:: Amader Chhuti :: পলকাটা হিরে – ওরছা

পলকাটা হিরে – ওরছা

অভিজিৎ চ্যাটার্জী


~ ওরছার তথ্য ~ ওরছার আরও ছবি ~

ঢেউখেলানো মাঠ এখন পাহাড়ি, বিন্ধ্য পর্বতের রাজ্য। মধ্যপ্রদেশের মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মজা হল মানুষের ভিড় নেই, শহরে লোক বেশি, কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে নেই বললেই চলে! ফলে নিশ্চিন্তে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি মন দেওয়া যায়।
৪৪নং জাতীয় সড়ক থেকে ডানদিকে যেতে শহরের গোলমাল উবে গেল, যেন অন্য জগতে ঢুকলাম। কিছুক্ষণ আগাছাভরা খোলা মাঠের পর, পাথরের ফটক দেখা দিতে লাগল, ওরছার রোমান্স-এর আভাস পেলাম। গেটগুলো ভারী নয়, ভেঙে পড়েছে বটে, কিন্তু গোলাপি পাথরের এই ভাঙা গেট দেখলেই মন হালকা হয়ে যায়, ওরছার লোকেরা বলে 'শাহী দরওয়াজা' (Royal Gate)।
একটু দাঁড়ালাম! নিঃশ্বাস নেব বলে আর কী! মনে হল দূর থেকে ধ্রুপদী সংগীতের আওয়াজ ভেসে আসছে, গলাটা চেনা, গহরজান। গহরজানের কন্ঠস্বর!
গহরজান তখন বিখ্যাত গায়িকা, মহারাজ ভবানী সিংহ বাহাদুর একবার গহরজানকে 'দাতিয়া–ওরছা'-তে অনুষ্ঠান করার আমন্ত্রণ জানালেন, দৈনিক দু'হাজার টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। সময়টা ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, সঙ্গীতদুনিয়ায় শীর্ষে থাকা গওহর, সামান্য এক দেশীয় রাজার রাজ্যে অনুষ্ঠান করবেন! প্রত্যাখ্যান করলেন। রাজাও ছাড়বেন না, যুবরাজের রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠানটাই তো মাটি হয়ে যাবে তাহলে। অবশেষে মহারাজ ভবানী সিংহ বাহাদুর সমর্থ হলেন গওহরকে রাজি করাতে। গওহর এলেন দাতিয়া–ওরছা-তে, সঙ্গে একশো এগার জনের দল, দশ জন ধোপা, চারজন নাপিত, কুড়িজন খিদমদগার বা আরদালি, পাঁচজন দাসী, পাঁচটা ঘোড়া, পাঁচজন সহিস, আর বাকিরা হল গওহরের বাজনদার, রূপচর্চার সঙ্গী এমন অনেকে। হবে নাই বা কেন, গওহর তো বেড়ালের বিয়ে দেন দৈনিক বারো হাজার টাকা খরচা করে! এদিকে চার দিন, পাঁচ দিন, এক সপ্তাহ হতে চলল - মহারাজা কিন্তু গওহরকে ডাকেন না গান গাইবার জন্য! কিন্তু প্রতিদিন দু হাজার টাকা পারিশ্রমিক ও উপহার পাঠাতে ভুলছেন না। গহরজান একদিন লুকিয়ে রাজার সঙ্গে দেখা করে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। ওইরকমের দাম্ভিকতা তাঁর মতো শিল্পীকে মানায় না। শোনা যায় গহরজান এরপর তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান করেন এই "দাতিয়া-ওরছা" তে।
অভিমিতা, মানে আমার মেয়ে বলে উঠল, 'বাবা দাঁড়িয়ে পড়লে যে, কী ভাবছো? চল এগোই।'
একটু এগিয়ে বাঁ দিকে চোখে পড়ল আথাপুলা (Athapula) ব্রিজ। ড্রাইভার বলল, এই রাস্তা চলে গিয়েছে রাজমহল ও জাহাঙ্গীর মহল-এর দিকে।
এবারে আমার স্ত্রী সুমিতার একের পর এক প্রশ্ন – 'এখানে তো কোনো গাইড দেখছি না! কোথায় কোথায় ঘুরব? কী কী দেখব? তুমি কিছু জানো নাকি?'
আমার হয়ে অভিমিতাই উত্তর দিল, 'বাবাকে তো মনে হচ্ছে ইতিহাসের জগতে ঢুকে পড়েছে।'
বলতে শুরু করলাম - ওরছা-র দেখার জায়গাকে চার ভাগে ভাগ করা যায় -
১) প্রাসাদ অংশ - জাহাঙ্গীর মহল, রাজমহল, শিসমহল আর রাই পরভীন মহল। ২) রামরাজা প্রাসাদ অংশ - রামরাজা মন্দির, চতুর্ভূজ মন্দির, দিনমান হরদয়াল প্যালেস, শাওন ভাদো। ৩) লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির ও সুন্দর মহল। ৪) বেতোয়া নদীর ধারে ছত্রী - এখান থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য অসাধারণ। 'ওরছা' কথাটার মানে হল হল 'লুকোনো', পুরো শহরটাই লুকিয়ে আছে বেতোয়া নদীর কোলে, চারদিকে জীর্ণ পাহাড় আর মাথাতোলা জঙ্গল ঘিরে আছে ওরছাকে।
১৫৩১-১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমস্ত বুন্দেলখণ্ডের রাজধানী ছিল ওরছা। রাজা রুদ্রপ্রতাপ সিংহের হাত ধরে ১৫০১ সালে এই শহর গড়ে ওঠে। প্রায় সাড়ে চারশো বছর তাঁর বংশধরেরা ওরছা শাসন করেন। ১৯৫০ সালে মহারাজা দ্বিতীয় বীর সিং দেও-র সময় ওরছা ব্রিটিশ ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মাটিতে, প্রতিটি পাথরে, প্রতিটি ইটে ইতিহাসের গন্ধ লেগে আছে। ভাবলেই শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে।
দূর থেকে কেল্লার চওড়া দেওয়াল দেখা দিল, পরিখার ওপর ছোট্ট ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি পাহাড়ে উঠছে, দুপাশে পাথরের পাঁচিল, আরও কয়েকটা বাঁক পেরিয়ে, বড় চাতালে এসে গাড়ি থামল।
বাঁদিকে রাজমহল, ডানদিকে জাহাঙ্গীর মহল, মাঝখানে শিসমহল - এখন মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের হেরিটেজ হোটেল হয়েছে।
মেয়েকে বললাম, দেখ, পেছনের ঢাল, জঙ্গলে মিশেছে, ওদিকে হয়তো কোথাও বয়ে যাচ্ছে বেতোয়া নদী! দেখা হবে নিশ্চয়! খুব ইচ্ছে ছিল এই পরিবেশে থাকার, তোর মা তো আর হেরিটেজ হোটেলে থাকবে না! সঙ্গে সঙ্গে সুমিতা বলে উঠল, 'তুমি থাকলে না কেন? আমি থাকব না বলেছিলাম এই তো!' অভিমিতা মধ্যস্থতা করে আমাকে খানিক সান্ত্বনার সুরেই বলল, 'শিসমহলের কাচের দেয়াল, সরু স্তম্ভ আর 'হেরিটেজ লুক', ব্যাপারটা খারাপ হত না?'
অতঃপর হাঁটতে হাঁটতে আবার ইতিহাসের কাহিনিতে ফিরি - ১৬শ শতাব্দীর থেকে ওরছার ইতিহাস এক রোমাঞ্চকর বাঁক নেয়। সে সময় আগ্রা মুঘলশক্তির কেন্দ্র, সেখানকার ঘটনার সঙ্গে জুড়ে যায় ওরছা। দাক্ষিণাত্যে সম্রাট আকবর বিশেষ সুবিধা করতে পারছেন না! খান্দেসের সুলতান আকবরকে সাহায্য করতে রাজি নন! ফিরে গিয়েছেন বুরহানপুর দুর্গে। কয়েকমাস পরে আবার আকবর দাক্ষিণাত্য অভিযানে বেরোলেন। এদিকে ছেলে সেলিম আনারকলির প্রেমে পড়েছেন, জাঁহাপনা মোটেই খুশি নন! উপদেষ্টা আবুল ফজল আকবরকে পরামর্শ দিলেন উত্তরাধিকার থেকে সেলিমকে বাদ দেওয়ার! ১৬০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সেলিম বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। আগ্রা দখলের চেষ্টা করে, ব্যর্থ হয়ে এলাহাবাদে এলেন। আবুল ফজলের পরামর্শের কথা সেলিমের কানে গিয়েছিল। ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে আবুল ফজলের সঙ্গে সৈন্যবাহিনী পাঠালেন আকবর, উদ্দেশ্য পুত্র সেলিমের বিদ্রোহ দমন। বদৌনি হয়ে বাহিনীর যাওয়ার কথা। এই সময় ওরছার রাজা মধুকর শাহের পুত্র বীর সিং জুদেও বদৌনি-র সামরিক প্রধান, সেলিম তাঁকে আবুল ফজলের বাহিনীকে আক্রমণ করার অনুরোধ জানালেন,বীর সিং জুদেও শুধু আক্রমণ করলেন তা নয়, আবুল ফজলের 'মাথা' কেটে সেলিমের কাছে পাঠিয়ে দিলেন! সেই থেকে দুজনের বন্ধুত্ব হয়। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে আকবরের মৃত্যুর পর, সেলিম হলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর! আর ওরই কিছুকাল আগে ১৫৯২ সালে ওরছার রাজা হন বীর সিং জুদেও। তৈরি করতে শুরু করলেন জাহাঙ্গীর মহল, স্বপ্ন ছিল বন্ধু জাহাঙ্গীর একদিন দিল্লির সম্রাট হবেন ও এখানে এসে থাকবেন। জাহাঙ্গীর সম্রাট হলেন, কথা রেখেছিলেন বন্ধুর অনুরোধের, এসেছিলেন ওরছার জাহাঙ্গীর মহলে, ছিলেন এক রাত!

ভাবতে রোমাঞ্চ হচ্ছিল, আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে একদিন এসেছিলেন ভারতের সম্রাট জাহাঙ্গীর!! মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী থ্রিল হচ্ছে না!
অভিমিতা প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা বাবা, গহরজান যখন এসেছিলেন, তখন কি উনি এখানেই ছিলেন?' এই সম্বন্ধে ইতিহাসে কিছু পাইনি, শুনেছি, ওরছার কোনও বিলাসবহুল প্রাসাদে রাখা হয়েছিল।
কয়েকতলা নিয়ে জাহাঙ্গীরের প্রাসাদ, অসংখ্য ঘর আর সিঁড়ি, ওই খাড়া সিঁড়ি ওঠা সহজ না হলেও, ওঠানামার কিন্তু একটা মজা আছে। কিন্তু এবার কন্যার মায়ের গলায় আতঙ্ক, 'অত সিঁড়ি কী করে ভাঙব, হাঁটুর ব্যথাটা বড্ড ভোগাচ্ছে যে!'
সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, এই প্রাসাদ কিন্তু আধুনিক প্রাসাদের মতো নয়, ঘরের ভেতরে দেখার কিছু না থাকলেও ঘর থেকে ঘরে, ঘুরতে ঘুরতে, প্রাসাদের এক নিজস্ব পরিবেশের সন্ধান পাওয়া যায়। ঘরগুলো বড় না হলেও অনেক জানলা, আলো হাওয়ার অভাব নেই! ভেতরের মহলে গম্বুজ, বারান্দা আর ছত্রীর ছড়াছড়ি। আসলে জাহাঙ্গীর মহল ধীরে সুস্থে দেখার জায়গা, এখানকার বাতাসে অদ্ভুত এক ম্যাজিক আছে। ধরতে সময় লাগে কিন্তু সেই জাদু উপভোগ করার মত।
আবার ইতিহাসে ফিরি। ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ, ওরছার তৎকালীন মহারাজ জুঝড় সিং, অগ্রাহ্য করলেন তৎকালীন মুঘল সম্রাট শাহজাহানের আদেশ, সম্রাট পাঠালেন তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেবকে। জুঝড় সিংকে হারিয়ে ওরছার রাজা করলেন দেবী সিংকে! এই জাহাঙ্গীর মহলেই আওরঙ্গজেব মুঘল পতাকা ওড়ালেন! কয়েকটা বছরের মধ্যেই মুঘলদের সঙ্গে ওরছার সখ্যতা, শত্রুতাতে পরিবর্তন হয়ে গেল! ইতিহাসের পাতা কখন যে কী ভাবে পাল্টায়, কেই বা বলতে পারে! মহারাজ জুঝড় সিং ছিলেন হরদৌল সিং-এর ভাই। সেই লালা হরদৌল, যাঁর রচিত লোকগীতি এখনও সারা বুন্দেলখন্ডে ছড়িয়ে আছে। ওরছার গ্রামে গ্রামে ঘুরলে আজও শোনা যায় তাঁর গান - সে এক অন্য ইতিহাস।
একটা জানলার ধারে গিয়ে একটু বসলাম। বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হই - শান্তি আর সৌন্দর্যের এমন মিলন! বুন্দেলখণ্ডের ওই ঢেউ খেলানো প্রান্তর, আর তার সঙ্গে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বনের সরল সৌন্দর্য - মিলে মিশে একাকার।

জাদুবলে যেন ফিরে গেলাম অতীতে - মনে হয়, ওই তো! ওই তো! বুন্দেলখণ্ডের সৈন্যরা চলেছে ঘোড়া ছুটিয়ে, আর চেঁচিয়ে বলছে, "জয় বুন্দেলও! জয় বুন্দেলও! জয় বুন্দেলও!" জাহাঙ্গীর মহলের চাতালে এসে দাঁড়ালাম - এখানেই তো নর্তকীরা জাহাঙ্গীর-নূরজাহানের মনোরঞ্জন করতেন, চোখ বন্ধ করে ফেললাম, কানে ভেসে এল যেন নর্তকীর পায়ের নুপুরের রিনিরিনি শব্দ!!
শিসমহলের পাশে যে প্রাসাদটা আছে, তার নাম রাজমহল। ওরছা শহর প্রতিষ্ঠা করেন রাজা রুদ্রপ্রতাপ সিং। সময়টা ১৫০১ সাল। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাজমহল তৈরির কাজ শুরু করলেও শেষ করে যেতে পারেননি। ওরছার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা মধুকর শাহ-এর আমলে এই মহলের কাজ শেষ হয়। তবে জাহাঙ্গীর মহল ও রাজমহলের স্থাপত্যরীতিতে বেশ ফারাক আছে। খেয়াল করলে দেখা যায়, রাজমহলে কোনো গম্বুজ নেই। বোঝাই যায় যে এই প্রাসাদ জাহাঙ্গীর মহলের অনেক আগে তৈরি হয়েছিল। রাজমহলের প্রধান আকর্ষণ রাজা আর রানি মহলের ফ্রেস্কো। দেখা যায় নানা রঙে আঁকা বুন্দেলি দেওয়াল চিত্র। রাজা মধুকর ছিলেন কৃষ্ণের ভক্ত, তাঁর ঘরের দেওয়ালে রয়েছে কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন কাহিনির ছবি। অন্যদিকে রানি গণেশ কুমারী রামভক্ত, ফলে তাঁর ঘরে রামায়ণের গল্পে দেওয়াল ভরা।

এগিয়ে চললাম প্রাসাদের দরবার-ই-আম আর দরবার-ই-খাস দেখতে। "দরবার-ই-খাস" হল খাস অর্থাৎ বিশেষ কক্ষ - মন্ত্রী-আমলার সঙ্গে রাজার ব্যাক্তিগত আলাপ-আলোচনার জন্য, আর "দরবার-ই-আম" মানে রাজা যেখানে সাধারণ মানুষ আমজনতার সঙ্গে দেখা করতেন। গাইড বললেন, 'সাহেব, ওই যে দেওয়ান-ই-আম-এর ওপেন স্টেজটা দেখছেন, ওখানে রাজনর্তকীরা নাচতেন। গানের জলসা বসত এখানে। এখন এম পি ট্যুরিজমের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো হয়।' রাজমহলের দেওয়াল ঘেঁষে যে রাস্তাটা পূর্বদিকে এগিয়েছে, চললাম সেদিকে। চোখে পড়ল বাঁদিকে কিছু পুরনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ওগুলো নাকি ছিল মহারাজাদের হামাম। আর বাগান আর ফোয়ারা পেরিয়ে চোখে পড়ল একটা দোতলা প্রাসাদ, ওর নাম রাই পরভীন মহল। ওই প্রাসাদকে ঘিরে রয়েছে এক উজ্জ্বল ইতিহাস আর প্রেমের গল্প! আসলে সমগ্র বুন্দেলখন্ডেই প্রেমের নানা কাহিনি ছড়িয়ে আছে। গোয়ালিয়রের গুর্জরী মহলের রানী মৃগনয়নী আর রাজা মান সিং-এর মধ্যে। আর ওরছাতে রাজা ইন্দ্রজিতের সঙ্গে রাই পরভীন-এর। দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায়, কে যেন ফিসফিস করে বলছে - "ও আমার রানী পরভীন,/ তোমার সৌন্দর্য যেন, ভগবানের সুগন্ধ!/ এ যেন স্বর্গ ও শয়তানের মধ্যে সেতু,/ তোমার মুখের শব্দ, যেন গঙ্গার জল।"
রাই পরভীন মহলের দিকে এগোতে থাকলাম। রাই পরভীন ছিলেন সুদক্ষ নৃত্যশিল্পী, গায়িকা, কবি ও অসম্ভব সুন্দরী। ঘোড়া চালনাতেও খুব দক্ষ ছিলেন। ১৫৬০ সাল, মহারাজ মধুকর শাহ-এর পুত্র যুবরাজ ইন্দ্রজিৎ প্রেমে পড়লেন রাই পরভীন-এর। যুবরাজ গড়ে তুললেন রাই পরভীন মহল। গান-প্রেম, আর নূপুরের রিনিঝিনিতে ভেসে যেতে লাগল এই প্রাসাদ! সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে রাই পরভীন-এর খ্যাতি! প্রেমের আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হল! সম্রাট আকবরের কানে গেল রাই পরভীন-এর সৌন্দর্যের কথা। বাদশাহ তাঁকে দেখতে চাইলেন, ছুটে এল মুঘল দূত রাজা মধুকর শাহ-এর দরবারে। রাই পরভীনকে পাঠাতে হবে মুঘল দরবারে! ইন্দ্রজিৎ কী করে মেনে নেবেন তাঁর প্রিয় রাই পরভীনকে অন্য পুরুষের কাছে পাঠানোর কথা! হোক না তিনি দিল্লির বাদশাহ! অগ্রাহ্য করলেন বাদশাহের অনুরোধ! সম্রাট ক্ষেপে লাল! এত সাহস! এক কোটি টাকা জরিমানা করলেন! অনিচ্ছা সত্বেও ইন্দ্রজিৎ রাই পরভীনকে পাঠালেন আগ্রাতে। রাই পরভীন মহলের দেওয়াল জুড়ে রয়েছে রাই পরভীন আর ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি যুবরাজ ইন্দ্রজিতের পূর্ণ মুরাল, বুন্দেলি শিল্পের এক চরম নিদর্শন, যা সারা ওরছাতে আর কোথাও নেই।
সম্রাট আকবর তো এদিকে রাই পরভীনের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়লেন। দিন কাটে, রাই পরভীন ফিরতে পারছেন না। মন খারাপ হয়। শেষে আকবরকে দু'লাইন লিখে পাঠালেন, যার অর্থ - আপনি সারা দুনিয়ার বাদশাহ, আমার স্পর্ধা মার্জনা করবেন, কাক ,শকুন আর ভিখারি অন্যের খাওয়াতে ভাগ বসায়, সারা দুনিয়ার বাদশার কি সেই আচরণ সাজে! - সম্রাট পত্রপাঠ রাই পরভীনকে ওরছা পাঠিয়ে দিলেন। মহলে আরও কিছুক্ষণ কাটালাম। ঘরগুলো বিভিন্ন তলায়, ঝুলবারান্দায় গাছের ডাল, দেওয়ালের ছবি, সব মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ।
ওরছায় সৌধের বাতাবরণের স্বপ্নিল ভাবের সঙ্গে আশ্চর্য সাযুজ্য আছে আশেপাশের বন্য পরিবেশের। সব মিলে এমন এক মাধুর্য সৃষ্টি হয় যার অনুভব অস্বীকার কঠিন।
রাই পরভীন মহল থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে আরও এগোলে প্রাচীন শিব মন্দির, পরিষ্কার জনশূন্য রাস্তা, শান্ত, দেওয়ালে হলদে আর খয়েরি রং দিয়ে বুন্দেলি ছবি আঁকা। চলেছি শহর থেকে একটু দূরে লক্ষীনারায়ণ মন্দির দেখতে। ওরছা শহর পায়ে হেঁটে ঘুরলে, তবেই তার ঠিক মাদকতা অনুভব করা যায়। পৌঁছলাম লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে। রাজা বীর সিং-এর আমলে এটি তৈরি হয়। দুর্গ ও মন্দিরের মিশ্রণ বলা চলে। বুন্দেলি স্থাপত্যের একটি অনন্য নিদর্শন। চুন, পাথর আর ইট দিয়ে তৈরি এই মন্দিরে, কামান রাখার জায়গা পর্যন্ত আছে! মন্দিরে বরং কোনও মূর্তি নেই। গর্ভগৃহের চারপাশে খোলা বারান্দা, বারান্দার ছাদগুলি ফ্রেস্কো দিয়ে ঢাকা। কালের নিয়মে কোথাও তার রঙ ফিকে হয়ে এসেছে, কিছুটা ইচ্ছে করেও নষ্ট করা হয়েছে, কিন্তু অনেক ছবি এখনও বেশ ভালো আছে। রামায়ন, মহাভারত, কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন কাহিনি, বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার, ১৮৫৭ সালে ঝাঁসির রানীর যুদ্ধ - সবই আঁকা আছে। ঘুরে ঘুরে দেখতে অনেকটা সময় লেগে গেল।

আজ ওরছাতে যে রামরাজা মন্দির দেখা যায় তা ছিল তৎকালীন সময়ে রাজা-রানির বাসস্থান। এর গঠনও ঠিক মন্দিরের মতো নয়। অন্যদিকে বিশাল চতুর্ভূজ মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল রামের মূর্তি রাখার জন্য। রাজা মধুকর শাহ এটি তৈরি করান। এত বড় মন্দির ওরছাতে আর নেই। উঁচু ছাদ, বড় বড় ছত্রী, শিখর আকাশ ছোঁয়া! লম্বা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে ওঠা যায়। পরে রাজা এখানে বিষ্ণুর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যদিও সেই মূর্তিও এখন আর নেই। এই নিয়ে স্থানীয় গল্পকথা রয়েছে।
বেলা ফুরিয়ে আসছে, গোধূলি আসন্ন। চলে এলাম বেতোয়া নদীর ধারে। এই সেই বেতোয়া নদী, কত ইতিহাসের সাক্ষী! কলকল করে বয়ে চলেছে, ছড়িয়ে আছে পাথর, নদীর বুকে। বিন্ধ্যপর্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে বেতোয়া গিয়ে মিশেছে যমুনাতে। ঘাটের নাম 'কাঞ্চন ঘাট।' নদীর পাড়ে চোখে পড়ে মন্দিরের মতো কিছু ছত্রী। সেই দিকেই এগোলাম। আসলে এইগুলো বুন্দেল রাজাদের স্মৃতিসৌধ, সার বেঁধে একই চত্বরে রয়েছে। এক একটি ছত্রী এক একজন রাজার নামে। প্রথমে একটি উঁচু বেদি তারপর তিনতলা সৌধ, ওপরে ছাদের চার কোনায় চারটি শিখর। কোনোটা বীর সিংহ দেও-র, কোনোটা মধুকর শাহ-এর, বাদ বাকি ছত্রীগুলো ভারতী চাঁদ, পাহাড় সিং, সাওয়ান্ত সিং, উদয়াৎ সিং এমন নানা নামের। মধুকরের ছত্রীতেই একমাত্র গণেশ মূর্তি রাখা আছে।
১৫৫৪ সাল, রাজা মধুকর শাহ তখন ওরছার শাসনকর্তা। তাঁর সময়ে ওরছা উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিল। দিল্লির সিংহাসনে তখন আসীন মুঘল সম্রাট আকবর! সম্রাট ইচ্ছে প্রকাশ করলেন, ওরছার জঙ্গলে সিংহ শিকার করবেন। কিন্তু রাজা মধুকর শাহ অনুমতি দিলেন না। এত স্পর্ধা একজন দেশীয় রাজার! সম্রাট আকবর আক্রমণ করলেন ওরছা! ১৫৭৭ সালে প্রবল যুদ্ধে রাজা মধুকর শাহ প্রবল পরাক্রমে প্রতিহত করলেন আকবরকে। ১৫৮৮ সালে সম্রাট আকবর আবার আক্রমণ করলেন ওরছা! এবার কিন্তু সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারলেন না রাজা মধুকর শাহ। হেরে গিয়ে নারোয়ার পাহাড়ে পালিয়ে গেলেন। ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হল রাজা মধুকর শাহ-র। ছত্রীর বাগানে ঘুরতে ঘুরতে নদীর জলের শব্দ কানে আসছিল। গাইডকে বললাম, চলুন একটু বসি নদীর ধারে। সূর্য ডুবছে - আকাশ গোলাপি। পর্যটকের ভিড় নেই তেমন। নদীর ধারে বড় বড় পাথর ছড়িয়ে আছে। আকাশের রঙ জলে পড়েছে, জলে ভেসে আসছে ছত্রীর ছায়া! তিরতির করে বয়ে যাওয়া সেই স্রোতে, সেই রঙ আর ছায়া কাঁপছে!
গাইড গুনগুন করে উঠলেন, লখনৌ-র নবাব ওয়াজিদ আলি সাহেবের সেই বিখ্যাত গানের কলি, 'বাবুল মোরা, নইহার ছুটো হি যায়ে…।'


~ ওরছার তথ্য ~ ওরছার আরও ছবি ~

 

অভিজিৎ চ্যাটার্জী পেশাগত ভাবে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার। আর নেশা ভ্রমণ। নেশার তাগিদে ঘুরে বেড়িয়ে নির্মাণ করেন পর্যটনকেন্দ্রগুলি নিয়ে বিভিন্ন ট্রাভেল ডকুমেন্টারি।

 

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

For any queries/complaints, please contact admin@amaderchhuti.com
Best viewed in FF or IE at a resolution of 1024x768 or higher