ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি - পঞ্চম পর্ব

আগের পর্ব – চতুর্থ পত্র


ভ্রমণকারী বন্ধুর পত্র - লাদাখ পর্ব

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

~ লাদাখের আরও ছবি ~

পঞ্চম পত্র


বন্ধুবর,

ফেরার সময় এগিয়ে আসছে আর ততোই মায়াময় রূপে আমায় মুগ্ধ করছে জড়িয়ে রাখছে লাদাখ। আগামীকাল ফেরা। আজকের দিনটা তাই নিজেদের ইচ্ছেমত কাটানো। পায়ে পায়ে মনখারাপ আর ভালোলাগা, ভালোলাগা আর মনখারাপ।

২০/১০/২০১৫, লে
আজ বিশ্রাম। লেহ শহরে হালকা ঘোরাঘুরি। সকালটা মেঘলা ছিল। ঘরের দেওয়ালজোড়া কাচের জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে চারপাশটা। তারপর একচোট শিলাবৃষ্টি হল। আজকে প্রথম হোটেলের ছাদে উঠেছিলাম। ততক্ষণে শিলাবৃষ্টি থেমে গেছে, অন্যরা নেমেও গেছে ছাদ থেকে। আকাশ একটু পরিষ্কার হলে ছাদ থেকে লাদাখ রেঞ্জের খয়েরি-বাদামি পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে লেহ প্যালেস চমৎকার লাগছিল। ঝলমলে রোদও উঠে গেল তার পরে।

একসময় তিব্বত আর চিনের সঙ্গে ব্যবসার পথ ছিল এই লে শহরের ভেতর দিয়ে। বেনারসের সিল্কও এই পথে পৌঁছাত সেখানে। কুষাণ আমলেই চিনের একটি ট্রেড রুট ছিল বলে বলা হলেও মূলতঃ দশম শতাব্দীর শেষের দিকে চিনের রাজপুত্র নিমা গোঁ পশ্চিম তিব্বত দখল করেন এবং শ্যে-র মূল স্থাপত্যগুলি তৈরি করেন। লেহ-র ১৫ কিমি পূর্বে শ্যে-তেই ছিল প্রাচীন লাদাখি রাজাদের প্রাসাদ। লেহ-র পথে বেরিয়ে এমনই সব পুরোনো ইতিহাস ভাবছিলাম। একসময়কার ট্রেডরুটগুলোই এখন কম-বেশি যাতায়াতের পথ হয়ে গেছে।
ব্রেকফাস্ট সেরে সকালে গেলাম লেহ প্যালেসে। পাহাড়ের গায়ে বালি রঙের ন'তলা প্রাসাদটিকে লেহ শহরের আনাচ কানাচ থেকে চোখে পড়ে। প্যালেসে তলার ওপর তলা, ফাঁকা ফাঁকা বড় বড় ঘর। প্রতি তলাতেই লাগোয়া ছাদ আর সেখান থেকে দেখা পাহাড়ে ঘেরা লেহ শহরের সৌন্দর্য খাড়া খাড়া সিঁড়ি ভাঙার ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। সমস্ত উপত্যকা জুড়ে ছড়ানো রয়েছে ছোট্ট ছোট্ট বাড়িঘর। তাদের মধ্যে ভাল করে ঠাহর করলে দেখা যায় আমাদের গত ক'দিনের ঠিকানা ছোট্ট হোটেলটিকেও। অদূরে লাদাখ রেঞ্জের পাহাড়শ্রেণী। দূরের পাহাড় সাদা আর কাছের পাহাড়ে ছায়া পড়ে কালো অথবা রোদ্দুরে হলুদ। আকাশে নীল-সাদা মেঘ।

এখানে লেহ প্যালেসের ইতিহাস একটু ছোট্ট করে বলে নিই দাঁড়াও। সতের শতকে লাসার পোতালা প্যালেসের আদলে এই প্রাসাদটি তৈরি করা শুরু করেন রাজা সেওয়াং নামগিয়াল। তারই ভাইপো সেনগে নামগিয়াল, লাদাখের অন্যতম এক রাজা প্রাসাদটির নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ করেন। তারপর দীর্ঘ সময় এটিই ছিল লে-র রাজাদের মূল প্রাসাদ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি দোরগা বাহিনির আক্রমণ প্রতিহত করতে না পেরে রাজ পরিবার স্তোক প্যালেসে আশ্রয় নেয়। প্রাসাদের নিচের তলাটা ছিল আস্তাবল আর গুদামঘর। একেবারে ওপরে রাজাদের বাসস্থান। প্রাসাদের মন্দিরটি এখনও চালু আছে। জুতো বাইরে রেখে আধো অন্ধকারে দেখি চেনা-অচেনা বুদ্ধ মূর্তিগুলি।
প্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। সংস্থাটির দায়িত্বে থাকা ভারতের অন্যান্য হেরিটেজ সাইটের ছবিওলা বড় বড় প্ল্যাকার্ড রাখা ফাঁকা ঘরগুলোতে। ছোট্ট প্যালেস মিউজিয়ামটি রাজাদের পোশাক-আশাক, ঢাল-তলোয়ার, পুঁথি-পত্র, থাঙ্কা, অলঙ্কার এসব নিয়ে জমজমাট।
লেহ প্যালেসের পেছনে সেমো পাহাড়ের গায়ে সেমো মনাস্ট্রি। পনেরো শতকের প্রথম দিকে রাজা তাশি নামগিয়াল এই মনাস্ট্রিটি তৈরি করেন। এই গোম্ফার মূল আকর্ষণ তিন তলার সমান উঁচু সোনার মৈত্রেয় বুদ্ধ মূর্তিটি। এছাড়া অবলোকিতেশ্বর আর মঞ্জুশ্রীর মূর্তিদুটিও একতলা সমান উঁচু।
প্যালেস দেখে বেরিয়ে গাড়ি ওঠে পেছনের পাহাড়ে মনাস্ট্রিতে যাওয়ার জন্য। যেখানে দাঁড় করালো সেখান থেকে সরু রাস্তা উঠে গেছে মনাস্ট্রিতে। খানিক দূর উঠে একটা চাতাল মতো জায়গা। এখনও অনেক সিঁড়ি ভাঙতে হবে। ভবিষ্যৎ বুদ্ধের কাছে পৌঁছানোর আশা ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখেই ক্লান্ত আমি সেখানেই একটা উঁচু জায়গা দেখে বসে পড়ি। সামনে অনেক নিচে পাহাড় ঘেরা উপত্যকায় ঝলমল করছে লেহ শহর। তাকে সযত্নে দুহাত বাড়িয়ে বাইরের জগৎ থেকে আড়াল করে রেখেছে শ্বেতশুভ্র স্তোক কাংড়ি পর্বতমালা - এও কি কম পাওয়া? সামনে দিয়ে পিঠে বোঝা নিয়ে অনায়াসে চলে যায় পাহাড়ি নারী। কী আর করি মোবাইলেই ধরে রাখি তাকে।
মনাস্ট্রি বন্ধ। ওপর থেকে নেমে আসে অন্যেরা। কেউ কেউ অর্ধপথ থেকেই। ভাগ্যিস যাইনি। আহ্লাদিত আমি।

পায়ে হেঁটে এলোমেলো ভাবে শহর ঘুরতে বেশ লাগছিল। দোকানপাট, বাজার-হাট, স্থানীয় জনজীবন দেখতে দেখতে। বেশ জমজমাট শহর লেহ – প্রচুর দোকানপাট, পথেঘাটে অনেক লোকজন, গাড়িঘোড়া। অক্টোবরের শেষের দিকে যদিও ট্যুরিস্টের সংখ্যা বেশ কমে এসেছে – যে ক'জন আছে তাদের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যাই বেশি। অনেক হোটেল দোকানপাট এবছরের মত ঝাঁপবন্ধ করে দিয়েছে। লোকজনের কেনাকাটারও প্রধান উদ্দেশ্য হল আসন্ন শীতের দিনগুলোর জন্য রসদসংগ্রহ। আর কিছুদিন পরেই লাদাখ অঞ্চল ভারতের বাকী এলাকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, আকাশপথে ছাড়া। বরফে ঢাকা লেহ-এর প্রায় নির্জন পথ আবার খানিক জনমুখর হয়ে উঠবে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে। তখন আসবে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী ট্রেকাররা – জমে যাওয়া জাঁসকর নদীর বুকে 'চাদর ট্রেক'-এর জন্য। মূল বাজারের কাছাকাছি ছিলাম। পায়ে পায়ে চলে এলাম নতুন বাসস্ট্যান্ড। জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের হ্যান্ডিক্রাফটস সেন্টার থেকে টুকিটাকি উপহার কেনা হল। ফেরার পথে পথের ধারের দোকান থেকে রঙচঙে টুপি-গ্লাভস-মাফলার। বারবার হাত থেকে খুলে নিয়ে লেখার জন্য আমার ডান হাতের গ্লাভসটা মাঝে মাঝে হারাতে হারাতে এবার একেবারেই হারিয়ে গেছে। ওটা হারানোরই ছিল হয়ত। ডায়েরিটাও হারাই হারাই করছিল। তবে সেটা যে শেষপর্যন্ত হারায়নি, তা তো আমার এই দিনলিপি পড়েই বুঝতে পারছ।

বিকেল চারটে নাগাদ হোটেলের কাছেই একটা চমৎকার রেস্টুরেন্টে চিকেন উইংস আর হট চকোলেট খাওয়া হল। সকালে প্রায় এগারোটা নাগাদ আলুপরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্টের পর। রোজ রোজ ব্রেড, বাটার আর ডিমসেদ্ধ/ওমলেট খেতে খেতে আমাদের হাল খারাপ। চুমকি আর টুসি দুই বোন মিলে একদিন হোটেলের রান্নাঘরে গিয়ে হোটেলের সবেধন নীলমণি কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-গার্ড-কাম-ম্যানেজার ধনগিরিকে ডিমের পোচ বানানো শেখাতে চেষ্টা করছিল। বুই বলেছে, কলকাতায় ফিরে আর পাঁউরুটি, ডিম আর আপেল খাবে না!
তবে লেহ-র আপেল কোনদিন ভুলব না। আর ভুলব না ধনগিরি বোম ঠোকরিকে। মানুষটি প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান। জন্ম নেপালে। প্রথমেই ধর্মের কথা বললাম এই কারণে যে ধর্মকে আশ্রয় করেই মানুষটির যাপন। ভীষণ হাসিখুশি, আপন-পর ভেদাভেদহীন ধনগিরি যিশুভক্ত। বলেছিল, যিশুর নির্দেশেই দুহাজার চোদ্দ সালে ভারতে চলে আসে। খ্রিস্টের বাণী প্রচার করতে গিয়ে একাধিক জায়গায় আক্রান্তও হয়েছে। তবু ইচ্ছে ভবিষ্যতে নেপালে অনেক চার্চ প্রতিষ্ঠার। বর্তমানে অবশ্য বিয়ে করার ইচ্ছে, বয়স হয়ে যাচ্ছে কিনা, হাসতে হাসতেই জানিয়ে দেয় সে। এখানে তার একটাই দুঃখ যে হোটেল মালকিনের নিজের ছেলে আছে বলে ধনগিরিকে ছেলে ভাবে না সে। আর তাই তার সঙ্গে মান-অভিমানের পালা লেগেই আছে। রাতে নিজের লেখা পড়ে শোনায় ধনগিরি। একটা লম্বা খাতায় নিজের যা মনে আসে লিখে রাখে, আর সেঁটে রাখে খবরের কাগজে/পত্রিকায় যিশু সংক্রান্ত কোনও খবর বেরোলে তার কাটিং। কাল লেহ থেকে ফেরার পথে রওনা দেব আমরা, আমাদের যাত্রা তথা আগামীদিনগুলো যাতে শুভ হয় তার জন্য খ্রিস্টের কাছে প্রার্থনা করে। ভাবি কতরকম মানুষ। ভালো মানুষ। এখনও আছে। তাই পৃথিবীটা আজও সুন্দর।

২১/১০/২০১৫, লে
সড়কপথে লেহ যাতায়াতের প্রচলিত পথ দুটি - একটা যেপথে আমরা ফিরলাম কার্গিল-জোজি লা-সোনমার্গ হয়ে লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে (মোটামুটি ৪৩০ কিমি) আর অন্যটা হিমাচল প্রদেশের ভেতর দিয়ে সারচু, রোটাং পাস হয়ে লেহ-মানালি হাইওয়ে (প্রায় ৪৮০ কিমি)। যে দিক দিয়েই যাওয়া যাক না কেন, অন্তত দিন দুয়েক সময় লাগে। পথে কার্গিল/সারচুতে রাত্রিবাস করতে হয়। দুটো রাস্তাই অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সময় বাঁচানোর জন্য দিল্লি থেকে আকাশপথে এসেছিলাম লেহ, ফেরার সময় সড়কপথে আশপাশ দেখতে দেখতে যাব ঠিক করা ছিল আগে থেকেই। মানালির পথে সামান্য ঘুরে আসা হয়েছে সো-মোরিরি দেখার সময়। এবারে সকাল সাড়ে আটটায় লেহ থেকে কার্গিলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। কার্গিল হয়ে শ্রীনগরে ফিরব। সেখান থেকে দিল্লি।
ঝকঝকে সকাল আর কনকনে ঠাণ্ডা। যতক্ষণ চোখ গেল স্তোক-কাংড়ি পর্বতমালাকে দেখতে লাগলাম। সকলেরই মন খারাপ। 'আবার আসিব ফিরে ভাব'-ও বটে। তবে শ্রীনগর/মানালি যাতায়াতের জন্য বাসের ব্যবস্থা থাকলেও বাকী লাদাখে জনপরিবহণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় পুরো ঘোরাঘুরিতেই গাড়ি ভাড়া করতে হ্য় বলে এই বেড়ানো বেশ খরচসাপেক্ষ। জীবনে একবার আসাই হয়তো আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য যথেষ্ট। তবে ইচ্ছে যে করে সে তো সত্যি। কতকিছুই তো দেখা হল না এই যাত্রায়। ওই যে লাল-নীল-হলুদ ছাদওলা বাড়িগুলোর কোনোটায় খানিকক্ষণ থাকার ইচ্ছে হয়েছিল, সেও তো হল না।

লেহ এয়ারপোর্ট ছাড়ালে প্রকৃতি মরুসদৃশ। দুপাশে ছড়ানো উপত্যকা, মাঝখান দিয়ে কালো পিচের রাস্তা সোজা চলে গেছে দিগন্তে। পথে পড়ল পাত্থরসাহিব গুরুদোয়ারা, ম্যাগনেটিক হিল। একবার শুধু খানিকক্ষণ দাঁড়ানো হল জাঁসকর-সিন্ধুর সঙ্গমে। রাস্তার থেকে অনেক নিচে সবুজ রঙের জাঁসকর এসে মিশেছে নীল সিন্ধুতে। সিন্ধু তাই আহ্লাদে এঁকেবেঁকে নেচে চলেছে যেন। দূর থেকেই চোখ আর প্রাণভরে দেখি। ইচ্ছে করে কাছে গিয়ে নীল-সবুজ জলের মিলনস্থল ছুঁয়ে আসি একটু। কিন্তু সময় নেই যে। সাড়ে নটায় নিম্মুতে ব্রেকফাস্ট। নিম্মুর পরে বাসগো রুইনস। লোয়ার লাদাখের একসময়ের রাজধানী বাসগোতে নামগিয়াল রাজাদের স্থাপিত কেল্লার ধ্বংসাবশেষ, মনাস্ট্রি দেখা হলনা সময়ের স্বল্পতায়। যদিও মাটি-পাথরের তৈরি এই কেল্লার ভগ্নাবশেষ ও আশপাশের রুক্ষ প্রকৃতি ফোটোগ্রাফারদের অবশ্য গন্তব্য। অনেক হিন্দি সিনেমার শুটিংও হয়েছে এখানে। তারপরেও খানিকটা চলে এসেছি। লেহ ইউনিভার্সিটিও পেরোলাম। বরফ পাহাড় সঙ্গী। পথের ধারের হলুদ গাছের সারি কখন যেন ফুরিয়ে গেছে। দুপাশের দৃশ্য এখনও শীতল মরুর মতই। সৌম্য বলছে, মঙ্গল গ্রহ। চন্দনদা জিজ্ঞাসা করল, কবে গিয়েছিলি?

সকাল সাড়ে দশটা, লিকির মনাস্ট্রি
লেহ -কার্গিল পথে পরপর বেশ কয়েকটা বৌদ্ধ গুম্ফা পড়ে। তারই একটা লিকির মনাস্ট্রি।
মূল রাস্তা থেকে পাঁচ কিলোমিটার সরে এসেছি। সামনে একজোড়া বরফ পাহাড়। লেহ শহর থেকে পশ্চিমে মোটামুটি ৫৫ কিমি দূরে একটা পাহাড়ের মাথায় নির্জনে রয়েছে লিকির গ্রাম আর মনাস্ট্রি। একসময় যদিও এটা ট্রেডরুটে পড়ত। তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের গেলুকপা সেক্টের এই বৌদ্ধ গুম্ফাটির প্রতিষ্ঠা করেন লামা দুয়াং চোসজে, রাজা লাচেন গিয়ালপো-র আমলে।
এবারে লিকিরের ইতিহাসের খাতাখানা খুলি দাঁড়াও। লাদাখি গল্প-কাহিনিতে লিকিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। লিকির মানে জড়ানো সাপ। যা দুই বিখ্যাত নাগরাজ নন্দ ও তাকসাকোর আত্মার শরীরী রূপ।
১৯০৯ সালে এক পর্যটক গবেষক লিকির গুম্ফার দেওয়ালে লেখা ইতিহাসের কাহিনিটি উদ্ধার করেন। সেই কাহিনি অনুযায়ী রাজা লা-চেন-রিগিয়াল-পো এগার শতকে মনাস্ট্রিটি নির্মাণ করেন। পনেরো শতকে বিখ্যাত সংখাপা লামা লাওয়াং-লোদস-সাংফু মনাস্ট্রির লামাদের কদমপা অর্ডার থেকে গেলুকপা অর্ডারে রূপান্তরিত করে মনাস্ট্রিটিকে নতুন করে গেলুকপা মনাস্ট্রি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। লা-চেন-রিগিয়াল-পো-র সাত জেনারেশন পরে ক্ষমতায় আসেন লা-চেন-গস-গ্রাব। তিনি শিক্ষার্থীদের লাসায় পাঠানোর চল শুরু করেন। আঠেরো জেনারেশন পরে রাজা হন দে-লেগস-মাম-রিগিয়াল। কিন্তু এঁর নাম সেই ইনস্ক্রিপশন থেকে জোর করে মুছে দেওয়া হয়েছিল। বাসগোর যুদ্ধে হেরে যাওয়ায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হন এই বৌদ্ধ রাজা। এরও প্রায় একশো বছর পরে দ্বিতীয় থে-ব্যাঙ-মাম-রিগিয়াল মনাস্ট্রিটির সংস্কার করেন। গুম্ফার নিচে একটি বড় চোর্তেন আছে যার ভেতরের ফ্রেসকোতে সংখাপা ও তাঁর সমসাময়িক লামাদের ছবি রয়েছে। চোর্তেনের দরজার মাথায় প্রাচীন এক লামার অদ্ভুত এক ছবি রয়েছে। চোর্তেনের নিচের ভাগের চৌকোনো ঘরটিকে প্রাচীন মন্দির বলা হয়, মনাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই সেটি ছিল। মনাস্ট্রির ওপরে পঁচাত্তর ফিট উঁচু একটি সোনালি বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। দেওয়ালজোড়া ফ্রেস্কো, নানান রঙের থাঙ্কা, আর প্রচুর পুঁথি নজর কাড়ছিল। দুটি প্রার্থনা হল। পুরোনো হলটিতে রয়েছে বোধিসত্ত্ব, অমিতাভ এবং শাক্যমুনি, মৈত্রেয় ও সাংখাপার তিনটি বড় মূর্তি। প্রায় দুশো বছরের প্রাচীন নতুন হলঘরটিতে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল অবলোকিতেশ্বরের মূর্তিটায়। এগারটা মাথা আর এক হাজারটা হাত। মাথা তো গোনা যাচ্ছে। হাত গোণার আর চেষ্টা করিনি। পাশেই পুঁথি রাখা থাকে থাকে। পুঁথি দেখলেই মনে হয় না জানি কী রহস্য লুকিয়ে আছে ওই সব প্রাচীন পুঁথির পাতায়। কত না অজানা কাহিনি। কে জানে!

বেলা ১১-৪০, আলচি মনাস্ট্রি
আলচি যেতে সিন্ধুর ওপরে ব্রিজ পেরোতে হল। এখানে সিন্ধু বেশ চওড়া। আবার বেশ গাছপালা চোখে পড়ছে। মূল রাস্তা থেকে অনেকটা ভেতরদিকে আলচি মনাস্ট্রি। আসলে আলচি গ্রামের মধ্যে। স্থানীয় মানুষজনের বিশ্বাস দশম শতকে এই মনাস্ট্রিটি তৈরি করেন গুরু রিনচেন জাংপো। কিন্তু মনাস্ট্রির দেওয়ালের লিখন অনুযায়ী ১১ শতকে মন্দিরগুলি তৈরি করেন এক তিব্বতীয় জ্ঞানী পুরুষ কাল-দান শেস-রাব। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দশম শতকে তিব্বতের রাজা ইয়েশে ওড অফ গুগে ট্রান্স হিমালয়ান অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারের জন্য একুশজন জ্ঞানী মানুষকে পাঠান। এরমধ্যে মাত্র দুজন প্রাণে বাঁচেন। এঁদের একজন রিনচেন জাংপো লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ ও সিকিম অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটান। তিনি নেপাল আর ভুটানেও গিয়েছিলেন। পনেরো শতকে এই মনাস্ট্রিটি লিকিরের গেলুকপা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়।

গ্রামে ঢোকার মুখে একটা প্রাচীন গাছ। একটু এগিয়ে একটা কিউরিও-এর দোকান – তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের নানান সামগ্রী তাতে। জিনিসগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, দামও তেমনই চড়া। এটাওটা নাড়াচাড়া করে দেখে একটা ছোট্ট আঙটি কেনা হয়। তারপর টিকিট কেটে গুম্ফা চত্ত্বরে ঢুকি। কোনদিকে যে যেতে হবে বুঝতে পারি না। কোনটা মন্দির কোনটা না মালুম হয় না। আসলে চত্ত্বরের ভেতরে আলাদা আলাদা একাধিক বৌদ্ধ মন্দির আছে। সেসব আবার তালাচাবি দেওয়া।
চমকে দেওয়ার মতো কাঠের সুন্দর কারুকাজ মূল গুম্ফার বাইরের দেওয়ালে আর ছাদে। ভিতরের দেওয়ালে আঁকা ছবিগুলি কাশ্মীরি শিল্পীদের আঁকা। সেইসময়ের কাশ্মীরের রাজারা ছিলেন হিন্দু। আবার শিল্পীরা অনেকে ইসলাম ধর্মীয়ও ছিলেন। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং ইসলামধর্ম তিনেরই প্রভাব পড়েছিল তাই সমসাময়িক আঁকায়। তবে কাশ্মীরি ঢঙটাই প্রবল নাক, চোখ আর দাড়ির কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যে। আবার প্রার্থনা হল বা দুখাং-এ একটা টানা সিরিজ রয়েছে উচ্চবংশীয়দের শিকার আর খাওয়াদাওয়ার – তাদের পোশাক, পাগড়িতে পারসী কাজের ছাপ।
ভেতরে ফোটো তোলা নিষেধ। পাহারাদার রিজদিং এব্যাপারে খুব সতর্ক। তার হাতেই মন্দিরের চাবির গোছা। বহু ভাঁজে ভরা মুখ, চোখের দৃষ্টি, কঠোর। আর মেজাজ একেবারে সপ্তমে বাঁধা।
প্রথমে সামটসেক মন্দিরে। তিনতলা মন্দিরের একতলাতেই শুধু পর্যটকদের ঢুকতে দেওয়া হয়। মন্দিরের বাইরের বারান্দায় কাঠের বিমের কারুকাজ আর বারান্দার ওপরে সামনের দিকে মৈত্রেয়, অবলোকিতেশ্বর আর মঞ্জুশ্রী বুদ্ধের কাঠ খোদাই মূর্তি ফ্রেমে আটকানো। কাঠের ফ্রেমের দরজাটা এতই নিচু যে মনে হচ্ছিল তা যেন কোনও হবিটের জন্য বানানো। ভেতরটা অন্ধকার আর ধূপ আর প্রদীপের তেল পোড়া গন্ধ। একটা অদ্ভুত রহস্যময় পরিবেশ। বেশ খানিকক্ষণ লাগল চোখ আর মনকে ওই আলোয়, ওই আবহে সইয়ে নিতে। মাথার ওপর কাঠের বিমের গায়ে নানা রঙের আঁকা। মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে কালো, সবুজ, গেরুয়া, সোনালি – বসে থাকা হাজার বুদ্ধমূর্তির ফ্রেসকো। ঘরের একেবারে শেষে ১৭ ফুট উঁচু বোধিসত্ত্ব মৈত্রেয়র মূর্তি। চার হাত, মাথায় মুকুট, পরনে ধুতি। একতলা ছাড়িয়ে মূর্তিটির মাথা দোতলায় উঠে গেছে। সামনের বৃহৎ কুলুঙ্গিগুলোর এক একটায় এক একটা বিশালকায় মূর্তি। ঢুকে বাঁ হাতে অবলোকিতেশ্বরের বিশাল সাদা রঙের মূর্তি। চারটে হাত। মাঝে লাল রঙের মৈত্রেয় বুদ্ধ। ডানদিকে হলুদ রঙের মঞ্জুশ্রী। এই মূর্তিগুলিও বিশাল। ধুতিতে ছবি আঁকা রয়েছে। মাঝে চোর্ত্তেন। অবলোকিতেশ্বরের ধুতিতে আঁকা ছবির বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করছেন যে এতে ১১-১২ শতকের কাশ্মীরি মন্দির, প্রাসাদ ও বাড়িঘরের ছবি আঁকা রয়েছে। যেহেতু ওই সময়ের কোনও সত্যিকারের বাড়িঘর আজ আর টিঁকে নেই। তাই অবলোকিতেশ্বরের ধুতিটিই একমাত্র সেইসময়ের কাশ্মীরকে চেনার একমাত্র উপায়। মৈত্রেয় বুদ্ধের ধুতিতে বুদ্ধের জীবনকথা আঁকা রয়েছে। আর মঞ্জুশ্রীর ধুতিতে তন্ত্রসাধনার ছবি। মূর্তিগুলির পাশে উড়ন্ত দেবীরা। সামটসেক মন্দিরের বিমগুলিতে সম্ভবত সেইসময়ের জামাকাপড়ের নকশা আঁকা আছে। এগুলোও মধ্যযুগের কাশ্মীরি বয়নশিল্পের শেষ উদাহরণ। সবুজ রঙের তারামূর্তি রক্ষাকর্ত্রীর রূপে। এর চোখের টান হঠাৎ করে অজন্তার কৃষ্ণা সুন্দরীকে মনে করিয়ে দেয় যেন।
প্রার্থনা হল বা দু-খাং এখানকার প্রাচীনতম নিদর্শন। দু-খাং-এর একেবারে পেছনের দেওয়ালে রয়েছে প্রাচীনতম বুদ্ধ বা ভৈরোকানার চারটি উজ্জ্বল রঙিন ফ্রেসকো। বাকি দেওয়ালে ছটি মন্ডল রয়েছে। মন্ডলগুলির মধ্যে বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব ও নানান দেব-দেবীর ছবি রয়েছে।
মঞ্জুশ্রীর মন্দিরটির ঢোকার দরজা আরও নিচু ভেতরটা আরও রহস্যময়। চোখটা একটু ধাতস্থ হতে তিনশো ষাট ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের যে কোনওদিকে তাকালেই এত বিচিত্র ছবি আর তার রঙের বাহারে কিছুক্ষণ চোখ-মন সব যেন ধাঁধিয়ে যায়। মঞ্জুশ্রীর চারটি মূর্তি পরস্পর পিঠ ঠেকিয়ে সংলগ্ন।
ক্যামেরায় ছবি তোলা তো নিষেধ। ওদিকে মনের ক্যামেরার সব ছবি একের ওপর অন্যে ওভারল্যাপ করে শুধু। এও মনে রাখতে হলে অজন্তার মতো সময় নিয়ে দেখতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে, বুঝতে হবে। নাহলে অসম্ভব। সত্যি বলতে কী অজন্তার সৌন্দর্য দেখার জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি থাকে তা এর বেলায় না থাকায় আমি রীতিমতো হতবাক আর অসম্ভব মুগ্ধ হয়েছি। এককথায় বললে সেই লালমোহনবাবুর 'জমজমাট'-এর মতোই অবস্থা। কী করে যে সে ছবি কলমে ধরব তা নিজেও জানি না। একেকটা মন্দিরের ভেতরের অদ্ভুত শান্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ, প্রাচীন গন্ধ, রঙিন ছবি, আলো-ছায়া – এ যেন অন্য এক ভুবনে পৌঁছে যাওয়া।
তবে পরে জেনে খুব মনখারাপ লাগল যে, আলচি মনাস্ট্রির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ভারতীয় প্রত্নবিভাগ ও লিকির মনাস্ট্রির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। ওদিকে আবহাওয়ার বদল আর মানুষের নিঃশ্বাসের বিষ অজন্তার মতোই ক্ষইয়ে দিচ্ছে এর অমূল্য চিত্রগুলিকে। পাশেই বাঁধ আর নদী, ফাটল ধরেছে জায়গায় জায়গায়। যে কোনও সময় একটা ভূমিকম্পেই ধ্বসে পড়তে পারে প্রাচীন ইতিহাসে মূর্ত এই মনাস্ট্রিটি।
আলচি থেকে বেরিয়ে আবার চলা। সিন্ধু চলেছে আমাদের সঙ্গে বাঁ হাতে। ঝকঝকে নীল আকাশে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ। এখনো বেশিটাই রুক্ষ পাহাড়, মাঝে মাঝে এক আধ ঝলক রঙিন গাছ। রাস্তা যথারীতি প্রায় খালি। কখনও এক-দুটো ট্রাক চোখে পড়ছে। পথের পাশে কখনও বা স্থানীয়দের বাসস্থানের এক ঝলক। সন্তান কোলে মা। কোথাও রাস্তা সারাই চলছে।

বেলা ১টা, উলেটোকপো
ভারী সুন্দর জায়গাটা। গাছের রঙে রঙে একেবারে রঙিন ঝলমলে হয়ে আছে পথ। লেহ-এর থেকে নিচুতে, তাই সমতল থেকে আকাশপথে সরাসরি লেহ এলে কেউ কেউ এয়ারপোর্ট থেকে লেহ শহর না গিয়ে এখানে এক রাত কাটিয়ে যান উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে।

বেলা পৌনে দুটো, খালাৎসে
বেশ জমজমাট জায়গা। পথের পাশে অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্ট। জাতীয় সড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় এখানেই দ্বিপ্রাহরিক ভোজন সারেন যাত্রী ও গাড়িচালকরা। সান অ্যান্ড মুন গার্ডেন রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাওয়া সারা হল। রেস্টুরেন্টের পিছন দিকে আপেল বাগানে গাছের ছায়ায় ওপেন এয়ার খাওয়ার জায়গা। বাগানে বসে খেতে খেতে ফলন্ত আপেল গাছের দিকে তাকিয়ে লেহ-এর হোটেলের আপেলগাছের কথা মনে পড়তে দীর্ঘশ্বাস – আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি?

সোয়া তিনটে, মুনল্যান্ড
কী অদ্ভুত এখানকার ভূ-প্রকৃতি। ফিকে হলুদ রঙের পাহাড় যেন ছবিতে দেখা এবড়োখেবড়ো রুক্ষ চাঁদের ভূমি।

সাড়ে তিনটে, লামায়ুরু মনাস্ট্রি
লাদাখের অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন মনাস্ট্রি লামায়ুরু। আলচি মনাস্ট্রির সমসাময়িক। প্রচলিত গল্পকথা এই যে আগে পুরো উপত্যকা জুড়ে একটি হ্রদ ছিল। এখানে একটি মনাস্ট্রি তৈরি করার জন্য জলদেবতা নাগের আত্মার কাছে প্রার্থনা করলে ও ভুট্টাদানা দিলে তাঁর আশীর্বাদে সমস্ত জল শুকিয়ে যায়। দশম শতাব্দীর শেষে গুরু নারোপা এখানে আসেন এবং দু-খাং-এ প্রার্থনা করেন। গুরু রিনচেন জাংপো এখানে অনেকগুলি মন্দির ও স্তুপ তৈরি করেন এবং দীর্ঘদিন ছাত্রদের শিক্ষা দেন। গুরু তিলোপা ও গুরু নারোপার অনুগামী ব্রিগুংপা সেক্টের অন্তর্ভুক্ত এই মনাস্ট্রিটি। প্রার্থনা হল পেরিয়ে বুদ্ধ ও বিভিন্ন গুরুর মূর্তি সাজানো রয়েছে অধিকাংশ মনাস্ট্রির মতোই। বাঁ দিকে প্রথমে গুরু পদ্মসম্ভবের মূর্তি। ডান হাতে প্রথম মূর্তিটি বুদ্ধের।
ভেতরের ঘরে অজস্র পুঁথি। ত্রিপিটকও রয়েছে তার মধ্যে। কয়েকটা বেশ অদ্ভুত মূর্তিও চোখে পড়ল। আসলে তান্ত্রিকমতে বুদ্ধ পূজিত হলে সেইসব গুম্ফায় বিচিত্র সব মূর্তি চোখে পড়ে। ধর্মপাল, সম্ভবত সিংহের ওপর বসে থাকা বৈশ্বরণ, তারা, চার হাতবিশিষ্ট মহাকাল, বজ্রধারা বুদ্ধ, শাক্যমুনি বুদ্ধ।
গুরু নারোপা যে ঘরে ধ্যান করতেন সেই ঘরটিতে এখন লাইব্রেরির মতো পুঁথি সাজানো রয়েছে।
বিকেল সোয়া চারটে, ফোতু লা
লেহ-শ্রীনগর পথে সর্বোচ্চ গিরিপথ – ১৩৪৭৯ ফুট। পথের ধারে বরফ জমে আছে। ভিউয়িং পয়েন্টের চাতালে দাঁড়ালে দূরে কারাকোরাম পর্বতমালা ঘিরে আছে চারপাশ। কিন্তু হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, মনে হচ্ছে চাতাল থেকে উড়িয়ে নিয়ে ফেলবে নিচের খাদে। ক্লান্ত লাগছে খুব।

বিকেল পাঁচটা, নামিকা লা – ১২২০০ ফুট
সূর্য নেমে আসছে। পাহাড়ের বুকে আলোছায়া খেলা করছে। আর লেখার শক্তি নেই। ঘুম পাচ্ছে খুব।

সন্ধে সাড়ে পাঁচটা, মূলবেখ
পাহাড় খোদাই করে তৈরি মৈত্রেয় বুদ্ধের প্রায় তিরিশ ফুট উঁচু একটা মূর্তি পথের ধারে। নিচের দিকটা ঢাকা পড়েছে ছোট্ট মন্দিরে। সূর্যাস্ত হয়ে গেছে, তবু দিনের আলোর শেষ রেশটুকু রয়ে গেছে এখনো। দুটো গুম্ফা এখানে – একটি দ্রুকপা ও অন্যটা গেলুপা সম্প্রদায়ের। ভিতরে প্রায়ান্ধকারে টিমটিম করে প্রদীপ জ্বলছে। প্রাচীন বানিজ্যপথ আর আজকের হাইওয়ের ধারে পাহাড়ের গায়ে কুষাণযুগে খোদিত এই দীর্ঘকায় ভবিষ্যৎ বুদ্ধকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হল বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তিদের কথা – ধর্ম মানুষকে যত কিছু দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে কি তার থেকে বেশি মনুষ্যত্ব?
সন্ধে সাতটা, কার্গিল
কার্গিল পৌঁছে হোটেল ঠিক করতে করতে একেবারেই অন্ধকার হয়ে গেল। দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে এসেছে। রাস্তাঘাটে আলোও নেই বিশেষ। তবে অফসিজন হওয়ায় বেশ কম ভাড়াতে ভাল হোটেলই পাওয়া গেল। যদিও চা-কফি ছাড়া খাবার কিছু মিলবে না। রাঁধুনি এ বছরের মত ছুটি নিয়েছে। অনতিদূরের রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে এসে ডাইনিং রুমে খাওয়া যাবে। আপাতত আজ রাতের মতো এখানেই বিশ্রাম। লেহ-এর হোটেলে ফ্রি ওয়াই-ফাই ছিল, কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগের হাল খুব খারাপ। এখানে পৌঁছেই তাই ছোট-বড় সবাই হোটেলের ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড জেনে নিয়ে মোবাইল ফোন হাতে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে গত কয়েকদিনের অনিয়মিততার ঘাটতিপূরণে ব্যস্ত!

(ক্রমশ)

আগের পর্ব – তৃতীয় পত্র


~ লাদাখের আরও ছবি ~

 

লেখালেখি, বেড়ানো, নানা রকম বই পড়া, ন্যাশনাল লাইব্রেরি আর কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় যাওয়া, কখনোবা গলা ছেড়ে গান গাওয়া এইসবই ভালো লাগে 'আমাদের ছুটি'-র সম্পাদক দময়ন্তী দাশগুপ্তের।

 

 

SocialTwist Tell-a-Friend

To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

Cannot connect to the Host