ইতিহাসের মেবারে

হিমাদ্রি শেখর দত্ত


~ রাজস্থানের তথ্য ~ রাজস্থানের আরও ছবি ~

শিবরাত্রির ছুটির সঙ্গে শনি-রবি মিলিয়ে টানা তিনটে দিনের ছুটি নজরে আসতেই প্ল্যান বানাই একটা ছোটখাটো আউটিং-এর। বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর শরণাপন্ন হই, কিন্তু, কপাল মন্দ, বন্ধুপত্নীর শনিবারে ছুটি না থাকায় তারা দুঃখের সঙ্গে যেতে অপারগ জানিয়ে দেয়।

অগত্যা শুধু নিজেদেরই ব্যবস্থাই করি। এসি ভলভো বাসে আমেদাবাদ থেকে উদয়পুর (সাড়ে তিন ঘন্টার রাস্তা), যাওয়া আসার আগাম টিকিট করে নেওয়া গেল। যাওয়ার একদিন আগে ভোর ভোর মোবাইলের আওয়াজে লেট ঘুম (আটটা বাজে) ভেঙে গেল। বন্ধুপত্নীর গলা – 'দেখুন না, আগে বলেনি - এখন আমাদের শনিবারে ছুটি দিয়েছে। আপনাদের যাওয়ার তো সব কিছু বুক হয়ে গেছে নিশ্চয়ই, তবুও আমরা কি চাইলে যেতে পারব?' গিন্নি ততক্ষণে তাঁর স্কুলে বেরিয়ে গেছেন - আমি তো বিছানায় উঠে বসি। 'সত্যি যাবে তোমরা? আমাদের বাসের টিকিট হয়ে গেছে, তবে সে মনে হয় পাওয়া যাবে। শুধু আগে হোটেলে কথা বলে দেখি, ঘর পাওয়া যাবে কিনা। আমি একটু পরে জানাচ্ছি।' 'হ্যাঁ, প্লিজ দেখুন।' হোটেলে ফোন প্রথমবারে কেউ তোলে না, দু তিন বার চেষ্টা করার পরে জনৈক বিক্রম সিং লাইনে এলেন – 'ও জী, আপ চলে আইয়ে, রুম কা বন্দোবস্ত হাতোঁ হাত কর দেঙ্গে - কোই প্রবলেম নেহি হ্যায়।' ব্যাস সব ফিট হয়ে গেল। বন্ধুকে ডেকে সুখবর দিয়ে দিই। ও তার নিজের জায়গা থেকেই ডাইরেক্ট উদয়পুর পৌঁছে যাবে এমন বাসে টিকিট কেটে নিচ্ছে বলে আমায় জানায়। ঠিক আছে, তাতে কোনও অসুবিধে নেই। উদয়পুরে মিট করছি তাহলে। এবার শ্রীমতীকে ফোন করি খবরটা দেওয়ার জন্যে। ফোনে কথাবার্তা শুরু হতেই, তার দিক থেকে প্রোপোজাল – 'তাহলে আর বাসে কেন, চল না সবাই মিলে গাড়িতে যাই। বেশি দূর তো নয়। বাসের টিকিট ফেরত দিয়ে দাও, আর সুদীপদাকেও বল, আজ রাতে আমাদের এখানে চলে আসতে - কাল ভোর ভোর বেরিয়ে পড়া যাবে।' আবার ফোন লাগাই - আর এই নতুন প্রস্তাবনার ঘোষণা করি। কী আশ্চর্য, সেটা সঙ্গে সঙ্গে গৃহীত হয়ে যায় অত্যন্ত আনন্দ আর খুশির সঙ্গে - ওদিককার রিঅ্যাকশন – 'আরে এটাই তো আমি চাইছিলাম। তোমার বাসের টিকিট কাটা বলে আমায় বাসের টিকিট কাটতে হচ্ছিল - এখনি সব ফেরত দিয়ে দাও। আমি মানে আমরা কাল সকাল আটটার মধ্যে তোমার ওখানে চলে আসছি - তোমাদের পিক আপ করে বেরিয়ে যাব। এখন ফোন ছাড়, আমায় গাড়ির পিইউসি করাতে যেতে হবে - স্টেট ক্রস করব, যদি ধরে তাহলে হেভি ফাইন হবে।' ও ফোন কেটে দেয়। মনে হচ্ছে এবার ট্যুরটা জমে যাবে।

পরের দিন সকাল সকাল উঠে আমরা সময়ের আগেই তৈরি হয়ে গেলাম। সাড়ে আটটা নাগাদ, নীল রঙের মারুতি এষ্টেলো নিয়ে বন্ধু আর বন্ধুপত্নী হাজির। মিনিট পনেরোর মধ্যেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম - উদয়পুরের উদ্দেশ্যে। চালকের আসনে সুদীপ চৌধু্রী, আমার কলিগ। আমরা ১৯৯৭ সাল থেকে বন্ধু। এখন দুজনেই রিটায়ার করেছি - ওরা বরোদায় বাসা বানিয়েছে, আমি আমেদাবাদে। কিন্তু আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বটা এখনও সমান ভাবেই বজায় আছে। অনেক দিন পরে বেরোনো, অনেক দিন পরে আবার মুখোমুখি - তাই গল্প আর গাড়ি সমান তালেই চলতে থাকে। পথে হিম্মতনগর ছাড়িয়ে একটি রেস্তোরাঁ টাইপের দোকানে গরম গরম সিঙ্গাড়া আর দারুণ চা পাওয়া গেল। হিম্মতনগর শহরের কোনও খাবারের দোকান তখনও খোলেই নি - বলল, বেলা এগারোটার আগে কিছু পাওয়া যাবে না। মনে হয় আজ শিবরাত্রি বলে সকলেই ছুটির মেজাজে রয়েছে। সুদীপ সঙ্গে 'ভ্রমণ সঙ্গী' বইটা নিয়ে এসেছিল - পাতা উলটে উলটে কুম্ভলগড়ের ঠিকুজি বের করলাম। কুম্ভলগড় দুর্গের প্রাচীর বিশ্বের দ্বিতীয় লম্বা প্রাচীর, যা কিনা চায়না ওয়ালের পরেই - এই অসাধারণ ব্যাপারটা একেবারেই অজানা ছিল - সেই দুর্গ দেখতে যাচ্ছি - এটা মনে করে চলার পথের উৎসাহ আরও কিছুটা বেড়ে গেল। এখন কেবল একটাই ভাবনা, আমাদের ঘর তো হোটেল লে-রয়-এ বুক করা আছে - সুদীপরা ঠিকঠাক ঘর পেয়ে গেলেই ব্যস। রাস্তায় আর কোথাও দাঁড়ানো হয় নি - একদম হোটেলের দোরগোড়ায় এসে সুদীপ গাড়ি বন্ধ করে। লে-রয় হোটেলটা মোটামুটি বড়, ভালো করেই সাজানো। দুদিকেই ঢোকার দরজা আছে। হোটেলের ঠিক পাশেই উদয়পুর সিটি স্টেশন। কিন্তু বেশ পরিচ্ছন্ন। শেষমেষ কোনও অসুবিধার মধ্যে পড়তে হলনা, দুজনেই পাশাপাশি ঘর পেয়ে যাই হোটেলের তিন তলায়। নীচে ডাইনিং প্লেস। আর একতলায় ব্রেকফাস্ট হল। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর হাসিমুখের স্টাফ দেখে স্বস্তি অনুভব করি।

কিছুটা ফ্রেশ হয়ে বসলাম ডাইনিং প্লেসে। খাবারের অর্ডার দিয়ে আমাদের ঘোরার প্ল্যানটা ঝালিয়ে নেওয়া হল। আগেই হোটেলের সঙ্গে কথা বলে দুদিনের জন্য লোকাল গাড়ি বুক করে রেখেছিলাম। সেটা অবশ্য সুদীপের খুব একটা পছন্দের ছিল না। কিন্তু যেহেতু আগে বাসেই যাচ্ছিলাম, তাই গাড়ি বুক করে যাওয়া ছাড়া লোকাল ট্রিপের জন্য আর কোনও রাস্তা ছিল না। যাই হোক অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর সে গাড়ি এল। বেলা প্রায় চারটে বাজে - যেতে হবে ১০৯ কিলোমিটার পথ - পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। এদিকটা ভারতের পশ্চিম বলে, সূর্যদেবের প্রকাশকাল অন্যান্য স্থানের তুলনায় একটু বেশি - আর সেটাই ভরসা। আজকের দ্রষ্টব্য কুম্ভলগড় – যা কিনা আরাবল্লী পাহাড়ের মাথায় বসানো।

কুম্ভলগড় দুর্গ রাজসমন্ড জেলায়, উদয়পুর শহরের থেকে ১০৯ কিলোমিটার উত্তরপশ্চিমে, পশ্চিম আরাবল্লী পাহাড়শ্রেণীর চূড়োয়। পাহাড়ের চূড়ার উচ্চতা ৩৬০০ ফিট (১১০০মিটার) এম.এস.এল. (মানে মিন সি লেভেল)। দুর্গের দেওয়ালের পরিসীমা প্রায় ৩৬ কিলোমিটার, যা কিনা বিশ্বের দ্বিতীয় লম্বা দেওয়াল - চীনের প্রাচীরের পরেই। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই দুর্গে রাণারা বসবাস করতেন - মহারাণা ভগত সিংহ ১৯৫৫ সালে শেষ রাণা ছিলেন। কুম্ভলগড় দুর্গই মহারাণা প্রতাপের জন্মস্থল।
যদিও ১৫০০ শতাব্দীতে মহারাণা কুম্ভ আদি দুর্গের বিশেষভাবে রূপান্তর করেন এবং তাঁর নামেই দুর্গের পরিচিতি, কিন্তু এই দুর্গের ইতিহাস তার থেকে পুরোনো। আমাদের গাড়ির চালক বাবলু অবশ্য এইসব ইতিহাসের কোনও ধার ধারে না। কথায় কথায় ওকে বর্তমানে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী কে জিজ্ঞাসা করাতে সে উত্তর দিয়েছিল, 'ক্যা পাতা!' কিন্তু সুখের বিষয় কুম্ভলগড়ে বেলাশেষে গাইড না পেলেও, আমরা একটি ছোট মেয়েকে পেয়েছিলাম, যে নিজে থেকে এগিয়ে এসেছিল, গাইড পরিচয় নিয়ে। তবে ওর ঘোরাবার সীমা নির্দিষ্ট ছিল একটি খেজুর গাছ পর্যন্ত। নীচে থেকে ঘুরে ঘুরে রাস্তা দুর্গের মাথায় উঠেছে - সেই পথে দুটো কি তিনটে টার্ন নেবার পরেই সেই খেজুর গাছ, যা ও পার করতে রাজী নয়। জানিনা সেটা তার নিজস্ব পছন্দ না অন্য কোন অজানা কারণ! কথায় কথায় জানা গেল, ক্লাস সেভেনে পড়ে, বাবা গাড়ি চালায়, দাদাজী গাইড ছিলেন - তার কাছ থেকেই কুম্ভলগড়ের কিছু কিছু শুনেছে। তারপর নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে রাজস্থানী মিশ্রিত হিন্দিতে শোনাতে লাগল মহা উৎসাহে। প্রফেশনাল গাইডরা যেখানে ৪৫০ টাকা করে নিচ্ছে, ও সেখানে ১০০ টাকা চায়। কিন্তু সেটা ওকে সঙ্গে নেওয়ার মূল কারণ নয়। ওর মুখের মধ্যে, চোখের মধ্যে এমন একটা ভালবাসা চোখে পড়েছিল, যে ওকে সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে নিই, বাকীরাও কেউ কোনও আপত্তি করেনি। দুর্গে ঢোকার মুখে আমাদের গাড়ি নিচেই ছেড়ে দিতে হয়েছিল - দুর্গের ভেতরে গাড়ির প্রবেশ নিষেধ। চিতোরে অবশ্য পুরোটাই গাড়িতে করে দেখা যায়, গাড়ি থামিয়ে নেমে নেমে। সুদীপ দুর্গের গেটে টিকিটঘর থেকে দুর্গ দেখার টিকিট আর রাতের লাইট এন্ড সাউণ্ড দেখার টিকিট কেটে নিয়ে এল। দুর্গ দেখার জন্য প্রতিজন ১৫ টাকা, আর আলো এবং শব্দের অনুষ্ঠানের জন্য জন প্রতি ১০০ টাকা করে টিকিট। শো সন্ধ্যে সাতটায় শুরু হয়, সূর্য ডোবার পরে - পঁয়তাল্লিশ মিনিটের শো। যদি এখানে এসে ইতিহাসকে জানতে হয়, তাহলে শুধু গাইডের ভরসায় না থেকে, এই শো-টি দেখে নেওয়া অবশ্যই উচিত। যদিও ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের লাইট এণ্ড সাউণ্ডের মত (যেমন হায়দ্রাবাদের গোলকুন্ডা ফোর্ট, আমেদাবাদের সাবরমতী আশ্রম বা গান্ধীনগরের অক্ষরধাম) টেকনিকালি উন্নত নয়। চিতোর দুর্গের পরেই কুম্ভলগড় রাজস্থানের প্রধানতম দুর্গ। আয়তনে চিতোরের থেকেও বড়। রাজস্থানে মাত্র তিনটি দুর্গ ছিল, যেখানে মহারাণাদের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষও বসবাস করত - জয়সলমীর, চিতোর আর কুম্ভলগড় দুর্গ। চিতোর, কুম্ভলগড় আর উদয়পুর এই তিনটিকে একসঙ্গে মেবারের প্রধান দুর্গ বলা হয়। এ ছাড়াও মেবার রাজত্বের অধীনে আরও অনেক দুর্গ আছে। মেবার কখনও কারো অধীনতা স্বীকার করেনি, নিজেদের দুর্গ হারিয়েছে, আবার যুদ্ধ করে জিতেছে, জঙ্গলে দিনাতিপাত করেছে, কিন্তু কখনও মোগল বা অন্য আক্রমণের কাছে মাথা নত করে নি। জয়পুর, বিকানীর বা আজমেরের সঙ্গে এখানেই মেবারের পার্থক্য। বাকিরা মোগলের সময় মোগলদের, ব্রিটিশের সময় ব্রিটিশদের তোষামোদি করে নিজেদের রক্ষা করেছে। তারা যে যুদ্ধ করেছে, তা কারোর অধীনে বা আজ্ঞাবহ হয়ে - নিজের রাজ্যের স্বাধীনতার জন্যে নয়; যেমনটি মহারাণা কুম্ভ বা মহারাণা প্রতাপ করে গেছেন আজীবন। তাই একই রাজ্যের পরিধির মধ্যে থাকলেও আজও মেবারের রাজপুত জয়পুরের রাজপুতের জল পর্যন্ত ছোঁয় না।


আমাদের লিটল গাইডের মুখে শোনা আর শো দেখে জানা সব খুঁটিনাটি যদি এক জায়গায় করি তাহলে তা খানিকটা এমন হবে। কুম্ভলগড় দুর্গের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে খুব ডিটেইলে জানা যায় না - কারণ ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাব। যদিও এই দুর্গের পত্তন রাজা সম্প্রাতি (মৌর্য্যবংশীয় সম্রাট অশোকের ছেলে)-এর দ্বারা – তখন এর নাম ছিল মচ্ছিন্দ্রপুর দুর্গ। পাহাড়ের নীচে মচ্ছিন্দ্রপুর বলে সেই সময়ে (৬০০শতাব্দী) একটি গ্রাম ছিল, সেই গ্রামের নামেই অশোকপুত্র এই দুর্গের নামকরণ করেন। ওই সময়ের ইতিহাসবিশেষজ্ঞ সাহিব হাকিম যদিও এই দুর্গের নাম বলেন, মাহোর। অশোকপুত্রের এই দুর্গের পত্তনের মূল কারণ ছিল স্ট্র্যাটেজিক, যা তার নিজের রাজ্যের সুরক্ষার জন্য পশ্চিমের একটা আউট পোস্ট হিসেবে কাজ করত। কিন্তু তিনি নিজে কখনও থেকেছেন কিনা, তা জানা যায় না। তারপর থেকে প্রায় ৭০০ বছর এই মচ্ছিন্দ্রপুর দুর্গের ইতিহাস কালের গভীরে নিমজ্জিত। বিশেষ কিছু জানা যায় না। ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে আলাউদ্দিন খিলজী যখন মেবার আক্রমণ করেন, তখন সেখানে গেহলোট রাজাদের রাজত্ব চলছিল। খিলজী যুদ্ধে গেহলোটদের পরাজিত করে মেবারের অধিকার অর্জন করেন। এই গেহলোট যোদ্ধাদের গোষ্ঠীতেই ছিলেন হাম্বীর। পরে তিনি আবার যুদ্ধ করে এই এলাকা খিলজীর হাত থেকে উদ্ধার করে মচ্ছিন্দ্রপুর দুর্গ থেকেই মেবারের শাসন স্থাপন করেন। তিনিই প্রথম রাণা উপাধি গ্রহণ করেন (রাণা অর্থাৎ যে রণ করে)। গেহলোট গোষ্ঠী থেকে জন্ম হয় শিশোদিয়া গোষ্ঠীর - তার পরের সমস্ত রাজপুত মেবার রাণারা এই শিশোদিয়া বংশের উত্তরপুরুষ। এদের পূজ্য ছিলেন সূর্য, তাই এরা নিজেদের সূর্য বংশীয়ও বলে থাকেন। স্থানীয় চারণগানেও কোথাও কোথাও সূর্যবংশীয় বলে রাণাদের উল্লেখ করা হয়। ইতিহাসে রাণা হাম্বীরের অন্য নাম মহারাণা অজয় সিংহ (১৩০৩ -১৩২৬ খৃষ্টাব্দ, রাজত্বকাল তেইশ বছর)। চিতোরের অন্নপূর্ণা মন্দির, যেটা আমরা সময়াভাবে দেখতে পারিনি, সেটি এই রাণা হাম্বীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। ১৩৬৪ সালে হাম্বীর মারা যান। ১৩২৬ থেকে ১৪৩৩ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত, মানে প্রায় একশো সাত বছর আরও চার জন রাণা মেবারের শাসন করেন এই মচ্ছিন্দ্রপুর দুর্গ থেকেই। এদের মধ্যে হাম্বীরপুত্র মহারাণা ক্ষেত্র সিংহ, পরে মহারাণা লাখা (লক্ষ সিংহ), মহারাণা চণ্ড ও মহারাণা মোকল (যিনি মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে খুন হন মহারাণা ক্ষেত্র সিংহের ছেলে চাচা ও মেরার হাতে। গুজরাতের সুলতান আহমেদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাণা মোকলকে যুদ্ধ শিবিরেই গোপনে খুন করা হয়)। মেবার রাজত্বের এইসময় যদিও বিশেষ গরিমাপূর্ণ নয়, কিন্তু মহারাণা লাখা সিংহের সময় জাওয়ারে বিখ্যাত তামা-দস্তা-রুপোর খনি আবিষ্কৃত হয়। জাওয়ারের সেই মাইনস আজও চলছে ভারত সরকারের অধীনে। ১৪৩৩ খৃষ্টাব্দে মোকলের জ্যেষ্ঠ পুত্র কুম্ভ মেবারের রাণা হোন। তিনি ছিলেন প্রতাপী, কলাপ্রেমী, সঙ্গীতজ্ঞ এবং কুশল যোদ্ধা। আমাদের সামনে আজ যে কুম্ভলগড় দুর্গ আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যার বিশালতা দেখে আমাদের মাথা ঘুরে যাচ্ছে, দুর্গের বর্তমান এই রূপ রানা কুম্ভের আমলে। ১৫শ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাস্তুকার মদনকে তিনি মচ্ছন্দ্রপুর দুর্গ দিয়ে বলেন - এমন দুর্গ বানিয়ে দাও যা কখনও কেউ ভেদ করতে না পারে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কুম্ভলগড়। সেই সময় রাণা কুম্ভের রাজ্য সীমা মেবারের রণথম্ভোর থেকে বাইরে গোয়ালিয়র (পূর্ব মধ্যপ্রদেশ) পর্যন্ত ছড়ানো ছিল। তার রাজত্বকালকে এককথায় দুর্গের স্থাপনকাল বলা যায় - তিনি সর্বমোট চুরাশিটি দুর্গের স্থাপনা করেন - যার মধ্যে বত্রিশটির নকশা বা প্ল্যান তিনি নিজেই বানিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কুম্ভলগড়। এছাড়া মেবার রাজত্বের মধ্যে, সিরোহীতে বাসন্তী দুর্গ, বদনৌরে বৈরাট দুর্গ, আবুতে অচলগড়, চিতোরগড়ের সাতটি প্রবেশদ্বার সবই তাঁর আমলেই তৈরি। এ ছাড়া অজস্র জলাশয়, মন্দির ও মহল তিনি বানিয়েছিলেন। রাণা কুম্ভ সঙ্গীতের ওপর কিছু গ্রন্থ লিখেছিলেন - যেগুলি আদি সুর ও তার তান-লয় ও বিস্তারের ভঙ্গিমা ব্যক্ত করে। 'কুম্ভো কা সঙ্গীতরাজ', 'সঙ্গীত মীমাংসা', 'সূড প্রবন্ধ' এই সঙ্গীত গ্রন্থগুলি বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। কিন্তু নিয়তির কি বিধান জানি না, এমন মহাশক্তিশালী জ্ঞানী কুশল যোদ্ধা মহারাণা কুম্ভ শেষ বয়সে উন্মাদ হয়ে যান - একদিন পূজাগৃহে সকালে পূজা করার সময় কুম্ভের ছেলে রাণা উদা পূজাগৃহে ঢূকে আসে। যেন পিতার আশীর্বাদ নিতে! রাণা কুম্ভ জিজ্ঞাসা করেন - তোমার তো এখন ঘোড়ায় চড়ার সময়, এখানে কি করছ? তার জবাবে উদা নিজের কোমরবন্ধ থেকে ছুরিকা বের করে, পিতাকে খুন করে। ১৪৬৮ খ্রিষ্টাব্দের এক সকালে এই মহান চরিত্রের জীবনাবসান হয় নিজেরই ছেলের হাতে।

কুম্ভলগড় দুর্গের দীর্ঘ প্রাচীর মেবার রাজ্যকে মারোয়াড় থেকে আলাদা করে রেখেছে। মারোয়াড় বলতে বোঝায় যোধপুরক্ষেত্র (যার মধ্যে পড়ে যোধপুর, নাগাউর, বারমের, পালি ইত্যাদি) যা কিনা দক্ষিণ-পশ্চিম রাজস্থানের অংশ। কুম্ভলগড় সবসময়ই মেবারের রাণা বা তাদের বংশজদের বিপদের সময় আশ্রয় দিয়েছে। ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দে ধাত্রী পান্না চিতোর থেকে নিজের ছেলের প্রাণের বলিদান দিয়ে মেবারের শিশু রাণা উদয় (মহারাণা উদয় সিংহ -২য়) কে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, যিনি পরে উদয়পুরের প্রতিষ্ঠা করেন। উদয় সিংহের ছেলে রাণা প্রতাপও এই দুর্গেই জন্ম গ্রহণ করেন। কুম্ভলগড় অজেয় দুর্গ হিসেবে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে। আহমেদ শাহ (১৪৫৭, ১৪৫৮, ১৪৫৯); মূহম্মদ খিলজী (১৪৬৭) এরা কেউই কুম্ভলগড় অধিকার করতে পারেন নি। ১৮১৮ সালে এই দুর্গ মারাঠাদের অধীনে আসে তাও টডের মধ্যস্থতায়। যুদ্ধে নয়। ২০১৩ সালে কুম্ভলগড় দুর্গ ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা প্রাপ্ত হয়। এই দুর্গ নিয়ে স্থানীয় নানা গল্পকথাও রয়েছে।

সূর্য ডুবে গেছে। আমরাও আস্তে আস্তে পাকদন্ডী বেয়ে নীচের দিকে চলা শুরু করি। যেখানে লাইট অ্যাণ্ড সাউন্ডের প্রোগ্রাম দেখানো হবে, সেটি একটি শিবমন্দির প্রাঙ্গণ। ওপর থেকে সেদিকে তাকাতেই জনারণ্য চোখে পড়ে। সুদীপ আর আমি নীচে নেমে এসে দেখি একটা চায়ের দোকান - মেয়েরা চলে গেল আদিবাসীদের তৈরি হ্যান্ডলুমের দোকানে, জাস্ট দেখে আসি বলে। আমরা চায়ের অর্ডার দিয়ে একটুখানি জিরোনোর জন্য বসলাম। নেমে আসার সময় আমার সঙ্গে চার বিদেশির কিছুটা কথাবার্তা হল - অষ্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন রাজস্থান দেখার জন্য। প্রায় তিন মাস হল আমার মেয়ে জামাই গেছে অষ্ট্রেলিয়াতে - তাই স্বাভাবিক ভাবেই এঁদের সঙ্গে একটু লম্বা কথাবার্তা হয়ে গেল। এঁরা সকলেই সিডনিবাসী। চারজনেই রিটায়ার্ড - ওঁরা জানেন কিনা জানি না, কয়েক লক্ষ বছর আগে ইণ্ডিয়া আর অষ্ট্রেলিয়া একসঙ্গেই জুড়ে ছিল - এখন ভৌগোলিকভাবে দুই গোলার্ধে। চায়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই তাঁদের রাস্তার ধারে এমনভাবে চা-পান ঠিক স্বাস্থ্যকর লাগে নি। বিদেশিরা চলে গেলেন। আমরা চারজনে চা খেয়ে আলো ও শব্দের ওপেন সিনেমাঘরে প্রবেশ করলাম। প্রচুর লোক সমাগম হয়েছে, তবু জায়গা পেতে খুব একটা অসুবিধে হল না। মন্দির প্রাঙ্গণের পাথরের ধাপে ধাপে লোকেরা বসেছে, যেন ওপেন থিয়েটার। আমাদের সামনে কুম্ভলগড়ের ঐতিহাসিক সেই প্রাচীর, যার ভেতরের দিকে গড়ের মধ্যের কোন একটা অংশে আমরা জটলা করেছি। পেছনে ডানদিক দিয়ে গড়ের রাস্তা একদম পাহাড়ের মাথা পর্যন্ত উঠে গেছে - যেখান থেকে এই একটু আগেই নেমে এলাম। এখানে সূর্যের আলো যেমন অনেকক্ষণ থাকে, তেমনই সূর্য ডুবে যাওয়ার পরে পরেই ঘন অন্ধকার হয়ে গেল। এই জায়গাটিতে সাধারণ ভাবে লাইট খুবই কম, মোবাইলের আলো জ্বেলে লোকজন যাতায়াত করছে। একটু পরেই অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল। জোরদার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শেষ হওয়ার পরে ব্যারিটোন আওয়াজে চতুর্দিক গমগমিয়ে উঠল 'ম্যায় কুম্ভল গড় হুঁ'। ইতিহাস আগেই লিখেছি, তাই এখন আর সেই কথায় যাচ্ছি না। অনুষ্ঠান চলা কালীন একবার সোজা আকাশের দিকে চোখ তুলেছিলাম - জানতাম রাজস্থানে আকাশ খুব পরিষ্কার থাকে - কিন্তু ঠিক ওপরেই সপ্তর্ষিমন্ডল আমার দিকে চেয়ে আছে দেখে খুব চমকে উঠলাম। পুরাণের সাত ঋষি আকাশের মহাছত্র পটে নিজের আসন বিছিয়ে যেন আমাদের সঙ্গেই কুম্ভলগড়ের ইতিহাস শুনছেন এমনটাই মনে হল। এক অনাস্বাদিত অনুভূতিতে মন ভরে গেল।

অনুষ্ঠানশেষে অন্ধকারে ঢালু পথ বেয়ে ফিরে চললাম উদয়পুরে আমাদের এখানকার ঠিকানার দিকে। আর হয়তো কখনও আসা হয়ে উঠবে না, কিন্তু যা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি তা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এক ভালোবাসা ও ভালোলাগার মানিক রতন হয়ে হৃদয়ে বিরাজ করবে। হোটেলে ফিরে পরের দিনের জন্য যে গাড়ি বুক করা আছে তা আবার গাড়িওলাকে মনে করিয়ে দিলাম, আর সেই সঙ্গে একটু তাড়াতাড়ি পাঠাবারও অনুরোধ করলাম। রাত্রি সাড়ে এগারটা নাগাদ খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাইরে লবিতে এসে বসি। সারাদিনের গল্প আর আগামীকালের প্ল্যান সবই একবার আলোচনা হল। কালকে সন্ধেয় ফিরে উদয়পুরে লেকের ধারে যাওয়া হবে এটাও ধার্য হল। সুদীপ ও তার গিন্নি আবার বাইরে গেল একটু হেঁটে আসার জন্য - আমরা দুজনে রুমের দিকে পা বাড়াই।

সাড়ে আটটায় গাড়ি আসবে। আজকের গন্তব্য চিতোর। সকালে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট হলে গিয়ে যে যার পছন্দমত খাবার খেয়ে নিলাম। আজকে আমাদের গাড়ি সুইফট ডিজায়ার - আর গাড়ির চালকও বেশ ভদ্রগোছের। হাসি মুখে গুডমর্নিং জানিয়েই আমাদের মনটা জিতে নিল। পৌনে নটা নাগাদ চিতোরের পথে বেরিয়ে পড়লাম। চিতোর যাওয়ার প্রায় সমস্ত রাস্তাটাই হাইওয়ে। উদয়পুর থেকে ১২৪ কিলোমিটার দূরে। রাজস্থানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, আরাবল্লী পাহাড়ের মাথায় (উচ্চতা ৩৯৪ মিটার/ ১৩০০ফিট) গম্ভীরি নদীর তটে স্থাপিত চিতোর নগরী। চিতোর জেলার ভূমিগত আয়তন সমগ্র রাজস্থানের প্রায় চার শতাংশ। চিতোরের আদি নাম ছিল চিত্রকূট - চিত্রাঙ্গদ মোরী বলে এক রাজপুত সেনানায়কের নামে - যা প্রাচীন মেবারী মুদ্রার ওপর বর্ণিত আছে। কথিত যে চিতোরের আদি দুর্গ এই চিত্রাঙ্গদ মোরীরই হাতে তৈরি হয়েছিল। মোরী বংশের এই দুর্গ পরে রাওয়াল বাপ্পা (অরিজিনালি গেহলোট বংশজ - কিন্তু রাওয়াল গোষ্ঠীর), যিনি মেবার রাজ্যের স্থাপনা করেন, মোরীদের কাছ থেকে জিতে নেন আর এখানেই ৭৩৪ খৃষ্টাব্দে মেবারের প্রথম রাজধানী নির্মাণ করেন। আবার জনমুখে এই প্রবাদও চালু আছে যে বাপ্পা রাওয়াল নাকি বিবাহের যৌতুক হিসেবে এই দুর্গ পান শোলাঙ্কিদের কাছ থেকে - কারণ শোলাঙ্কি রাজকুমারীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। তারপর থেকে বাপ্পার বংশজরা মেবার শাসন করেছে ১৬০০ শতাব্দী পর্যন্ত। সামান্য সময়ের জন্য অধিকার হারালেও বাপ্পা রাওয়ালের বংশজরা মেবারের রাজধানী হিসেবে চিতোরে আটশো চৌত্রিশ বছর টানা রাজত্ব করেছেন।
যদিও কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, কিন্তু কথিত যে চিতোর স্থানটি মহাভারতের সময়ও বিরাজ করত। মধ্যমপান্ডব মহাবলশালী ভীম এই স্থানে এক সাধু-মহাত্মার কাছে এসেছিলেন অমরত্ব লাভের মন্ত্র শিখতে। সেই সাধুর সঙ্গে তার দিনাতিপাত ও শিক্ষা ভালোই চলছিল, কিন্তু যতগুলি নিয়মের পালন করার ছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি আর ধৈর্য্য রাখতে পারেননি - রাগে ও হতাশায় খুব জোরে মাটিতে লাথি মারেন - যার থেকে ভীমতাল/ মতান্তরে ভীমলাত বলে একটি জলাশয়ের উৎপত্তি হয়। ভীম নিরাশ হয়ে ফিরে যান, কিন্তু এই পাহাড়ি রুক্ষ এলাকায় ওই জলাশয়ের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে মানুষের বসবাস শুরু হয়ে যায়। গম্ভিরী নদীতটে আদি প্রস্তরযুগের (early stone age) কিছু কিছু অবশেষ পাওয়া গেছে। বৌদ্ধকালে (আজ থেকে ২৬০০ বছর পূর্বে) এই জায়গাটি ভারতের ষোলোটি মহাজনপদের মধ্যে অবস্তি মহাজনপদে সম্মিলিত ছিল বলে মনে করা হয়। একসময় চিতোর সম্রাট অশোকের অধীনেও ছিল যখন তিনি উজ্জৈনের শাসক ছিলেন। তখন চিতোর উজ্জৈন (উজ্জয়িনী) থেকে শাসিত হত। পরে এই পুরো এলাকা শকদের হাতে চলে যায়। তারা পশ্চিম থেকে এসে ভারত আক্রমণ করেছিল। তখন এই জনপদের নাম বদলে হয় শিবি জনপদ। শকেরা তিনশ বছর শাসন করে। তারপরে গেহলট / গুহিলেরা মেবার ক্ষেত্রে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে, আর শেষ পর্যন্ত শকেদের হটিয়ে রাওয়াল বাপ্পাদিত্য (গহিল/ গুহিল/ গেহলট বংশীয়) মেবারে তার রাজত্ব স্থাপনা করেন, চিতোরকে রাজধানী বানিয়ে। এই বংশই পরে শিশোদিয়া গোষ্ঠীতে ভেঙে যায়, যার শেষ মহারাণা ছিলেন মহারাণা ভগবত সিংহ (১৯৫৫ -১৯৮৪)। এই বংশেই রাণা কুম্ভ, রাণা প্রতাপ, রাণা উদয়সিংহ এমন সব মহান যোদ্ধারা জন্ম গ্রহণ করেছিলেন সে তো আগেই বলেছি।
ইতিমধ্যে আমাদের সুইফট ডিজায়ার তার গন্তব্যস্থলে এসে পৌঁছেছে। সুদীপ, আমাদের টীম ম্যানেজার, দুর্গে ঢোকার টিকিট কেটে নিয়ে এল। গাড়ির জন্যও আলাদা টিকিট কাটতে হল। চিতোরগড় ২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে পাহাড়ের মাথায় সেই কোন অনাদিকাল থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাস বলে চিতোর দুর্গের ওপরে তিনবার ভয়ানক আক্রমণ হয়েছিল - তার ফলস্বরূপ তিন তিনবার এখানে জহরব্রতের উদযাপন হয়। হাজার হাজার রাজপুত নারী তাঁদের জীবন বিসর্জন দেন জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে। সেই কথা বলার আগে, আমাদের চিতোর প্রবেশ নিয়ে কিছু বলি। রাণা কুম্ভের হাতে এই দুর্গের সংস্কার ঘটে এবং শত্রু -আক্রমণের থেকে নিজেদের রক্ষার্থে তিনি এই দুর্গের ভিতর সাতটি দরজা নির্মাণ করেন। সমতল থেকে ধীরে ধীরে গাড়ি নিয়ে উঠতে উঠতে আমরা পেরিয়ে আসি সেই সাতটি দরজা - পাডন পোল, ভৈঁরো পোল, হনুমান পোল, গণেশ পোল, জোড়লা পোল, লক্ষ্মণ পোল আর রাম পোল। দুর্গের ভেতরে কোনও মহলই তার সম্পূর্ণ আকারে আর নেই - কেবল ভগ্নাবশেষ মাত্র - কিন্তু সেগুলির গঠন, আয়তন আর বিস্তার দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে মহলগুলি কত বড় ছিল! মহলের ভগ্নাবশেষের মধ্যে ঘুরে বেড়াবার সময় বার বার মনে হচ্ছিল, এই সেই দুর্গ যার পথ আর সিঁড়ি ধরে রাণা কুম্ভ বা রাণা প্রতাপ হেঁটে গেছেন এক দিন। সমস্ত মহলের ছাদ ভেঙে ফেলা হয়েছে - এই সব কাজ আলাউদ্দিন খিলজী, আহমেদ শাহ আর কিছুটা আকবরের করা। তিনবার আক্রমণের ফলে তিন লক্ষাধিক মানুষের রক্ত এই দুর্গের মাটিতে মিশেছে। এ এক অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাস।

সারাক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পরে আমার মনে হল চিতোর প্রধানত তিনজনের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে - একজন অবশ্যই রানি পদ্মিনী, অন্য জন মীরাবাঈ আর শেষজন হলেন ধাত্রী পান্না। মহারাণা সমর সিংহের (তৃতীয় রাণা) পরে তার ছেলে মহারাণা রতন সিং (১৩০২) মেওয়াড়ের সিংহাসনে বসেন। রতন সিংহ মাত্র এক বছর রাজত্ব করেছিলেন (১৩০২ -১৩০৩)। রাণা হয়ে বসার মাস খানেকের মধ্যে চিতোরের ওপর প্রথম আক্রমণ আসে – দিল্লিতে তখন সুলতান বংশ - সুলতান আলাউদ্দীন খিলজী ১৩০২ খ্রিস্টাব্দে চিতোর আক্রমণ করেন। আক্রমণের হেতু অনেকেই বলেন রানি পদ্মিনীর রূপখ্যাতি। দিল্লীর সৈন্যদল ছয় মাস চিতোর দুর্গ ঘিরে থাকে। দুর্গের ভেতর খাদ্য ও পানীয় জলের চূড়ান্ত ঘাটতি দেখা যায়। দুর্গকে আর বাঁচানো যাবে না দেখে, রাজপুত নারীরা প্রাণ বিসর্জন দেন তাদের রীতি অনুযায়ী জহর ব্রত করে। শেষ যুদ্ধে রতন সিংহও নিহত হন। কথিত আছে রানি পদ্মিনীর সঙ্গে ১৬০০০ রাজপুত নারী মুখে তুলসী পত্র নিয়ে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করেন। যুদ্ধশেষের পর খিলজী একজন নারীকেও কেল্লার ভেতর না পেয়ে ক্রোধে সমস্ত মন্দির, প্রাসাদ ধুলিসাৎ করে দেন। গাইড আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই এক টুকরো চৌকোনা জমি বার বার দেখাতে থাকেন, যার নীচে এক বিশাল গহবর আছে, যাতে নাকি ষাট লক্ষ মণ কাঠ আর ঘি জ্বালানো হয়েছিল, আর প্রাসাদের সমস্ত রাজপুত নারী তাদের মহারানি পদ্মিনীর সঙ্গে সেই অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে জহরব্রত পূর্ণ করেছিলেন।
পরের আক্রমণ হয় ১৫৩৪ সনে যখন রাণা প্রতাপের বাবা উদয় সিংহ (২য়) মেবারের রাণা ছিলেন। এই আক্রমণ করেছিলেন গুজরাতের বাহাদুর শাহ। উদয় সিংহ পরে রাজধানী উদয়পুরে সরিয়ে নিয়ে যান। সেবারেও জহরব্রতে অনেক রাজপুত মহিলা প্রাণ দেন। চিতোরের ওপর শেষ আক্রমণ করেন সম্রাট আকবর ১৫৬৭-তে। দুর্গের নীচ থেকে আকবরের কামানের গোলা যখন চিতোরের দেওয়ালে পৌঁছাচ্ছিল না, তখন তিনি দুর্গের লেভেলে কামান লাগানোর জন্যে দুর্গের সামনে মাটির ঢিপি বানাতে আদেশ দেন - সেই ঢিপি আজও বিদ্যমান - যার পোষাকী নাম মোহর মার্গি (মোহর পর্বত)। কারণ কথা হয়েছিল, সারাদিন মাটি ঢালার পরে শ্রমিকদের একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। কিন্তু সেই মাটির পর্বত তৈরি হওয়ার পরেও আকবরের কামান চিতোরের দুর্গের কিছুই করতে পারে নি – কারণ গোলা যখন গিয়ে দেওয়ালের কাছে গিয়ে পড়ত, তার গতিবেগ কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। যাই হোক চার মাস ধরে দুর্গের চারপাশে প্রায় ষাট হাজার মোগল সৈন্যের ঘেরাওয়ের পর ১৫৬৮-র ফেব্রুয়ারি মাসে চিতোরের পতন ঘটে। মোগলসৈন্য যখন দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করে খালি দুর্গের ইট-কাঠ ছাড়া তাদের হাতে আর কিছুই আসে নি। শেষজীবনে আকবর রাজপুতদের এই অসীম সাহস আর নির্লোভ বলিদানে এতই আবিষ্ট হন যে রাজপুত বীরদের স্মরণে তিনি শ্বেতপাথরের মূর্তি বানিয়ে আগ্রায় স্থাপন করেন।

মীরাবাঈ ছিলেন রাজস্থানের পালীপ্রদেশের কন্যা। তাঁর বিবাহ হয়েছিল সংগ্রাম সিংহের জ্যেষ্ঠ পুত্রের সঙ্গে, যিনি অল্পদিনেই মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পরে মীরা তাঁর জীবন সম্পূর্ণভাবে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে সমর্পণ করেন। রাজ ঘরানার বধূ, সাধু-সন্তদের সঙ্গে খোলা রাস্তায় কীর্তন করছেন - এটা রাজপরিবার মেনে নিতে পারেনি। তাঁরা মীরাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে নানাভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। উত্যক্ত হয়ে মীরা একদিন মেবার ছেড়ে মথুরা, বৃন্দাবন পাড়ি দেন - ঘুরতে ঘুরতে দ্বারকা পৌঁছান। ভক্তিযোগের প্রথম রাস্তা ১৬০০ শতাব্দীতে মীরাবাঈ-এর হাত ধরেই আসে। রাজস্থানে সে সময় সতীপ্রথা ছিল, তবুও মীরা কেন সতী হননি সে প্রশ্ন কেউ কখনও তোলে নি। চিতোরে মীরাবাঈ-এর মন্দিরে আমরা গেছিলাম, কিন্তু সচরাচর ক্যালেন্ডারে মীরাবাঈ-এর যেমন ছবি দেখি তেমনই একটা ছবি বা পেইন্টিং মন্দিরের সিংহাসনের নিচে বসানো আছে। সিংহাসনে আসীন বাঁশী হাতে মীরার আরাধ্য দেবতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। খঞ্জনী বাজিয়ে এক বৃদ্ধা - আজকের মীরাবাঈ, আসল মীরাবাঈ-এর লেখা কোনও গান হয়তো গাইছিলেন - অনেক চেষ্টা করেও তার একটা শব্দও বোধস্থ করতে পারি নি। বোধহয় আমার মত পাপী লোকের কানে কৃষ্ণনাম প্রবেশ পায়নি।

আমাদের স্কুলের ইংরেজির পাঠ্যবই-এ একটা লেখা ছিল - খুব সম্ভবত ক্লাস সিক্সে, 'ইন্ডিয়া রিডার'-এ - ধাত্রী পান্নার গল্প। মেবার রাণাদের বংশরক্ষার কৃতিত্ব পুরোপুরি পান্নাবাইকে দেওয়া যায়। শিশু উদয় সিং-এর লালন পালনের ভার তার ওপরেই ছিল। পান্নার নিজের ছেলে চন্দন আর উদয় ছিল সমবয়সী। সংগ্রাম সিংহের ভাই পৃথ্বীরাজের দাসীপুত্র ছিল বনবীর। সে নিজেকে মেবারের ভবিষ্যত রাজা হিসেবে ভাবত। সে ঘুমন্ত অবস্থায় মহারাণা বিক্রমাদিত্যকে হত্যা করে। তারপরে মেবার বংশের শেষ কুলদীপ উদয় সিংকেও হত্যা করতে যায়। তখন পান্নাবাই উদয়কে তার পালঙ্ক থেকে সরিয়ে নিজের ছেলেকে সেই পালঙ্কে রেখে দেয়। তার চোখের সামনেই নিজের ছেলেকে খুন হতে দেখেও পান্নাধাই এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি। এত বড় আত্মত্যাগ, ইতিহাসে, প্রভুপুত্রের জন্যে কেউ করেছে বলে আমার জানা নেই। ধন্য তুমি ধাত্রীপান্না।
চিতোরে আরও দুটি অভাবনীয় জিনিস আছে যা অবশ্যই দেখার। তার একটি বিজয়স্তম্ভ আর অন্যটি কীর্তি স্তম্ভ। বিজয়স্তম্ভের নির্মাতা রাণা কুম্ভ। ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি মালয়াড়ের সুলতান মহমুদ শা-কে যুদ্ধে পরাস্ত করেন, সেই বিজয়ের স্মৃতিস্তম্ভ হল বিজয়স্তম্ভ। ১২২ ফুট উঁচু এই স্তম্ভে গায়ের নিঁখুত ভাবে খোদাই করা রয়েছে হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি । প্রত্যেক দেবদেবীর নীচে তাঁর নামও লেখা আছে। স্তম্ভের ভেতরে ১৫৭টি সিঁড়ি আছে ওপরে যাওয়ার জন্য, কিন্তু সেই পথ এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কীর্তিস্তম্ভও চতুর্দশ শতাব্দীতেই বানানো – তবে এটা রাণারা বানান নি। এটির নির্মাতা দিগম্বর সম্প্রদায়ের জৈনরা। লম্বায় ৭৫ ফুট। ভেতরে ৫৪টি সিঁড়ি আছে - কিন্তু এখানেও ভেতরে যাওয়া বন্ধ। এই স্তম্ভের চারদিকে ভগবান আদিনাথের জোড়ামূর্তি আছে।
ঘোরার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝেই বাদাম, পেয়ারা, লেবুর জল বা কমলার রস খাওয়া চলছিল। চিতোর দেখা শেষ হল সূরয পোলে এসে। এই দরজাটির পর কেল্লার পাহাড় সটান সমতল ভূমিতে নেমে গেছে - ধাপে ধাপে নয়, একদম হঠাৎ। পুবদিকে হওয়ার জন্য ভোরের প্রথমসূর্যের আলো এই দরজা দিয়ে কেল্লার অভ্যন্তরে প্রবেশ করত - তাই নাম সূরজ পোল। নিচের ওই সমতল ভূমিতে আকবর তার সেনাদের নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে চিতোর জয়ের প্রতীক্ষায় ছিলেন। পাহাড়ের মূল অধিবাসী ভিলেরা আজও আছে। তারা এখন মহার্ঘ জড়িবুটি আর আয়ুর্বেদিক বৃক্ষ-গুল্ম-লতার চাষ করে রাণাদের দেওয়া জমিতে সরকারি সহায়তায়। সেইসব অতি দুষ্প্রাপ্য আয়ুর্বেদিক জড়ি-বুটি দিয়ে এখানে হস্ত শিল্পীরা নানানকিছু বানাচ্ছেন - যেমন চাদর বা হালকা লেপ, যা পেতে বা গায়ে দিয়ে শুলে নাকি গায়ের ব্যথা বা নাক ডাকা সেরে যাবে!
ফেরার পথে চিতোর মনের মধ্যে একটা হাহাকার আর বেদনা ছড়িয়ে দিল - যা এখানে এক সময় আপন বৈভব আর শক্তির সামঞ্জস্যে অপরূপভাবে ছড়িয়ে ছিল, আজ তার ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রেতভূমিতে শুধুই পদচারণা করে এলাম। চিতোরের পুরোনো রূপ আর কোনদিনও আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু যেটুকু রয়েছে তাকে বাঁচিয়ে রাখার সৎ চেষ্টাও কি আছে? শহুরে দোকানপাট আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা-শখের নিবারণ করছে ঠিকই, কিন্তু জাতীয় স্মারকের চারপাশে না ছড়িয়ে এই সব দোকানপাট কোনও একটা নির্ধারিতস্থানে একত্রে রাখতে পারলে বোধহয় ভাল দেখাত। তবে এটা আমার নিজস্ব ভাবনা।

সন্ধ্যা যখন কিছুটা রাতের পথে এগিয়েছে সে সময় আমরা চিতোর থেকে উদয়পুর ফিরে আসি। এবারের মতো ঘোরাফেরা সাঙ্গ হল। যদিও বেড়ানোর শেষ চরণ এখনও বাকি আছে। রুমে ফিরে চা খাওয়া হল। মিনিট পনেরো-বিশের মধ্যেই সুদীপের ডাক, 'চল এবার এখানকার লেকে যাওয়া যাক - একটু বসে চলে আসব।' উদয়পুর শহরের মধ্যে দুটি বড় লেক আছে - একটির নাম পিছোলা লেক (Pichola Lake) আরেকটির নাম ফতেহ সাগর। রাস্তায় বেরিয়ে লেক জিজ্ঞাসা করলে, স্থানীয় লোকজন পিছোলা লেকের রাস্তা দেখিয়ে দেবে। পিছোলা লেকের মধ্যেই লেক প্যালেস স্থাপিত, যা এখন একটি হেরিটেজ হোটেলের রূপ পেয়েছে। বেশির ভাগ ফরেন ট্যুরিস্টই ওখানে থাকেন। রাতের অন্ধকারে লেকের জলের মধ্যে হাজার আলোর রোশনাই নিয়ে জেগে থাকা লেক প্যালেস দেখলাম - নয়ানাভিরাম সে দৃশ্য। কিন্তু সুদীপ আসলে খুঁজছিল ফতেহ সাগর লেক - জিজ্ঞাসাবাদের সময় পিছোলা বলায় আমাদের কিছুটা গলিপথ ঘোরাঘুরি করতে হয়। তাতে অবশ্য একটা লাভ হয়েছিল, রাতের উদয়পুর আর তার রাস্তাঘাটে দোকানপাট-মানুষজন কেমনভাবে থাকে তার একটা আভাস পাওয়া গিয়েছিল। স্থানীয়েরা এবং রাস্তায় কর্তব্যরত পুলিশ যতটা পারেন সাহায্য করারই চেষ্টা করেছেন। অবশেষে পৌঁছালাম ফতেহ সাগর লেক। লেক পিছোলার উত্তরে হল এই লেক মহারাণা ফতেহ সিংহ উদয়পুরের উদ্যোগে বানানো। সব মিলিয়ে অবশ্য উদয়পুরে চারটি লেক আছে, দুটির কথা বললাম, বাকী দুটি হল উদয় সাগর লেক (উদয়পুর সিটি থেকে ১৩ কিমি পূর্বে) আর ডেহবার লেক বা জয়সমন্ড লেক (উদয়পুর থেকে ৫২ কিমি দক্ষিণ পুর্বে)। ফতেহ সাগর আর লেক পিছোলা আবার নিজেদের মধ্যে সংযুক্ত। ফতেহসাগর লেকের মাঝে দুটি ছোট্ট দ্বীপ আছে, যাতে রয়েছে নেহরু গার্ডেন ও উদয়পুর অবজারভেটরি। রাতে নৌকা চলাচল বন্ধ ছিল, তাই যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ফতেহ সাগরেও মধ্যেও বর্তমানে একটি লেক হোটেল তৈরি হয়েছে - নানানরকম আলো আর রঙিন ফোয়ারা দিয়ে সুসজ্জিত সেটি। কিছুক্ষণ ওখানে বসে, নিজেদের ছবি তুলে ডিনারের আগে ফিরে আসি ডেরায়।

শোওয়ার আগে ট্যাবের ওপর আঙুল চালিয়ে তিনদিনের ছবিগুলি দেখছিলাম - ঘোরাঘুরি মন্দ হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা আমরা খুব উপভোগ করেছি এই আউটিংটা। মানুষ আসলে মুক্তই থাকতে পছন্দ করে - সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে নিজের পায়ে নিজেই ক্রমশ শক্ত করে শিকল বেঁধে চলেছে। কিন্তু তাকে যদি ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে মনের গভীরে সে সব সময়ই শিকল ভাঙতেই চেয়েছে। আসুন শেকলভাঙার দল ভারী করি। চরৈবেতি।


~ রাজস্থানের তথ্য ~ রাজস্থানের আরও ছবি ~

জিওলজি পড়ার সময় আর চাকরির খাতিরে ভারতের বিভিন্ন দেশ, শহর, গ্রাম ঘুরেছেন হিমাদ্রি শেখর দত্ত। মিশেছেন স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে। বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি স্বচ্ছন্দ অসমীয়া ও গুজরাটি ভাষাতেও। নানা বিষয়ে লেখালখি করাটাই সখ। পাঠক পড়লে অবসরের পর লেখালেখি নিয়েই দিনযাপনের ইচ্ছে। প্রকাশিত পুস্তক – 'স্ব' এবং 'এক ছক্কা তিন পুট'। এখন সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন আমাদের ছুটি পত্রিকার সঙ্গেও।

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

Cannot connect to the Host