Home Page
Current Issue
Archive
Travel Plans
Trekking Routemap
Tips
Explore
Rail
Air travel
Other Websites

Feedback




hit counters
hit counter


উত্তরপ্রদেশ (Uttar Pradesh)

 

আগ্রা(Agra)- মহাভারতের আমলে নাম ছিল অগ্রবন। গ্রিকবীর আলেকজান্ডারের জীবনীকার টলেমির লেখায় প্রথম আগ্রা নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। সুলতান সিকান্দার লোদি ১৫০৪ সালে যমুনা নদীর তীরে এই শহরের পত্তন করেন। ১৬৩৪ সালে এখানে রাজধানী স্থাপন করেন সম্রাট আকবর। মুঘল আমলেই উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছায় আগ্রা।
তবে আগ্রা বলতে প্রথমেই মনে পড়ে তাজমহলের কথা। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তম পত্নী মমতাজ মহলের সমাধির উপর গড়ে তোলেন শ্বেত পাথরের এই অপরূপ স্মৃতিসৌধটি। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাতেও প্রথমের সারিতেই রয়েছে তাজমহলের নাম। তবে শুধু তাজমহলই নয়, আগ্রা জুড়েই রয়েছে ঐতিহাসিক আরও নানান নিদর্শন।
যমুনার তীরে ইন্দো-পারসিক স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ কীর্তি তাজমহল(Tajmahal)। লাল বেলেপাথরের দরজা পেরিয়ে মূল চত্ত্বরে প্রবেশ করতে হয়। প্রশস্ত বাগানের মধ্য দিয়ে ফোয়ারা আর গাছের সারি দেখতে দেখতে সৌধের কাছে পৌঁছনো। চাঁদনি রাতে তাজকে প্রত্যক্ষ করা যেন এক রূপকথা। পূর্ণিমা রাতে তাজ দর্শনের ব্যবস্থাও আছে। পশ্চিম দরজার মুখে তাজ মিউজিয়াম। ভূগর্ভস্থ মকবারায় পাশাপাশি শায়িত রয়েছেন মমতাজ বেগম ও সম্রাট শাহজাহান।
তাজমহল থেকে ২কিমি দূরে ষোড়শ শতাব্দীতে তৈরি আগ্রা ফোর্ট (Agra Fort)। লাল বেলেপাথরের এই দুর্গটি সম্রাট আকবরের সময়ে নির্মিত হয়। অমরসিং দরওয়াজা দিয়ে ঢুকে সামনেই জাহাঙ্গির মহল। এই দুর্গে অন্যান্য দ্রষ্টব্যগুলি হল- যোধাবাঈয়ের মহল, শাহজাহানের খাস মহল, অঙ্গরী বাগ, মিনা মসজিদ, দেওয়ানি আম, দেওয়ানি খাস, শিশমহল, নাগিনা মসজিদ, মছি ভবন, মিনা বাজার প্রভৃতি।
দুর্গ থেকে ১কিমি দূরে নূরজাহানের পিতা মির্জা গিয়াস বেগের সমাধি মদ-উদ-দৌলা। তাজমহলেরও আগে তৈরি ইন্দো-পারসিক শিল্পের আরেকটি অপূর্ব নিদর্শন। দিল্লি গেটের কাছে জুম্মা মসজিদ (Jama Masjid)। শাহজাহানের প্রধানমন্ত্রী আফজল খাঁ-র সমাধিক্ষেত্র চিনি কা রৌজা। তাজমহল থেকে ১০কিমি দূরে সিকান্দ্রায় রয়েছে সম্রাট আকবরের সমাধিক্ষেত্র। আর দেখে নেওয়া যায় দয়ালবাগে রাধাস্বামী মন্দির, রামবাগ, জামি মসজিদ প্রভৃতি।
যাওয়াঃ- আগ্রা ক্যান্টনমেন্ট (AGC) ও আগ্রা ফোর্ট (AF) এই দুটি স্টেশনেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রেন আসছে। এছাড়া দিল্লি, জয়পুর, বেনারস, মথুরা, হরিদ্বার, লখণৌ প্রভৃতি ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে বাস চলাচলও রয়েছে নিয়মিতই।
থাকাঃ- ইউ পি ট্যুরিজমের হোটেল তাজখেমা তাজমহলের পূর্ব গেটের কাছে। রাহি ট্যুরিস্ট বাংলোটি রাজা-কি-মাণ্ডি স্টেশনের কাছে। তাজমহলের কাছেপিঠে নানান মান ও দামের বেসরকারি হোটেল রয়েছে।
মরসুমঃ- অক্টোবর থেকে মার্চ মাস বেড়ানোর ভালো সময়।
খাওয়া-দাওয়াঃ- স্থানীয় মিষ্টি ‘পেঠা’-র স্বাদ নেওয়া যায়।
সবঃ- তাজের পূর্ব গেট থেকে ১কিমি দূরে শিল্পগ্রামে প্রতি বছর ১৮-২৭শে ফেব্রুয়ারি ১০ দিন ব্যপী তাজ মহোৎসব বসে।
কেনাকাটাঃ- আগ্রায় শ্বেত পাথরের সামগ্রী বেশ জনপ্রিয়। সংগ্রহ করা যায় তাজমহলের ক্ষুদ্র রেপ্লিকা। তাজ কমপ্লেক্সে হস্তশিল্পের নানান দোকান ও সরকারি এম্পোরিয়াম আছে। শিল্পগ্রামে সারা ভারতের নানান শিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায়।
|| ভ্রমণকাহিনি – তাজমহল – প্রেমে অপ্রেমে ||

ফতেপুর সিক্রি (Fatehpur Sikri)- আগ্রা থেকে ৩৬কিমি দূরে সম্রাট আকবরের একসময়ের রাজধানী শহর ফতেপুর সিক্রি। নিঃসন্তান আকবর সন্তানকামনায় খাজা সেলিম চিস্তির দ্বারস্থ হলে পিরবাবার আশীর্বাদে সম্রাটের হিন্দু মহিষী যোধাবাই-এর গর্ভে জন্ম নেয় এক পুত্র সন্তান। গভীর কৃতজ্ঞতায় সম্রাট সেই সন্তানের নাম রাখেন ‘সেলিম’, যিনি পরে সম্রাট জাহাঙ্গির নামে ইতিহাসে পরিচিত। আর খাজা সেলিম চিস্তির সাধনভূমিতে আকবর গড়ে তোলেন এক অনুপম নগরী। ফতেপুর সিক্রি স্থান পায় ইতিহাসে।
মাইল ছয়েক দীর্ঘ এক পাহাড় চূড়োয় তৈরি হয়েছিল ফতেপুর সিক্রি। অনুপম ভাস্কর্যমণ্ডিত বুলন্দ দরওয়াজা দিয়ে প্রবেশ করলে সামনেই জামি মসজিদ। মসজিদ চত্ত্বরের মাঝে মুসলমান ফকির শেখ সেলিম চিস্তির সমাধির উপর শ্বেত পাথরের তৈরি অপরূপ কারুকার্যময় দরগা। ফতেপুর সিক্রির অন্যান্য দ্রষ্টব্যের  মধ্যে রয়েছে দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, ইবাদতখানা, যোধাবাঈয়ের প্রাসাদ, আখঁ মিচৌলি, হিরণ মিনার, পাঁচমহল প্রভৃতি।
যাওয়াঃ- আগ্রা থেকে বাসে বা আগ্রা ফোর্ট স্টেশন থেকে ট্রেনে ফতেপুর সিক্রি যাওয়া যায়। এছাড়া ভাড়া গাড়ি, অটো, টাঙ্গার সঙ্গে চুক্তি করেও ফতেপুর সিক্রি ঘুরে নেওয়া যায়।
থাকাঃ- উত্তরপ্রদেশ ট্যুরিজমের রাহি গুলিস্তান ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রেস্ট হাউসও রয়েছে ফতেপুর সিক্রিতে। বুকিং- আর্কিও লজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া, ২২ দ্য মল, আগ্রা। অল্প কয়েকটি বেসরকারি হোটেলও আছে।
|| ভ্রমণকাহিনি – ইতিহাসের শহরে ||

মথুরা-বৃন্দাবন (Mathura-Vrindaban)- পুরাণ মতে, হিরণ্যকশিপুর পুত্র মধু-র নাম থেকে মধুরা, অপভ্রংশে মথুরা। তবে শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি রূপেই এই দুই শহরের পরিচিতি। হিন্দুতীর্থ, বিশেষত বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের কাছে মথুরা, বৃন্দাবন পরম পবিত্র। এখানেই কংশের কারাগারে দেবকীর গর্ভে জন্ম হয় শ্রীকৃষ্ণের। পরে অত্যাচারী রাজা কংশকে হত্যা করেন শ্রীকৃষ্ণ।
মন্দিরনগরী মথুরা। দ্রষ্টব্য শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমি মন্দির, কংশের দুর্গের ভগ্নাবশেষ, গীতামন্দির, দ্বারকাধীশ মন্দির, রঙ্গভূমি ইত্যাদি। মন্দিরের পাশাপাশি দেখে নিতে হবে ১৬৬১-তে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব নির্মিত জুম্মা মসজিদ, ১৮৭৪-এ নির্মিত মিউজিয়ামটি বা অম্বরের মহারাজ বিহারিমলের মৃত্যুতে তাঁর সঙ্গে সহমরণে যাওয়া স্ত্রী-র স্মরণে তাঁদের পুত্র ভগবানদাস নির্মিত সতীবুর্জ।
মথুরা থেকে মাত্র ১৪-১৫ কিলোমিটার দূরে বৃন্দাবন। তুলসীর আর এক নাম বৃন্দা। একসময় এখানে প্রচুর তুলসীগাছ ছিল। বৃন্দার বন, তাই নাম হয় বৃন্দাবন। দ্রষ্টব্য রাজা মানসিংয়ের অর্থানুকূল্যে রূপ-সনাতন-এর তৈরি গোবিন্দজির মন্দির, মদনমোহন মন্দির, হরিদাস গোস্বামী প্রতিষ্ঠিত ১৮৬৪ সালে তৈরি বঙ্কুবিহারী মন্দির, শ্রীরঙ্গনাথ মন্দির ইত্যাদি।
মথুরা-বৃন্দাবনে এলে দেখতে হবে দশাশ্বমেধ ঘাট, গণেশ ঘাট, অসিকুণ্ড ঘাট প্রভৃতি পবিত্র ঘাটগুলি।
যাওয়াঃ- নিকটতম রেলস্টেশন মথুরা। আগ্রা এবং দিল্লি দু-জায়গা থেকেই প্রচুর বাস আছে মথুরা যাওয়ার। দূরত্ব আগ্রা ৫৮ কিলোমিটার। বাসে সময় লাগে ঘন্টা দেড়েক, আর দিল্লি ১৪৫ কিলোমিটার ঘন্টা তিন-সাড়ে তিনেকের পথ।
থাকাঃ- মথুরায় থাকার জন্য আছে ইউ পি ট্যুরিজমের দুটি হোটেল রাহি ট্যুরিস্ট বাংলো, ট্যুরিস্ট রিসেপশন সেন্টার। মথুরা-বৃন্দাবনের এস টি ডি কোডঃ- ০৫৬৫।
লখণৌ(Lucknow)- উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখণৌ - ভারতীয় সঙ্গীত ও শিল্পকলার অন্যতম পীঠস্থান। গোমতী নদীর দুই তীরে লখণৌ-এর জনবসতি। দক্ষিণ-পশ্চিম তীরে চারবাগ রেলস্টেশনের বিপরীতে চারবাগ বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে সুভাষ মার্গ ধরে ৩-৪ কিমি এগোলেই পুরনো লখণৌ-এর প্রধান দ্রষ্টব্য এলাকায় পৌঁছান যায়। এখানেই রয়েছে বড়া ইমামবাড়া, ছোটা ইমামবাড়া, পিক্‌চার গ্যালারি, ক্লকটাওয়ার, জুম্মা মসজিদ প্রভৃতি। কাইজার বাগ বাসস্ট্যান্ডের কাছে আরেক দ্রষ্টব্য সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতি বিজরিত রেসিডেন্সি। আরও পূর্বদিকে সিকান্দার বাগে শাহনাজফ ইমামবাড়া ও ন্যাশনাল বটানিকাল গার্ডেন। বারাণসী বাগে লখণৌ চিড়িয়াখানা ও স্টেট মিউজিয়াম।
নবাব আসাদ-উদ-দৌল্লার আমলে নির্মিত বড়া ইমামবাড়ার গঠনশৈলী বিচিত্র। ৫০মিটার লম্বা ও ১৫মিটার চওড়া প্রধান হলঘরটির বিশেষত্ব হল হলের মধ্যে কোন পিলার বা বিম নেই। বিশ্বের বৃহত্তম স্তম্ভহীন কক্ষ। নবাবের সমাধিও রয়েছে এই কক্ষে। বড়া ইমামবাড়ার ওপর তলায় রয়েছে ভুলভুলাইয়া বা গোলকধাঁধা। ৪৮৯টি একইরকম দেখতে দরজা রয়েছে ভুলভুলাইয়াতে। নবাব নাকি এখানে বেগমদের নিয়ে লুকোচুরি খেলতেন। তবে সাধারণ দর্শকের ক্ষেত্রে গাইড ছাড়া ভুলভুলাইয়ার অলিগলি থেকে পথ চিনে বেরিয়ে আসা বেশ কঠিন। বড়া ইমামবাড়ার কাছেই রুমি দরওয়াজা। রুমি দরওয়াজার নিচ দিয়ে পিচের রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে ছোটা ইমামবাড়া। মহম্মদ আলি শাহর সময়ে নির্মিত এই ইমামবাড়ার স্থাপত্যশৈলী ভারি সুন্দর। অসংখ্য ঝাড়লন্ঠন শোভাবর্ধন হলঘরটির করেছে । ভিতরে সিংহাসন ও নানা সাজের তাজিয়া। নবাব আলি শাহ ও তাঁর মায়ের সমাধি রয়েছে অভ্যন্তরে।
যাওয়াঃ- নিকটতম বিমানবন্দর লখণৌতে আমাউসি বিমানবন্দর। লখণৌতে রেলস্টেশন দুটি- চারবাগ স্টেশন ও লখণৌ সিটি স্টেশন(LJN/LKO)।
লখণৌ রেলস্টেশনের বিপরীতে চারবাগ বাসস্ট্যান্ড থেকে উত্তরপ্রদেশ রাজ্য সড়ক পরিবহনের বাস যাচ্ছে উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। হজরতগঞ্জের কাছে কাইজারবাগ বাসস্ট্যান্ড থেকেও বারাণসী, আগ্রা, অযোধ্যা, দিল্লি, কানপুর, এলাহাবাদ প্রভৃতি বিভিন্ন জায়গার বাস যাচ্ছে।
থাকাঃ- হজরতগঞ্জে উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের হোটেল রাহি গোমতী। রানা প্রতাপ মার্গে ফরেস্ট রেস্ট হাউসও আছে। স্টেশন ও বাসস্ট্যান্ডের কাছে চারবাগ এলাকায় বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে। এছাড়া লখণৌতে বিভিন্ন ধর্মশালা ও কালীবাড়িতে থাকার ব্যবস্থা আছে।   
খাওয়াদাওয়াঃ- লখণৌয়ের হোটেল রেস্তোঁরায় বিরিয়ানি, মুর্গ মুসল্লম-এর মত নবাবী খানার স্বাদ নেওয়া যেতে পারে। কুলফি, ফালুদা আর দশেরি আম রাখা যায় এই তালিকায়।
কেনাকাটাঃ- লখণৌ-এর খ্যাতি চিকনের কাজের জন্য। চিকনের শাড়ি, পাঞ্জাবি প্রভৃতি সংগ্রহ করা যায়। আতর, জুয়েলারি, জারদৌসি বা অ্যান্টিকও রাখা যায় কেনাকাটার তালিকায়।
ৎসবঃ- প্রতিবছর ২৫শে নভেম্বর-৫ই ডিসেম্বর – দশদিন ব্যাপী ধুমধামে পালিত হয় লখণৌ মহোৎসব। মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো আর নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন মানুষজন।  
মরসুমঃ- অক্টোবর থেকে মার্চ মাস বেড়ানোর সেরা সময়।
বেনারস(Benaras)- পুরী, দার্জিলিং-এর পরই বোধহয় বাঙালির বেড়ানোর নস্টালজিয়া কাশী বা বেনারসকে ঘিরে। কাশী বলতেই মনে পড়ে সত্যজিত রায়ের চলচ্চিত্র ‘অপরাজিত’-য় ভোরবেলার দশাশ্বমেধ ঘাট আর বালক অপুকে অথবা ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ মছলীবাবা, ফেলুদা বা স্বয়ং লালমোহন বাবুকে।
বেনারসের অলিগলি, পুরনো গন্ধ আর গঙ্গার ঘাটগুলিতে বিচিত্র ধরনের মানুষের সমাহার – এটাই কাশীর প্রকৃত ছবি । অন্য কোথাও বেড়াতে গেলে ভিড়টা অসহ্য ঠেকে, অথচ নানা মানুষের এই জনস্রোতটাই বেনারসের প্রাণ। বেনারসের সেরা আকর্ষণ পতিতপাবণী মা গঙ্গা, গঙ্গার তীরের একের পর এক ঘাট আর বাবা বিশ্বনাথের মন্দির(Biswanath Temple)। বেনারসের ঘাটগুলো সব গায়ে গায়ে। যেন একটা ঘাটেরই এক্সটেনশন, শুধু নামগুলো বদলে বদলে গেছে। এরমধ্যে কয়েকটি বিশেষ ঘাট হল দশাশ্বমেধ, মণিকর্ণিকা, হরিশ্চন্দ্র, রাজাঘাট, অহল্যাঘাট, পঞ্চগঙ্গা, তুলসী, কেদার প্রভৃতি। এরমধ্যে দশাশ্বমেধই প্রধান। পুরাণ মতে, রাজা দিব্যোদাস এখানে অশ্বমেধ যজ্ঞ করে ব্রহ্মাকে তুষ্ট করেন। তাই শিব এখানে ব্রহ্মেশ্বর। আবার ইতিহাস বলছে, ভারশিব নামে জনৈক নাগনৃপতি খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে এখানে পর পর দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ করেন। আর তারপর থেকেই এই পবিত্র যজ্ঞস্থলের নাম হয় দশাশ্বমেধ। দশাশ্বমেধের লাগোয়া রাজেন্দ্রপ্রসাদ ঘাট। এখানে বড় বড় থামের গায়ে হাতে আঁকা মা গঙ্গা, শিবের ছবি। তা পেরিয়ে মানমন্দির ঘাট। এই ঘাটের গায়েই রাজা জয়সিংহের তৈরি চারশো বছরের প্রাচীন মানমন্দির। মানমন্দিরের ছাদে বিখ্যাত যন্তর-মন্তর। তবে বেনারসের বিখ্যাত বাঁদরদের ঠিকানাও কিন্তু এই ছাদই। মানমন্দিরের ছাদ থেকে নীচে গঙ্গা আর ঘাটের চিত্র অপরূপ লাগে। বিচিত্র মানুষ ব্যস্ত বিভিন্ন কাজে, তারমধ্যে নিজস্ব ভঙ্গীতে অবিচল গরু-মোষ, সামনে গঙ্গার বুকে নানারঙের নৌকার সারি-কেউ তীরে কেউবা ভেসে চলেছে। এ যেন কোন শিল্পীর তুলিতে আঁকা অজস্র টুকরো টুকরো ছবি গেঁথে আস্ত একটা ছবি। দশাশ্বমেধের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে একেবারে জলের কাছে ঘাটের ওপর নিচু নিচু তক্তা পাতা। তক্তার ওপরে, ঘাটের আশপাশে বড় বড় ছাতার আড়ালে ভিড় জমান সাধু-সন্ন্যাসী, পুণ্যার্থী থেকে নিছক পর্যটক। সামনে  আরতির বেদিগুলির উপরে হলুদ পতাকা উড়ছে। এখানেই সন্ধ্যায় আরতির এক অন্যরকম জমজমাট মেজাজ। গঙ্গার বুকে তখন আলোর প্রদীপমালা। আবার খুব ভোর ভোর বেনারসের ঘাটে পৌঁছলে মুগ্ধতার অন্য এক ছবি মনে আঁকা হয়ে যায়। ভোরের গঙ্গা প্রণাম থেকে সন্ধ্যার আরতি – ঘাটে বসেই কেটে যাবে সময়।
মণিকর্ণিকা শ্মশানঘাটকে ঘিরে রয়েছে নানা গল্পকথা- নৌকায় ভেসে যেতে যেতে মাঝির মুখে শোনা হয়ে যায়। এখানেই জলের মধ্যে হারিয়ে যায় দুর্গার মণিকুন্ডল। অনেক চেষ্টাতেও খুঁজে না পেয়ে শেষে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন দেবী। ক্রোধের সেই অগ্নি আজও অনির্বাণ শিখায় জ্বলছে এমনই বিশ্বাস ভক্তদের। শ্মশানঘাটের ঠিক পাশেই গোয়ালিয়রের রানি বৈজাবাঈয়ের মাতৃস্মৃতিমন্দির। মাতৃঋণ বলে তাঁর জীবনে আর কিছুই নেই এই মন্দির বানিয়ে এমনই অহংকার বাসা বাঁধে তাঁর মনে। সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরটি হেলে পড়ে। দশাশ্বমেধ থেকে মণিকর্ণিকা -যাতায়াতের পথে নৌকো থেকেই নজর কাড়ে ললিতা ঘাটের ওপরে বৌদ্ধ মনাস্ট্রির আদলে তৈরি নেপালি মন্দিরটি।
বেনারসের একটা নিজস্ব চরিত্র আছে, রূপ-রস-গন্ধ। বেনারস মানেইতো পান,মশলা,আতর,মালাই,রাবড়ি,পুরি,কচুরি। বিশ্বনাথের গলির চত্বরটায় বেশ কয়েকটা বড় মশলার দোকান আছে। বেনারসে নানারকম রঙিন রঙিন পাথরের ভারি সুন্দর সুন্দর মালা পাওয়া যায়। দশাশ্বমেধ ঘাটে নামার একটু আগে রাস্তার ওপরে বেশ কটা বড় দোকান আছে। গোধুলিয়া মোড়ের মাথায় পরপর কতগুলো মালাইয়ের দোকান। কাশির রাস্তাঘাট ঠিক যেন গোলকধাঁধা। যত মানুষ, তত গলি, তার চেয়েও বেশি দোকানপাট। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন, বিদেশি, সাধু, পর্যটক, ভিখারি-বিচিত্র মানুষের ভিড়ে যেন ছোটখাটো একটা ভারতবর্ষ। আবার বেনারসের অলিতেগলিতে না ঘুরলে এখানকার মেজাজটা ঠিক টের পাওয়া যায় না। প্রায়-অন্ধকার সংকীর্ণ রাস্তা, দুধারে অজস্র দোকানপাট, মাঝেমধ্যে প্রাচীন মন্দির, কাদা প্যাচপ্যাচে রাস্তায় ব্যস্ত মানুষজন, বিদেশিদের ঘোরাফেরা। এর মধ্যেই স্কুটার, মোটরসাইকেলের পাশ কাটানো, গলি জুড়ে নির্ভীক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালকার ষাঁড়, গোরু, গোবর আর গলির একেক অংশে একেকরকম বিচিত্র গন্ধ। রাস্তার দুদিকের দেওয়ালে মাঝে মাঝে হাতে আঁকা হাতি,ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ঘোড়সোয়ারের ছবি, কোথাওবা বিজ্ঞাপন আঁটা। দুপাশের বাড়িগুলোর অধিকাংশই বেশ প্রাচীন।
বিশ্বনাথের গলিতে ঢোকার মুখে খাবারের দোকানগুলো পেরোলে কাঠের খেলনা, পিতল, পাথরের জিনিসপত্রের হরেক দোকান। গলির দুপাশেও পশরা নিয়ে বসেছে দোকানিরা। গলির আরও ভিতরে ফুল, সিঁদুর, পুজোর সাজিওলা দোকানগুলো। মানুষের ভিড়, পাণ্ডা আর দোকানদারদের হাঁকাহাঁকি। এদেরই কারও কাছে জুতো জমা রেখে ফুলের সাজি হাতে ভিড়ের ঠেলা খেতে খেতে এগিয়ে চলা। মন্দিরের সোনার চুড়ো তখন সকালবেলার রোদ্দুরে ঝলমল করে। বিশ্বনাথের মন্দিরের স্থাপত্যসৌন্দর্যও দেখার মতো। পাশেই ঔরঙ্গজেবের মসজিদ। মসজিদ পেরিয়ে মস্তবড় চাতাল, একপাশে জ্ঞানের কূপ জ্ঞানবাপী। এই কূপকে ঘিরেও নানা গল্প আছে।
বেনারসে থেকে দেখে নেওয়া যায় বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়(Benaras Hindu University), রামনগর প্যালেস ও মিউজিয়াম, অন্নপূর্ণামন্দির, দুর্গা মন্দির, তুলসী মানস মন্দির প্রভৃতি। বেনারস থেকে ৮৬কিমি দূরে সতীপিঠ বিন্ধ্যাঞ্চল। আর ৩৭কিমি দূরে প্রাচীন চুনার দুর্গ(Chunar Fort)। বেনারসে গঙ্গার অপর পারে রামনগরের রাজবাড়ি। নৌকা করে রামনগর যাওয়ার মজাই আলাদা।
বেনারস থেকে ১০কিমি দূরে বিখ্যাত বৌদ্ধতীর্থ সারনাথ(Sarnath)। সারনাথেই প্রথম পাঁচজন শিষ্যের কাছে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন বুদ্ধদেব। প্রথম বৌদ্ধমহাধর্মচক্র এখানেই হয়। সম্রাট অশোকের সময়ে এখানে বৌদ্ধবিহার গড়ে ওঠে। পাশাপাশি দুটি স্তুপ- চৌখণ্ডীস্তুপ ও ধামেকস্তুপ, প্রথমেই নজরে পরে। ধামেকস্তুপের কাছে মহাবোধি সোসাইটি নির্মিত মূলগন্ধ কুটি বিহার। সারনাথের প্রত্নতাত্ত্বিক মিউজিয়ামটি বিশেষ আকর্ষণীয়। এখানেই বিখ্যাত অশোক স্তম্ভটি সংরক্ষিত রয়েছে।
যাওয়াঃ- বেনারসে বিমানবন্দরটি হল বাবাতপুর এয়ারপোর্ট। রেলস্টেশন তিনটি- কাশী, সিটি ও জংশন স্টেশন। এরমধ্যে বেনারস জংশন স্টেশনটিই প্রধান। আবার মুঘলসরাই স্টেশনে (MGS) নেমেও অটোয় বেনারস পৌঁছান যায়। বেনারসে প্রধান বাস টার্মিনাস চারটি। উত্তর ও মধ্য ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক পথে বেনারসের যোগাযোগ রয়েছে। বেনারস থেকে বাসে সারনাথ, চুনার প্রভৃতি জায়গা ঘুরে নেওয়া যায়।
থাকাঃ- বেনারস স্টেশনের কাছেই রাজ্য পর্যটনের রাহি ট্যুরিস্ট বাংলো। এছাড়া শহর জুড়ে ও ঘাটের কাছে অজস্র হোটেল, হলিডে হোম ও ধর্মশালা আছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকলে বেনারসের প্রধান আকর্ষণ গঙ্গা ও ঘাটের কাছাকাছি থাকাই ভালো।
খাওয়াঃ- বেনারসে এলে রাবড়ি, কেশরীয়া শরবত, প্যাঁড়া আর কুলফি মালাইয়ের স্বাদ নিতেই হবে। আর বিখ্যাত জর্দা পান।
কেনাকাটাঃ- বেনারসের আর এক ঐতিহ্য বেনারসী শাড়ি। তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি বা সরকারি এম্পোরিয়াম থেকে কেনা ভালো। আর মিলবে পাথর-পুঁতির হরেক রকম মালা।
সবঃ- প্রতিবছর কার্তিক পূর্ণিমার কয়েকদিন আগে থেকে শুরু হয় গঙ্গা মহোৎসব (Ganga Festival)। পর্যটন দপ্তরের উদ্যোগে গঙ্গার ঘাট জুড়ে বসে গান বাজনার আসর। আর এক বড় উৎসব দুর্গাপুজো।
মরসুমঃ- অক্টোবর থেকে মার্চ বেনারস বেড়াবার মনোরম সময়।

|| ভ্রমণ কাহিনী - এ জীবন পুণ্য করো ||
দুধওয়া ন্যাশনাল পার্ক (Dudhwa National Park)- লখণৌ থেকে ২৩৮কিমি দূরে প্রায় ৬০০ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে দুধওয়া ন্যাশনাল পার্ক। ১৯৭৭ সালে জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পায় দুধওয়া, ১৯৮৮ তে টাইগার রিজার্ভের। শাল, সেগুন, শিশু খয়ের ইউক্যালিপ্টাসে ছাওয়া গভীর বনের বুক চিরে বয়ে চলেছে নানান পাহাড়ি নদী। লেপার্ড, চিতল হরিণ, গন্ডার, শম্বর, নীলগাই, হগ ডিয়ার, সোয়াম্প ডিয়ার প্রভৃতি নানান বন্যপ্রাণ, সরীসৃপ ও পাখির দেখা মিলবে এই অরণ্যে।
যাওয়াঃ- নিকটতম বিমানবন্দর লখণৌ। কাছের রেলস্টেশন দুধওয়া জংশন(DKX) ও মাইলানি জংশন (MLN)। স্টেশন থেকে বাস, জিপ গাড়িতে ন্যাশনাল পার্কে পৌঁছান যায়। লখণৌ-এ থেকেও উত্তরপ্রদেশ পর্যটনের কন্ডাক্টেড ট্যুরে দুধওয়া বেড়িয়ে নেওয়া যায়।
থাকাঃ- দুধওয়া, সাথিয়ানা, বাঁকাটি, সোনারিপুর ও কুইলায় ফরেস্ট রেস্ট হাউস আছে। দুধওয়া বাদে অন্যান্য জায়গায় নিজেদের রেশন নিয়ে যেতে হবে।
মরসুমঃ- ১৫ই নভেম্বর থেকে ১৫ই জুন পার্ক খোলা থাকে। বেড়ানোর ভালো সময় ডিসেম্বর থেকে মার্চ।

Album

  • To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

    For any queries/complaints, please contact admin@amaderchhuti.com
    Best viewed in FF or IE at a resolution of 1024x768 or higher