার অসুবিধে হবেনা – কারণ ওরা রাতে ঘুমান রান্না-কাম-খাওয়ার ঘরে। একটা বড় ঘরে বীরেন আর চন্দনদারা। মানে টুসি-চুমকি দুই বোনের পরিবার। সামনের একটা ছোট ঘরে সৌম্য – তার পরের ঘরে আমরা তিনজন ও অক্সিজেন সিলিন্ডার। আমাদের ঘরটায় দুটো খাট আছে। একটা ডাবল আর অন্যটা সিঙ্গল। আর থান ইটের মতো ভারী কম্বল। বাড়ির শেষপ্রান্তে রান্নাঘর – পাশে কমন বাথরুম।
রাত্তির যতো বাড়ছে, ঠান্ডাও। বাইরে তারায় ভরা আকাশ। সামনে রুপোলি চাদর বিছানো প্যাংগং। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না তীব্র ঠান্ডায়। গ্রামের সোলার ইলেক্ট্রিসিটি সিস্টেম খারাপ। তাই ঘরের অন্ধকারে ভরসা মোমবাতি।
বীরেনদের ঘরে মোমের মৃদু আলোয় খানিকক্ষণ মেমরি গেম খেলা হল সবাই মিলে – তারপর ঠান্ডা বাড়তেই রান্নাঘরে গিয়ে জুটেছি। ঘরটার ঠিক মাঝখানে একটা ছাদ ফুঁড়ে ওঠা লম্বা সিলিন্ডারের মধ্যে গনগনে আগুন জ্বলছে। আগুনের ওপরে জল গরম হচ্ছে। ওখান থেকে জল নিয়েই আমাদের হাত-মুখ ধোওয়া আর বাথরুমের কাজ সারা হয়েছে। বাড়ির বাসিন্দারা সকলেই রান্নাঘরে। এই ঘরটাই কেবল যা গরম। মেঝে বিছানো মোটা কম্বলের ওপর গোল হয়ে বসে সামনের ছোট টুলে থালা বাটি নিয়ে রাতের খাওয়া – গরম গরম ডাল-ভাত-আলুসেদ্ধ অমৃতসমান। তাক হাতড়ে আচার, মাখনের অবশেষ বের করে আনেন সাসোমার মেয়ে - ভাষার ব্যবধানে বেশি গল্প হয়না – তবে সারাক্ষণই মুখে হাসি দুজনেরই। বহুক্ষণ ধরে খাওয়া আর আড্ডা চলে আমাদের। আমার তো খেয়ে আর উঠতেই ইচ্ছে করে না। রান্নাঘরটা এত গরম হয়ে গেছে যে সোয়েটারও খুলে ফেলি। এদিকে হাত ধুতে বেরোলেই তো ঝপাস করে ঠান্ডার কবলে। বাইরের তাপমাত্রা বোধহয় শূন্যের আশেপাশে।
রাত্তিরে বুইয়ের খুব কষ্ট হয়, দীপেরও। বেশ খানিকক্ষণ পালা করে অক্সিজেন নেয় দুজনেই। দীপ তো প্রায় সারারাত জেগেই ছিল – ভোরবেলা সৌম্য-র ঘরে গিয়ে যখন ওকে ডাকে আড্ডা দেওয়ার জন্য সৌম্য ভারী রাগ করে কেন ওকে রাতেই ডাকা হয়নি বলে।

১৭/১০/২০১৫, স্প্যাংমিক গ্রাম, প্যাংগং সো
পথের ধারের দোকানে ব্রেকফাস্ট – গরমাগরম ব্রেড-অমলেট বা ম্যাগি। ফেরার পথে তাড়া আছে। আজ থেকে লাদাখ হিল কাউন্সিলের ভোটপর্ব শুরু। এতকাল কংগ্রেসের রাজ থাকলেও এবার বুদ্ধ-র দেশে বিজেপি-র রমরমা বেশি। এত কষ্টে দিন কাটানোর পরেও এরা ভোট দিতে সকলেই বেশ আগ্রহী। আসলে বঞ্চিত মানুষের কিছুই তো অধিকার থাকে না। অন্ততঃ ভোট দেওয়ার অধিকারটুকু তাই বোধহয় এদের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ।
পৌনে নটা নাগাদ প্যাংগংকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম ফেরার পথে। পেছনে পড়ে রইল স্প্যাংমিক গ্রাম। নীল জলের লেক যখন শেষবারের মতো পাহাড়ের আড়ালে চলে গেল, মনটা খারাপ হয়ে গেল খুব। সকালে তার আর এক অপরূপ চেহারা। তবু বড় কম সময় থাকা হল। যেন দেখা হল না কিছুই দু চোখ ভরে।

সকাল ১০-৪৫, দুরবুক
পথের ধারের দোকানে ব্রেকফাস্ট – গরমাগরম ব্রেড-অমলেট বা ম্যাগি। ফেরার পথে তাড়া আছে। আজ থেকে লাদাখ হিল কাউন্সিলের ভোটপর্ব শুরু। এতকাল কংগ্রেসের রাজ থাকলেও এবার বুদ্ধ-র দেশে বিজেপি-র রমরমা বেশি। এত কষ্টে দিন কাটানোর পরেও এরা ভোট দিতে সকলেই বেশ আগ্রহী। আসলে বঞ্চিত মানুষের কিছুই তো অধিকার থাকে না। অন্ততঃ ভোট দেওয়ার অধিকারটুকু তাই বোধহয় এদের কাছে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ।

দুপুর ১২-০০, চ্যাং লা
এবারে থামা অল্পক্ষণের জন্যই। উল্লেখযোগ্য, একটা হিমালয়ান মোনাল চোখে পড়ল। কিন্তু ক্যামেরাবন্দি করা যায়নি।

লেহ্-তে ফিরে এসে দুপুরের খাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ফিরে দেখি ভোটের কল্যাণে দোকানপাট সব বন্ধ। প্রবল খিদের মুখে আমাদের উদ্ধার করল সেই সদাহাস্যময় ধনগিরি বোম ঠোকরি। আমাদের হোটেলে এমনিতে গেস্টদের জন্য শুধু ব্রেকফাস্ট আর যতবার ইচ্ছে চা-কফির ব্যবস্থা - লাঞ্চ-ডিনারের আয়োজন নেই। যখন ফিরেছি ততক্ষণে তার এবং হোটেলের মালকিনের পরিবারেরও দুপুরের খাওয়া হয়ে গেছে। রিসেপশন রুমের টেবিলেই মালকিনের ঘর থেকে থালায় থালায় ভাত আর ডাল নিয়ে আসে ধনগিরি। খিদের মুখে তাই দারুণ লাগে। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে সকলের শেষে বসি। ডালও তখন তলানিতে। আচার হবে, বা মাখন? ধনগিরি প্রথমে না বলেও আবার খুঁজেপেতে কয়েক দলা মাখন এনে দেয়। ব্যস, চমৎকার পেট ভরে যায়।
তৃপ্তি করে খেয়ে উঠে রিসেপশনের লাউঞ্জে বসি। দীপ বলেছে লাউঞ্জের আলমা্রি থেকে গতকাল বীরেন 'সেভেন ইয়ারস ইন টিবেট' বইটা পেয়েছে। আমিও উঁকিঝুঁকি মারি আলমারিটায়। ধনগিরিকে বলতেই তালা খুলে দেয় আর বলে যেটা ইচ্ছে নিয়ে যান। হিন্দি, ইংরেজি ছাড়াও নানা বিদেশি ভাষায় লেখা এই বইগুলো বিভিন্ন সময়ে বেড়াতে এসে লোকজন ফেলে গেছে। যত্ন করে তাদের আলমারিতে তুলে রাখে ধনগিরি, আর কেউ পড়তে চাইলেই তাকে দিয়ে দেয়। আমরাও উলটে পালটে দেখে একটা বই সংগ্রহ করি।
ঘরে গিয়ে বিশ্রাম আর আড্ডা। কদিন ধরেই ভাবছি, লেহ্-তে একটা বাঙালির তেলেভাজা আর চায়ের দোকান খোলা বড় জরুরি। এই ঠান্ডায় বিকেল-সন্ধে হলেই প্রাণটা কেমন কেমন করে ওঠে যে।

(ক্রমশ)

আগের পর্ব – দ্বিতীয় পত্র


~ লাদাখের আরও ছবি ~

'আমাদের ছুটি' আন্তর্জাল ভ্রমণ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক দময়ন্তী দাশগুপ্ত নেশায় লেখক, ভ্রামণিক, ভ্রমণসাহিত্য গবেষক। প্রকাশিত বই - 'অবলা বসুর 'ভ্রমণকথা', 'আমাদিগের ভ্রমণবৃত্তান্ত - ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গমহিলাদের ভ্রমণকথা - ১ম পর্ব' (সঙ্কলিত এবং সম্পাদিত)

 

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

Cannot connect to the Host