Home Page
Current Issue
Archive
Travel Plans
Trekking Routemap
Tips
Explore
Rail
Air travel
Other Websites

Feedback




hit counters
hit counter

পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)

"বাংলা দেশটা ভারতবর্ষের কটিদেশে হওয়াতে এখানে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটেছে – বাংলার উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এটা ভারতবর্ষের আর কোনও প্রদেশে নেই। এটা নাকি একটা 'অ্যাক্সিডেন্ট অফ জিয়োগ্রাফি'। এত বৈচিত্র্য আর কোনও একটা প্রদেশে পাবি না', বলে ফেলুদা। 'শস্য-শ্যামলাও পাবি, রুক্ষতাও পাবি, সুন্দরবনের মতো জঙ্গল পাবি, গঙ্গা পদ্মা মেঘনার মতো নদী পাবি, সমুদ্র পাবি, আবার উত্তরে হিমালয় আর কাঞ্চনজঙ্ঘাও পাবি।"

'দার্জিলিং জমজমাট' – সত্যজিৎ রায়

সত্যি, পশ্চিমবঙ্গের মতো এত বৈচিত্র্য ভারতবর্ষের অন্য কোনো রাজ্যেই নেই। এর একেক অংশ একেকরকম।

উত্তরবঙ্গ (North Bengal)

বাঙালির হাতের কাছের পাহাড় মানেই উত্তরবঙ্গ। খুব ঠান্ডার সময়টুকু বাদ দিলে যে কোনও সময়ই এখানে বেড়ানোর মরসুম।
শিলিগুড়ি(Siliguri) – উত্তরবঙ্গ আর সিকিমের দরজা শিলিগুড়ি। তাই বেড়ানোর জায়গা হিসেবে তেমন জনপ্রিয় না হলেও পূর্ব হিমালয় ও তার পাদদেশের অঞ্চলগুলিতে বেড়ানোর জন্য শিলিগুড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। শিলিগুড়ি থেকে উত্তরবঙ্গ, ডুয়ার্স, সিকিমের নানান অংশে যাওয়ার জন্য বাস, ভাড়া গাড়ি, জিপ, ল্যান্ডওভার পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিমানবন্দর বাগডোগরার অবস্থানও শিলিগুড়িতে।
শিলিগুড়িতে এসে অধিকাংশ মানুষই যেখানে একবার ঢুঁ মারবেনই সেটা হল বিদেশি পণ্যের বাজার হংকং মার্কেট
১৮ কিমি দূরে মহানন্দা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারি
যাওয়া – নিকটবর্তী স্টেশন শিলিগুড়ি (SGUG) ও নিউ জলপাইগুড়ি (NJP)। নিকটতম বিমানবন্দর বাগডোগরা ।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বড় শহর থেকে শিলিগুড়ির বাস পাওয়া যায়। সিকিম, অসম, ঝাড়খন্ড, বিহার ইত্যাদি রাজ্যের সঙ্গেও এন বি এস টি সি-র বাস সার্ভিস রয়েছে।
থাকা – শিলিগুড়িতে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের মৈনাক ট্যুরিস্ট লজ। আর শহর জুড়েই রয়েছে নানান মান ও দামের বেসরকারি হোটেল। এছাড়া বেশ কয়েকটি ধরমশালাও রয়েছে। পি ডব্লু ডি-র বাংলো, মিউনিসিপাল পান্থনিবাস ও ইয়ুথ হোস্টেলেও থাকা যায়।
দার্জিলিং (Darjeeling) – পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের অন্যতম শৈলশহর সুন্দরী দার্জিলিং পাহাড়ের রানি নামে সমধিক পরিচিত। চিরহরিত অরণ্যে ছাওয়া সবুজ পাহাড়ের মাথায় রুপোর মুকুটের মতো জ্বলজ্বল করে কাঞ্চনজঙ্ঘা। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত তাতে এঁকে দেয় সোনারঙ। তুলোর মতো মেঘের রাশি ভিজিয়ে দেয় শরীর। সত্যজিতের সিনেমায়, অঞ্জন দত্তের গানে আজও দার্জিলিংকে ঘিরে বাঙালির নস্টালজিয়া অমলিন।
দার্জিলিংয়ের মূল আকর্ষণ ম্যল। ঘোড়ায় চড়া, কফিশপে আড্ডা, বুকশপে ঢুকে বইয়ের পাতা নাড়াচাড়া করা অথবা স্রেফ ম্যলের কাঠের বেঞ্চিতে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর মেঘ-রোদ্দুরের খেলা দেখতে দেখতেই সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। ম্যল লাগোয়া অবজারভেটরি হল আর মহাকাল গুহা। স্টেশন থেকে ম্যল যাওয়ার পথের দুপাশে পসরা নানান নিয়ে বসেছে দোকানিরা। ম্যল থেকে হাঁটাপথেই পৌঁছে যাওয়া যায় দার্জিলিং চিড়িয়াখানায়। পরিচিত নাম পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক। সাইবেরীয় বাঘ, স্নো-লেপার্ড, তিব্বতীয় নেকড়ে, হিমালয়ের কালো ভাল্লুক, রেড পান্ডার মতো বিরল সব প্রাণীর দেখা মিলবে এখানে। চিড়িয়াখানার ভিতরেই রয়েছে হিমালয়ান নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। পাশেই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। চকবাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে আশপাশের দ্রষ্টব্যগুলি দেখে নেওয়া যায়। বাজারের গায়েই লয়েড বোটানিক্যাল গার্ডেন। লেবং কার্ট রোডে টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টার। এখানে তিব্বতীয় হস্তশিল্পের শো-রুমটি অবশ্য দ্রষ্টব্য। শহর থেকে ২ কিমি দূরে হ্যাপি ভ্যালি টি এস্টেট। দার্জিলিং রেল স্টেশনের পাশেই কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরের আদলে তৈরি বীরধাম মন্দির।
দার্জিলিং থেকে ১০ কিমি দূরে কৃত্রিম লেক সিঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সিঞ্চল গেম স্যাংচুয়ারি। ওক, কাটুস, কাপাসি, কাওলার অরণ্যের বাসিন্দা বার্কিং ডিয়ার, বুনো শুয়োর, কালো ভাল্লুকেরা। বিশ্বের সর্বোচ্চ গল্ফ কোর্সটি এই সিঞ্চলেই। সিঞ্চল থেকে দার্জিলিং শহরে জল সরবরাহ হয়। সিঞ্চলের ২ কিমি দূরে ঘুম দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন। দার্জিলিং থেকে দূরত্ব ৮ কিমি। এখানে রয়েছে তিব্বতীয় গোলুকপা সম্প্রদায়ের বৌদ্ধদের ইয়াগা চোলিং মনাস্ট্রি ও হলুদ টুপি বৌদ্ধদের সানতেন চোলিং মনাস্ট্রি। ফেরার পথে দেখে নেওয়া যায় সোনাদা মনাস্ট্রি। ঘুম থেকে ৩ কিমি দূরে বাতাসিয়া লুপ। এখানে পাহাড়কে বেড় দিয়ে টয়ট্রেনের রেললাইন চলে গেছে। বাতাসিয়া লুপের মাঝখানেই ওয়ার মেমোরিয়াল।
দার্জিলিং শহর থেকে ১২ কিমি দূরে ঘুম হয়ে পথ গিয়েছে রক গার্ডেন। পাহাড় থেকে নেমে আসা চুন্নু ফলসকে ঘিরে সাজানো বাগান।
দার্জিলিং-এর অন্যতম আকর্ষণ টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখা। দার্জিলিং থেকে ১১ কিমি দূরে টাইগার হিল। পর্যটক মরসুমে প্রতিদিন ভোর ৪টের সময় দার্জিলিং থেকে টাইগার হিল ট্যুরের গাড়ি যায়। নিজেরাও গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে আসা যায়। সূর্যের প্রথম আলোয় রঙিন হয়ে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু, মাকালু প্রভৃতি তুষারশৃঙ্গগুলি।
যাওয়া – নিকটতম রেলস্টেশন শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহর থেকে বাসেও পৌঁছনো যায় শিলিগুড়ি। বিমানে এলে বাগডোগরায় নামতে হবে।
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং ৮০ কিমি। শেয়ার জিপ বা গাড়িভাড়া করে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পৌঁছনো যায়। বাসও যাচ্ছে। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের হেরিটেজ টয়ট্রেনে চড়েও দার্জিলিং যাওয়া যায়।
দার্জিলিং শহরের আশপাশে ঘোরার জন্য মরসুমে ডি.জি.এইচ.সি. কন্ডাক্টেড ট্যুরের ব্যবস্থা করে। টয় ট্রেনের জয় রাইডেও বেড়িয়ে নেওয়া যায় দার্জিলিং থেকে ঘুম।
থাকা – দার্জিলিং-এ পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের দার্জিলিং ট্যুরিস্ট লজ। দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলের ম্যাপেল লজ ও লুইস জুবিলি লজ। দার্জিলিং-এ বেনফিসের হোটেল হিমালয়।
এছাড়াও দার্জিলিংএ শহর জুড়েই নানান মান ও দামের বেসরকারি হোটেল এবং হলিডে হোম রয়েছে।
দার্জিলিং-এর এস টি ডি : ০৩৫৪
কেনাকাটা – দার্জিলিং-এর চা পৃথিবী বিখ্যাত। আর রয়েছে হরেক রকম গরম পোশাক। ম্যল লাগোয়া চৌরাস্তা জুড়ে পসরা নিয়ে বসেছে দোকানীরা। কিউরিও শপ থেকে সংগ্রহ করা যায় নানান মূর্তি, কুকরি, পাথরের মালা এইসব। স্থানীয় পোশাকও কেনা যায় স্মারক হিসেবে।
|| ভ্রমণ কাহিনি - মেঘ কুয়াশায় একা একা এলোমেলো ||

মিরিক(Mirik) – শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে ছোট্ট শৈলশহর মিরিক। শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব ৫২ কিমি, দার্জিলিং থেকে দূরত্ব ৪৯ কিমি।
টলটলে জলের লেক আর পাহাড়ি ঝোরা নিয়ে মনোরম মিরিক। লেকের জলে কাঞ্চনজঙ্ঘার রুপোলি ছায়া। লেককে ঘিরে সাজানো বাগান। পাহাড়ের ঢালে কমলা, এলাচ, পাইন আর অর্কিডের সবুজ অরণ্য। বাসস্ট্যান্ডের বিপরীতে মিরিক গুম্ফা। ২ কিমি দূরে খার্বো চা বাগিচা ও দেবী সিংহলীলার মন্দির।
দার্জিলিং থেকে ১৫ কিমি দূরে জোড়পোখরি। আর ১৯ কিমি দূরে সবুজে মোড়া স্বপ্নের দেশ লেপচাজগত
যাওয়া – শিলিগুড়ি বা দার্জিলিং থেকে ভাড়া গাড়ি, শেয়ার জিপ বা বাসে পৌঁছে যাওয়া যায় মিরিক।
থাকা – ডি জি এইচ সি-র ট্যুরিস্ট হোটেল আর ডে সেন্টার রয়েছে মিরিকে। জেলা পরিষদের ডাকবাংলোও আছে। আর আছে বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল। ব্লু লেগুন হোটেলটির বুকিং পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর থেকে করা যায়। জোড়পোখরিতে ডি জি এইচ সি-র ট্যুরিস্ট লজ আছে। লেপচাজগত-এ থাকার জন্য রয়েছে বনবিভাগের নেচার এডুকেশন অ্যান্ড ওয়াইল্ডারনেস রিসর্ট।
কার্সিয়াং (Kurseong) – ১৪৫৮ মিটার উচ্চতায় পাইন, ফার, বার্চে ছাওয়া মনোরম স্বাস্থ্যনিবাস কার্সিয়াং। শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব ৪৮ কিমি। পাহাড়ের ঢালে চা বাগিচা। সবুজের মাঝে পাহাড়ি কাঠের বাড়ির বারান্দা আলো করে থাকে রংবেরঙের ফুল। নির্মেঘ আকাশে জেগে থাকে রুপোলি চূড়া। ভিউ পয়েন্ট ঈগলস ক্র্যাগ থেকে মনোরম সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। শহিদ স্মারক ও জলাধার এখানেই। ১২ কিমি দূরে ডাউহিলে রয়েছে ফরেস্ট মিউজিয়াম, ডিয়ার পার্ক, মিনি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক। ২ কিমি দূরে গিদ্দাপাহাড়ে নেতাজী মিউজিয়াম। ৪ কিমি দূরে বিখ্যাত মকাইবাড়ি টি এস্টেট। ভারতের বেশ কয়েকটি সেরা স্কুলও রয়েছে এই কার্সিয়াং-এ।
যাওয়া – শিলিগুড়ি-দার্জিলিং পথে বাসে বা জিপে দার্জিলিং-এর ৩২ কিমি আগে কার্সিয়াং। শিলিগুড়ি-দার্জিলিং টয়ট্রেনও কার্সিয়াং-এ থামে।
থাকা – থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের কার্সিয়াং ট্যুরিস্ট লজ। এছাড়াও বেশ কিছু প্রাইভেট লজ আছে।
কালিম্পং(Kalimpong) – শিলিগুড়ি থেকে ৬৯ কিমি ও দার্জিলিং থেকে ৫১ কিমি দূরে ১২৫০ মিটার উচ্চতায় ফুল আর অর্কিডের দেশ শান্ত-স্নিগ্ধ কালিম্পং। কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও এখান থেকে পানডিম, সিনিয়লচু, কাব্রু, জানু ইত্যাদি একের পর এক বরফে ঢাকা শিখর দৃশ্যমান।
শহর থেকে ৩ কিমি দূরে পাহাড়ের মাথায় সবুজ বাগানে সাজানো দেলো। দেলোপাহাড়ে রয়েছে থারপা চোলিং গুম্ফা। রংবেরঙের ফুলগাছ আর সবুজ ঘাসের লন নিয়ে কাঠের বাংলোবাড়ি দেলো ট্যুরিস্ট লজ। পাহাড়ের কিনারায় ভিউপয়েন্ট। দেলোর ওপরেই দেলো জলাধার বা নেওড়াখোলা জলপ্রকল্প। এখান থেকেই শহরে জল সরবরাহ করা হয়। পথেই পড়ে স্কটিশ মিশনারি ড. জন অ্যান্ডারসন গ্রাহামসের প্রতিষ্ঠিত অনাথ আশ্রম গ্রাহামস হোম
শহরের অপরপ্রান্তে ২ কিমি দূরে দুরপিনদারা পাহাড়। এখানে রয়েছে জংডং পালরি ফোব্রাং গুম্ফা। গুম্ফার কাছেই জেলেপলা ভিউপয়েন্ট। এখান থেকে পাহাড়ের ঢালে মিলিটারিদের গল্ফকোর্স, পাহাড়ের নিচে বয়ে চলা তিস্তা, রিয়াং, রেত্রি নদী দেখা যাবে।
কালিম্পং-এর অন্যান্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে রয়েছে তংসা মনাস্ট্রি, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত গৌরিপুর হাউস, চিত্রভানু আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফট সেন্টার, মঙ্গলধাম মন্দির, কালীমন্দির ও বনদপ্তরের নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার।
অর্কিডের শহর কালিম্পং-এ নানান জাতের অর্কিড আর ক্যাকটাস দেখতে যেতে হবে পাইন ভিউ নার্সারি, শান্তিকুঞ্জ নার্সারি, নার্সারি ম্যানসন হেভেন প্রভৃতি শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন নার্সারিতে।
যাওয়া – শিলিগুড়ি বা দার্জিলিং থেকে বাস বা ভাড়া গাড়িতে কালিম্পং পৌঁছান যায়।
থাকা – পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের বিলাসবহুল মরগান হাউস ট্যুরিস্ট লজটি দুরপিন পাহাড়ে। এদেরই হিল টপ ট্যুরিস্ট লজও। আর আছে বনদপ্তরের বাংলো, ইয়ুথ হস্টেল ও ডি জি এইচ সি-র দেলো ট্যুরিস্ট লজ ও দুরপিনদারায় ট্র্যাডিশনাল টি হাউস। রয়েছে বেনফিশের হোটেল অর্কিড। এছাড়াও নানান মান ও দামের হোটেল রয়েছে শহর জুড়ে।
কালিম্পং-এর এস.টি.ডি. কোড ০৩৫৫২
লাভা-লোলেগাঁও-রিশপ(Lava-Lolegaon-Rishap) – কালিম্পং থেকে গাড়িভাড়া করে কাছেপিঠে বেশ কয়েকটি স্পটে ঘুরে নেওয়া যায়। লাভা ও লোলেগাঁও-এ বাসও যাচ্ছে। ট্রেকিং-এ আগ্রহীরাও এ পথে যে কোনও স্পটেই ট্রেক করে যেতে পারেন।
লাভা(Lava) – কালিম্পং থেকে ৩৪ কিমি দূরে ২১০০ মি উচ্চতায় সবুজে ছাওয়া পাহাড়ি গ্রাম লাভা। বাসস্ট্যান্ডের থেকে একটু নেমে বাজারচত্বর। ঢালু পথ চলে গেছে লাভার গুম্ফা চত্বরে। গুম্ফাচত্বর থেকে শ্বেতশুভ্র হিমালয় দৃশ্যমান। টিফিনদাঁড়া ভিউপয়েন্ট থেকে হিমালয়ে অপরূপ সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করা যায়। লাভার আর এক দ্রষ্টব্য নেওড়া ভ্যালি নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। ১৪ কিমি দূরে ছাঙ্গে ফলস। শহর থেকে উত্তর-পূর্বে ১৪ কিমি দূরে নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক। চেদি ফেরি পর্যন্ত গাড়ি যায়। জঙ্গল দর্শনের জন্য অনুমতিপত্র মিলবে লাভায় ফরেস্ট লজ সংলগ্ন অফিস থেকে। ১৩ কিমি দূরে ঘন সবুজ পাহাড় আর ছবির মতো কাঠের বাড়িঘর নিয়ে মেঘে ঢাকা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম রিকিসম
কালিম্পং থেকে লাভার পথে ১৮ কিমি দূরে পাহাড়ি গ্রাম চুমারচিন ছুঁয়ে আরও ৪ কিমি এগিয়ে ওক, পাইন, বার্চ, দেবদারু ছাওয়া পাহাড়ি শান্ত জনপদ পেডং। দ্রষ্টব্য পেডং মনাস্ট্রি, ডামসিং দুর্গ, সেন্ট জর্জেস স্কুল।
থাকা – লাভাতে ডি জি এইচ সি-র ট্যুরিস্ট লজ ও বন দপ্তরের কটেজ আছে। রয়েছে বেশ কয়েকটি হোটেলও। অর্কিড হোটেলটির বুকিং পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর থেকে করা যায়।
লোলেগাঁও(Lolegaon) – কালিম্পং থেকে লাভার ২ কিমি আগে ডানহাতি পথে ২০ কিমি যেতে ধূপি, দেওদার, পাইন গাছে ছাওয়া পাহাড়ি গ্রাম লোলেগাঁও, স্থানীয় নাম কাফের। ছোট্ট বাসস্ট্যান্ড ঘিরেই বাজার বসে। বাজার আর বাসস্ট্যান্ডের মাঝখান দিয়ে রাস্তা গেছে হেরিটেজ জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলে ক্যানোপি ওয়াকের ব্যবস্থা রয়েছে। বাসস্ট্যান্ড থেকে ৪ কিমি দূরে ঝান্ডিদাঁড়া ভিউপয়েন্ট। ঝান্ডিদাঁড়া থেকে হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা, শিম্ভো, কাবরু, জোপুনো, পান্ডিম, সিনিয়লচু তুষারশৃঙ্গ দেখা যায়।
দার্জিলিং জেলার লোলেগাঁও রেঞ্জে নতুন বেড়ানোর ঠিকানা নিমবং, চারখোল, রেশিখোলা, সামতাহার, কাফেরভিলেজ, চুইখিম। এই সবকটি জায়গাই কিন্তু অ্যালকোহল-ফ্রি জোন।
থাকা – লোলেগাঁও-এ ডি জি এইচ সি-র ট্যুরিস্ট লজ, বন দপ্তরের বাংলো আর কটেজ আছে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি হোটেল আছে বাজারের আশেপাশে। লাভলি রিসর্ট-এর বুকিং করা যায় পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর থেকে।
রিশপ(Rishap) – লাভা থেকে ১১ কিমি দূরে পাইন, ধূপিতে ছাওয়া ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম রিশপ। উচ্চতা ৪,৩১০ মিটার। রিশপ থেকে হিমালয়ের শোভা অতুলনীয়। আকাশজুড়ে একের পর এক – সিঙ্গলীলা, কাবরু, কাঞ্চনজঙ্ঘা – বরফাবৃত শৃঙ্গের সারি। অপরূপ সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত। দেড় কিলোমিটার ট্রেক করে পৌঁছান যায় টিফিনদাঁড়া ভিউপয়েন্টে।
থাকা – রিশপে বেশ কিছু হোটেল ও রিসর্ট আছে। লোলেগাঁও রিসর্টটি পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর থেকে বুকিং করা যায়।
সান্দাকফু (Sandakphu) – ট্রেকারদের স্বর্গ সন্দকফু। দার্জিলিং থেকে ৫৮ কিমি দূরে ৩৬৫৮ মিটার উঁচুতে নির্জন সান্দাকফু –পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম স্থান। সামনে উন্মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তে চলে রঙের খেলা। মেঘের ঘোমটা ঢেকে দেয় শ্বেতশুভ্র হিমালয়। এপ্রিল-মে মাসে রডোডেনড্রন, ম্যাগনোলিয়া, মন্দার, চিমল – পাহাড়ি ফুলে ঢেকে যায় সান্দাকফু। এখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও এভারেস্ট মাকালু, পান্ডিম, নরসিং, নাপসে, কোকতাং প্রভৃতি একের পর এক হিমালয়ের শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গগুলি নজর কাড়ে।
যাওয়া – চড়াই উতরাই পথে পায়ে চলাই সবচেয়ে ভালো উপায়। দার্জিলিং থেকে বাসে বা গাড়িতে ঘুম, লেপচাজগত, সুখিয়াপোখরি হয়ে পাহাড়ের কোলে মানেভঞ্জন-এ বিশ্রাম। পরদিন সকালে ট্রেকিং শুরু। মেঘমা, টুমলিং/টংলু , জৌবাড়ি হয়ে গৈরিবাসে রাত্রিবাস। এখান থেকেই শুরু হচ্ছে সিংগালিলা ন্যাশনাল পার্ক। গৈরিবাস থেকে চড়াই পথে কালপোখরি হয়ে বিকেভঞ্জন। বিকেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু ৪ কিমি দূরে। ফেরার পথে গুরদুম-শ্রীখোলা হয়ে রিম্বিক ও বিজনবাড়ি দেখে দার্জিলিং-এর পথ ধরা যায়। একটু সময় হাতে থাকলে যাওয়ার সময় ১ম রাত টুমলিং, ২য় রাত কালপোখরি-তে কাটিয়ে ৩য় দিন সন্দকফু পৌঁছোনো যায়। ল্যান্ডরোভার বা জিপেও সান্দাকফু ঘুরে আসা গেলেও গুরদুম- শ্রীখোলা অদেখাই থেকে যাবে।
থাকা– পি ডব্লু ডি বাংলো, পর্যটন দপ্তরের ট্রেকার্স হাট, ইয়ুথ হস্টেল, ফরেস্ট বাংলো, ডি জি এইচ সি-র হাট, সানরাইজ হোটেল, শেরপা শ্যালে হোটেল রয়েছে সান্দাকফুতে। মানেভঞ্জন-এ বনবাংলো, ট্রেকার্স হাট, ইয়ুথ হোস্টেল ও কয়েকটি প্রাইভেট লজ আছে। টুমলিং-এ বেসরকারি লজ, টংলু-তে ট্রেকার্স হাট, গৈরিবাসে বনবাংলো, ট্রেকার্স হাট ও ইয়ুথ হোস্টেল রয়েছে। শ্রীখোলায় থাকার জন্য রয়েছে ডি জি এইচ সি-র ট্রেকার্স হাট ও কয়েকটি প্রাইভেট লজ। রিম্বিকে বেসরকারি হোটেল এবং বিজনবাড়িতে পি ডব্লু ডি বাংলো, ফরেস্ট বাংলো বা বেসরকারি হোটেলে থাকতে হবে।
ফালুট (Falut) – সান্দাকফু থেকে ২৩ কিমি দূরে ৩৬০০ মিটার উচ্চতায় ফালুট। হিমালয়ের অপরূপ শোভার জন্যই ফালুটের খ্যাতি। মেঘ না থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এভারেস্ট দুই শৃঙ্গই দৃশ্যমান। ফালুটের সূর্যোদয়-সূর্যাস্তও ভারী মনোরম। ফালুট যাওয়ার পথেই পড়বে সবুজে ঢাকা উপত্যকা সামানদেন। রডোডেনড্রন, ম্যাগনোলিয়া, ফার, ওক ছাওয়া পথে বেড়িয়ে নেওয়া যায় রামাম আর সিংগালিলা পাস।
যাওয়া – সান্দাকফু থেকে পায়ে হেঁটে বা জিপে ফালুট পৌঁছান যায়।
থাকা – ফালুটে ডি জি এইচ সি-র ট্রেকার্স হাট ও ইয়ুথ হোস্টেল আছে। পথে সামানদেন, মোলে ও রামাম-এ থাকার ব্যাবস্থা আছে।
প্রয়োজনীয় – সান্দাকফু -ফালুট ট্রেকিং করলে মানেভনজং থেকেই পোর্টার, গাইড পাওয়া যায়।

|| সান্দাকফু - ফালুট ট্রেক রুট ম্যাপ ||

|| ভ্রমণকাহিনি - পায়ে পায়ে পাহাড়ে || সান্দাকফু – চেনা পথে ফিরে আসার গল্প || || সান্দাকফুর টানে |||| সান্দাকফুর পথে যেতে যেতে ||

মংপু (Mongpu) – রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত মংপু ভূগোল বইতেও ঠাঁই করে নিয়েছে সিঙ্কোনা চাষের জন্য। ৩৭৫৯ ফুট উচ্চতায় ছোট্ট পাহাড়ি শহর। দূরত্ব কালিম্পং থেকে ৩৮, দার্জিলিং থেকে ৫৭ ও শিলিগুড়ি থেকে ৪৯ কিমি। এইখানেই মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়িতে বসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত ‘জন্মদিন’ কবিতাটি লেখেন। রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাটানোর দিনগুলি নিয়ে মৈত্রেয়ী দেবী রচনা করেন ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’।
মংপু থেকে ১৩ কিমি নিচুতে শাল, সেগুন, অর্জুনে ছাওয়া পাহাড় থেকে নেমেছে কালিঝোরা। ঝোরার নামেই জায়গার নাম। কালিঝোরা বাজার থেকে খাড়াই পথ গিয়েছে ১৬ কিমি দূরে ৪০০০ ফুট উঁচু লাটপাঞ্চারে। আরও এগিয়ে মহানন্দা অভয়ারণ্য। লাটপাঞ্চারের ২কিমি দূরে থানসেরিদাঁড়া ভিউপয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও অন্যান্য তুষারশৃঙ্গ নয়নাভিরাম। মংপু থেকে ৩ কিমি দূরে পাহাড়ে ঘেরা সবুজ ইকো ভিলেজ তিনচুলে। এখান থেকে হিমালয়ের অপরূপ শোভা প্রত্যক্ষ করা যায়।
থাকা – মংপুতে পি ডব্লু ডি ও সিঙ্কোনা প্ল্যানটেশনের বাংলো আছে। কালিঝোরায় পি ডব্লু ডি বাংলো আছে। লাটপাঞ্চারে আছে লাটকুঠি বনবাংলো।
কোচবিহার (Coochbehar) – ঐতিহাসিক শহর কোচবিহার। শহর জুড়ে একের পর এক হেরিটেজ বিল্ডিং আর অসংখ্য দিঘি। যার মধ্যে প্রধান আকর্ষণ বিশাল রাজপ্রাসাদ। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের রাজত্বকালে ১৮৮৭ সালে ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাসাদটি নির্মিত হয়। বর্তমানে প্রাসাদের এক অংশে সংগ্রহশালা।
কোচবিহার শহর পুরোটাই তোর্সা নদীর তীরে অবস্থিত। পরিকল্পিত শহর হওয়ার সুবাদে অতি সুন্দর ও পরিষ্কার। বড় বড় গাছের সমারোহ, তার মধ্যে দিয়ে প্রশস্ত রাজপথ, প্রমোদ উদ্যান, বড় বড় দীঘি দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দ্রষ্টব্য বস্তুর মধ্যে মহারাজার রাজপ্রাসাদ, রানীর বাগান, ভিক্টোরিয়া কলেজ, গ্রন্থাগার এবং অবশ্যই মদনমোহন এবং অসংখ্য ছোটো বড়ো মন্দির মসজিদ, সাগরদিঘি, বড়দেবী মন্দির, ইন্ডোর স্টেডিয়াম, নরেন্দ্রনারায়ণ পার্ক প্রভৃতি। কাছেপিঠেই প্রাচীন জনপদ গোসানিমারি, বৈষ্ণবতীর্থ মধুপুর ধাম, বাণেশ্বর শিবমন্দির আর রসিকবিল পাখিরালয়।
কোচবিহার জেলার সুরম্য রাজপ্রসাদ ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে মহাজার প্রাণনারায়ণের নির্মিত। ইমারতের চূড়ায় ধাতু নির্মিত গম্বুজ আছে। প্রাসাদটিতে ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতি লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রাণনারায়ণ কর্তৃক নির্মিত রাজপ্রাসাদ ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে গেলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ বর্তমান প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন। প্রাসাদে ওঠার জন্য পাঁচটি সিঁড়ি আছে। গম্বুজের চূড়া পর্যন্ত সিঁড়িটি কারুকার্য শোভিত। ইতালীয় স্থাপত্যকলা অনুসারে অলংকরণ সমৃদ্ধ এই মন্দিরটি পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণীয় সম্পদ। মন্দির নির্মাণ ক্ষেত্রে প্রাণনারায়ণের রাজত্বকাল কোচবিহারের স্বর্ণযুগ। ইনি ছাড়া কোচবিহারের আর কোন রাজা এত অধিক সংখ্যক মন্দির নির্মাণ করতে সক্ষম হননি। তাঁর রাজত্বকালে যে সমস্ত মন্দির নির্মিত হয়েছিল তন্মধ্যে হিরণ্যগর্ভ, আনন্দময়ী, নৃসিংহ ঠাকুর, সিদ্ধেশ্বরী, বাণেশ্বর, ক্রোটেশ্বর শিবমন্দির, বামাকালী ঘূর্ণেশ্বরী প্রভৃতি মন্দির উল্লেখযোগ্য।
কোচবিহারের বিখ্যাত মন্দিরগুলির মধ্যে বাণেশ্বর শিবমন্দির অন্যতম। মন্দিরটির উত্তরদিকে অবস্থিত একটি চালামন্দির ত্রিরথ; সিংহাসনের শীর্ষে পদ্মের উপর শিবমূর্তির উপবিষ্ট বিগ্রহ ও এক অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি অধিষ্ঠিত। পিতলের মূর্তি উচ্চতায় ৬ ইঞ্চির মতো। অর্ধনারীশ্বরের অর্থাৎ শিবদুর্গার সম্মিলিত পৌরাণিক রূপ বাণেশ্বর বলেও আখ্যাত। মূর্তির ডানদিকে শিবের জটা আর বামদিকে দুর্গার মাথায় অর্ধ পদ্মাকৃতি মুকুট দেখা যায়। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে নানা মতবাদ চালু আছে। কেউ বলেন বাণরাজা কেউ বলেন রাজা জল্পেশ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে মহারাজা প্রাণনারায়ণই ইঁটের প্রাচীর ঘিরে মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন। কিংবদন্তি অনুসারে দৈত্যরাজ বাণাসুর বাহুবলে স্বর্গরাজ্য অধিকার করে দেবতাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাণাসুর ছিলেন শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। দেবতাদের দুর্দশা দেখে তিনি বাণাসুরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বর্গরাজ্য দেবতাদের ফিরিয়ে দিতে। বাণাসুর একটি শর্তে স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন সেটি হল যদি তাঁর উপাস্য দেবতা এই স্থানে অধিষ্ঠান করেন। সেই সময় থেকেই বাণেশ্বর শিবের প্রতিষ্ঠা। এই মন্দিরটি উচ্চতায় ৪০ ফুট, গম্বুজাকৃতি, বাঁকানো কার্নিশ এবং মন্দিরটি পশ্চিমমুখী। মন্দিরের গর্ভগৃহটি মাটির সমতল থেকে ৭ ফুট নীচে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয়। প্রধান দরজার উপরে খিলান বহুমুখী এবং ছুঁচালো। খিলানের উপরে লহরা, তার উপর বেঁকি। উপরে পর পর গম্বুজ, পদ্ম, পলকাটা আমলক, কলস ও ত্রিশূল স্থাপিত। মন্দিরের অভ্যন্তরে কালো পাথরের শিবলিঙ্গ এবং গৌরীপট্ট প্রতিষ্ঠিত। পাশেই আরেকটি মূর্তি রয়েছে দুহাতে ত্রিশূল নিয়ে। দেবী চণ্ডীর পিতলের মূর্তি। পাশে রয়েছে পাথরের তৈরি একটি ছোটো বিষ্ণুপট্ট, তাতে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা, যমুনা মূর্তি খোদিত।
বাণেশ্বর শিবপূজা উপলক্ষে শিব চতুদর্শীতে মহাসমারোহে পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সপ্তাহব্যাপী মেলা চলে। বাণেশ্বর শিবমন্দিরের মত একই উচ্চতাবিশিষ্ট গম্বুজাকৃতি আরেকটি মন্দির সহজেই নজর কাড়ে তা হল সিদ্ধেশ্বরী মন্দির। ইটের তৈরী ৩২ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট মন্দিরটি আটচালা এবং গম্বুজ শোভিত। এহেন মন্দির কোচবিহারে আর নেই বললেই চলে। গম্বুজের উপর প্রথাগত ভাবে পদ্ম, আমলক, কলস ও ত্রিশূল দেখা যায়। মন্দিরের প্রবেশপথ থেকে গর্ভগৃহ ৫ ফুট নীচে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে হয়। মূল মন্দিরের প্রবেশদ্বার দিয়ে সিঁড়িপথে কয়েক ধাপ অবতরণ করলে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর আসন নজরে পড়ে। চতুর্ভুজা ধাতুময়ী ক্ষুদ্র সিদ্ধেশ্বরী কালিকা পদ্মের ওপর উপুড়ভাবে শায়িত শবরূপী শিবের পিঠের ওপর উপবিষ্টা। ওপরে দুহাতে রয়েছে কর্তরী ও খড়্গ নীচের দুহাতে রয়েছে দর্পণ এবং অভয়মুদ্রা। দেবীর ভৈরব হল সিদ্ধেশ্বর। দেবীকে কালী জ্ঞানে পূজা করা হয় থাকে।
সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের দক্ষিণ পাশে বৃক্ষরূপিনী কামাক্ষ্যা দেবীর থান আছে। একটি প্রাচীন কামরাঙা বৃক্ষই দেবীর প্রতীক এবং পীঠস্থান রূপে পরিগণিত। পূর্বে আসামের অন্তর্গত এবং পরে কোচবিহারের অধীন এই কামাক্ষীয় মন্দির বিখ্যাত। কিংবদন্তি অনুযায়ী, কামরূপের পৌরাণিক রাজা নরকাসুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। প্রাচীন পৌরাণিক উপাখ্যানে দেখা যায়, বর্তমান কোচবিহার, গোয়ালপাড়া, আসাম অঞ্চলে নরকাসুরের পুত্র ভগদত্ত রাজত্ব করতেন। এই ভগদত্তের বংশে রাজা ভাস্করবর্মনের জন্ম। এই বংশের বিলুপ্তির পর কোচবিহার অঞ্চলটি রাজা ধর্মপাল অধিকার করেছিলেন। পরতবর্তীকালে এর ধ্বংসাবশেষের উপর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা নরনারায়ণ দুটি নাটমন্দির পঞ্চরত্নসমেত ইঁটের পরিখা দ্বারা বেষ্টিত বর্তমানের এই কামাক্ষীয় মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরাভ্যন্তরে ভগবতী মূর্তি।
হোসেন শাহের আক্রমণে এবং পরবর্তী সময়ে ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে কালাপাহাড় কামরূপ সহ কোচবিহার আক্রমণের সময় কামতেশ্বরী মন্দির সম্পূর্ণরূপে বিনিষ্ট হয়ে পড়েছিল। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা প্রাণনারায়ণ বর্তমান কামতেশ্বরী মন্দিরটি পুননির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরটির চারিদিকে সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। প্রধান ফটক দিয়ে মন্দির প্রাঙ্গনে প্রবেশ করতেই প্রথম দেলাভিটা, গারোদঘর (ধনাগার) এবং হোমগৃহের পরেই কামতেশ্বরী দেবীর মূল পাকা মন্দির। মন্দিরের অভ্যন্তরে দেবীর সিংহাসনের উত্তরপাশে সূর্যমূর্তি এবং পৃথক চৌকিতে মহাদেব, নারায়ণ, গোপাল ও ব্রহ্মার মূর্তি স্থাপিত আছে। মন্দির প্রাঙ্গণের উত্তর পূর্বকোণে একটি মন্দিরে মহাদেব ও লক্ষ্মীনারায়ণ এবং দক্ষিণ পশ্চিমকোণে একটি মন্দিরে তারকেশ্বর শিব বিদ্যমান। রাজা প্রাণনারায়ণ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করলেও কোনো মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন নি। মূর্তির পরিবর্তে কবচ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঐ কবচ যে রৌপ্য কৌটায় আবদ্ধ ছিল তার ওপরে ভগবতীর মূর্তি অঙ্কন করেছিলেন। কৌটার অভ্যন্তরে রক্ষিত বস্তু কেউ দেখতে পাননি এমনকি পূজারীও নন। পরবর্তিকালে কবচরূপী দেবী অপহৃত হলে শূন্য সিংহাসনকে পূজা করা হয়ে থাকে। প্রতিবছর বৈশাখ মাসে সারা মাসব্যাপি বিশেষ সমারোহের সঙ্গে পূজাপাঠ, হোম ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া আরো কিছু কিছু দুর্গ যেমন ফেঙ্গয়াগড়, বৈদ্যেরগড়, বিক্রমরাজার গড়, প্রতাপগড়, কামতাপুর দুর্গ, বারোপাইকের গড়, বিশ্বসিংহের কেল্লা, চিলারায় (শুক্লধ্বজ) কোট ইত্যাদি সম্ভবত খ্রিস্টিয় পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত। এদের মধ্যে চিলারায়ের কোট এবং কামতাপুর দুর্গ উল্লেখ করার দাবি রাখে। চিলারায়ের কোট হল মাটি-ইঁট-চুন মেশানো উঁচু পাঁচিলঘেরা এক গড়। উত্তর-দক্ষিণে ৮৪ মিটার বিস্তৃত। দুর্গের ঘরগুলি ছিল বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তৈরি। দুর্গের মধ্যে ছিল অন্দরমহল। তাই স্থানের নাম হয় অন্দরান ফুলবাড়ি। নীলধ্বজ নির্মিত কামতাপুর দুর্গ মাটির পাঁচিল, প্রায় ২২ কিলোমিটার বিস্তৃত। দুর্গের অভ্যন্তরে রাজপ্রাসাদের প্রবেশদ্বার শীলদুয়ার, সন্ন্যাসী দুয়ার, জয় দুয়ার, নিমাই দুয়ার ও হেঁকোদুয়ার।
কোচবিহারের সুভাষপল্লী অঞ্চলে অনাথনাথ শিবমন্দির মন্দিরটি দক্ষিণমুখী এবং উচ্চতায় প্রায় ২৮ ফুট। মন্দিরটি চারকোণা এবং চারকোণে চারটি স্তম্ভ দেখে মুসলিম স্থাপত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইটের তৈরি এই মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। দেওয়ালের গায়ে দুটি বিড়াল মূর্তি, দুটি সিংহ মূর্তি ও একটি গণেশ মূর্তি সহ পদ্মের অলংকরণ আছে। সামনের দেওয়ালে খাঁজকাটা অনেক খোপ দেখা যায়। মন্দিরের ছাদের উপর গম্বুজ, গম্বুজের উপরে পদ্ম, আমলক ও ত্রিশূল রয়েছে। মন্দিরটির অভিনবত্বের মধ্যে দেওয়ালের গায়ে বিড়াল মূর্তির উপস্থাপনা যা পশ্চিমবঙ্গে আর কোনও মন্দিরে দৃষ্ট হয় না। এই উপস্থাপনার পিছনে হয়তো কোনও ইতিহাস বা উপাখ্যান থাকতে পারে কিন্তু তা অজানাই থেকে গেছে।
ধলিয়াবাড়িতে পোড়ামাটির ফলকযুক্ত দক্ষিণমুখী সিদ্ধনাথ শিবের পঞ্চরত্ন মন্দির দেখা যায়। অলংকরণ যুক্ত মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। দেবালয়ের বাঁকানো চালের উপরে চারকোণে চারটি রত্ন আছে কিন্তু মাঝখানের রত্নটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে বলে অনুমিত হয়। অনাথনাথ শিবমন্দিরের মত এই মন্দিরেও মুসলিম স্থাপত্যের কিছু কিছু আধিপত্য নজরে পড়ে। পশ্চিমদিকের দেওয়ালে ৯ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মিহরাবের উপস্থাপনা সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। মন্দিরের প্রবেশপথের দ্বারের খিলান বহুমুখী এবং ছুঁচালো। তার নীচে ও দুপাশে দুটি স্তম্ভ রয়েছে। স্তম্ভের গায়ে পলকাটা আমলকের অলংকরণ দেখা যায়। দেওয়ালের গায়ে খাঁজকাটা অনেকগুলি কুঠুরি বা খোপ আছে। সেই সমস্ত খোপে দশাবতার, পৌরাণিক দেবীর মূর্তি, বন্দুকধারী পল্টন, নর্তকী মূর্তি এবং লতাপাতার অলংকরণ দেখা যায়। সম্ভবত রাজা প্রাণনারায়ণ এটির নির্মানকার্য শুরু করেছিলেন তবে সমাপ্ত হয়েছিল দেবনারায়ণের সময়ে। মন্দিরাভ্যন্তরে বিগ্রহটি সাড়ে চার ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট। সিদ্ধনাথ শিবমন্দির ছাড়া আর সর্বত্রই পোড়ামাটির অলংকরণ অনুপস্থিত। এরই অদূরে যে স্তূপ দেখা যায় তা সম্ভবত উপেন্দ্রনারায়ণের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ।
বৈরাগী দিঘির উত্তর পাড়ে মদনমোহন মন্দির মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে। বিগ্রহটি কোচবিহার মহারাজাদের গৃহদেবতা। মন্দির প্রকোষ্ঠে রৌপ্যনির্মিত বৃহৎ মঞ্চ এবং মঞ্চের উপর রুপোর সিংহাসনে অলংকরণভূষিত অষ্টধাতুর মদনমোহন বিগ্রহ। চারকক্ষবিশিষ্ট মন্দিরটির প্রতিটিই কক্ষেই দেবদেবীর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কক্ষে মদনমোহন বিগ্রহটি অধিষ্ঠান করছেন। এই কক্ষটির ওপরে সোনালি রংয়ের গম্বুজ, গম্বুজের মাথায় পদ্ম, কলস, আমলক ইত্যাদি শোভা পাচ্ছে। মদনমোহন মন্দিরের বাঁ দিকের কক্ষে রয়েছেন অষ্টধাতুর অন্নপূর্ণা, নয়নতারা ও মঙ্গলচণ্ডী বিগ্রহ। দক্ষিণদিকের ঘরে রয়েছেন শ্বেতপাথরের শায়িত মহাকাল মূর্তির উপর কষ্টিপাথরের এক কালিকা মূর্তি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে বর্তমান মন্দিরে দুটি মদনমোহন বিগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। ছোট বিগ্রহটির গঠন কার্য, আকার দেখলে অতি প্রাচীন বলে মনে হয়। রাসযাত্রা উপলক্ষে দশদিনধরে সাড়ম্বরে পূজাভোগ, যজ্ঞাদি অনুষ্ঠিত হয়।
মদনমোহন মন্দিরের পূর্বদিকে দক্ষিণমুখী ভবানীদেবীর মন্দির। মন্দিরটি ইঁটের তৈরি এবং চারচালার ওপরে গম্বুজ অবস্থিত। গম্বুজের ওপরে পদ্ম, আমলক, কলস ইত্যাদি পরপর স্থাপিত। মন্দিরটি উচ্চতায় ২৮ ফুটের মতো হবে। মন্দিরাভ্যন্তরে রুপোর সিংহাসনে মাটির তৈরি দেড়ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ভবানীদেবীর মূর্তি। দেবী দশভূজা, বামে সিংহ এবং দক্ষিণে বাঘের পিঠে দাঁড়িয়ে অসুর নিধনে উদ্যোতা। সম্ভবত মজারাজ প্রাণনারায়ণ কামতেশ্বরী মন্দির অনুকরণে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া মন্দিরের অভ্যন্তরে মহাকালের এবং কষ্টি পাথরের তৈরি ৪ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সিংহবাহিনী দুর্গার মূর্তি রয়েছে। কোচবিহার শহরে দেবীপল্লীতে বড়দেবীর পশ্চিমমুখী মন্দির। মূর্তি মৃন্ময়ী, দশভূজা। ইনি দুর্গা বা বড়মা বলে খ্যাত।
গুঞ্জবাড়িতে মহারাজা শিবেন্দ্রনারায়ণের রাণী ডাঙ্গআয়ী কামেশ্বরী দেবী যে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার নামও ডাঙ্গর আয়ী হয়ে যায়। সম্ভবত তিনি উনিশ শতকের শেষ দিকে মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরের ছাদ সমতল এবং চারকক্ষ বিশিষ্ট। ছাদ সমতল হলেও ওপরে গম্বুজ বিদ্যমান। মন্দিরাভ্যন্তরে সিংহাসনের উপরে রাধাবিনোদ মূর্তি শোভা পাচ্ছে। অন্যান্য কক্ষে রয়েছেন পাথরের নারায়ণ ও শিব এবং অষ্টধাতুর নির্মিত রাধাকৃষ্ণ, দুর্গা, কালী ইত্যাদি বিগ্রহ। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের উপরে প্রতিষ্ঠা ফলক দেখা যায়। তাতে লেখা আছে ১২৯০ সাল। তবে বর্তমানে মন্দিরটি অবহেলায় এবং অনাদরে জরাজীর্ণ। মন্দিরের সম্মুখেই এক বিশাল দীঘির দেখা মেলে। দীঘিটি রাজমাতা দীঘি বলেই পরিচিত।
দিনহাটা মহকুমায় বলরাম ঠাকুরের মন্দিরটি উল্লেখের দাবী রাখে। গম্বুজশোভিত মন্দিরটির ছাদ সমতল এবং রেলিং দিয়ে ঘেরা। গম্বুজের দুপাশে দুটি থাম এবং সন্মুখে চারথামবিশিষ্ট বারান্দাযুক্ত দালান মন্দিরটি অত্যন্ত সুরম্য। দুপাশে থামের উপর কলস স্থাপিত আর সন্মুখের থামের উপর ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের মূর্তি দেখা যায়। মূর্তিগুলি চুন-বালি দিয়ে তৈরি। মন্দিরাভ্যন্তরে কৃষ্ণ-বলরামের অষ্টধাতু নির্মিত বিগ্রহ। সম্ভবত মন্দিরটি বাংলার ১৩১৪ সালে স্থাপিত হয়েছিল। রাসযাত্রায়, জন্মাষ্টমী এবং দোলযাত্রায় বিশেষ উৎসব পালিত হয় এবং সেই উপলক্ষে বেশ বড়ো মেলা বসে।
মধুপুরধাম অসমীয়া ধর্মপ্রচারক কবি শঙ্করদেব এবং দামোদরদেবের পদধুলি ধন্য পবিত্র তীর্থক্ষেত্র রূপে সুপরিচিত। কবি শঙ্করদেব শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক ছিলেন এবং কথিত আছে তিনি চিলারায় কোটে (তুফানগঞ্জ) কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁরই প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে মজারাজা নরেন্দ্রনারায়ণ শঙ্করদেব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরটি উচ্চতায় ৫০ ফুটের মতো হবে। মন্দিরটি রেখদেউল রীতিতে নির্মিত পূর্বমুখী মন্দির। মন্দিরের সম্মুখে সমতল ছাদবিশিষ্ট জগমোহন বা মন্ডপ। মন্দিরের শীর্ষদেশে পর পর সংস্থাপিত পদ্ম, আমলক, কলস ও বিষ্ণুচক্র দেখা যায়। মন্দিরাভ্যন্তরে শঙ্করদেব এবং তাঁর শিষ্য মাধবদেবের যুগলমূর্তি এবং তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র যত্ন সহকারে সুসজ্জিত। এই চত্বরে রয়েছে আরো কতকগুলি ধাম-কীর্তনঘর, ভোজনঘর এবং দোলমন্দির। শঙ্করদেবের আবির্ভাব ও তিরোভাব তিথি, রাসযাত্রা, দোলযাত্রা ইত্যাদি উপলক্ষে বড়ো উৎসব পালিত হয় এবং মেলা বসে। দূরদূরান্ত থেকে বৈষ্ণবগণ এই সব তিথিতে যোগদান করে উৎসব মুখর করে তোলেন।
মধুপুরধামের কিছুটা দূরে তোর্সা নদীর ধারে হরিহরপুরে মহারাজা উপেন্দ্রনারায়ণ আঠারো শতকের প্রথমদিকে ইঁটের তৈরি সুরম্য চারচালা শিখরবিশিষ্ট শিবমন্দির নির্মান করেছিলেন। মন্দিরটি প্রায় ২০/২৫ ফুটের মতো উঁচু এবং পশ্চিমমুখী। মন্দিরটি অতি সুন্দর। প্রবেশদ্বারের উপরে এবং খিলানের দু'পাশে বেলেপাথরে তৈরি লতাপাতা অলংকরণযুক্ত। শিবরাত্রি উপলক্ষে উৎসব প্রাঙ্গণে মেলা বসে।
কোচবিহার জেলার যে সমস্ত মসজিদ এবং মাজার আছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহারানীগঞ্জে তোর্সাপীরের ধাম এবং হলদিবাড়ির পীর ত্রক্রাশুল মাজার। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মহারাজ হরেন্দ্রনারায়ণ তোর্সাপীরের ভক্ত ছিলেন। তাঁরই উৎসর্গীকৃত সাতবিঘা জমিতে তোর্সাপীরের মসজিদ বা মাজার অবস্থিত। এখানেই আছে পাগলা পীর, সত্য পীর ও খেয়াজ পীরের ঢিবি। মহরম উপলক্ষে এই বিশাল চত্বরে মেলা বসে এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই মেলায় লোক সমাগম হয় এবং পীরের সমাধিতে বাতাসা, নকুলদানা, খই ইত্যাদি উৎসর্গ করেন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে হুজুর সাহেবের মেলা বসে। আগে এখানে ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হত এবং ধর্মপ্রাণ পণ্ডিত মুসলিমরা এই মাজার শরিফে ধর্মসভায় যোগ দিতেন। এখন শুধু মেলা বসে এবং জাতি ধর্ম নির্বিশেষে লোকজন এই মাজারে এসে ফুল, চাদর, ধূপকাঠি এবং মুরগি উৎসর্গ করে যান। এছাড়া আছে পুরানী মসজিদ, খাগড়াবাড়ির মসজিদ, শিবপুরের মসজিদ। এই সমস্ত মসজিদে মহরম উপলক্ষে নানা উৎসব ধুমধাম সহকারে পালিত হয়।
যাওয়া – নিকটতম রেল স্টেশন কোচবিহার। রেল স্টেশন থেকে শহর ৪ কিমি দূরে। স্টেশন চত্বর থেকে অটো, সাইকেল-রিকশা যাচ্ছে। বাস বা ভাড়া গাড়িতে যেতে হবে ৪৫ কিমি দূরে রসিকবিল
থাকা – মিউনিসিপাল পান্থনিবাস, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড রেস্ট হাউস, সার্কিট হাউস, পি ডব্লু ডি-র হোটেল ও বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে। রসিকবিলে রয়েছে বনবাংলো। কোচবিহারের এস টি ডি ০৩৫৮২।
|| ভ্রমণকাহিনি - ঘনাদার শ্বশুরবাড়িযাত্রা – অথঃ কোচবিহারকথা ||
গৌড় ও পাণ্ডুয়া (Gour & Pandua) – উত্তরবঙ্গের মালদহকে কেন্দ্র করে ঘুরে নেওয়া যায় বাংলার অতীত ইতিহাসের সাক্ষী গৌড় ও পাণ্ডুয়া। মালদহের দক্ষিণে গৌড় ও উত্তরে পাণ্ডুয়া। রাজা শশাঙ্ক থেকে দেবপালের আমল পর্যন্ত গৌড়ের স্বর্ণযুগ বলে চিহ্নিত। ভেঙ্গে পড়া প্রাচীন মসজিদ, মিনার, প্রাসাদ আজও অতীতের সমৃদ্ধির কথা বলে।
মালদহ থেকে গৌড় যাওয়ার পথে পিয়াসবারি দিঘি। পিয়াসবারির পশ্চিমে বৈষ্ণবতীর্থ রামকেলি। রামকেলি থেকে আধ কিমি দক্ষিণে বারোদুয়ারী বা বড়সোনা মসজিদ। আর রয়েছে ফিরোজ মিনার, কদম রসুল মসজিদ, চিফা মসজিদ, লুকোচুরি গেট, বাইশগজী প্রাচীর, ছোটসোনা মসজিদ, তাঁতিপাড়া মসজিদ, লোটন মসজিদ, গুণমন্ত মসজিদ, চামকাটি মসজিদ প্রভৃতি।
পাণ্ডুয়ার প্রধান আকর্ষণ সিকন্দর শাহ ও গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলে নির্মিত বিখ্যাত আদিনা মসজিদ। আদিনার ১ কিমি দূরত্বে সুলতান সিকন্দর শাহের গড়ের ধ্বংসাবশেষ সাতাশঘরা। পান্ডুয়ার অন্যান্য দ্রষ্টব্যগুলি হল বড়ী দরগাহ, সালামি দরওয়াজা, ছোটি দরগাহ, একলাখী মসজিদ, কুতবশাহী মসজিদ।
পাণ্ডুয়া থেকে ৫৬ কিমি দূরে কুলীক নদীর পাড়ে কুলীক পাখিরালয় (Kulik Bird Sanctuary)। ১৯৮৫ সালে জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পেয়েছে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই পাখিরালয়। জুলাই থেকে অক্টোবরে জারুল, শিমূল, শিশু, সেগুন, অর্জুন গাছে ছাওয়া রায়গঞ্জ ঝিলে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। মাছরাঙা, বক, ফিঙে, ছাতারে, দোয়েলের পাশাপাশি ভিড় জমায় শামুকখোল, হেরণ, কমোরান্ট-এর মতো ভিনদেশীরা।
মালদহর ৩৫ কিমি দক্ষিণে ফারাক্কা ব্যারেজ।
যাওয়া – নিকটতম স্টেশন মালদা টাউন (MLDT)। বাসও যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের নানা জায়গা থেকে মালদহে। মালদহ থেকে ট্যাক্সি, টাঙ্গা বা বাসে গৌড়-পাণ্ডুয়া ঘুরে নেওয়া যায়। বাসে করে গৌড় যেতে হলে পিয়াসবারিতে নামতে হবে। সরাসরি রায়গঞ্জে এসেও কুলীক ঘোরা যায়।
থাকা – মালদহে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের মালদা ট্যুরিস্ট লজ। পিয়াসবারিতে জেলা পরিষদের ট্যুরিস্ট লজ আছে। কুলীকে পাখিরালয় লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রায়গঞ্জ ট্যুরিস্ট লজ। রায়গঞ্জে স্টেশনের কাছে জেলা পরিষদের বাংলো। এছাড়া, মালদহ ও রায়গঞ্জ শহরে অনেক বেসরকারি হোটেল আছে।
কেনাকাটা– মালদহর ফজলি আম বিখ্যাত। আম ও আম থেকে তৈরি আমসত্ত্ব, আচার এসব কেনা যায়।

ডুয়ার্স (Dooars)

ডুয়ার্স কোন জায়গাবিশেষের নাম নয়। শিলিগুড়ি থেকে সেবক হয়ে তিস্তা নদীর ওপরে করোনেশন ব্রিজ পেরোলেই ডুয়ার্সের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া যায়। এরপর সোজা আলিপুরদুয়ারের দিকে ডুয়ার্স দেখতে দেখতে এগিয়ে যাওয়া। একসময় ভুটানের অসংখ্য প্রবেশপথ ছড়িয়ে ছিল জলপাইগুড়ির জেলার উত্তরাঞ্চলে। অনেকের মতে দুয়ার থেকেই ডুয়ার্স শব্দের উৎপত্তি। ডুয়ার্স শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে একে একে ভেসে ওঠে জঙ্গল, পাহাড়, অসংখ্য নদী ঘেরা উত্তরের শান্ত-সবুজ নির্জন একটি এলাকা। ওদলাবাড়ি থেকে কুমারগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত তিস্তা থেকে সংকোশ পর্যন্ত জলপাইগুড়ি জেলার মাত্র ১১ টি ব্লকে ১৩৮ টি ভাষা ও উপভাষার মানুষের বাসভূমি ডুয়ার্স। কোচ, বাভা, মেচ, রাজবংশী, বোড়ো, সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও  এই সব জনজাতির পাশাপাশি রয়েছেন বাঙালি অন্যান্য বহু ভাষাভাষীর মানুষ। সামিল হয়েছেন একে অপরের সুখদুখে - জিতিয়ার যাত্রায়, ফুলপাতির নাচে, বিষহরী পালাতে, চোরচুন্নীর খেলায়, নবান্নের গানে একসাথে মাতোয়ারা হয়েছেন এই এলাকার মানুষ। আজান আর শাঁখের সুরে বেজে উঠেছে প্রাণের ঐক্যতান। শেলরুটির স্বাদে কখন যেন মিশে গেছে ধূমায়িত খিচুড়ির সৌ্রভ। চাঁদভাঙা জোছনা রাতে কুলি লাইন থেকে উঠে আসা দ্রিমি দ্রিমি মাদলের বোল চাবাগিচার সবুজ গালিচা পেরিয়ে কখন যেন আছড়ে পরে নীল পাহাড়ের গায়ে।
যাওয়া – ডুয়ার্সের কোন জায়গায় যেতে শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে কয়েকদিনের জন্য গাড়িভাড়া করে নেওয়া যায়। জলদাপাড়া ও বক্সাঅরণ্যে আলিপুরদুয়ার হয়েও যাওয়া যায়। কোনও কোনও ট্রেন হাসিমারা-তেও থামে। শিলিগুড়ি থেকে ডুয়ার্সের বিভিন্ন অংশে যাওয়ার জন্য বাসও পাওয়া যায়।
মরসুম – ১৬ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর গরুমারা ও জলদাপাড়া অভয়ারণ্য বন্ধ থাকে। বেড়ানোর সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ।
লাটাগুড়ি(Lataguri) – ডুয়ার্সের গরুমারা ও চাপরামারি অরণ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার লাটাগুড়ি। পিচরাস্তার পাশেই জঙ্গল লাগোয়া নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার। এখানে ডিয়ার পার্ক ও ছোটখাটো প্রদর্শনী আছে। লাগোয়া বনবিভাগের অফিস থেকে কাছাকাছির বিভিন্ন জঙ্গল-বিটে ঢোকার অনুমতিপত্র ও গাইড পাওয়া যায়। এখান থেকে গরুমারা, চাপরামারি, খুনিয়া,চুকচুকি, মেদলা অরণ্যে ঢোকার পারমিট সংগ্রহ করতে হবে। চালসা থেকেও খুনিয়া ও চাপরামারি অরণ্য দর্শনের পারমিট মেলে। প্রতি বৃহস্পতিবার অরণ্য বন্ধ থাকে।
শিলিগুড়ি থেকে লাটাগুড়ির দূরত্ব ৮০ কিমি। লাটাগুড়ি থেকে ময়নাগুড়িতে এসে ৩ কিমি দূরে জল্পেশ শিবমন্দিরটিও দেখে নেওয়া যায়।
থাকা – লাটাগুড়ি বাজার ও প্রকৃতি বীক্ষণকেন্দ্রর কাছাকাছি অঞ্চল জুড়ে বেশ কিছু হোটেল ও রিসর্ট আছে। অরণ্য হোটেলটির বুকিং পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর থেকে করা যাবে।
গরুমারা (Gorumara) – লাটাগুড়ি থেকে চালসা যাওয়ার পথে ৯ কিমি দূরে ডানহাতে গরুমারা অভয়ারণ্যের মূল ফটক ও চেকপোস্ট। চেকপোস্ট পেরিয়ে চা-বাগানকে বাঁয়ে রেখে রাস্তা চলে গেছে জঙ্গলের গভীরে। এই পথ ধরে আরও ৬ কিমি গেলে গরুমারা বনবাংলো। ভারতীয় একশৃঙ্গ গন্ডার, বাইসন আর হাতির জন্য গরুমারা অভয়ারণ্য বিখ্যাত। বহেড়া, কাটুস, শিমুল, শিরীষ, জাম, লালি গাছে ছাওয়া সবুজ অরণ্য ছড়িয়ে আছে প্রায় ৮০ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে। ১৯৭৬ সালে অভয়ারণ্যের স্বীকৃতি পায় গরুমারা। ১৯৮০ সালে পায় জাতীয় উদ্যানের শিরোপা।
বনবাংলোর পাশেই রাইনো পয়েন্ট ওয়াচ টাওয়ার। নীচে ইংডং নদী, নদীর পাড়ে সবুজ ঘাসজমি। সল্টলিকে নুন চাটতে আসে গন্ডার, বাইসন, হাতি। বনবাংলোয় থাকলে রাতে ওয়াচটাওয়ার থেকে স্পটলাইট ফেলে বন্যপ্রাণী দেখানো হয়। বনবাংলোর সামনে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক তার দিয়ে ঘেরা জায়গায় কুনকি (পোষা) হাতিদের রাখা হয়। বনবাংলো থেকে দেড় কিমি দূরে যাত্রাপ্রসাদ ওয়াচটাওয়ার। ওপর থেকে নীচে মূর্তি নদী ও বিস্তীর্ণ চারণভূমি দেখা যায়। এখানেই দেখা হয়ে যেতে পারে বাইসন, গন্ডার, হাতির পাল, হরিণ আর ময়ূর-ময়ূরীদের সঙ্গে। সঙ্গে বাইনোকুলার থাকলে সুবিধা হবে। জঙ্গলের পথে দৌড়ে বেড়ায় বুনো মোরগ। ধীরেসুস্থে রাস্তা পার হয় ময়ূর।
লাটাগুড়ি থেকে চালসার পথে ২ কিমি এগোলে ডানহাতে চুকচুকি। চুকচুকি হ্রদের ধারে চুকচুকি ওয়াচটাওয়ার। শীতকালে এখানে নানান প্রজাতির পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। গরুর গাড়িতে চেপে ঘুরে আসা যায় মেদলা ওয়াচটাওয়ার।
থাকা – গরুমারা অভয়ারণ্যে কাঠের বনবাংলো আছে। এখানে থাকতে হলে সঙ্গে রেশন নিয়ে আসতে হবে। বনবাংলো বুকিং করতে হবে, ডি এফ ও, জলপাইগুড়ির থেকে।
মূর্তি ও খুনিয়া(Murti & Khuniya) – চালসা থেকে ১০, লাটাগুড়ি থেকে ১৪ কিমি দূরে পাহাড়-জঙ্গল আর মূর্তি নদী নিয়ে অবকাশ যাপনের মনোরম ঠিকানা মূর্তি। নদীর ধারে ছড়িয়ে আছে গ্রাম।
মূর্তি নদীর ব্রিজ পেরিয়ে খুনিয়া মোড়। রাস্তার দুপাশ জুড়ে ঘন জঙ্গল। চেকপোস্ট থেকে কিছুটা এগোলেই চন্দ্রচূড় ওয়াচটাওয়ার। ঘাসজমিতে হাতি ও বাইসনের দেখা মেলে।
থাকা – মূর্তি নদীর ধারে পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের বনানী বাংলো। মূর্তির কাছে কালীপুরে গরুমারা এলিফ্যান্ট ক্যাম্প ও গরুমারা ইকো ভিলেজ। এই দু’জায়গার বুকিং হয় লাটাগুড়ির নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার থেকে।
চাপরামারি (Chapramari) – লাটাগুড়ি থেকে ৩০ কিমি দূরে চাপরামারি অভয়ারণ্য। জঙ্গলের গভীরে বনবাংলো, বনবাংলোর সামনে বনাঞ্চল, জলাজমি, সবুজ ঘাসের চারণভূমি। এই ঘাসজমিতেই হাতি, গাউরের দল আসে। চাপরামারির অরণ্যে শতাধিক প্রজাতির অর্কিড পাওয়া যায়। গাউর, হাতি ছাড়াও হরিণ, নীলগাই, শম্বর প্রভৃতি নানান জীবজন্তু ও নানানরকম পাখির দেখা মেলে এই অরণ্যে।
থাকা – চাপরামারি অরণ্যের ভেতরে থাকার একমাত্র জায়গা বনদপ্তরের বাংলো। চাপরামারি বন-লাগোয়া পানঝোরা বনবস্তিতে চাপরামারি ওয়াইল্ডারনেস ক্যাম্প। দু’জায়গায় থাকার বুকিং-ই জলপাইগুড়ির অরণ্য ভবন থেকে করা যাবে। লাটাগুড়ির নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার থেকেও ওয়াইল্ডারনেস ক্যাম্পের বুকিং করা যায়।
সামসিং-সুনতালেখোলা (Samsing-Suntalekhola) – চালসা থেকে মেটেলি চা বাগান পেরিয়ে সবুজে ছাওয়া পাহাড়ি পথে ২৫ কিমি দূরে এলাচ, শাল, পাইনে ছাওয়া পাহাড়ি গ্রাম সামসিং। নির্জনতা ভাঙ্গে পাখির ডাক আর মূর্তি নদীর কলতানে। অদূরে ভুটান পাহাড়।
সামসিং থেকে ৪ কিমি দূরে পাহাড়ি পথের শেষে খেলনার মতো কাঠের ঝোলা সাঁকোর নীচে উচ্ছ্বল তরুণী নদী সুনতালেখোলা। সাঁকো পেরিয়ে বনবিভাগের কটেজ ওয়াইল্ডারনেস ফরেস্ট ক্যাম্প। দুপাশে কমলা, এলাচ গাছের সবুজে ঘেরা পাহাড়। সামসিং থেকে সুনতালেখোলা যাওয়ার পথে ডাইনে পাথর ছড়ানো পথে কিছুটা এগিয়ে মূর্তি নদীর পাড়ে রকি আইল্যান্ড। ৫কিমি দূরে ফুলে ফুলে সেজে  থাকা মোহময়ী সুন্দরী গ্রাম। আরও এগিয়ে পথ গিয়েছে আরণ্যক সাকাম-এ।
থাকা – সামসিং-এ বন উন্নয়ন নিগমের কটেজ ও সুনতালেখোলায় ওয়াইল্ডারনেস রিসর্ট। রকি আইল্যান্ডে বেসরকারি টেন্ট আর কটেজ ব্যবস্থা আছে।
ঝালং-বিন্দু-প্যারেন(Jhalong, Bindu, Paren) – চালসা থেকে কুমানি, গৈরিবাস হয়ে পথ গিয়েছে ঝালং-এ। ঝালংয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে জলঢাকা নদী। বনবাংলোর পাশে ঝোলুং ঝোরা এঁকেবেঁকে গিয়ে মিশেছে জলঢাকা নদীতে। সামনে জলঢাকার ওপর ব্রিজ। ঝালং থেকে পাহাড়ি পথে ছোট্ট গ্রাম প্যারেন হয়ে ভুটান সীমান্তে ভারতের শেষ জনপদ বিন্দু। পথে পড়বে ঝালং-এ জলঢাকা হাইডেল পাওয়ার প্রজেক্ট, প্যারেনে রঙিন রঙিন কাঠের বাড়িঘর আর রাস্তার ধারে কমলালেবুর বাগান। ছবির মতো পাহাড়ি গ্রাম বিন্দু। রঙিন কাঠের বাড়ির জানলায়, বারান্দায় টব আলো করে রয়েছে ফায়ারবল, পিটুনিয়া, গ্ল্যাডিয়োলা আর অর্কিডের ফুল। বিন্দুতে জলঢাকা ব্যারেজের ওপারে ভুটান। বাঁধের ওপর পায়ে হেঁটে ওঠা যায়, ছবি তোলা নিষেধ। হেঁটে আসা যায় ওপারে ভুটানের চৌহদ্দি থেকেও। হাটবারে ভুটানের গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ আসেন বিন্দুতে বাজারহাট সারতে। প্রয়োজন মুছে দেয় রাজনৈতিক সীমারেখা। এখানে বিন্দু নদী জলঢাকায় মিশেছে। নদীর গা থেকে খাড়াই উঠে গেছে ভুটান পাহাড়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে বিন্দু থেকে হিমালয়ের বরফশৃঙ্গ দেখা যায়। বুধবারে ঝালং-এ আর বৃহস্পতিবারে বিন্দুতে হাট বসে। শিলিগুড়ি থেকে বিন্দুর দূরত্ব ১০৪ কিমি। ঝালং থেকে বিন্দু ১৩ কিমি। ঝালং থেকে দলগাঁও হয়ে রঙ্গো বেরিয়ে নেওয়া যায়। প্যারেন থেকে ঘুরে আসা যায় তোদে।
থাকা – ঝালং-এ বন উন্নয়ন নিগমের জলঢাকা বনবাংলো ও প্যারেনে বনদপ্তরের কটেজ রয়েছে। বিন্দুতে থাকতে হবে বেসরকারি হোটেলে।
জলদাপাড়া-খয়েরবাড়ি(Jaldapara-Khayerbari) – জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার মাদারিহাট। অরণ্যের দোরগোড়ায় মাদারিহাট ট্যুরিস্ট লজ। মাদারিহাট হাইওয়ের ধারেই অভয়ারণ্যে ঢোকার চেকপোস্ট। চেকপোস্ট থেকে অরণ্যের গভীরে ৮ কিমি দূরে হলং বনবাংলো। দোতলা কাঠের বাংলো। চারপাশে সাজানো বাগান। অদূরে হলং নদী। হলং নদীর ওপারে অরণ্য লাগোয়া খোলা জায়গায় সল্টলিকে নুন খেতে আসে হাতি, গন্ডারেরা। হলং বাংলোর সামনে থেকেই প্রতিদিন সকালে তিনটি ট্রিপে এলিফ্যান্ট রাইড হয়।  কার সাফারিতেও জঙ্গল ঘোরা যায়। ২১৬ বর্গ কিমি ব্যাপী জলদাপাড়া অরণ্যের সেরা আকর্ষণ একশৃঙ্গ গন্ডার। এছাড়াও রয়েছে বাইসন, হগ ডিয়ার, ময়ূর, বুনো শুয়োর প্রভৃতি নানান জীবজন্তু এবং নানা প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ। শাল, খয়ের, শিশু, শিমূল, শিরীষ গাছের ঘনজঙ্গল চিরে বয়ে চলেছে তোর্সা, মালপি, হলং, কালিঝোরা, বুড়িতোর্সা প্রভৃতি নদী। নদীর জলে রয়েছে নানান প্রজাতির কচ্ছপ আর মাছ। অরণ্যের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিরাট বিরাট ঘাসের বন।
মাদারিহাট থেকে গাড়ি নিয়ে ঘুরে আসা যায় ১০ কিমি দূরের সাউথ খয়েরবাড়ি নেচার পার্ক অ্যান্ড লেপার্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার থেকে। খয়েরবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ লেপার্ড সাফারি পার্ক ও টাইগার রেসকিউ সেন্টার। লেপার্ড পার্কটির ভিতরে ব্যাটারিচালিত গাড়িতে ঘোরা যায়। বুড়িতোর্সার বুকে বোটিংয়েরও ব্যবস্থা আছে।
জলদাপাড়া থেকে ২৪ কিমি দূরে আদিবাসী গ্রাম টোটোপাড়া।
শিলিগুড়ি থেকে ১১৯ কিমি দূরে জলদাপাড়া অভয়ারণ্য।
থাকা – মাদারিহাটে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিস্ট লজ, বেসরকারি হোটেল। জলদাপাড়া অরণ্যের গভীরে হলং-এ রয়েছে বনবাংলো।
ভ্রমণ কাহিনি - || হলং-এ এক রাত্রি ||

বক্সা-জয়ন্তী(Buxa-Jayanti) – বক্সা টাইগার প্রজেক্টের প্রবেশদ্বার রাজাভাতখাওয়া। আলিপুরদুয়ার থেকে দূরত্ব ১৭ কিমি। বুড়িতোর্সার পূর্বপাড়ে জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের চিলাপাতা জঙ্গল পেরিয়ে ৭৬৫ বর্গ কিমি বনাঞ্চল জুড়ে বক্সা অরণ্য। শিমূল, শাল, খয়ের, সেগুন, শিশু, দেবদারু গাছে ছাওয়া বনাঞ্চলে নানান প্রজাতির অজস্র পাখি ও প্রজাপতির দেখা মেলে। অরণ্যের বুক চিরে বয়ে চলেছে রায়ডাক নদী।
রাজাভাতখাওয়া থেকে ১০ কিমি দূরে বক্সা মোড় পেরিয়ে আরও ৪ কিমি এগিয়ে সান্তালাবাড়ি। এখান থেকে পাহাড় বেয়ে জঙ্গলে ঘেরা পথে ৫ কিমি হাঁটাপথে বক্সা পাহাড়ের মাথায় ঐতিহাসিক বক্সাদুর্গ। বক্সাদুয়ার থেকে ১৩ কিমি দূরে জয়ন্তী। ঘন সবুজ জঙ্গলের মাঝে জয়ন্তী নদী আর পাহাড় নিয়ে ছোট্ট জনপদ। নদীর বুকে জেগে আছে ভেঙ্গে যাওয়া রেলপথের চিহ্ন। নদীর পাড়ে দাঁড়ালে ‘আবার অরণ্যে’র দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠে। ঘণ্টা দুয়েকের দূরত্বে মহাকাল মন্দির। ২ কিমি দূরে পুখরিপাহাড়। পাহাড় চূড়োয় টলটলে জলের হ্রদ।
আলিপুরদুয়ার থেকে ৪০ কিমি দূরে তুরতুরির চা বাগান। আরও ৮ কিমি দূরে ভুটানঘাট
থাকা – জয়ন্তী, রাজাভাতখাওয়া, বক্সাপাহাড় ও ভুটানঘাটে ফরেস্ট বাংলো আছে। জয়ন্তীতে নদীর পাড়েই পি এইচ ই বাংলো। বুকিং-ই.ই., পি. এইচ. ই., ক্লাব রোড, জলপাইগুড়ি।
গারুচেরা(Garuchera) - মূর্তি নদী,গরুমারা জাতীয় উদ্যান, জলদাপাড়া অভয়ারণ্য, বক্সা ফোর্টের বাইরেও রয়ে গিয়েছে এক অচেনা ডুয়ার্স যার সন্ধান আমরা অনেকেই পাইনি। তেমনই এক অচিন ডুয়ার্সের ঠিকানা গারুচেরা।
বীরপাড়ার কাছেই গারুচেরা বনবস্তি। এখানে সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর বসে ব্যস্ত পাখিদের উড়ে বেড়ানো দেখে মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ওয়াচটাওয়ারে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায় অরণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করে। দুপুরটা জঙ্গলে ঘুরে বেরিয়েই কাটানো যায় অথবা ফরেস্টের ভেতর দিয়ে ১০ কিমি ট্রেকিং করে পৌছে যাওয়া যায় ভূটান পাহাড়ের পাদদেশে। হাতে সময় থাকলে ঘুরে দেখতে পারেন ভূটানের সিমেন্ট কারখানা, বৌদ্ধ মনেস্ট্রি। পৌঁছে যেতে পারেন ভূটানের কোল লাগোয়া শতাব্দী প্রাচীন মাকড়াপাড়া কালীবাড়িতে। এরকম পরিবেশে কালীবাড়ি – একদিকে জঙ্গল, পাহাড়, পাথুরে নদী তার মাঝে সহজ সরল সাধাসিধে বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ – সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত মোহময় ব্যঞ্জনা! এই পটে আঁকা বন্যছবি উপলব্ধি করতে যেতে হবে গারুচেরা।
যাওয়া - N.J.P থেকে ট্রেনে নিউ মাল – বানারহাট – দলগাঁও (বীরপাড়া) সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় কিংবা শিলিগুড়ি থেকে সড়ক পথে N.H 31C ধরে সেবক এর পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য উপভোগ করে ওদলাবাড়ি-মাল-বানারহাট পেরিয়েও পৌঁছে যেতে পারেন বীরপাড়াতে। বীরপাড়া পৌঁছানোর আরও একটি বিকল্প পথ রয়েছে। বানারহাট থেকে কারবালা চা বাগান - রেতী নদী, বান্ধাপানি হয়ে মাঝারি ও ছোট মাপের ৫ টি সাঁকোবিহীন নদীর খাত অতিক্রম করে অতি বন্ধুর পথ পেরিয়ে জয় বীরপাড়া চা বাগানকে ডান হাতে রেখে পৌছানো যায় বীরপাড়াতে।
বীরপাড়া থেকে দলমোড় চা বাগানের দিকে এগোলে রাস্তাটি দু ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি সোজা পাগলু ভূটানের দিকে চলে যায় অপরটি বাদিকে গোমটু ভূটান (১১ কিমি) এর দিকে যায়। বাঁদিকের রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে লঙ্কাপাড়া চা বাগান ও ফরেস্ট পার হয়ে আবার বাঁদিকে পথ চলা ।
পথ বললে ভুল হয় – অরণ্যের মাঝে অসমতল কাঁচা রাস্তা যাও আবার গিয়ে শেষ হয় বেশ চওড়া একটি পাহাড়ি নদীতে যা পারাপার করার জন্য কোন সাঁকো নেই। এখন শীতকাল তাই নদীতে বিন্দুমাত্র জল নেই- শুধুই বালু আর বড় বড় পাথর, একেবারেই শুকনো দেখে বোঝার উপায় নেই বর্ষার সময় এই নদীগুলি কী ভয়ানক রূপ ধারণ করে। নদীখাতে দাঁড়িয়েই উপভোগ করা যায় কাছের ভূটান পাহাড়ের মনোময় শোভা। এবড়োখেবড়ো নদীখাত পেরিয়ে গারুচেরা বনবস্তি। সেখান থেকে ডানদিকে মোড় ঘুরে ২ কিমি কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে ছবির চেয়েও সুন্দর একদিকে ভূটান পাহাড় অপর দিকে শাল-সেগুন প্রধান অরণ্য – বিস্তৃর্ণ ফাঁকা জায়গার মাঝে  ছবির মতো  কটেজগুলি।
থাকা –এখানে থাকার জন্য বনবিভাগের তিনটি কটেজ আছে।

ভ্রমণকাহিনি- অরণ্যের রূপকথারা || একটুকরো ডুয়ার্স ||

দক্ষিণবঙ্গ (South Bengal)

মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) – কলকাতা থেকে ১৯৭ কিমি দূরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের স্মৃতি বিজড়িত মুর্শিদাবাদ ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকাভুক্ত। মুর্শিদকুলি খাঁর নাম থেকেই জেলার নাম হয় মুর্শিদাবাদ, আবার কেউ বলেন মুর্শিদাবাদের নামকরণ হয়েছে নানকপন্থী সাধু মুকসূদন দাসের নাম থেকে।
মুর্শিদাবাদ শহরের সেরা আকর্ষণ হাজারদুয়ারি (Hazarduari)। ১৮৩৭ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন খাঁয়ের জন্য ৮০ ফুট উঁচু তিনতলা গম্বুজওয়ালা এই প্রাসাদটি নির্মিত হয়। আদপে ৯০০টি দরজা হলেও আরও ১০০টি কৃত্রিম দরজা রয়েছে প্রাসাদে। তাই নাম হাজারদুয়ারি। প্রাচীন মুর্শিদাবাদের স্মৃতি নিয়ে অপরূপ গথিকশৈলীর এই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। আক্ষরিক অর্থেই এ এক ঐতিহাসিক জাদুঘর। নীচের তলায় রয়েছে তৎকালীন নবাবদের ব্যবহৃত প্রায় ২৭০০ টি অস্ত্রশস্ত্র। যার মধ্যে আলিবর্দি ও সিরাজের তরবারি এমনকি যে ছুরিকা দিয়ে মহম্মদী বেগ সিরাজকে খুন করেছিলেন তা পর্যন্ত রক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। এই সুরম্য বিশাল রাজপ্রাসাদের দ্বিতলে দেখা যায় রুপোর সিংহাসন যেটি ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী মহারানী ভিক্টোরিয়ার দেওয়া উপহার। ১৬১টি ঝাড়যুক্ত বিশাল ঝাড়বাতির নীচে সিংহাসনে বসে নবাব দরবার পরিচালনা করতেন। মন্ত্রণাকক্ষের লুকোচুরি আয়না, দেশ-বিদেশ থেকে সংগৃহীত বিশ্ববিখ্যাত সব ঘড়ি, মার্শাল, টিশিয়ান, রাফায়েল, ভ্যান ডাইক প্রমূখ ইউরোপীয়ান শিল্পীর অয়েল পেন্টিং, প্রাচীন সব পাথরের মূর্তি হাজারদুয়ারীকে বিখ্যাত করে তুলেছে। ত্রিতলে আছে নবাবী আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শণ সোনা দিয়ে মোড়া কোরাণ শরিফ, অমূল্য পুঁথিপত্র, আইন-ই-আকবরীর পান্ডুলিপি সহ অসংখ্য বইয়ের সম্ভার।  ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসেরও কিছু বিশিষ্ট নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই মিউজিয়ামে।
হাজারদুয়ারীর চত্বরে রয়েছে ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে জনার্দন কর্মকারের তৈরি ১৮ ফুট লম্বা, আট টন ওজনের “জাহানকোষা” কামান বা বিশ্বজয়ী কামান। এই কামানে একবার তোপ দাগতে ৩০ কেজি বারুদ লাগত বলে জানা যায়। এটি বাচ্চেওয়ালি কামান নামেও পরিচিত।
হাজারদুয়ারীর অদূরে কাঠগোলায় দুগার পরিবার কর্তৃক তৈরি নন্দন কাননে একটি চারতলা বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদের কাছেই অপূর্ব কারুকার্যমন্ডিত আদিনাথ মন্দির। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে এটি তৈরি হয়েছিল। জগৎশেঠের কুঠিবাড়ির অদূরেই মহিমাপুরে রাজা কীর্তিচাঁদ বাহাদুর হাজারদুয়ারী প্রাসাদের অনুকরণে তৈরি করেছিলেন নবীপুর রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদটি এখন জীর্ণ। অনেক পৌরাণিক দেবদেবীর মূর্তি থাকায় দেবালয় বলেও ভুল হয়। অদূরে জাফরাগঞ্জ দেউড়ি অর্থাৎ মীরজাফরের প্রাসাদ আর মিরণের প্রাসাদ। শোনা যায় মিরণের এই প্রাসাদেই সিরাজদ্দৌলা খুন হয়েছিলেন আততায়ী মহম্মদী বেগের হাতে। জাফরাগঞ্জের অর্থ হল বেইমান বা নিমকহারাম দেউড়ি। এই দেউড়িতে আছে ইংরেজদের কাছ থেকে উপঢৌকন পাওয়া দুটি কামান। দেউড়ির বিপরীত দিকে জাফরাগঞ্জ সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছেন মীরজাফর ও তাঁর পরিবারের সহস্রাধিক মানুষজন।
মুর্শিদাবাদে নবাবী শাসনের পত্তন হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র আমলে। মুর্শিদাবাদ রেলস্টেশনের অদূরে কাটরা মসজিদ। ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ এটি নির্মাণ করান। মূলত মন্দিরের উপাদান দিয়েই তৈরি হয়েছিল মসজিদটি এমন ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে নির্মাণশৈলী অপূর্ব, যদিও অনেকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের তিনটি বিধ্বস্ত; চারকোণে চারটি মিনারের উচ্চতা হবে আনুমানিক আশি ফুট, তন্মধ্যে দুটি মিনার কালের কবলে পড়েছে। মসজিদটিতে একসঙ্গে সাতশো জন বসে নামাজ পড়তে পারে। এটি শুধু প্রার্থনাগৃহ নয়, নবাবের সাময়িক বসবাসের জন্যও ব্যবহৃত হত। কালো পাথরের খিলানযুক্ত বিশাল প্রবেশদ্বার। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে মসজিদটির প্রভূত ক্ষতি হয়েছিল। কথিত আছে, মক্কার অনুকরণে এটি নির্মিত হয়েছিল। ভাবতেও বেশ অবাক লাগে যে মসজিদ চত্বরেই রয়েছে একটি শিব মন্দির। কাটরা মসজিদের পেছনেই রয়েছে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-র সমাধি।
 নবাবী যুগের ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষ্যকে তার কাঁধে নিয়ে এখনও নির্জন প্রান্তর জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বড়া ইমামবাড়া। গঙ্গার অপর পারে খোশবাগ, রোশনীবাগ শান্তস্নিগ্ধ পরিবেশে বিরাজ করছে। খোশবাগ হল আনন্দবাগিচা-সেখানে রয়েছে আলিবর্দি খাঁ, সিরাজদ্দৌলা, লুৎফাউন্নিসা সহ নবাব পরিবারের বিশিষ্টজনের সমাধিক্ষেত্র। রোশনীবাগের সুশোভিত উদ্যানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা এবং তাঁর পরিজনেরা। এই উদ্যানের মাঝে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে আলিবর্দি একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
হাজারদুয়ারীর দক্ষিণে মতিঝিল বিখ্যাত; শুধু সুরম্য লেকের জন্য নয়, লেকের ধারে ত্রিতল প্রাসাদের জন্য। প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন আলিবর্দির জ্যেষ্ঠ জামাতা নবাব নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ। পরবর্তী সময়ে এটিই ঘসেটি বেগমের প্রাসাদ বলে চিহ্নিত হয়ে যায়। ঘসেটি বেগমের সেই মতিঝিলের প্রাসাদও আজ নিশ্চিহ্ন। মতিঝিল মসজিদ লাগোয়া গুপ্তকক্ষেই রয়েছে ঘসেটি বেগমের সমাধি। মুর্শিদাবাদের অন্যান্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে রয়েছে মদিনা মসজিদ, ঘড়িঘর, ননীপুর রাজ প্রাসাদ, জগত শেঠের বাড়ি, হীরাঝিল, কদম শরীফ প্রভৃতি।
মুর্শিদাবাদ থেকে মাত্র ৫৩ কিমি দূরে বিখ্যাত পলাশীর আমবাগান। ১৭৫৭ সালে এখানেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদৌল্লার পরাজয় ঘটে ব্রিটিশদের হাতে।
মুর্শিদাবাদের ১৪ কিমি দূরে বহরমপুর। বহরমপুরের প্রাচীন জনপদ হল সৈদ্যবাদ। এখানে একসময় ফরাসী উপনিবেশ ছিল তাই অঞ্চলটির ফরাসডাঙ্গানামেই বেশি পরিচিত। তারও আগে এই অঞ্চলে আর্মেনিয়ানরা বাস করত। ১৭৫৮ সালে তৈরি সুবৃহৎ আর্মেনিয়ান গির্জাটি আজও অটুট রয়েছে। অনবদ্য অলংকরণ। গির্জার চত্বরে অনেকের সমাধি নজরে পড়ে। সৈদ্যবাদের রাজবাড়িটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এর খিলানের অভিনবত্ব লক্ষ্য করা যায়। এখানে কয়েকটি শিবমন্দির যেমন চারচালাবিশিষ্ট পঞ্চমুখী শিবমন্দিরটির কথা উল্লেখ্য। অদূরে রয়েছে কুঞ্জঘাটা রাজবাড়ি। নবাব মীরজাফরের দেওয়ান নন্দকুমারের জামাতার তৈরি। এই প্রাসাদটিও কালের কবলে পরলেও প্রাসাদসংলগ্ন দুর্গাদালান, শিবমন্দির, লক্ষ্মীনারায়ণের মন্দির এবং বৃন্দাবনচন্দ্র জীউর মন্দির এখনো রয়েছে। মুর্শিদাবাদ, বহরমপুরে যেমন অসংখ্য মসজিদ আছে তেমনি রয়েছে অসংখ্য রাজবাড়ি এবং হিন্দু দেবদেবীর মন্দির। বহরমপুর থানার বিষ্ণুপুরে প্রতিষ্ঠিত করুণাময়ী কালী বিশেষ জাগ্রতা দেবী বলে সাধারণ লোকের বিশ্বাস। দেবীর বর্তমান মন্দিরটি লালগোলার রাজপরিবার কর্তৃক নির্মিত। মন্দিরাভ্যন্তরে চার হাত বিশিষ্ট দেবীর অর্দ্ধাঙ্গ মূর্তি, সঙ্গে রয়েছেন তাঁর ভৈরব মহাকাল শিব। করুণাময়ী কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে নানাপ্রকার কিংবদন্তী চালু আছে। শোনা যায়, কালাপাহাড় যখন দক্ষিণ ভারতে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন তখন জনৈক ব্রাহ্মণ তাঁর হাত থেকে করুণাময়ীকে রক্ষা করার জন্য দক্ষিণ ভারত থেকে মূর্তিটিকে উড়িষ্যায় নিয়ে এসেছিলেন এবং পুরী যাওয়ার পথে মূর্তিটিকে আর রক্ষা করা সম্ভব নয় ভেবে নদীতে নিক্ষেপ করেন এবং জলপ্রবাহের পরে মূর্তিটি বিষ্ণুপুরের শ্মশানঘাটে এসে উপস্থিত হয়। দক্ষিণ ভারতের ভাস্কর্যের সঙ্গে বিষ্ণুপুরে প্রতিষ্ঠিত কালী মূর্তিটির সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
মুর্শিদাবাদ থেকে ৬ কিমি দূরে কিরীটেশ্বরী মন্দির। কিরীটেশ্বরী একান্নপীঠের অন্যতম। এই দেবীর পূর্ব নাম ছিল কিরীটকণা। দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহ একান্ন অংশে বিভক্ত হয়ে ভারতে নানা স্থানে পতিত হয়েছিল। কিরীটেশ্বরী পীঠে সতীর কিরীটের এক কণামাত্র পড়েছিল বলে প্রবাদ আছে। মন্দিরটি পশ্চিমমুখী; মন্দিরের মধ্যে কোন মূর্তি নেই। মূল মন্দিরটি ধ্বংস হলেও কারুকার্যময় প্রস্তর বেদিটি এখনো বর্তমান। প্রাচীন এই বেদীর উপর আরও একটি বেদি আছে এবং এটিই দেবীর কিরীটরূপে পূজিত হয়। এই পীঠস্থানের দেবী বিমলা ও ভৈরব সম্বর্ত নামে খ্যাত। কিরীটেশ্বরী ভৈরব বলে যে মূর্তি পূজিত হয় তা প্রকৃত পক্ষে একটি বুদ্ধমূর্তি। সম্ভবতঃ কিরীটেশ্বরীর মূল মন্দিরটি পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বে নির্মিত হয়েছিল। ১৭৫৬ খ্রীস্টাব্দে বঙ্গাধিকারী দর্পনারায়ণ এই মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন। এই মন্দিরের পিছনে দুটি শিব মন্দির রাজা রাজবল্লভের প্রতিষ্ঠিত বলে কথিত।
বহরমপুর ও মুর্শিদাবাদের মাঝে কাশিমবাজার। বহরমপুর থেকে ১১ কিমি দূরে রাঙামাটি - গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ।
বহরমপুর থেকে খাগড়া ঘাট হয়ে যাওয়া যায় আজিমগঞ্জ। সেখান থেকে নৌকায় ভাগিরথী পেরিয়ে জিয়াগঞ্জ। আজিমগঞ্জে গঙ্গার তীরে বড়নগরের মন্দির। নাটোরের রানী ভবানীর পৃষ্ঠপোষকতায় শুধু এই মন্দিরটি কেন, মন্দিরের পর মন্দির গড়ে উঠেছিল এই গঙ্গার তীরে। তাঁর ইচ্ছা ছিল বড়নগরকে কালীধামে পরিণত করা। পঞ্চমুখী পঞ্চান্ন শিব, চারবাংলা মন্দির মুখোমুখি অবস্থান করছে, দেবতা অবশ্যই শিব ঠাকুর। প্রতিটি মন্দিরের টেরাকোটার অলংকরণ লক্ষ্য করা যায়। রামায়ণ, মহাভারত ছাড়াও নানা পৌরাণিক আখ্যান দেওয়ালে স্থান পেয়েছে। রানী ভবানীর অপূর্ব কীর্তি ভবানীশ্বর শিবমন্দির। আটকোণাকৃতি, উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট, মন্দিরটি গম্বুজাকৃতি; মন্দিরের মাথায় আটটি পাপড়িবিশিষ্ট পদ্মের অবস্থান। আটটি প্রবেশদ্বার। অলিন্দযুক্ত ভাস্কর্যময় মন্দিরটির পাশে তাঁরই নির্মিত আরও একটি মন্দিরে মহিষমর্দিনী দুর্গার রাজরাজেশ্বরীর মূর্তিটি অষ্টধাতুতে গড়া, মন্দিরাভ্যন্তরে প্যানেলের মধ্যে স্থাপিত; অপূর্ব কারুকার্যমন্ডিত, অলংকরণ সমৃদ্ধ, রণসম্ভারে সজ্জিতা এমন মূর্তি খুব কমই নজরে আসে। মন্দিরে আরও দেবদেবীর অধিষ্ঠান লক্ষ্য করা যায়, যেমন বিষ্ণু, জয়দুর্গা, মহালক্ষ্মী, মদনগোপাল ইত্যাদি। অদূরেই রানী ভবানী কন্যা তারাসুন্দরী নির্মিত গোপাল মন্দিরটি আজ জীর্ণ। পাশেই রয়েছে গঙ্গেশ্বর, কস্তুরীশ্বর, নাগেশ্বর শিব মন্দির। এগুলিও জরাজীর্ণ। রাজবাড়িটিও বিলুপ্তপ্রায়। বেলডাঙ্গা থানার অন্তর্গত নওপুকুরিয়া গ্রামে মা ডুমনীর পুজো খুব ধুমধামে হয়ে থাকে। দেবীমূর্তি চর্তুভুজা এবং প্রস্তরময়। অনেকে এই মূর্তিকে বৌদ্ধতারা মূর্তি বলে থাকেন।
সুতীথানার বংশবাটি গ্রামে বৃদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা অত্যন্ত প্রাচীন। প্রস্তর মুর্তি তবে পক্ষীরূপা। কথিত আছে দ্বাপরে কংস কর্তৃক নিধন হওয়ার ভয়ে যশোদা পক্ষীরূপ ধারণ করে কারাগার থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সেই কল্পনা করে এই দেবী মূর্তির প্রতিষ্ঠা। রূপপুর গ্রামে রুদ্রদেবের মন্দির ১৮৯২ সাল নাগাদ তৈরি হয়েছিল। এটি দক্ষিণমুখী এবং সামনে বারান্দাওয়ালা একটি সাধারণ পাকা দালানঘর মাত্র। মন্দিরাভ্যন্তরে একটি বেদির উপর প্রায় দেড়ফুট উঁচু ও এক ফুট চওড়া বিশিষ্ট কালো পাথরের খোদিত ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর বুদ্ধদেব যোগাসনে উপবিষ্ট। মূর্তিটির ডানহাত নাভিমূলে এবং বাম হাত ভূমি স্পর্শিত। এই বুদ্ধমূর্তিই এখানে রুদ্রদেব নামে খ্যাত এবং শিবের ধ্যানে পূজিত। মন্দিরে রুদ্রদেবের মূর্তি ব্যতীত দারুময় বাণেশ্বর মূর্তি ও মন্দিরের দুপাশে মোট চারটি চারচালার শিব মন্দির আছে।
কান্দি থানার দোহালিয়া গ্রামে দক্ষিণা কালী মন্দিরটি সিদ্ধপীঠ বলে খ্যাত। মন্দিরটি বারান্দাযুক্ত পাকা দালান মন্দির। মন্দিরাভ্যন্তরে উঁচু বেদির উপর সিঁদুর চর্চিত হয়ে দেবী কূর্মাকৃতি ব্রহ্মশিলা বিশেষ। শিলার গায়ে সোনার তৈরি জিভ, চোখ লাগানো আছে এবং গ্রামবাসীগণ এই শিলাটিকে দক্ষিণাকালী রূপে পূজা করে থাকেন। কালী মন্দিরের পশ্চিম দিকে পাঁচটি এবং পূর্বে দুটি চারচালা শিবমন্দির রয়েছে। মন্দিরগুলি কান্দির সিংহরাজ পরিবার কর্তৃক নির্মিত।
ভরতপুর থানার বৈদ্যপুর গ্রামে সুউচ্চ একতলা খিলানযুক্ত বারান্দাসহ পাকা মন্দিরে ধর্মরাজ প্রতিষ্ঠিত। মন্দিরে চারটি বিগ্রহ- মনোহর রায় আকার বৃহত্তম ঢিবি, ধর্মরাজ, চম্পক রায় গোলাকৃতি ছোট ঢিবি, চাঁদ রায় আকৃতি চ্যাপ্টা। ব্রহ্মার ধ্যানে ধর্মরাজকে পূজা করা হয় বলে জানা যায়। অদূরেই শক্তিপুর গ্রামে বিখ্যাত কপিলেশ্বর মন্দির। আদি মন্দিরটি নাকি প্রস্তর নির্মিত ছিল। বহুপূর্বেই তা গঙ্গাবক্ষে বিলীন হয়ে গেছে। সেই মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ ইতঃস্তত ছড়ানো দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান মন্দিরটি ইটের তৈরি, দক্ষিণমুখী। দৈর্ঘ্য ১৮ হাত, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ১৮ এবং ৪০ হাত। এই মন্দিরের নিকটেই ৬০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট চন্দ্রশেখর শিবমন্দির। বাঘডাঙ্গার রানী মুক্তকেশী দেবী কর্তৃক মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল।
যাওয়া – নিকটতম রেল স্টেশন মুর্শিদাবাদ(MBB) ও বহরমপুর কোর্ট। কলকাতা, দুর্গাপুর, মালদহ, শিলিগুড়ি, শান্তিনিকেতন প্রভৃতি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাসও যাচ্ছে মুর্শিদাবাদ। অটো বা রিক্সায় মুর্শিদাবাদ শহরের বিভিন্ন দ্রষ্টব্যগুলি দেখে নেওয়া যায়।
থাকা – বহরমপুর রেলস্টেশনের কাছেই পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিস্ট লজ। বেনফিশের হোটেল সিরাজবাগ। হাজারদুয়ারির কাছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইয়ুথ হোস্টেল, পি ডব্লু ডি রেস্ট হাউস ও মুর্শিদাবাদের পৌর অতিথি নিবাস। এছাড়া শহরজুড়ে রয়েছে নানান মান ও দামের অনেক হোটেল।
খাওয়াদাওয়া- মুর্শিদাবাদের আম আর মিষ্টির খ্যাতি রয়েছে। খাগড়ার ছানাবড়া, আজিমগঞ্জের বরফি সন্দেশ, রঘুনাথগঞ্জের রসকদম্ব, ধুলিয়ানের খোয়া চমচম, কমলাভোগ, ক্ষীরমোহন ইত্যাদির স্বাদ নিতে হবে।
কেনাকাটা – মুর্শিদাবাদের সিল্ক বিখ্যাত। সরকারি সিল্ক রিসার্চ সেন্টারটিও ঘুরতে হবে। খাগড়ার খ্যাতি কাঁসার বাসনের জন্য।
উৎসব - মুর্শিদাবাদ-বহরমপুরের খোজা খিজির বা বেরা উৎসব এক দ্রষ্টব্য বস্তু। এই উৎসবের প্রবর্তক নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ স্বয়ং। ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করার পর এই উৎসবের আয়োজন করেন। উৎসবের বিষয়বস্তু হল গঙ্গাবক্ষে আলোক সজ্জায় সজ্জিত করে কলাগাছের বেরা বা নৌকা তৈরি করে ভাসানো হাজার আলোর রোশনাই। ময়ূরপঙ্খী আদলে তৈরি নৌকা, তবে ময়ূর নয়, সামনে মকর আর পিছনের মুখ হাতির মত। সোদা ভাসানো উৎসব মুসলমানদের উৎসব বলে চিহ্নিত হলেও হিন্দু মেয়েরাও এতে অংশগ্রহণ করে থাকে। কলার পেটো দিয়ে নৌকা বানিয়ে ফুল, সিন্নি বা বাতাসা দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে গঙ্গায় বা পুকুরে ভাদ্রমাসে সোদা ভাসানো হয়।
খেতুর পঞ্চমী মহোৎসব বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উৎসব এবং প্রবর্তন করেছিলেন শ্রীচৈতন্যভক্ত নরোত্তম দাস। তিনি  খেতুর গ্রামে বৈষ্ণবদের প্রথম মহাসম্মেলন আহ্বান করেছিলেন। দিনটি ছিল লক্ষ্মী পূর্ণিমার পরবর্তী পঞ্চমী তিথি। সেই দিনটিকে উপলক্ষ্য করে প্রতি বছর পাঁচদিন ব্যাপি উৎসব পালিত হয়ে আসছে।

|| ভ্রমণকাহিনি- ইতিহাসও কথা বলে ||

বিষ্ণুপুর (Bishnupur) – টেরাকোটার অপরূপ শৈলীর মন্দির, বিষ্ণুপুরী ঘরানার রাগসঙ্গীত আর বালুচরী-স্বর্ণচরীর কারুকাজে উঠে আসা ইতিহাসের নানান ছবি নিয়ে অনন্য বিষ্ণুপুর। বাঁকুড়া জেলার এই ছোট শহরটির পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বিষ্ণুপুরের মত পুরাকীর্তিবহুল স্থান পশ্চিমবঙ্গে খুব কমই আছে। কিংবদন্তী অনুযায়ী, খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক নাগাদ বিষ্ণুপুরে মল্লরাজ বংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন এর নাম ছিল মল্লভূম। প্রায় এক হাজার বছরের দীর্ঘ রাজত্বকালে মল্লরাজবংশের হাত ধরে শিল্প-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধির চূড়ায় ওঠে বিষ্ণুপুর।
বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলির অবস্থান বেশ কাছাকাছিই। রিক্সাভাড়া করে প্রধান প্রধান মন্দিরগুলি ঘুরে নেওয়া যায়। সবচেয়ে বিখ্যাত জোড়বাংলা মন্দির। মল্লেশ্বর, মদনমোহন, জোড়বাংলা, মুরলীমোহন, শ্যামরায় মন্দিরগুলি ইঁটের তৈরি। কালাচাঁদ, লালজী, মদনগোপাল, রাধামাধব, রাধাগোবিন্দ, রাধাশ্যাম, নন্দলাল মন্দিরগুলি ল্যাটেরাইট পাথরে নির্মিত। মন্দিরগুলিতে পোড়ামাটির অপরূপ ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে দেব-দেবী, সমাজজীবন, ফুল-লতা-পাতা, পশুপাখির নানান মোটিফ। হাতে সময় থাকলে পায়ে পায়ে বেড়িয়ে নেওয়া যায় বিষ্ণুপুরের মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে থাকা নাম না জানা ছোট ছোট মন্দিরগুলিও। যে স্থাপত্যরীতি বিষ্ণুপুরে সবচেয়ে সমাদৃত তাকে একবর্তনী শৈলী বলা হয়। বাঁকানো কার্নিসযুক্ত দেওয়াল ও ইষৎ ঢালু ছাদের কেন্দ্রে একটিমাত্র চূড়ার বিন্যাস এই রীতির বৈশিষ্ট্য। শহরের জলাভাব মেটাতে মল্লরাজ বীরসিংহ এখানে অনেকগুলি দীঘি খনন করেন। লালবাঈ-এর গল্পকথা জড়িয়ে রয়েছে বিখ্যাত লালবাঁধকে ঘিরে। এছাড়াও রয়েছে কৃষ্ণবাঁধ, যমুনাবাঁধ, কালিন্দীবাঁধ, শ্যামবাঁধ, পোকাবাঁধ, চৌখনবাঁধ প্রভৃতি। লালবাঁধের কাছেই বিখ্যাত দলমাদল কামান। পাশে ছিন্নমস্তার মন্দির। শুধু স্থাপত্যই নয়, রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সঙ্গীতজগতে যে বিশিষ্ট ঘরানার একদা সৃষ্টি হয়েছিল তার ধারা আজো অম্লান হয়ে বেঁচে আছে সঙ্গীত শিল্পীদের কন্ঠে। সঙ্গীতাচার্য যদুভট্টের জন্মস্থান এই বিষ্ণুপুরে।
বিষ্ণুপুরের অন্যতম আকর্ষণ জোড়বাংলা(কেষ্ট-রাই) মন্দির। মল্ল রাজা রঘুনাথ সিং ১৬৫৫ খ্রীষ্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। ক্লাসিকাল চালা শিল্পরীতি অনুযায়ী নির্মিত এই মন্দিরটি। এটি দেখলে মনে হবে দুটো কুঁড়েঘর একটা ছাদ আর দেওয়াল দিয়ে জোড়া। এর গাত্রে খোদিত টেরাকোটার কাজ অসাধারণ। তৎকালীন রাজাদের কীর্তি রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি বর্ণিত আছে এই টেরাকোটার কাজে ছবির মাধ্যমে।
রাজা বীরসিংহ কর্তৃক ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত লালজি মন্দিরটি বাঁকুড়া জেলার চারচালা একচূড়া মন্দিরগুলির মধ্যে বৃহত্তম। ৫৪ বর্গফুটের ভিত্তিবেদির উপর প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণমুখী মন্দিরটির পূর্ব-পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে তিনটি করে তোরণযুক্ত প্রবেশ পথ ও সংলগ্ন দালান আছে। চূড়ার নীচের খাড়া অংশের চারদিকে চারটি খিলানযুক্ত অলিন্দ ও সাতটি করে পঙ্খ আছে আর উপরের অংশে কার্নিসের প্রয়োগ, পীঢ়া দেউলদীর্ঘ আকৃতি এবং অলংকরণ মন্দিরটিকে বিশিষ্ট মর্যাদা দান করেছে।
বিষ্ণুপুরে উল্লেখযোগ্য মন্দিরের সংখ্যা তিরিশের নীচে হবে না। বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি দেউল, চালা, রত্ন প্রভৃতি স্থাপত্যগত দিক থেকে পৃথক পৃথক পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দেউল পর্যায়ের সৌধগুলির মধ্যে মলেশ্বর শিবের মন্দির উল্লেখযোগ্য। এটি ল্যাটেরাইট পাথরে ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে রঘুনাথ সিংহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মন্দিরটি পূর্বে নাকি দেউল আকৃতির ছিল এবং বক্রাকৃতি গন্ডির উপরে আমলক ও কলস স্থাপিত ছিল। আদি মন্দিরের সঙ্গে বর্তমান মন্দিরে কিছু কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় বিশেষ করে উদগতা অংশগুলির ক্ষেত্রে। পলেস্তারার প্রয়োগে গোটা মন্দিরটিই আধুনিকতার রূপ পেয়েছে। বর্তমান মন্দিরটি একটি চতুষ্কোন গৃহের উপর অষ্টকোণাকৃতি এক শিখর বিশিষ্ট। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের উপর একটি পাথরের হাতি ও শিলালিপি আছে, মন্দিরাভ্যন্তরে মেঝের উপর স্থাপিত উত্তরদিকে বিস্তৃত গৌরীপট বেষ্টিত শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত আছে। ইনিই মল্লেশ্বর শিব নামে খ্যাত। মন্দিরের সংলগ্ন একটি বৃহৎ নহবত খানা আছে। মন্দির চত্বরে একটি চৌবাচ্চার মধ্যে জলেশ্বর শিব নিহিত আছেন।
রত্নমন্দিরের মধ্যে মদনমোহন, কালাচাঁদ, রাধাগোবিন্দ, নন্দলাল ও রাধামাধবমন্দির উল্লেখযোগ্য। রত্নমন্দির বিষ্ণুপুর জেলায় বিশেষ সমাদৃত হয়েছিল। ইঁট ও মাকড়া পাথরে তৈরি কালাচাঁদ মন্দিরের গায়ে পৌরাণিক দেবদেবী, কৃষ্ণলীলা প্রভৃতি দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। অষ্টকোণাকৃতি এই নবরত্নবিশিষ্ট মন্দিরের চূড়ায় পদ্ম, আমলক, ঘট ও ধ্বজা। ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত রাধামাধব মন্দিরে ভিত্তিবেদির সমান্তরাল দুটি সারিতে পশু পক্ষী ও পৌরাণিক ভাস্কর্য। দুপাশের দেওয়াল ও কার্নিসের নীচে খোপের মধ্যে দুসারি করে মূর্তি ও ভাস্কর্য। খিলানশীর্ষে ও থামের গায়েও নানাবিধ ভাস্কর্যে সজ্জিত - বিষয় প্রধানত কৃষ্ণলীলা, দশাবতার, পদ্ম প্রভৃতি। এই অঞ্চলে একরত্ন মন্দির সবই পাথরের, দুই একটি ইঁটের ছাড়া, তার মধ্যে মদনমোহন মন্দির উল্লেখযোগ্য। পোড়ামাটির কাজে একদিকে পশুপক্ষি, কৃষ্ণলীলা, দশাবতার ও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনি রূপায়িত, অপরদিকে স্থান পেয়েছে প্রধানত যুদ্ধ দৃশ্য। থামের গায়ে কীর্তন ও বাজিয়ের দল ও খিলানশীর্ষে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ ও মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনি। মদনমোহন মন্দিরের চারিদিকে ইঁটের সুউচ্চ প্রাচীর। মন্দিরটি দক্ষিণমুখী এবং বারান্দাবিশিষ্ট। বিষ্ণুপুরে ইঁটের মন্দিরগুলির মধ্যে এই মন্দিরটিই অন্যতম বলে বিবেচিত। ভিতের চারিদিকে হাঁসের সারি, বাদ্য ও নৃত্যরত মূর্তি, রামায়ণকাহিনি, দশাবতার ও ড্রাগন মূর্তি দ্বারা অলংকৃত। সম্মুখে নাটমন্দিরটির দেওয়ালে পোড়ামাটির কাজ আছে।
১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ কর্তৃক রাধাশ্যাম জীউর মন্দির নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরটি মাকড়া পাথরের এবং চারচালা রীতিতে গঠিত এবং টেরাকোটাসমৃদ্ধ গম্বুজাকৃতি রত্নশিখরটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। দক্ষিণমুখী মন্দিরটির দেওয়ালে অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণু, ব্রহ্মা, মহেশ্বর ও গণেশাদি দেবতা, হাতি, ঘোড়া, মহিষ, হরিণ ইত্যাদি পশুপাখি, নরনারী প্রভৃতি পোড়ামাটির মূর্তিদ্বারা সুন্দরভাবে অলংকৃত। বিষ্ণুপুর দুর্গের ভেতরের দেবালয়গুলি সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তৈরি বলে মনে হয়। এরমধ্যে শ্যামরায়ের পঞ্চরত্ন মন্দিরটি উল্লেখযোগ্য। মন্দিরটি ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এবং পঞ্চরত্ন মন্দিরের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। বিষ্ণুপুর দুর্গের মধ্যে আর একটি ভগ্ন জোড়বাংলা মন্দিরের দেখা পাওয়া যায়। মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির কাজের নিদর্শন দুচারটি রয়েছে। এখানে একজোড়া করে চারটি রেখদেউল এবং দুর্গের বাইরে রাসমঞ্চ বলে পরিচিত পিরামিডতুল্য গৃহটি উল্লেখযোগ্য।
বিষ্ণুপুরে বহু প্রাচীন কীর্তির মধ্যে আছে গড়খাই দুর্গ। দ্রষ্টব্যবস্তু হল পাথরের তৈরি পাথর দরজা ও বীর দরজা, দলমর্দন বা দলমাদল কামান ইত্যাদি।
বিষ্ণুপুরের অদূরে অযোধ্যা গ্রামে ইঁটের তৈরি বারোটি শিবমন্দির পাশাপাশি অবস্থিত। পঞ্চরথ দেউলরীতির এই দেবালয় উচ্চতায় ২৫ ফুট ও প্রস্থে ১০ ফুটের বেশি হবে না। এরই কাছাকাছি গিরিগোবর্ধনের মন্দির নির্মাণ রীতির এক অভিনব নিদর্শন। দেবগৃহের চালা প্রচলিত কোনো পদ্ধতিতে তৈরি না করে বড়ো বড়ো শিলাখন্ডের আকারে বিন্যস্ত। বিগ্রহটি শ্রীকৃষ্ণের, এছাড়া সতেরো চূড়াযুক্ত আটকোণা রাসমঞ্চটি উল্লেখযোগ্য। এই থানার অন্তর্গত জয়কৃষ্ণপুরে যত ছোটো ছোটো মন্দির নির্মিত হয়েছিল এমনটি আর কোথাও হয় নি বলে মনে করা হয়। ইঁট ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাকড়া পাথরের নির্মিত দেউল একরত্ন পঞ্চরত্ন, দালান প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
যাওয়া– নিকটতম স্টেশন বিষ্ণুপুর(VSU)। বাঁকুড়া, কলকাতা, আসানসোল, দুর্গাপুরের মতো পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহর থেকে নিয়মিত বাসও যাচ্ছে বিষ্ণুপুরে।
থাকা – পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের ট্যুরিস্ট লজ রয়েছে বিষ্ণুপুরে। পাশেই পৌরসভার পৌর পর্যটন আবাস। এছাড়া শহর জুড়েই রয়েছে নানান মান ও দামের বেসরকারি হোটেল।
মেলা – বিষ্ণুপুরের আরেক আকর্ষণ বিষ্ণুপুর মেলা। শীতের রোদ গায়ে মেখে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ জুড়ে (২৩-২৭ ডিসেম্বর) চলে এই মেলা। মেলার সময় আগে থেকে বুকিং করে আসাই ভালো।
কেনাকাটা – বালুচরী আর স্বর্ণচরী শাড়ির জন্যও খ্যাত বিষ্ণুপুর। সংগ্রহে রেখে দেওয়ার মতো আরেকটি জিনিস হল হিন্দুপুরাণের দেবদেবীদের ছবি আঁকা দশাবতার তাস। এছাড়াও স্যুভেনির হিসেবে কেনা যায় বিষ্ণুপুরের মাটির ঘোড়া বা অন্যান্য পোড়ামাটির তৈরি ঘর সাজানোর জিনিসপত্র, ডোকরা, কাঠ বা শাঁখের কাজ।
ভ্রমণকাহিনি- মন্দির-নগরীতে কিছুক্ষণ

মুকুটমণিপুর (Mukutmanipur) – কংসাবতী ও কুমারী নদীর সঙ্গমে উইক-এণ্ড ছুটি কাটানোর দারুণ স্পট মুকুটমণিপুর। অনুচ্চ পাহাড়ি টিলা, দুই নদীর বাঁধ আর সবুজে ছাওয়া টলটলে নীল জলের লেক। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুই-ই মনোরম। আরও অপরূপ জ্যোৎস্না রাত। লেকের জলে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও আছে।
৬ কিমি দূরে পার্শ্বনাথ স্বামীর মন্দির। নদী পেরিয়ে ওপারে দেড় কিমি দূরে ছোট্ট দ্বীপ বনপুকুরিয়া মৃগদাবটি। মুকুটমণিপুর থেকে বাসে খাতড়া হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় ঝিলিমিলি।
যাওয়া – কলকাতা, দুর্গাপুর, আসানসোল, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর – পশ্চিমবঙ্গের নানান জায়গা থেকে বাস যাচ্ছে মুকুটমণিপুর। কাছের স্টেশন বাঁকুড়া(BQA)।
থাকা – সেচ ও জল দপ্তরের কংসাবতী ভবন।বুকিং – সুপারিনটেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, কংসাবতী প্রোজেক্ট, বাঁকুড়া বা ইরিগেশন অ্যান্ড ওয়াটার সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট, রাইটার্স বিল্ডিং, কলকাতা।ইয়ুথ হোস্টেল। বুকিং : অধিকর্তা, যুব কল্যাণ দপ্তর।৩২/১ বি বা দী বাগ (দক্ষিণ)।পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের সোনাঝুরি প্রকৃতি ভবন কেন্দ্র। এছাড়াও নানান বেসরকারি হোটেল রয়েছে।
মেলা– পৌষ মাসের মকর সংক্রান্তিতে কাঁসাই নদীর তীরে ঝিলিমিলিতে বসে টুসু পরব।
শুশুনিয়া - শাল, সেগুন, অর্জুন, পলাশ, মহুয়া,বাবলা, আমলকী-র সবুজে ছাওয়া পাহাড় আর গ্রাম নিয়ে শুশুনিয়া। পাহাড়তো নয়, বড়সড় একটা টিলা। বয়সে হিমালয়ের চেয়েও প্রাচীন –সেই আর্কিয়ান যুগে জন্ম। ইতিহাসেও উল্লেখ রয়েছে এই শুশুনিয়ার কথা। একসময় রাজপুত রাজা চন্দ্রবর্মার দুর্গ ছিল পাহাড়ের মাথায়। ৪৪০ মিটার উঁচু এই পাহাড়ের পায়ের কাছে নির্জনে বয়ে চলেছে গন্ধেশ্বরী নদী। কোলঘেঁষে যে ঝরনাটা বয়ে চলেছে তার জল ওষধির কাজ করে। বর্ষায় পুরো এলাকা সবুজ হয়ে যায়, আর বসন্তে রঙ বদলে পলাশের রঙে রাঙা। অদ্ভুত সুন্দর ছায়াঘন পরিবেশ। জ্যোৎস্নারাতে শুশুনিয়াকে কেমন অপার্থিবমনে হয়। ঝরনার ঠিক উল্টোদিকেই সিঁদুরমাখা শিলামূর্তিটি স্থানীয় মানুষ নৃসিংহদেব রূপে পুজো করেন।
গ্রীন লজের পাশ দিয়ে চার -পাঁচ কিলোমিটার নীচে নেমে, শুশুনিয়া গ্রাম। গ্রামটায় কয়েক হাজার লোকের বাস। একটা হাইস্কুল আছে, লাইব্রেরি আছে, ব্যাঙ্ক আছে। তিনমাথার মোড় থেকে ছাতনার বিপরীত দিকের রাস্তাটায় একটু এগিয়ে বাঁহাতে একটা রাস্তা চলে গেছে হুকুমিয়া গ্রামের দিকে। দু’পাশে সুন্দর শালের জঙ্গল।
তিনমাথার মোড় থেকেই ডানদিকের সরু রাস্তাটা চলে গেছে একেবারে শুশুনিয়া পাহাড়ের নীচে যেখানে ঝরনার জলটা এসে পড়েছে। তার পাশ দিয়ে একটা পায়ে চলার পথ উঠছে ওপরে। অর্ধেকটার কিছুটা ওপরে পায়ে চলার পথটা শেষ হয়ে গেছে। পাহাড়ের একবারে মাথায় একটা ছোটমতো শিবমন্দির আছে। ঠিক ওপরে ওঠার আগেই একটা ঘনজঙ্গল। জঙ্গলে হনুমান আর বুনো শুয়োর আছে।
পাহাড়ের তলায়, ঝরনার আশেপাশে কয়েকটা দোকান আছে। এখানকার বাসিন্দারা পাথর কেটে নানান জিনিষপত্র তৈরি করেন, তারই সব দোকান। তিনমাথার মোড়ের কাছেও এরকম বেশ কয়েকটা দোকান আছে। তবে হুকুমিয়া গ্রামের কাছে শিলালিপি গ্রামে গেলে কারিগরদের কাজ একেবারে সামনে বসেই দেখা যায়।
শুশুনিয়ায় আসার পথে ছাতনায় দেখে নেওয়া যায় বিশালাক্ষী বা বাসুলি দেবীর প্রাচীন মন্দিরটি। এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচয়িতা বড়ু চন্ডীদাস। ছাতনায় চন্ডীদাসের নামে একটা কলেজ হয়েছে -বড়ু চন্ডীদাস মহাবিদ্যালয়।
যাওয়াঃ নিকটবর্তী রেলস্টেশন ছাতনা। কলকাতা থেকে দূরত্ব ১৩২ কিলোমিটার। ছাতনা থেকে শুশুনিয়ার দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। ছাতনায় পৌঁছে শুশুনিয়া মোড় থেকে ট্রেকারে মিনিট পনেরো-কুড়ি লাগে শুশুনিয়ায় তিনমাথার মোড়ে পৌঁছাতে। বাঁকুড়া বা দুর্গাপুর থেকে বাসে বা গাড়িতেও শুশুনিয়া আসা যায়।
থাকাঃ এখানে থাকার জায়গা তিনটে-কোলে বাংলো, রামকৃষ্ণ লজ আর গ্রীন লজ। মোড়ের মাথায় বেশ কয়েকটা ঝুপড়ি দোকান আছে। দোকানগুলোয় বলে রাখলে রান্না করে রাখে। ঠিক বাঁহাতেরটাই ঝড়ুদার দোকান। কথা বলে রাখলে ঝড়ুদা থাকা -খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। ঝড়ুদা -৯৪৭৪৭২৪৬২৩ (জুলাই ২০১১)।
ভ্রমণ কাহিনি - শুশুনিয়া পাহাড় আর এক টেনিদার গল্প || শুশুনিয়াকথা

বিহারীনাথ পাহাড় (Biharinath)- আসলে পাহাড়তো নয়, টিলা। বাঁকুড়া জেলার অন্যান্য টিলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু (১৪৮০ ফিট)। এখনো বাঙালির উইক-এন্ড ট্যুরের হাত-বইতে তেমন স্থান পায়নি সে। মহুয়া, শাল, পিয়ালের একাকী মৌন এই বিহারীনাথে জেগে আছে অপরূপ আদিম নৈঃশব্দ। বর্ষায় সবুজ পাহাড়ের গায়ে খেলা করে মায়াবী মেঘ-রোদ্দুরের  আলো-ছায়া। বিহারীনাথ থেকেই চোখে পড়ে শরপাহাড়ি আর দূরের দিগন্তরেখায় আঁকা আবছা পাঞ্চেত পাহাড়। পাহাড়ের নীচেই শিব মন্দির, লাগোয়া জলাশয়।
যাওয়া – বিহারীনাথের কাছেই রানীগঞ্জ। দূরত্ব ৩৫কিমি। বাঁকুড়া ৫০ কিমি দূরে। গাড়িতে বাঁকুড়া থেকে দেড় ঘন্টায় আর রানীগঞ্জ স্টেশন থেকে এক ঘন্টার কমেই পৌঁছান যায় এখানে। দু’জায়গা থেকেই ভাড়া গাড়ি পাওয়া যায়। তাছাড়া রানীগঞ্জ থেকে ঠিক বিহারীনাথ পাহাড় পর্যন্ত বাস সার্ভিস আছে- তবে সংখ্যায় কম। বিহারীনাথ পৌঁছনোর সবচেয়ে সহজ উপায় আসানসোল থেকে আদ্রাগামী লোকাল ট্রেনে উঠে মধুকুণ্ডা নামা আর সেখান থেকে গাড়ি বা ট্রেকারে সরাসরি ২০ কিমি দূরে বিহারীনাথ।
থাকা – এখানে একমাত্র থাকার জায়গা শালতোড়া পঞ্চায়েত সমিতির লজ। খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও লজেই।
|| ভ্রমণকাহিনি - তার সাথে মনে মনে কথা বলা চলে ||

বড়ন্তি (Baranti) - কলকাতা থেকে মাত্র ২৫০ কিলোমিটার দূরে পুরুলিয়ার একটি ছোট্ট গ্রাম বড়ন্তি। শাল সেগুন মহয়া গাছের ছায়াঘেরা নিবিড় অরণ্যের বুকে জনা বিশেক পরিবার নিয়ে এই গ্রাম। আর তার পাশেই ছোট ছোট টিলাকে সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে এক সুবিশাল হ্রদ মুরাডি। প্রচুর পাখি আর প্রজাপতির আনাগোনা এখানে। পূর্ণিমার রাতে বরন্তির মোহময় রূপ সত্যি অতুলনীয়।
বড়ন্তি থেকে ১০-১১ কি.মি. দূরে ২২০০ ফিট উচ্চ চূড়া নিয়ে ঝাড়খন্ড-বাংলা সীমান্তে পঞ্চকোট পাহাড়। এই পাহাড়ের এক প্রান্ত ১৯৫৯ সালে নির্মিত ৬৭৭৭ মিটার দীর্ঘ পাঞ্চেৎ জলাধার (Panchet Dam) আর অপরদিকে ইতিহাসের পঞ্চকোট রাজ্যের রাজধানী গড় পঞ্চকোটের ধ্বংসাবশেষ ও বিরিঞ্চিনাথের মন্দির। বর্ষার সময় পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে অজস্র জলধারা চোখে পড়ে। তবে মূল ঝরনা দুটি - গড় পঞ্চকোটের ৬০০ ফিট উঁচুতে অবস্থিত গোমুখ ধারা ও বিরিঞ্চিনাথ মন্দিরের কাছে হনুমান ধারা। একসময় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চল। পাহাড়ের গায়ে কয়েকটি গুহাতে আজও সেই নিদর্শন বর্তমান। পাহাড়ের অনেক অংশই এখনও বেশ দুর্গম।
 বড়ন্তি ড্যামের ওপর দিয়ে রাস্তাটা গিয়ে রামচন্দ্রপুর-কিনাইডি-কোটালডি হয়ে সুভাষ রোডের শেষে বরাকর পুরুলিয়া রোডে পড়বে। সেখান থেকে বাঁদিকে ঘুরে রঘুনাথপুর দিকে কিছুটা যাবার পর গোবাগের মোড়। গোবাগ মোড় থেকে পাকা রাস্তা ধরে পাঞ্চেৎ জলাধার দিকের যাবার রাস্তায় ৩ কি.মি. দূরে রাস্তার দক্ষিনে ও পঞ্চকোট পাহাড়ের পশ্চিম দিকে পাহাড় থেকে একটি জলধারা পড়ছে যার স্থানীয় নাম “হদহদি”। হদহদির ১০০ মিটার দূরে মূল রাস্তা থেকে একটি রাস্তা পাহাড়ের ভিতর প্রবেশ করেছে। বহু কাল আগে তৈরি হওয়া পঞ্চকোট পাহাড়ের একটি চূড়াতে যাবার রাস্তাকে কিছু বছর আগে বন দপ্তর সংস্কার ও পূননির্মাণ করেছিল। এক সময়ে গাড়ি যাতায়াতের প্রচেষ্টায় রাস্তাটি তৈরী হলেও দীর্ঘ দিনের অবহেলায় গাড়ি চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে ট্রেকিং এর পক্ষে রাস্তাটি ভাল। পাহাড়ের চড়াই উতরাই পেরিয়ে একদিকে গভীর খাদ নিয়ে পঞ্চকোটের বৈচিত্র্যময় শাল, মহুয়া, কেন্দুর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে রাস্তাটি ৭ কি.মি. দূরে শেষ হয়েছে। গাড়ি থেকে হদহদির কাছে নেমে ৭ কি.মি. ট্রেক করে পৌঁছানো যায় ২১০০ফুট উচ্চতায়। মূল রাস্তা থেকে বেশ কটি পায়ে চলা সুঁড়ি পথে পাহাড়ের এদিক ওদিক চলে গেছে। হদহদি থেকে শুরু করে আবার একই জায়গায় ফিরে আসতে পুরো ট্রেকিংয়ে মোটামুটি চার-সাড়ে চার ঘন্টা সময় লাগে।
যাওয়া – নিকটতম বড় স্টেশন আসানসোল (Asansol) থেকে আদ্রা-আসানসোল প্যাসেঞ্জারে বা আসানসোল-রাঁচি প্যাসেঞ্জারে মাত্র আধ ঘন্টা দূরেই একটি প্রায় নির্জন ছোট্ট রেল স্টেশন, নাম মুরাডি(Muradi)। এই মুরাডি থেকে রিক্সা বা ভাড়া গাড়িতে লাল মাটির উঁচু নিচু পথ পেরিয়ে চলে আসা যায় বড়ন্তি।
থাকা -থাকার জায়গা বলতে হাতে গোনা তিনটি কটেজ - বরন্তি ওয়াইল্ড লাইফ এন্ড নেচার স্টাডি হাট,আকাশমণি রিসর্ট এবং মন পলাশ। সত্যি মন হারিয়ে যায় এদের মাঝে।
তথ্য –সিন্টু ভট্টাচার্য ও চন্দন কুমার রায়
|| ভ্রমণকাহিনি - বনে-পাহাড়ে ||

গড় পঞ্চকোট (Garh Panchkot) - বর্ধমান জেলা আর ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সীমায় পুরুলিয়া জেলায় পাঞ্চেৎ পাহাড়ের কোলে সবুজে ছাওয়া গড়পঞ্চকোট ছোট্ট ছুটির জন্য আদর্শ জায়গা। গড়পঞ্চকোট পাহাড়ের উচ্চতা ৬৪৬ মিটার।
পঞ্চকোট - স্থানীয় নাম পাঞ্চেৎ - প্রাচীন 'রাজচাকলা পঞ্চকোট' রাজ্যের অংশ ছিল। সম্ভবত ৯০ খ্রিস্টাব্দের প্রথমভাগে দামোদর শেখর পঞ্চকোট রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। ঝালদার সরদারদের সহায়তায় আশপাশের বেশ কয়েকটা পরগণাও দখল করেন। শক্তিশালী পাঁচটি বংশ (কোট) -এর থেকে জায়গার নাম হয় পঞ্চকোট।
সিংদেও রাজবংশের ১৫০০ বছরের উত্থানপতনের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে গড়ের ধ্বংসাবশেষ।
পঞ্চকোট পাহাড়ের উল্লেখ পুরাণেও পাওয়া যায়। পঞ্চকোট রাজ্য সম্ভবত তিলকম্পা রাজ্যের অংশ ছিল। তিলকম্পা রাজ্যের রাজধানী ছিল তেলকুপী। পাঞ্চেৎ বাঁধ তৈরির সময় এই গ্রামটি জলের তলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
স্থানীয় মন্দিরগুলিতে পঞ্চরত্ন, জোড় বাংলা, পিরহা প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের স্থাপত্যের নজির দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে পঞ্চরত্ন মন্দিরটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
১৮৭২ সাল নাগাদ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সিং দেও রাজাদের এস্টেট ম্যানেজার হিসেবে কিছুকাল এখানে বসবাস করেছিলেন। সেইসময়েই তিনি 'পঞ্চকোট গিরি', 'পঞ্চকোটস্য রাজশ্রী' এবং 'পঞ্চকোট গিরি বিদায় সঙ্গীত' এই কবিতাগুলি রচনা করেন।
গড়পঞ্চকোট থেকে মোটামুটি দু'কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত পাঞ্চেৎ বাঁধ থেকে অপরূপ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। বাঁধের জলে নৌকাবিহার করা যায়। ২২ কিলোমিটার দূরে বরাকর নদীর ওপর মাইথন বাঁধ। গড়পঞ্চকোটের কাছেপিঠে অন্যান্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে রয়েছে জয়চণ্ডী পাহাড়, মুরাডি লেক, বড়ন্তি, বিহারিনাথ মন্দির ও পাহাড়। জঙ্গল-পাহাড়ে পাখি দেখেও কাটিয়ে দেওয়া যায় সময়।
যাওয়াঃ নিকটবর্তী স্টেশন আসানসোল, বরাকর ও কুমারডুবি। কুমারডুবি (১৯ কিমি) সবচাইতে কাছে কিন্তু যোগাযোগ ভালো বরাকর (২১ কিমি) বা আসানসোল (৪৯ কিমি) থেকে। কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়েও সড়কপথে NH-2 ধরে আসা যায়। স্টেশন থেকে অটো, ট্রেকার বা ভাড়া গাড়িতে গড়পঞ্চকোট।
থাকাঃ পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ণ নিগমের (WBFDC) গড়পঞ্চকোট প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র ও পর্যটকাবাস।

|| ভ্রমণকাহিনি - বর্ষায় গড়পঞ্চকোটে ||

অযোধ্যা পাহাড় (Ayodhya Hill) – পুরুলিয়া জেলার ঝাড়খণ্ড সীমান্তে দলমা পাহাড়ের অংশ অযোধ্যা পাহাড়। উচ্চতা প্রায় ২০০০ফুট। শাল, শিরিষ, মহুয়া, সেগুনে ছাওয়া সবুজ অরণ্যভূমি আর ছোট-বড় পাহাড়ি ঝোরা নিয়ে মনোরম পাহাড়ি পরিবেশ। পাহাড়ের ঢালে আদিবাসী গ্রাম, চাষের ক্ষেত। ট্রেকিংয়ের জন্যই অযোধ্যা পাহাড় বেশি পরিচিত। এর একটা এন্ট্রি পয়েন্ট পূর্বদিকে সিরকাবাদ, অন্যটি পশ্চিমে বাঘমুণ্ডি। দুটি দিক দিয়েই ট্রেকিং করে পাহাড়ে ওঠা যায়।
পাহাড়ে ট্রেকিং করা ছাড়াও ঘুরে নেওয়া যায় ছৌ শিল্পের পিঠস্থান চোড়দা গ্রাম, চাণ্ডিল ড্যাম, পাখি পাহাড়, সীতা কুণ্ড, টুরগা ফলস প্রভৃতি।
যাওয়া– নিকটতম রেলস্টেশন একদিকে পুরুলিয়া(PRR) ও অন্যদিকে সুইসা(SSIA)। সিরকাবাদ হয়ে যেতে চাইলে পুরুলিয়া থেকে বাসে পৌঁছাতে হবে। সিরকাবাদ থেকে ট্রেকিং শুরু। অন্যদিকে হাওড়া-রাঁচি রেলপথে সুইসা পৌঁছে সেখান থেকে ভ্যান বা জিপে বাঘমুণ্ডি হয়ে অযোধ্যা। বাঘমুণ্ডি থেকেও ট্রেক করা যায়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার মাস পুরুলিয়া থেকে অযোধ্যা যাওয়ার সরাসরি বাস পাওয়া যায়।
থাকা – বন দপ্তরের ট্যুরিস্ট বাংলো আছে অযোধ্যা পাহাড়ে। ওয়েস্ট বেঙ্গল কমপ্রিহেনসিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের লজগুলি একেবারে পাহাড়ের মাথায় – ডব্লু বি সি এ ডি সি, এস সি সেন রোড, পুরুলিয়া – ৭২৩১০১, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের বা কৃত্তিবাস আশ্রমেও থাকার ব্যবস্থা আছে। বাঘমুণ্ডি ও বলরামপুরে সেচ দপ্তরের বাংলা আছে – সেচ বিভাগ, পুরুলিয়া।
মেলা – পৌষ সংক্রান্তিতে টুরগা বাঁধে টুসু মেলা বসে। চৈত্র সংক্রান্তিতে অযোধ্যার কাছেই বসে লহরিয়া বাবার গাজন মেলা।

|| ভ্রমণকাহিনি - অযোধ্যা কাণ্ড ||

ঝাড়গ্রাম – শাল, পলাশ, মহুয়া, শিমুলে ছাওয়া রাঙা মাটির রাস্তা বেয়ে বসতির ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে দেখা। গ্রীষ্মে-বর্ষায় রূপ বদলে বদলে যায়। স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে রাজার প্রাসাদ এখন হেরিটেজ হোটেল। তবে প্রাসাদের কিছু অংশ ঘুরে দেখা যায়। শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ঝাড়গ্রাম ডিয়ার পার্ক। স্টেশন থেকে দশ কিলোমিটার দূরে মল্ল রাজাদের ঐতিহাসিক গড় শালবনি। ঝাড়গ্রাম থেকে জঙ্গলমহলের পথে কিছুদূর এসে আরও দশ-এগার কিলোমিটার দূরে জামবনি পেরিয়ে আরও ৫ কিলোমিটার দূরে চিল্কিগড়।
ঝাড়গ্রাম থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে শাল, মহুয়া, সোনাঝুরি, শিরিষের ভরা সংসার বেলপাহাড়ি-র পাহাড়ি টিলাতে। মকর সংক্রান্তিতে টুসু উৎসবের আকর্ষণই আলাদা। বেলপাহাড়ি থেকে আরও ৯ কিলোমিটার এগিয়ে ঘাঘরার কাছে কংসাবতী নদীর ওপর তারাফেনি ব্যারেজ। ঝাড়গ্রাম থেকে ১৮ কিমি দূরে দহিজুড়িতে প্রায় হাজার বিঘার বাগান। ছোট্ট ছুটি কাটানোর জন্য থাকার ব্যবস্থাও আছে। দহিজুড়ি আর বেলপাহাড়ির মাঝে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল শিলদা। চুয়াড় বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই শিলদা। রাজার বাড়ি ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, শিলদা বাঁধ অন্যান্য দ্রষ্টব্য।
বেলপাহাড়ি থেকে ১০ কিমি দূরে তামাজুড়ি থেকে ১৮ কিমি দূরে কাঁকড়াঝোড় ফরেস্ট। শাল, পিয়াল, মহুয়া, সেগুন, আকাশমণিতে ছাওয়া গহীন অরণ্যে দেখা মেলে ভালুক ও বুনো শুয়োরের। কখনও দলমা পাহাড় থেকে নেমে আসে হাতির পাল। তবে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ফরেস্ট বাংলোদুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যাওয়ার আগে পরিস্থিতি ভালোভাবে জেনে যাওয়া উচিত হবে।
যাওয়া — কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রামের দূরত্ব ১৮২ কিমি। হাওড়া থেকে অনেক লোকাল ও মেল ট্রেন যায়। সময়ের দিক থেকে ইস্পাত এক্সপ্রেস, লালমাটি এক্সপ্রেস্, হাওড়া-ঘাটশিলা প্যাসেঞ্জার ভালো।
থাকা — রাজবাড়িতে সরকারি ট্যুরিস্ট লজ, পি ডব্লিউ ডি বাংলো,ফরেস্ট রেস্টহাউস ছাড়াও ডলুং গেস্টহাউস, ঈশানি গেস্টহাউস, যশোদা গেস্টহাউস ইত্যাদি বেশ কয়েকটি বেসরকারি থাকার জায়গা আছে।

ভ্রমণকাহিনি - || রাঙামাটির দেশ ঝাড়গ্রামে ||

শান্তিনিকেতন (Shantiniketan) – ১৮৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বোলপুরের কাছে ২০ বিঘা জমি কিনে শান্তিনিকেতনের সূচনা করেন। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে গড়ে ওঠে বর্তমান শান্তিনিকেতন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। আজও ক্লাস বসে শাল-বকুল-আমগাছের ছায়ায়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে শান্তিনিকেতনের মাটি-আকাশ-বাতাস।
উত্তরায়ণের বিচিত্রা ভবনে গড়ে উঠেছে রবীন্দ্র মিউজিয়াম। ১৯১৩ সালে পাওয়া নোবেল পুরস্কারটি না থাকলেও পুরস্কার পাওয়া অন্যান্য পদক, ব্যবহৃত জামাকাপড়, ছবি, পাণ্ডুলিপি এসব রয়েছে সংগ্রহশালাটিতে। পাশেই রবীন্দ্র ভবন। আর রয়েছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শ্যামলী, পুনশ্চ, উদয়ন, কোনার্ক। অদূরে স্টুডিও চিত্রভানু। বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় মহর্ষির সাধনবেদি ছাতিমতলা। কাছেই ব্রহ্মচর্যাশ্রম। কলাভবনে শোভা পাচ্ছে অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, গগনেন্দ্রনাথের আঁকা ছবি ও ম্যুরাল, রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্য।
উত্তরায়ণ থেকে কিছুটা এগিয়ে বল্লভপুর অভয়ারণ্য বা ডিয়ার পার্ক। শান্তিনিকেতন থেকে ৩ কিমি দূরে শ্রীনিকেতন (Sriniketan) । শান্তিনিকেতন থেকে সিউড়ি হয়ে ৫৯ কিমি দূরে বক্রেশ্বর (Bakreswar) উষ্ণ প্রস্রবণ। পথে পড়বে দুবরাজপুরে মামা-ভাগ্নে পাহাড়
যাওয়া – নিকটতম রেলস্টেশন বোলপুর (BHP)। সড়কপথে সারা ভারতের বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ রয়েছে।
থাকা– পূর্বপল্লী বা ভুবনডাঙায় পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের শান্তিনিকেতন ট্যুরিস্ট লজ। এছাড়া পি এইচ ই, বনদপ্তর, ইরিগেশন, সি ই এস সি, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ও পি ডব্লু ডি-র গেস্টহাউস আছে বোলপুরে। এছাড়া বোলপুর ও শান্তিনিকেতনে বেসরকারি হোটেল ও হলিডে হোম আছে। বক্রেশ্বরে পি ডব্লু ডি-র বাংলো ও বেসরকারি হোটেল আছে।
উৎসব – শান্তিনিকেতনের জন্মদিন ৭ই পৌষকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরে জমে ওঠে পৌষমেলা। তবে শান্তিনিকেতনের সেরা উৎসব মার্চে বসন্তোৎসব। নানান রঙের আবিরে রঙিন হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতনের প্রাঙ্গণ আর মানুষজন।
কেনাকাটা – শান্তিনিকেতনের নানান রকম কুটির শিল্পজাত দ্রব্য কেনা যায়।

ভ্রমণ কাহিনি - বসন্ত উৎসব, ভারতবর্ষ ও একটি ভূতের গল্প || বসন্ত উৎসবে শান্তিনিকেতনে

কামারপুকুর-জয়রামবাটি (Kamarpukur-Jayrambati)– শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব ও সারদা মায়ের স্মৃতিবিজড়িত এই দুটি স্থান হপ্তাশেষের ছোট্ট বেড়ানোর জন্য খুব সুন্দর। কলকাতা থেকে ১০৪ কিমি আর বাঁকুড়া থেকে ৮৫ কিমি দূরে কামারপুকুরের অবস্থান। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি কামারপুকুরে রামকৃষ্ণদেবের জন্ম হয়। ১৯৫১ সালে জন্মভিটাতে রামকৃষ্ণদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। সাদা মার্বেল পাথরে ঠাকুরের অনুপম মূর্তি। শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের প্রবেশদ্বারের কাছে যোগী শিব মন্দির। মঠের বিপরীতে হালদার পুকুর। ডানদিকে লাহাবাবুদের বাড়ি ও পাঠশালা, গোপেশ্বর শিব মন্দির, ভিক্ষামাতা ধনী কামারনীর বাড়ি ইত্যাদি দর্শনীয়।
কামারপুকুর চটি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের পটভূমি গড় মান্দারনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পিকনিক স্পট গড় মান্দারন পর্যটন কেন্দ্র। পথে পড়বে আমোদর নদী। কামারপুকুর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে চাঁদুর শালবন।
কামারপুকুর থেকে ৬ কিমি দূরে সারদা মায়ের জন্মস্থান জয়রামবাটি। ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর সারদামণির জন্ম হয়। তাঁর জন্মভিটায় ১৯২৩ সালে মাতৃমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মন্দিরে রয়েছে মায়ের পাথরের মূর্তি।
মন্দিরের বিপরীতে মায়ের বাসগৃহ। লাগোয়া পুন্যিপুকুর। পুকুরের পাড়ে কুলদেবতা সুন্দরনারায়ণ ও শীতলাদেবীর মন্দির। ১ কিমি দূরে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ মিশন প্রতিষ্ঠিত বিবেকানন্দ মঠ বা নরনারায়ণ মন্দির।
তারকেশ্বর (Tarakeshwar) – আদিনাথ বা শিবের মন্দিরকে ঘিরে খ্যাতি তারকেশ্বরের। মন্দিরটি তৈরি করান রাজা ভারমল্ল। শিবরাত্রি ও চৈত্র সংক্রান্তিতে আর শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবারে অসংখ্য ভক্ত সমাগম হয়। মন্দিরের লাগোয়া দুধপুকুর। মন্দিরে রয়েছেন বাসুদেব ও ব্রহ্মা। লাগোয়া রাজবাড়িটিও দর্শনীয়।
যাওয়া– তিনটি জায়গা যাওয়ার জন্যই সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন তারকেশ্বর। কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকেই বাস যাচ্ছে তারকেশ্বর, কামারপুকুর ও জয়রামবাটি।
থাকা – তারকেশ্বরে থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের তারকেশ্বর ট্যুরিস্ট লজ। দুধপুকুরের পাড়ে তারকেশ্বর মিউনিসিপাল গেস্ট হাউস। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি হোটেল ও ধরমশালা আছে। কামারপুকুরে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠের যাত্রীনিবাসে থাকার জন্য যোগাযোগ : প্রেসিডেন্ট মহারাজ, শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ, কামারপুকুর, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ – ৭১২৬১২। ১ কিমি দূরে জেলা পরিষদের বাংলো। বুকিং – ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার, হুগলী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, চিনসুরা। এছাড়াও বেশ কয়েকটি বেসরকারি লজ রয়েছে।
জয়রামবাটিতে মাতৃমন্দিরের যাত্রীনিবাসে থাকা যায়। বুকিং : অধ্যক্ষ মহারাজ, শ্রীশ্রীমাতৃমন্দির, জয়রামবাটি, বাঁকুড়া-৭২২১৬১। বিবেকানন্দ মিশনের রেস্ট হাউসে থাকতে হলে যোগাযোগ : সেক্রেটারি, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ মিশন, ৭ রিভারসাইড রোড, ব্যারাকপুর, ২৪ পরগনা (উত্তর)।
জয়রামবাটিতেও বেসরকারি ট্যুরিস্ট লজ রয়েছে।
মেলা– শিবরাত্রি ও চৈত্রসংক্রান্তিতে তারকেশ্বরে বাবার মন্দিরকে ঘিরে মেলা বসে যায়। ফাল্গুন মাসে রামকৃষ্ণদেবের আবির্ভাব তিথিতে ১৫ দিন ধরে মেলা চলে কামারপুকুরে। প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় জয়রামবাটিতে পালিত হয় মন্দির প্রতিষ্ঠা দিবস।
খাওয়াদাওয়া – কামারপুকুরে রামকৃষ্ণদেবের প্রিয় সাদা বোঁদে ও জিলিপি চেখে দেখা যায়।
নবদ্বীপ (Nabadwip) – বৈষ্ণব ধর্মের পিঠস্থান নবদ্বীপ। এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। নবদ্বীপ জুড়ে একের পর এক মন্দির আর মঠের সারি। সারাদিন ধরেই চলে দেবতার ভজন। রিকশা ভাড়া করে বা পায়ে পায়ে ঘুরে নেওয়া যায় মন্দিরগুলি। নবদ্বীপ থেকে ঘুরে আসা যায় মায়াপুর, শঙ্করপুর স্যাংচুয়ারি, কৃষ্ণনগর, ফুলিয়া, রানাঘাট প্রভৃতি।
যাওয়া – নিকটতম রেলস্টেশন নবদ্বীপধাম(NDAE) ও কৃষ্ণনগর(KNG)। কলকাতা থেকে কৃষ্ণনগরের দূরত্ব ১০০ কিমি। কৃষ্ণনগর থেকে ন্যারোগেজ লাইনে নবদ্বীপধাম স্টেশনে পৌঁছে ফেরি পেরিয়ে নবদ্বীপে যাওয়া যায় বা সরাসরি বাসে নবদ্বীপে পৌঁছানো যায়।
থাকা – নবদ্বীপধাম স্টেশনের কাছে মিউনিসিপাল ট্যুরিস্ট লজ। এছাড়া শহর জুড়ে নানান বেসরকারি লজ, ধরমশালা ও অতিথিশালা আছে।
উৎসব – নবদ্বীপের প্রধান আকর্ষণ রাস উৎসব। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ধুমধামে পালিত হয় এই রাস মেলা।
খাওয়াদাওয়া – নবদ্বীপের মিষ্টি প্রসিদ্ধ।
কেনাকাটা – ফুলিয়া ও শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি সংগ্রহ করা যায়।
অম্বিকা কালনা (Ambika - Kalna) : ভাগীরথীর তীরে অম্বিকা কালনা। এখানে অম্বিকা দেবীর মন্দির ও তৎসংলগ্ন রাসমঞ্চ উল্লেখযোগ্য। দেবীর নামেই স্থানের নামকরণ হয়েছে। মধ্যযুগের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের বহু নিদর্শন এখানে রয়েছে। একইসঙ্গে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ এবং জৈন সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য অধিকাংশ মসজিদই তৈরি হয়েছিল হিন্দু দেবালয়ের ভগ্নাবশেষ দিয়ে। আবার অনেকের বিশ্বাস, অম্বিকা দেবীর মন্দির আদিতে জৈন মন্দির ও এখানে জৈন দেবতা ছিলেন। কালনার মুসলমান যুগের নিদর্শনগুলি তুর্কী আফগান রাজত্বকালের। এইসময় ইসলাম সংস্কৃতির প্রসিদ্ধ কেন্দ্র হয়ে ওঠে কালনা। পাঁচশ বছর আগে তৈরি ফিরোজ শাহের মসজিদ। শিলালেখ অনুযায়ী, ১৫৩৩ সালে ফিরোজ শাহের আমলে তৈরি। মসজিদের মাথার গম্বুজ ও মিনারগুলি এখন ভেঙ্গে পড়েছে। নসরৎ শাহের মসজিদ এবং মজলিশ সাহেবের মসজিদের খিলান স্থাপত্যশিল্পের উৎকর্ষতা প্রমাণ করে মুসলিম সংস্কৃতির কথা। একইসময় কালনা বৈষ্ণব সংস্কৃতিরও প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে শ্রীচৈতন্য ও নিত্যানন্দের প্রভাবে। রাজা চিত্রসেন ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চারচালাবিশিষ্ট মন্দিরটির গঠনশৈলী অত্যন্ত সুন্দর। দেবী দারুনির্মিত ও চতুর্ভুজা। তারপর প্রতিষ্ঠিত হয় কালনার বিখ্যাত শিবমন্দির। এখানেও ১০৮টি শিবমন্দির রয়েছে এবং মন্দিরের শিবের রঙ শুভ্র। বর্ধমান রাজবংশের আরও বহু কীর্তি আছে কালনায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লালজীর মন্দির ও তার কারুকার্য, কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির ও জলেশ্বর মন্দির। লালজীর মন্দিরে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ। লালজী মন্দিরের টেরাকোটার কাজ প্রাচীন স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন। পঁচিশচূড়া বিশিষ্ট শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরের টেরাকোটার কাজও অপূর্ব।
উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য: ১০৮ শিবমন্দির, প্রতাপেশ্বর মন্দির, রাসমঞ্চ, লালজী মন্দির, কৃষ্ণচন্দ্রজী মন্দির, শ্রী;শ্রী অম্বিকা সিদ্ধেশ্বরী মাতার মন্দির৷
হাতে একটু বেশি সময় থাকলে ঘুরে নেওয়া যায় গোপালজীমন্দির, বিজয়বৈদ্যনাথমন্দির, আমলীতলা, মহাপ্রভুবাড়ি, শ্যামসুন্দরবাড়ি, জগন্নাথমন্দির, অনন্তবাসুদেবমন্দির প্রভৃতি ৷
    পরামর্শঃ  ফোটো তোলার জন্য আদর্শ প্রতাপেশ্বর মন্দিরের টেরাকোটার অলঙ্করণ এবং ১০৮ শিবমন্দিরের অনবদ্য গঠনশৈলী৷ মন্দিরগুলি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে ৷ তবে বেশ কিছু মন্দিরের গর্ভগৃহ দুপুরে অল্প সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়৷ কলকাতা থেকে অম্বিকা কালনা ঘুরে দেখতে রাত্রিবাসের কোনো প্রয়োজন হয়না ৷ নিজেদের গাড়িতে বা ট্রেনে গেলে স্হানীয় রিক্সা ভাড়া করে সমস্ত দ্রষ্টব্যস্হান ভালোভাবে দেখে অনায়াসে সন্ধ্যার মধ্যে কলকাতা ফেরা যায়৷
যাওয়াঃ কলকাতা থেকে লোকাল ট্রেনে অম্বিকা-কালনা পৌঁছানো যায়। সবথেকে ভালো হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে কাটোয়া লোকাল ৷ সড়কপথে কলকাতা থেকে জি টি রোড / দিল্লিরোড ধরে ব্যান্ডেল পৌঁছে সেখান থেকে আসাম-লিঙ্করোড ধরে কালনা প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ৷

ভ্রমণ কাহিনি - কলকাতার কাছেই || আম্বুয়ামুলুকে ||

চন্দননগর (Chandannagar) – কলকাতা থেকে ৩৭ কিমি দূরে অতীতের ফরাসি কলোনি আজকের চন্দননগর। গঙ্গার তীরে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ। নদীর তীরে ভূ-কৈলাসের রানির তৈরি পাথরে বাঁধানো স্ট্র্যান্ড লাগোয়া বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত পাতালবাড়ি। উল্টোদিকে সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট। লাগোয়া চন্দননগর মিউজিয়াম। আর রয়েছে ফরাসি ইনস্টিটিউট, রোমান ক্যাথলিক চার্চ, সমাধিভূমি, দ্যুপ্লে কলেজ (বর্তমানে কানাইলাল বিদ্যামন্দির), রবীন্দ্র ভবন, নন্দদুলাল, বিশালাক্ষী ও দেবী ভুবনেশ্বরীর মন্দির। ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক। ১৩ কিমি দূরে শ্রীরামপুর।
যাওয়া – নিকটতম রেলস্টেশন হাওড়া-বর্ধমান লাইনে চন্দননগর।
থাকা – মিউনিসিপাল গেস্ট হাউস – চন্দননগর পৌরসভা। এছাড়া বেসরকারি কয়েকটি হোটেল আছে।
উৎসব – চন্দননগরের প্রধান আকর্ষণ জগদ্ধাত্রী পুজো। ভদ্রেশ্বর থেকে চন্দননগর পর্যন্ত প্রায় শতাধিক পুজো হয়। আলোর রোশনাইয়ে কেটে যায় রাতের অন্ধকার। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন নিগম ও আই টি ডি সি কন্ডাক্টেড ট্যুরে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো দেখায়।
খাওয়াদাওয়া – চন্দননগরের জলভরা ও ভাপা সন্দেশ বিখ্যাত।
গাদিয়াড়া-গেঁওখালি (Gadiara-Geonkhali) – কলকাতার কাছেই হাওড়া জেলায় হুগলী নদীর তীরে বেড়ানোর মনোরম জায়গা গাদিয়াড়া। এখানে রূপনারায়ণ ও দামোদর নদ হুগলীতে মিশেছে। সমুদ্রের মতো দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি। গাদিয়াড়ায় দেখে নেওয়া যায় ক্লাইভের প্রাচীন দুর্গ ও লাইটহাউসটি। বাঁধের ধারে পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াতেও ভাল লাগে। লঞ্চে নুরপুর হয়ে চলে যাওয়া যায় পূর্ব মেদিনীপুরের গেঁওখালিতে। হুগলী নদীর তীরে আর এক মনোরম পর্যটন কেন্দ্র গেঁওখালি। বেড়িয়ে আসা যায় মহিষাদল রাজবাড়ি থেকে।
যাওয়া– কাছের বড় শহর কলকাতা। নিকটবর্তী রেলস্টেশন বাগনান(BZN)। কলকাতা থেকে বাসে বা ট্রেনে বাগনান হয়ে সেখান থেকে অন্য বাসে গাদিয়াড়া যাওয়া যায়। তবে গাদিয়াড়া যাওয়ার সবচেয়ে ভালো পথ কলকাতা থেকে বাসে নুরপুর পৌঁছে সেখান থেকে লঞ্চে গাদিয়াড়া বা গেঁওখালি যাওয়া।
থাকা – গাদিয়াড়ায় নদীর পাড়ে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের রূপনারায়ণ লজ। এছাড়াও নানান হোটেল ও লজ রয়েছে এলাকা জুড়ে। গেঁওখালিতে হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির ত্রিবেণী সঙ্গম ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স ও সেচ দপ্তরের বাংলো আছে।
|| ভ্রমণ কাহিনি - ভাসছি রঙিন ক্যানভাসে ||

দিঘা-শঙ্করপুর (Digha-Shankarpur) – বাঙালির কাছে সমুদ্র বলতেই ফার্স্ট চয়েস দিঘা। সপ্তাহান্তের ছুটিতে পরিবারের অন্যদের বা বন্ধুদের সঙ্গে হৈ চৈ করা আর সমুদ্রের জলে গা ভেজানোর জন্য হাতের কাছের দিঘা সবারই প্রিয়। হাওড়া থেকে ট্রেন চালু হওয়ায় দিঘায় যাওয়া এখন আরওই সুবিধাজনক হয়ে গেছে। দিঘার সমুদ্র স্নানের উপযুক্ত হলেও সমুদ্র অনেকটা এগিয়ে আসায় কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো হয়েছে পাড়। বাজারের কাছে অনেকটা জায়গা জুড়ে পর্যটকদের স্নানের ভিড় লেগে থাকে। যাত্রী চাহিদা মেটাতে দিঘার সৈকত প্রসারিত হয়েছে ওড়িশা সীমান্তে নিউ দিঘা পর্যন্ত। নিউ দিঘার সৈকতটি তুলনায় প্রশস্ত, ঝাউগাছে মোড়া।
দিঘায় থেকে বেড়িয়ে নেওয়া যায় সর্প উদ্যান, মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম, দিঘা বিজ্ঞান কেন্দ্র, সায়েন্স পার্ক প্রভৃতি।
১৩ কিমি দূরে মৎসপ্রকল্প ও ঝাউবিথিকায় ছাওয়া সমুদ্রতট নিয়ে শঙ্করপুর। বর্তমানে আরও দুটি সমুদ্রসৈকত মন্দারমণিতাজপুর ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দিঘা থেকে জুনপুটের সমুদ্রসৈকতও বেড়িয়ে নেওয়া যায়। আবার চন্দনেশ্বর মন্দির ঘুরে বিশ্রাম নেওয়া যায় তালসারি সমুদ্রসৈকতেও। শেষের দুটি স্পটই কিন্তু ওড়িশায়।
যাওয়া – হাওড়া থেকে বাস পাওয়া তো যায়-ই,  প্রতিদিনই এখন ট্রেন-ও যাচ্ছে দিঘায় (DGHA)। কলকাতার বিভিন্ন জায়গা (ধর্মতলা, লেকটাউন, করুণাময়ী, উল্টোডাঙা, গড়িয়া প্রভৃতি) থেকে সারাদিন ধরেই বিভিন্ন সময়ে দিঘার বাস যাচ্ছে। এছাড়াও আসানসোল, বর্ধমান, দুর্গাপুর, হলদিয়া, মেদিনীপুর ইত্যাদি পশ্চিমবঙ্গের বড় শহরগুলি থেকে দিঘার বাস ছাড়ে।
বাসপথে দিঘা থেকে ১৬ কিমি আগে চাউলখোলায় নেমে ভাড়া গাড়িতে বা ট্রেকারে ৪ কিমি দূরের মন্দারমনি (Mandarmani) সৈকতে পৌঁছনো যায়। দিঘা-কলকাতা সড়কে রামনগর পেরিয়ে চোদ্দমাইল-এ নেমে ভ্যানরিকশায় পৌঁছনো যায় শঙ্করপুর সৈকতে। দিঘা থেকে শঙ্করপুর যাওয়ার জন্য সি এস টি সি-র বাস আছে। দিঘা থেকে বাসে কন্টাই হয়ে পৌঁছনো যায় জুনপুট (Junput)। দিঘা থেকে দূরত্ব ৪১ কিমি। দিঘাগামী বাসে বালিসাই নেমে বাঁয়ে ৩ কিমি দূরে তাজপুর (Tazpur)।
থাকা – দিঘা শহরে ঢোকার মুখে সমুদ্র সৈকত থেকে কিছুটা দূরে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের ট্যুরিস্ট লজ। শহরের শুরুতেই দিঘা ডেভেলপমেন্ট স্কিমের সৈকতাবাস। এছাড়া রয়েছে বেনফিশের হোটেল মীনাক্ষি। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের কলকাতা অফিস থেকেও বেনফিশের হোটেল বুকিং করা যায়। আর ডিরেক্টরেট অব সোশাল ওয়েলফেয়ার-এর কল্যাণ কুটির রেস্ট হাউস। এছাড়াও দিঘা ও নিউ দিঘা জুড়ে নানান সংস্থার হলিডে হোম ও বেসরকারি অজস্র হোটেল রয়েছে।
শঙ্করপুরে বেনফিসের লজ ও অন্যান্য বেশ কিছু বেসরকারি হোটেল আছে। মন্দারমনির সমুদ্র সৈকতের গা ঘেঁষে একের পর এক বেসরকারি হোটেল। জুনপুটে থাকার জন্য রয়েছে জুনপুট রিসর্ট। তাজপুরে থাকার জন্য বেসরকারি হোটেল আছে।
কেনাকাটা– সমুদ্র তীরের স্থানগুলিতে ঝিনুক-শাঁখ-মুক্তোর পসরাই প্রধান।

ভ্রমণ কাহিনি - দিনান্তভ্রমণে দিঘা || ভাললাগার মন্দারমনি

নয়াগ্রাম - বাংলার হারিয়ে যেতে বসা পটচিত্রের শিল্পীদের গ্রাম। হাজার বছরের প্রাচীন এই শিল্পকে আঁকড়ে আজও বেঁচে আছেন মেদিনীপুরের পিংলা ব্লকের প্রত্যন্ত এই গ্রামের বাসিন্দারা।
আগে গান, পরে হয় পট। মূলতঃ দুধরনের পট তৈরি হয় - জড়ানো পট আর চৌকো পট। জড়ানো পটে কোন কাব্য, ঘটনা এইসব চিত্রিত হয়। আর নানান গল্পকথা শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন চৌকো পটে।
যাওয়াঃ নিকটবর্তী রেলস্টেশন বালিচক। বালিচক থেকে বাসে/গাড়িতে নয়াগ্রাম(পিংলা) আধঘন্টার রাস্তা। কলকাতা থেকে সড়কপথে দূরত্ব ১২৫ কিলোমিটার। খড়গপুরগামী বাসে ডেবরায় নেমে সেখান থেকে ময়নার বাসে নয়াগ্রাম।
থাকাঃ স্থানীয় শিল্পীদের বাড়িতে থাকা যায়।
|| ভ্রমণ কাহিনি - ছবিপটের ছায়ানটে ||

সুন্দরবন (Sundarban) – সুন্দরবন বেড়ানোকে দুভাগে ভাগ করা যায় – একদিকে সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের ভগবতপুর, লোথিয়ান দ্বীপ, বনি ক্যাম্প, কলস ক্যাম্প, অন্যদিকে সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের সজনেখালি, সুধন্যখালি, দোবাঁকি থেকে একেবারে বুড়ির ডাবরি পর্যন্ত।
বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ ও বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্ভ্রমণ কাহিনি - দিনান্তভ্রমণে দিঘাদরবন। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার ক্যানিংয়ের দূরত্ব কলকাতা থেকে মাত্র ৪০ কিমি। ১৯৮৯ সালে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ও ১৯৯৭ সালে ওয়ার্ল্ড ন্যাচারাল হেরিটেজ সাইটের তকমা পায় সুন্দরবন। সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভকে গ্লোবাল বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।
সুন্দরবনের খ্যাতি বাংলার বাঘ- রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের জন্য। তবে বাঘ ছাড়াও চিতল হরিণ, নানা প্রজাতির সাপ আর নানান পাখির মেলা সুন্দরবনে। জলে কুমির, কামট, কচ্ছপ।
নামখানা থেকে ২০ কিমি দূরে লোথিয়ান দ্বীপের ভগবতপুরে কুমির প্রকল্প গড়ে উঠেছে। ভগবতপুর থেকে ৩০ কিমি অরণ্যের গভীরে সুন্দরীকাটি ইকো ট্যুরিজম সেন্টার।ঠাকুরান নদী ধরে বঙ্গোপসাগরের কোলের কাছে শেষদ্বীপ চুলকাটি বা কলস দ্বীপ। কলস থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার জলপথে বনি ইকো-ক্যাম্প।
ক্যানিং থেকে অথবা বাসন্তি-সোনাখালি হয়ে লঞ্চে পৌঁছনো যায় সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের সজনেখালিতে। সজনেখালি থেকে ট্যুরিস্ট পারমিশন আর গাইড নিয়ে লঞ্চে ভেসে পড়তে হবে টাইগার রিজার্ভের অন্যান্য জায়গাগুলি ঘুরে দেখার জন্য। সজনেখালিতে ম্যানগ্রোভ ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, ওয়াচটাওয়ার, পাখিরালয়, কুমির পুকুর, কচ্ছপ পুকুর, কামট পুকুর, বনবিবির মন্দির প্রভৃতি দর্শনীয়।
যাওয়া – সুন্দরবনের সবচেয়ে কাছের বড় শহর কলকাতা। নিকটতম রেলস্টেশন নামখানা(NMKA)। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাকদ্বীপ ও নামখানার লোকাল ট্রেন ছাড়ে। কলকাতা থেকে ট্রেন বা বাসে কাকদ্বীপ হয়ে নামখানা। সেখান থেকে লঞ্চে বা নৌকায় সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের দিকটা বেড়িয়ে নেওয়া যায়। সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের দিকে যেতে হলে শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে ক্যানিং পৌঁছে বা কলকাতার বাবুঘাট থেকে বাসে বাসন্তী-সোনাখালি পৌঁছে, সেখান থেকে লঞ্চে উঠতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন ও বিভিন্ন বেসরকারি পর্যটন সংস্থা প্যাকেজ ট্যুরে সুন্দরবন বেড়াতে নিয়ে যায়। বড় দলে গেলে ক্যানিং বা সোনাখালি থেকে নিজেরা লঞ্চ ভাড়া করেও ঘোরা যায়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের চিত্ররেখা ও সর্বজয়া লঞ্চে সুন্দরবন প্যাকেজের ব্যবস্থা রয়েছে।
থাকা – সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ বেড়ানোর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লঞ্চে রাত্রিবাস। তবে সজনেখালিতে থাকার নানান ব্যাবস্থাও আছে। জেটি ঘাটের কাছেই পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের সজনেখালি ট্যুরিস্ট লজ। গোসাবাতে হোটেলেও থাকা যায়। এছাড়া গোসাবা দ্বীপের পাখিরালয় গ্রামে জেলা পরিষদের ট্যুরিস্ট লজ আছে। পি ডব্লু ডি ও সেচ দপ্তরের বাংলোও আছে গোসাবায়। পাখিরালয়ের কাছেই টেগোর সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টের গেস্টহাউস। পাখিরালয়েও বেশ কিছু হোটেল আছে।
নামখানায় থেকে লঞ্চে বেড়িয়ে নেওয়া যায় সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের দিকটা। ভগবতপুরে থাকার তেমন ভাল ব্যবস্থা নেই। তবে কাকদ্বীপ সেচ দপ্তর থেকে সীতারামপুর বাংলো বুক করে রাতে থাকা উচিত হবে। বনি ও কলস ক্যাম্পে থাকতে হলে, বুকিং ও অন্যান্য তথ্যের জন্য যোগাযোগ : ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ডিভিশন, নিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং (৫ তল), কলকাতা-৭০০০২৭।
প্রয়োজনীয় – সুন্দরবন প্রবেশে অনুমতি প্রয়োজন – চিফ কনসারভেটর অব ফরেস্ট, গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল, থার্ড ফ্লোর, পি-১৬ ইন্ডিয়া এক্সচেঞ্জ প্লেস, কলকাতা-৭০০০০১ বা ফিল্ড ডিরেকটর, সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ, ক্যানিং, সাউথ ২৪ পরগনা। বিদেশিদের অনুমতি মিলবে সেক্রেটারি, ডিপার্টমেন্ট অব ফরেস্ট অ্যান্ড ট্যুরিজম, গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল, রাইটার্স বিল্ডিং, কলকাতা-৭০০০০১।
কেনাকাটা – সুন্দরবনের মধু বিখ্যাত। সজনেখালির বিট অফিস থেকে কেনা যায়।
মরসুম – অক্টোবর থেকে মার্চ বেড়ানোর সেরা সময়।
ভ্রমণ কাহিনি - || সুন্দরবনের অন্দরে || সুন্দরবন দর্শন ||

বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জ (Bakkhali- Frazerganj) – কলকাতা থেকে ১৩০ কিমি দূরে পাশাপাশি দুই সমুদ্রসৈকত বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ। বাসস্ট্যান্ড থেকে হাঁটা দূরত্বে ঝাউবীথিকার সবুজ পেরিয়ে সমুদ্রসৈকত। সমুদ্রে জাল ফেলে বাগদা চিংড়ির মীন ধরে জেলেরা। সমুদ্রের ধারে রয়েছে ব্যাক্তিগত উদ্যোগে তৈরি পরপর বসার জায়গা। নীল সমুদ্রে অপরূপ সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত আর জ্যোৎস্না রাত।
বাসস্ট্যান্ডের পিছনে সাঁকো পেরিয়ে বনবিভাগের এলাকায় রয়েছে কুমীর প্রকল্প, কচ্ছপ প্রকল্প আর ডিয়ার পার্ক।
বকখালি থেকে ভ্যানরিকশা ভাড়া করে বেড়িয়ে আসা যায় নামখানা-বকখালি পথে অর্ধেক দূরত্বে পশ্চিমবঙ্গ মৎস উন্নয়ন প্রকল্পের হেনরি আইল্যান্ড থেকে। পথের দুধারে বাংলার গ্রামের চেনা চিত্র। পথে বাইশমাথা খেজুরগাছ পেরিয়ে আরও খানিক এগিয়ে একের পর এক মাছের ভেড়ি। মোট ১৬২টি ভেড়ি আছে। ফিশারিজ-এর বাংলোর পাশে জলাশয়ে নৌকাভ্রমণের ব্যবস্থা আছে। বকখালি থেকে ২ কিমি দূরে ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত। ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যান্ড্রু ফ্রেজার গড়ে তুলেছিলেন এই সৈকতাবাস। তাঁর নামানুসারেই পূর্বতন নারায়ণতলার নতুন নামকরণ হয়। ফ্রেজারের বাংলোটি সমুদ্রের গর্ভে হারিয়ে গেলেও সাহেবী আমলের বাংলোর ধ্বংসাবশেষগুলো আজও অতীতের স্মৃতি বহন করে। ফ্রেজারগঞ্জে রয়েছে বেনফিশের হারবার। হারবারে সার দিয়ে মাছ ধরার নৌকোগুলো দূরযাত্রার প্রস্তুতি নেয়। এখান থেকে নৌকো ভাড়া করে ঘুরে আসা যায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জম্বুদ্বীপ থেকে।
যাওয়া – নিকটতম বড় শহর কলকাতা। রেল স্টেশন নামখানা। কলকাতার ধর্মতলা থেকে ভূতল পরিবহনের বাসে সরাসরি বকখালি পৌঁছনো যায়। বাসে বা ট্রেনে নামখানা পৌঁছে সেখান থেকে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পেরিয়ে, ওপার থেকে বাস ধরে পৌঁছতে হবে ২৫ কিমি দূরে বকখালিতে। কলকাতা থেকে ধর্মতলা-নামখানা রুটে অনেক সরকারি ও বেসরকারি বাস যায়। আর শিয়ালদহ থেকে ট্রেন যাচ্ছে কাকদ্বীপ হয়ে নামখানা। কলকাতা থেকে ফ্রেজারগঞ্জের দূরত্ব ১৩২ কিমি। ১০৫ কিমি দূরে নামখানায় পৌঁছেও হাতানিয়া-দোয়ানিয়া পেরিয়ে বাসে বা ট্রেকারে ২৭ কিমি দূরে ফ্রেজারগঞ্জে পৌঁছানো যায়। বকখালিতে থেকে ঘুরে নেওয়া যায় ফ্রেজারগঞ্জ।
থাকা – বকখালিতে সমুদ্রের কাছেই রাজ্য পর্যটনের ট্যুরিস্ট লজ ও বেশ কয়েকটি হোটেল আছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছে বনদপ্তরের রেস্টহাউস। হেনরি আইল্যান্ডে মৎস্য দপ্তরের বাংলো বুকিং – এস এফ ডি সি, নর্থ ব্লক, বিকাশ ভবন, ফার্স্ট ফ্লোর, সল্ট লেক।
ফ্রেজারগঞ্জে বেনফিশের সাগরকন্যা গেস্টহাউস ও সাগরী কটেজ।
|| ভ্রমণ কাহিনি - বকখালি ভ্রমণ ও একটি রচনা লেখার গল্প ||

গঙ্গাসাগর (Gangasagar) – গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থান তীর্থভূমি গঙ্গাসাগর। ছোটবড় ৫১টি দ্বীপ নিয়ে ৫৮০ বর্গ কিমি জুড়ে সাগরদ্বীপ। গঙ্গার মর্তে আসা ও সগর রাজার পুত্রদের জীবনদানের লোকগাথাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই তীর্থভূমি। কপিলমুনির আশ্রমটি  সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেলেও পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা কপিলমুনির মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে ভক্ত সমাগম হয়। মকর সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় জমে এই সঙ্গমে।
যাওয়া – নিকটতম বড় শহর কলকাতা। রেলস্টেশন কাকদ্বীপ ও নামখানা। কলকাতা থেকে বাসে ঘণ্টা তিনেকের যাত্রায় পৌঁছনো যায় হারউড পয়েন্ট ৮ নম্বর লঞ্চ ঘাটে। ট্রেনে কাকদ্বীপ বা নামখানা পৌঁছেও বাসে বা রিকশায় হারউড পয়েন্ট ৮ নম্বর লঞ্চ ঘাটে পৌঁছনো যায়। সেখান থেকে ফেরি ভেসেলে গঙ্গা পেরিয়ে কচুবেড়িয়া। কচুবেড়িয়া থেকে বাসে বা ট্রেকারে ৩০ কিমি দূরে সাগর। মেলার সময় যাতায়াতের আরও বিশেষ ব্যবস্থা থাকে।
থাকা – গঙ্গাসাগরে থাকার জন্য নানান ধরমশালা ও পান্থনিবাস আছে। এছাড়া, পি ডব্লু ডি, সেচ দপ্তরের ও পাবলিক হেল্থ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাংলো ও পঞ্চায়েতের যাত্রীনিবাস আছে।

কলকাতা (Kolkata)
গঙ্গার পূর্ব পাড়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতা। কলকাতার ইতিহাস বহু প্রাচীন, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মতও রয়েছে। তবে পর্যটকের কাছে কলকাতার আকর্ষণ চিরন্তন।
রবীন্দ্র সেতু – কলকাতায় ঢোকার মুখেই প্রথম যা বিস্ময় জাগায় তা হাওড়া ব্রিজ, এখন রবীন্দ্র সেতু নামেও পরিচিত। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই সেতুটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ক্যান্টিলিভার পদ্ধতিতে তৈরি ব্রিজ। জল থেকে ৩৫ ফুট উঁচুতে ইস্পাতের তৈরি এই ঝুলন্ত সেতুতে ৮টি গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারে। দুপাশে ফুটপাত। রাতে আলোর মালায় সেজে ওঠে হাওড়া ব্রিজ। নদীবক্ষে সে এক অপরূপ দৃশ্য।
বিদ্যাসাগর সেতু – হাওড়া ব্রিজের ওপর থেকে চাপ কমাতে ১৯৯২ সালে ২ কিমি দক্ষিণে তৈরি হয়েছে এশিয়ার দীর্ঘতম ও বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কেবল স্টেড ব্রিজ, গঙ্গার বুকে দ্বিতীয় হুগলী ব্রিজ বা বিদ্যাসাগর সেতু।
শহীদ মিনার – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নেপাল জয়ের স্মারক স্বরূপ ১৮২৮-৩০ সালে ময়দানের উত্তর-পূর্বে ৫২ মি উঁচু অকটারলোনি মনুমেন্টটি তৈরি হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণে নাম বদলে এটি শহীদ মিনার হয়।
ময়দান – শহরের প্রাণকেন্দ্রে সবুজে ঢাকা বিস্তীর্ণ ময়দান বা গড়ের মাঠ। রাজনীতির নেতা-নেত্রী থেকে সাধু-সন্ন্যাসী, নানান পসরা নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা সবারই ঠিকানা ময়দান। সারা বছর নানা রঙের জার্সিতে ফুটবল খেলা আর শীতে ক্রিকেট ব্যাট হাতে ভিড় জমায় ছেলেরা। ময়দানের কাছেই ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ। ময়দানের পশ্চিমে ইডেন উদ্যান, উত্তর-পশ্চিমে হাইকোর্ট ভবন, টাউন হল। টাউন হলের বিপরীতে বিধানসভা ভবন, তার সামনে আকাশবাণী। ময়দানের উত্তরে গভর্নর হাউস বা রাজভবন।
যাদুঘর – এশিয়ার বৃহত্তম মিউজিয়াম ভারতীয় যাদুঘর। চৌরঙ্গী ও পার্ক স্ট্রিটের কাছে জওহরলাল নেহরু রোডে এশিয়া ও ভারতের প্রাচীনতম যাদুঘরটির অবস্থান। মিশরের প্রাচীন মমি থেকে বিরাট উল্কাপিন্ড, তিমির চোয়াল, বৃহদাকার কুমির, কচ্ছপ-কাঁকড়ার ফসিল, বুদ্ধের অস্থির আধার, প্রাচীন মুদ্রা, নানান দুর্লভ ভাস্কর্য ও ছবির সংগ্রহ রয়েছে এখানে। সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা। যাদুঘরের কাছেই ভারতের প্রাচীনতম গ্রন্থাগার এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল। যাদুঘরের লাগোয়া কলকাতা আর্ট কলেজ
এম পি বিড়লা প্লানেটারিয়াম – বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্লানেটারিয়ামটিই জওহরলাল নেহরু রোড ও শেক্সপিয়ার সরণির সংযোগস্থলে অবস্থিত কলকাতার বিড়লা প্লানেটারিয়াম। নির্মাণের দিক থেকে এটিই ভারতের প্রথম প্লানেটারিয়াম। তৈরি হয়েছিল ১৯৬২ সালে। প্রতিদিন বিভিন্ন সময়ে ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দী ধারাভাষ্যে দর্শকদের চোখের সামনে প্রদর্শনীকক্ষে সৌরজগতের চেনা-অচেনা নানান দিক তুলে ধরা হয়।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল – ময়দানের দক্ষিণে ও প্লানেটারিয়ামের উল্টোদিকে শ্বেত পাথরে তৈরি ২০০ ফুট উঁচু কলকাতার তাজ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। চূড়ায় ব্রোঞ্জের পরী। মেমোরিয়ালের অন্দরে ছবি ও মূর্তিতে ব্রিটিশ ভারতের তথা বাংলার নানান স্মারক – টিপুর তরবারি থেকে সিরাজের কামান, ব্রিটিশ শাসনকর্তাদের জলরঙে আঁকা ছবি এসব রয়েছে। রাতে আলো ও ধ্বনির প্রদর্শনীতে দেখে নেওয়া যায় কলকাতার ৩০০ বছরের অধ্যায়।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পশ্চিমে রেসকোর্স
রবীন্দ্রসদন-নন্দন – ময়দানে দক্ষিণ-পূর্বে চৌরঙ্গি ও লোয়ার সার্কুলার রোডের সংযোগস্থলে বাংলার তথা কলকাতার অন্যতম সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র রবীন্দ্রসদন, আকাদেমি অব ফাইন আর্টস ও নন্দন। লাগোয়া শিশির মঞ্চ, বাংলা আকাদেমি সভাঘর, কলকাতা ইনফর্মেশন সেন্টার। বিড়লা প্লানেটারিয়াম ও রবীন্দ্রসদনের মাঝে ক্যাথিড্রাল রোডে ইন্দো-গথিক শৈলীতে তৈরি সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল। আকাদেমি অব ফাইন আর্টস-এর সামনে মোহরকুঞ্জ
রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনের বিপরীতে নেহরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম। নানান দেশের পুতুলের সমাহার মুগ্ধ করে বড়দেরও।
বি বা দী বাগ – লাল দিঘিকে কেন্দ্র করে বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ বা ডালহৌসি স্কোয়্যার। বাগের উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কেন্দ্রীয় দপ্তর রাইটার্স বিল্ডিং, পশ্চিমে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, পাশেই জি পি ও। জি পি ও লাগোয়া পোস্টাল মিউজিয়াম। বাগের দক্ষিণে টেলিফোন ভবন। বি বা দী বাগের উত্তর-পূর্বে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ। চার্চের ডানদিকে কলকাতা পুলিসের সদর দপ্তর লালবাজারভাসমান যাদুঘর – বিশ্বের প্রথম ভাসমান নৌ-বিষয়ক যাদুঘরটি তৈরি হয়েছে কলকাতায় গঙ্গাবক্ষে।
চিড়িয়াখানা – রেসকোর্স ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে খিদিরপুর ব্রিজ পেরিয়ে কলকাতা চিড়িয়াখানা। ভারতের নানান অঞ্চল ও বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা জীবজন্তু নিয়ে ভারতের অন্যতম চিড়িয়াখানা। জালের ঘেরাটোপে সিংহ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, সাদা বাঘ, হাতি, জিরাফ, জেব্রা, নানা প্রজাতির হরিণ, কুমির, কচ্ছপ, বাঁদর প্রভৃতি প্রাণী আর শীতের দিনে লেকের বুকে পরিযায়ী পাখিদের ভিড়। বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
জাতীয় গ্রন্থাগার – চিড়িয়াখানার বিপরীতে ভারতীয় জাতীয় গ্রন্থাগার কলকাতার তথা ভারতের গর্বস্থল। ১৭ লক্ষ বই আর ৫ লক্ষ নথিপত্র রয়েছে লাইব্রেরির সংগ্রহে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্রন্থাগারের দরজা খোলা থাকে।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি – চিৎপুর রোড ও বিবেকানন্দ রোডের সংযোগস্থলে দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনে ঐতিহাসিক জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। ১৮২৩ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি নির্মাণ করান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ও মৃত্যু দুইই এই বাড়িতেই হয়েছিল। কবির লেখার ঘর, দক্ষিণের বারান্দা ও ঠাকুর পরিবারের আরও নানান স্মৃতি এ বাড়ির ইঁটকাঠে। প্রতি বছর ২৫ বৈশাখ কবির জন্মদিনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে ঠাকুরবাড়ির অঙ্গন। গান শুনতে ভিড় জমান রবীন্দ্রপ্রেমীরা। বর্তমানে এখানে মিউজিয়াম ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দপ্তর গড়ে উঠেছে।
অদূরে গঙ্গাতীরে নিমতলা মহাশ্মশানে রয়েছে বিশ্বকবির সমাধিস্থল। আরও উত্তরে কলকাতার বিখ্যাত পটুয়াপাড়া কুমোরটুলি
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ- উত্তর কলকাতার মানিকতলা মোড়ের কাছে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় রোডে সাহিত্য-শিল্পের আর্কাইভ ও পাঠাগার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ। বই, পুঁথি, পান্ডুলিপি, মুদ্রা ও নানান প্রাচীন দ্রব্যের সংগ্রহশালা। রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর প্রমূখদের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অনেক বই এখন সাহিত্য পরিষদেই রাখা আছে।
পরেশনাথ মন্দির- বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে কিছুটা এগিয়ে গৌরীবাড়িতে পরেশনাথ মন্দির। চত্ত্বরে বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে বিভিন্ন জৈন তীর্থঙ্করদের। মন্দিরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, সাদা মার্বেলের বিগ্রহ, মূল্যবান রঙিন পাথর আর কাঁচের কারুকার্য ভারি সুন্দর। জলাশয়ে মাছ খেলা করে। শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ। রাসপূর্ণিমায় বিরাট উৎসব হয় ও ভক্তদের মিছিল বেরোয়। বেলগাছিয়া ব্রিজের কাছে আরেকটি বড় জৈন মন্দির আছে।
কালীঘাটের কালীমন্দির- আদিগঙ্গার পারে কালীঘাটে দেবী কালীর মন্দিরটি ভক্ত আর পর্যটক উভয়ের কাছেই আর্কষণীয়। দেবীর মুখ কালো পাথরে তৈরি। স্বর্ণালঙ্কারে ভূষিতা দেবীর জিভ, হাত ও দাঁত সোনার পাতে মোড়া। মাথায় সোনার মুকুট, হাতে রূপোর খড়্গ। ৫১টি সতীপিঠের মধ্যে কালীঘাট অন্যতম। কালীঘাট মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিমে কেওড়াতলা মহাশ্মশান
ঠনঠনিয়া কালীমন্দির- কলেজস্ট্রিট থেকে শ্যামবাজারগামী বিধান সরণীতে প্রাচীন ঠনঠনিয়া কালীমন্দির। দেবী এখানে সিদ্ধেশ্বরী। মূর্তিটি মাটির। অদূরে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটা
কলেজস্ট্রিট- কলকাতার বিভিন্ন জায়গাতেই ফুটপাত জুড়ে বইয়ের সম্ভার বা বইয়ের দোকান থাকলেও বইপাড়া বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে কলেজস্ট্রিটের চেনা ছবি। রাস্তার উপর সারা দুনিয়ার নামী-দামী আর অভাবনীয় পুরনো ও নতুন বইয়ের এমন নিয়মিত বাজার বোধহয় আর কোথাও নেই।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও এই কলেজস্ট্রিট চত্ত্বরেই। আর বিখ্যাত ইন্ডিয়ান কফি হাউস
নাখোদা মসজিদ - মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে চিৎপুর ধরে দক্ষিণে সামান্য দূরে জ্যাকেরিয়া স্ট্রিটের সংযোগস্থলে নাখোদা মসজিদ। ইন্দো-সেরাসেনিক শৈলীতে লাল বেলে পাথরে গড়া কলকাতার বৃহত্তম মসজিদ। মহরমে জমকালো উৎসব হয়।
আর্মেনিয়ান চার্চ- বড়বাজারের উত্তর-পশ্চিমে আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে প্রাচীন এই আর্মেনিয়ান চার্চটির অবস্থান।
বিড়লা ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল মিউজিয়াম- দক্ষিণ কলকাতায় সৈয়দ আমির আলি এভিনিউ ও গুরুসদয় রোডের সংযোগস্থলে বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিকাল মিউজিয়াম। বিজ্ঞানের নানা মডেল, বিজ্ঞানের নানান কারসাজি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক পাঠাগার এইসব কিছুই এখানকার আকর্ষণ। সোমবার বাদে সপ্তাহের অন্যান্য দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫.৩০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
বটানিকাল গার্ডেন- অবস্থানে হাওড়া জেলার শিবপুরে হলেও কলকাতা দর্শনার্থীদের বেড়ানোর তালিকায় উল্লেখযোগ্য ভারতের প্রাচীনতম এই বটানিকাল গার্ডেন। ২৭০ একর বিস্তৃত এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বাসস্থান। প্রধান আর্কষণ ২৫০ বছরের প্রাচীন বিরাট বটগাছটি। জলাশয়ে বড় বড় কানা উঁচু থালার আকারের বিশাল পদ্মপাতা দেখে চমৎকৃত হতে হয়। বিচিত্র ধরণের গাছের মধ্যে রয়েছে সিসিলি দ্বীপ থেকে আনা জোড়া নারকেল, ব্রাজিল থেকে আনা অনেকগুলি মাথাওয়ালা তালগাছ, ম্যাড ট্রি প্রভৃতি। বাগিচায় নানান রঙের বাঁশ, ফুল ও অর্কিডের সম্ভারও দেখার মতন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গার্ডেন খোলা থাকে।
সল্টলেক- শহরের উত্তর-পূর্বে সাজানো গোছানো সল্টলেক সিটি। সল্টলেকে বিনোদনের অন্যতম স্থান নিক্কোপার্ক। টয় ট্রেন, কেবল কার, ফ্লাইং সসার, মুনরেকার, রোলার কোস্টার রাইড ইত্যাদি অসংখ্য বিনোদনের সম্ভার রয়েছে পার্ক জুড়ে। শীতকালে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা ও গরমে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্ক খোলা থাকে। নিক্কো পার্কের লাগোয়া নলবন ওয়েটল্যান্ড ইকোপার্ক কমপ্লেক্স। রয়েছে জলবিহারের নানারকম ব্যবস্থা। অরোরা স্টুডিওর বিপরীতে নলবন ফুডপার্ক। সল্টলেকের আর এক আর্কষণ করুণাময়ীর কাছে বিকাশভবনের বিপরীতে সবুজে ছাওয়া বনবিতান। লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে। এশিয়ার বৃহত্তম যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনও সল্টলেকেই অবস্থিত।
সায়েন্সসিটি- ই.এম. বাইপাস ও পার্কসার্কাসের সংযোগস্থলে এশিয়ার একমাত্র বিজ্ঞান নগরী। বিজ্ঞানের কারিকুরিতে উপভোগ করা যায় মহাকাশ কিম্বা পৃথিবীর অভ্যন্তরের নানান জীবন্ত দৃশ্য, জুরাসিক অরণ্যের ডাইনোসর, টাইম মেশিন প্রভৃতি আর্কষণীয় ইভেন্টগুলি। সায়েন্স সিটির বিপরীতে এনার্জি এডুকেশন পার্ক।
মিলেনিয়াম পার্ক- হাওড়া ব্রিজ ও দ্বিতীয় হুগলী সেতুর মাঝে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে কে.এম.ভি.-এর তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে গাছ-গাছলিতে ছাওয়া মনোরম পার্ক।
অ্যাকোয়াটিকা- উত্তর কলকাতায় কেষ্টপুরের কাছে কোচপুকুরে ওয়াটার থিম পার্ক অ্যাকোয়াটিকা। এখানে নানারকম বিনোদনের ব্যবস্থা আছে।
দক্ষিণেশ্বর-বেলুড় মঠ- কলকাতার কাছেপিঠে ঘোরার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দর স্মৃতিবিজরিত দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও বেলুড় মঠ ভক্ত ও পর্যটক উভয়ের কাছেই আর্কষণীয়। রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত এই কালীমন্দিরটি বিশেষ প্রসিদ্ধ। শ্রীরামকৃষ্ণের ধ্যানের আসন পঞ্চবটি বেদিটিও দর্শনীয়। কল্পতরুতে এখানে বড় উৎসব হয়।
নৌকোয় গঙ্গা পেড়িয়ে ওপারে বেলুড় মঠ। বাসেও যাওয়া যায়। রামকৃষ্ণ মিশনের মূল দপ্তরও এখানেই। স্বামীজির বাড়ি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র, শ্রীরামকৃষ্ণ মিউজিয়াম, ব্রহ্মানন্দমন্দির, মাতৃমন্দির প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান। বেলুড়ে গঙ্গার তীরের মনোরম পরিবেশ শরীর মন জুড়িয়ে দেয়।
যাওয়া- কলকাতায় প্রধান রেলস্টেশন তিনটি- হাওড়া(HWH), শিয়ালদহ(SDAH)কলকাতা(KOAA) স্টেশন। নেতাজী সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি কলকাতার উত্তরে অবস্থিত। কলকাতা ও তার কাছেপিঠের দ্রষ্টব্যগুলি বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি, মেট্রো বা ভাড়া গাড়িতে ঘুরে নেওয়া যায়।

উৎসব - দুর্গাপুজো থেকে ঈদ, বড়দিন সবই কলকাতার নিজের উৎসব। তবে কলকাতার দুর্গাপুজোর আমেজই আলাদা।

কেনাকাটা- কথায় বলে কলকাতায় পয়সা ফেললে বাঘের দুধও মেলে। সত্যিই, অ্যান্টিক থেকে আধুনিক, বিদেস দ্রব্য থেকে গ্রামীন শিল্পকলা সবই মেলে কলকাতার বাজারে। কলকাতার অজস্র কেনাকাটার জায়গার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল- নিউ মার্কেট,বড়বাজার, ঢাকুরিয়ার দক্ষিণাপণ, সি.আই.টি. রোডে গড়িয়াহাট মার্কেট, চৌরঙ্গী-পার্কস্ট্রিট এলাকায় অকশন হাউস, কলেজস্ট্রিটের বইপাড়া ইত্যাদি আর অজস্র ছোটবড় আধুনিক ম্যল।
খাওয়া-দাওয়া-বাঙালি যা রসনাপ্রিয়, তা কলকাতার অলিতে গলিতে নামীদামী থেকে সাধারণ, পুরনো আর নতুন খাবারের দোকানগুলো দেখলেই বোঝা যায়। তাই কলকাতায় এসে মোড়ের মাথার ফুচকা-তেলেভাজা থেকে চায়না টাউনের রেস্টুরেন্ট কোথাও হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা।
মিষ্টি তৈরিতেও বাঙালিই সেরা। চিত্তরঞ্জন আর কে.সি দাসের রসগোল্লা, ভীমনাগ কিম্বা নকুড়ের সন্দেশের খ্যাতি তো জগতজোড়া।

Album

  • To view this site correctly, please click here to download the Bangla Font and copy it to your c:\windows\Fonts directory.

    For any queries/complaints, please contact admin@amaderchhuti.com
    Best viewed in FF or IE at a resolution of 1024x768 or higher